অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যঅনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছ

সবজি বিক্রি করে গরীবের জন্যে হাসপাতাল বানিয়েছেন যিনি!

স্ত্রী মমতাজ বেগমের প্রতি ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ মুঘল সম্রাট শাহজাহান নির্মাণ করেছিলেন তাজমহল, লোকে সেটাকে ভালোবাসার প্রতীক হিসেবেই জানে। সুভাষিণী মিস্ত্রি বিশাল কোন সাম্রাজ্যের অধিপতি নন, অনেক টাকাপয়সাও নেই তার। কিন্ত যে কাজটা তিনি করেছেন, সেটা হয়তো ছাড়িয়ে গেছে শাহজাহানের ভালোবাসা কিংবা তাজমহলের কীর্তিকেও। বিনা চিকিৎসায় স্বামীকে হারানো এই ভদ্রমহিলা মানুষের বাড়িতে কাজ করে আর সবজি বিক্রি করেই গড়ে তুলেছেন হাসপাতাল, যাতে গরীব মানুষকে বিনা চিকিৎসায় মারা যেতে না হয়!

বারো বছর বয়সে একটা মেয়ের স্কুলে যাওয়ার কথা, বান্ধবীদের সঙ্গে পুতুল খেলার কথা। সেই বয়সে সুভাষিণীকে দাঁড়াতে হয়েছিল ছাদনাতলায়। পুতুলের বিয়ে দেয়ার বয়সে তার নিজেরই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল, সংসার নামের কঠিণ একটা জগতে প্রবেশ করতে হয়েছিল সেই অল্প বয়সে। স্বামীর ভালোবাসায় সেই সংসারজীবনে অভ্যস্তও হয়ে গিয়েছিলেন সুভাষিণী। কিন্ত যখন তার বয়স মাত্র তেইশ, তখনই জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাতটা পেলেন তিনি। ১৯৭১ সালে অসুস্থ হয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা যান সুভাষিণীর স্বামী। হাসপাতালের বারান্দায় বড় অবহেলা পড়েছিল তার দেহটা, টাকার অভাবে ঔষধ কিনতে পারেননি, ডাক্তারদের দেয়া টেস্টগুলোও করানো সম্ভব হয়নি। তাকিয়ে তাকিয়ে শুধু মৃত্যুপথযাত্রী স্বামীর কষ্টটা দেখেছেন সুভাষিণী।

স্বামীর মৃত্যুর পরে চার সন্তানকে নিয়ে পথে নেমে আসতে হয়েছিল তাকে। সংসারে একটা পয়সা আয় নেই, সঞ্চয় বলতে কিছুই রেখে যেতে পারেননি তার দিনমজুর স্বামী। দুমুঠো অন্নের জন্য পরের বাড়িতে ঝি-গিরি থেকে শুরু করে চায়ের দোকানে কাজ, রাজমিস্ত্রির ঢালাইয়ের কাজ, ছাদ পেটানোর কাজ, ধাপায় কয়লা কুড়ানোর কাজ, মাছের ভেড়িতে পানা পরিষ্কার করার কাজ, জমিতে চারা বসানোর কাজ, ধান চাষ—আরও কত কী করেছেন তিনি! তবুও পাঁচজনের সংসার চলছিল না। সারাদিন কাজ করে চালডাল কিনে এনে হাড়িতে চড়াতেন সুভাষিণী, তাতেও পেট ভরতো না সবার। বাধ্য হয়ে এক ছেলেকে অনাথ আশ্রমে দিয়ে দিলেন, তাতে যদি কিছুটা সাশ্রয় হয় সবার!

সুভাষিণী মিস্ত্রি, সবজি বিক্রি করে হাসপাতাল নির্মাণ

এতকিছু করেও যখন পোষাচ্ছিল না, তখন একজনের পরামর্শে কিছু টাকা ধার করে নেমে পড়লেন সবজির ব্যবসায়। কলকাতার বাইরের হাঁসপুকুর থেকে অল্প দামে সবজী কিনতেন সুভাষিণী, তারপর সেগুলো মাথায় করে মাইলের পর মাইল পথ হেঁটে ঢুকতেন শহরে, পার্ক সার্কাসের চার নম্বর ব্রীজ লাগোয়া অস্থায়ী বাজারে বিক্রি করতেন সেসব। প্রতিদিন সেই একই কাজ, বিশাল একটা তরকারীর ঝাঁকা মাথায় করে নিয়ে আসছেন এক মহিলা, নিত্যদিনের দৃশ্য হয়ে উঠেছিল সেটা।

সবজি বিক্রি করে খানিকটা স্বচ্ছ্বলতা এলো, মানে অন্তত খেয়েপরে বাঁচাটা নিশ্চিত হলো। কিন্ত সুভাষিণী তো এতেই থেমে যাওয়ার মানুষ নন। মনের ভেতরে অদম্য একটা স্বপ্নকে লালন করে এসেছেন স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে, গরীব অসহায় লোকজন, যারা টাকার অভাবে দামী ডাক্তার বা হাসপাতালে যেতে পারেনা, সরকারী হাসপাতালের বারান্দায় পড়ে যাদের মৃত্যু হয়, সেই মানুষগুলোকে বিনা চিকিৎসায় মরতে দেয়া যাবে না কোনভাবেই। সেজন্যেই তো নিজে না খেয়ে টাকা জমিয়েছেন এতগুলো বছর ধরে, ছেলেদের ডাক্তারী পড়িয়েছেন, মেয়েদের নার্সিং ইনস্টিটিউটে ভর্তি করেছেন।

জমানো টাকা ভেঙে চব্বিশ পরগণার হাঁসপুকুরে এক টুকরো জমি কিনলেন সুভাষিণী। লোকে জমি কেনে বাড়ি করবে বলে, সুভাষিণী কিনলেন হাসপাতাল বানাবেন বলে, তাও গরীব মানুষের জন্যে! বড় ছেলে অজয় ততদিনে ডাক্তার হয়েছে, তাকে ডেকে নিজের ইচ্ছের কথা জানালেন সুভাষিণী। শুরু হয়ে গেল এতদিনের স্বপ্নপূরণের মিশন। ১৯৯৩ সালে ছোট্ট একটা টিনের ছাউনি দেয়া ঘরে শুরু হয়ে গেল হাসপাতালের কার্যক্রম, গ্রামের মানুষজনের সহায়তায় গঠিত হলো ট্রাস্টি বোর্ড। প্রথম দিনেই আড়াইশোর বেশী গরীব রোগীকে বিনেপয়সায় চিকিৎসা দেয়া হলো, নিজেদের উদ্যোগেই মেডিকেল ক্যাম্প করলেন অজয় আর তার ডাক্তার বন্ধুরা। রোগীদের ভীড় দেখে অজান্তেই সেদিন নিজের চোখে জল এসেছিল সুভাষিণী মিস্ত্রির।

সুভাষিণী মিস্ত্রি, সবজি বিক্রি করে হাসপাতাল নির্মাণ

টিনশেড সেই ঘরটা এখন আর নেই। এক কাঠার ছোট্ট জায়গাটা এখন ছড়িয়ে কত বড় হয়ে গেছে! তিন একরের বিশাল এলাকা জুড়ে হাসপাতাল প্রাঙ্গণ, তার মাঝখানে বিশাল বিল্ডিংটা, নাম রাখা হয়েছে ‘হিউম্যানিটি হসপিটাল’। সুভাষিণীর ছেলে অজয়ই সবকিছু দেখাশোনা করে, আছে অভিজ্ঞ ডাক্তার-নার্স; আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার যেটা, এখানে রোগীদের বিনাপয়সায় চিকিৎসা দেয়া হয়। ঔষধপত্রও সরবরাহ করা হয় হাসপাতালের তরফ থেকেই। অর্থোপেডিক, গাইনো, ইউরোলজি সহ অন্যান্য বিভাগ ও ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থাও চালু হয়েছে এখানে। হিউম্যানিটি হসপিটাল এখন পশ্চিমবঙ্গের গরীব অসহায় রোগীদের সবচেয়ে বড় ভরসাস্থল, দূর-দূরান্ত থেকে রোগীরা আসেন এখানে, এখানকার ডাক্তার-নার্সেরাও চেষ্টা করেন নিজেদের পক্ষে সর্বোচ্চটা করার।

সুভাষিণী মিস্ত্রির বয়স এখন আশি’র ওপরে। তেইশ বছর বয়সে স্বামীকে হারানোর পরে যে সংগ্রামটায় লিপ্ত হয়েছিলেন তিনি, সেটার ফল এখন পাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের গরীব মানুষেরা। পুরো চব্বিশ পরগণা কিংবা গোটা রাজ্যেই সবাই তাকে একনামে চেনে, হিউম্যানিটি হসপিটালের কথা জানে সবাই। শুধু হিউম্যানিটি হসপিটালই নয়, ঘুর্ণিঝড় সিডরের পরে সুন্দরবনের উপকূলীয় এলাকায় পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্যে পঁচিশ শয্যার আরো একটি হাসপাতাল স্থাপন করেছেন সুভাষিণী, এখানেও গরীব রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়া হয়। সুভাষিণীর এই মহৎ কীর্তিকে সম্মান জানিয়েছে তার রাষ্ট্রও, এবছর তাকে প্রদান করা হয়েছে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মাননা।

বাস্তবতা কখনও কখনও কল্পনাকেও হার মানায়। মানুষের বাড়িতে কাজ করে, দিনমজুরি করে, সবজি বিক্রি করে এক-দুই-পাঁচ টাকা করে জমিয়েছিলেন সুভাষিণী। অভাবের তাড়নায় না খেয়ে থেকেছেন, তবু সেই সঞ্চয়ে হাত দেননি কখনও; সেটাকে ‘গরীব মানুষের অধিকার’ হিসেবে আগলে রেখেছেন বছরের পর বছর। অবশেষে হাসপাতাল নির্মাণের মাধ্যমে নিজের স্বপ্নটা পূরণ করেছেন তিনি। অমানবিকতার অন্ধকারে মানবতার ডাকে অসাধ্য সাধন করা সুভাষিণী মিস্ত্রি তো অনন্য একজন, যাকে নিয়ে পুরো মানবসভ্যতাই গর্ব করতে পারে।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close