তারুণ্য

স্টাইল ক্যানভাস- অসাধারণ এক টেইলারিং সার্ভিসের গল্প

মায়ের স্বপ্ন ছিল দুই মেয়েই সরকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বের হবে। সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে অনেক ইচ্ছে, অনেক সুখ বিসর্জন দিতে হয়েছে মা’কে। সন্তানেরাও মায়ের সাধ অপূর্ণ রাখেনি। তাঁর মুখে হাসি ফুটিয়ে নাজিয়া ইসলাম হয়েছেন ডাক্তার, সাদিয়া ইসলাম হয়েছেন ইঞ্জিনিয়ার।

এদেশের প্রেক্ষিতে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়া মানে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়া, নিজের একটা পরিচয় তৈরি করতে পারা। কিন্তু দুই বোনেরই ভাবনা ছিল ভিন্ন। গতানুগতিক পেশার পাশাপাশি দুই বোনেরই ইচ্ছে ছিল ব্যতিক্রম কিছু করে নিজেদের ‘উদ্যোক্তা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার।

কি, অবাক হচ্ছেন? ভাবছেন ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার পর কেউ আবার উদ্যোক্তাও হতে চায় নাকি! খানিকটা পাগলাটেও শোনাবে হয়তো এই পরিকল্পনা। কিন্তু দুই বোনই যে ছিলেন লক্ষ্যে অটুট! কিন্তু কী করবেন তারা? কী অভিনবত্ব আনা যেতে পারে উদ্যোক্তা হিসেবে? সেসবই ভাবতেন দুজন। হঠাৎই একদিন আইডিয়া পেয়ে গেলেন তারা। বলাবাহুল্য, পেলেন সাদিয়া ইসলামের স্বামী।

তিনি বুদ্ধি দিলেন মহিলাদের জন্য ঘরে বসেই টেইলারিং সেবা প্রদানের উদ্যোগ নিতে। অর্থাৎ, আমরা দর্জি দোকানে গিয়ে যেভাবে অর্ডার দেই, ঠিক একইভাবে এই সুবিধা যাতে মহিলারা ঘরে বসেই পান। টেইলার স্বয়ং আপনার বাসা থেকে অর্ডার নিয়ে যাবে, তারপর সেলাইয়ের পর আবার হোম ডেলিভারি দিয়ে যাবে। দারুণ না আইডিয়াটা?

শুরুটা ছিল চ্যালেঞ্জিং, যেহেতু এই বিষয়ে দুজনের কারোরই কোন অভিজ্ঞতা ছিল না। এরকম কোনো সার্ভিসও তখন ঢাকায় চালু হয়নি। ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে দুই বোন অল্প কিছু পুঁজি বিনিয়োগ করে বাচ্চাদের কাপড় বিক্রি করা শুরু করলেন। প্রতিষ্ঠানের নাম দিলেন ‘Style Canvas’। বোনের ডাক্তারি পেশার ব্যস্ততার জন্য সাদিয়া ইসলামকেই সব কিছু পরিচালনা করতে হতো। ইতিমধ্যে তারা চেষ্টা করতে থাকলেন খুব ভাল একটি সেটআপ তৈরি করতে যাতে গ্রাহকদের মানসম্পন্ন সার্ভিস দিতে পারেন। সাদিয়া বলছিলেন,

‘আমি সবসময়ই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম যে কোয়ালিটির ব্যাপারে এক বিন্দুও কম্প্রোমাইজ করব না। এবং অর্ডার কালেকশন ও ডেলিভারি টাইম স্ট্রিক্টলি ফলো করব। কেননা এটাই আমাদের দর্জি দোকানের একটি চিরাচরিত সমস্যা।’

নানা চড়াই-উৎরাই পাড়ি দিয়ে অবশেষে স্টাইল ক্যানভাস চতুর্থ বছরে পদার্পণ করেছে। প্রায় ৩০০ জন কাস্টমারকে নিয়মিত সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটির দক্ষ কর্মীবাহিনী। সাদিয়া উদ্যোগটিকে আর নিতান্তই স্রেফ স্টার্টাপ হিসেবে দেখতে চান না। অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন যেন স্টাইল ক্যানভাসকে সবাই এক নামে চেনে। মনের গহীনে প্রবল আশাবাদ, স্টাইল ক্যানভাস একদিন ব্র্যান্ডে পরিণত হবে।

মা-বাবার প্রতি প্রবল শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতা সাদিয়ার। মা-বাবার ইচ্ছার বিপরীত পেশায় গিয়েও শেষমেশ মা-বাবাকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে পারিবারিক অনুশাসন আর তাদের দেয়া শিক্ষার জন্যই আজ ব্যতিক্রম কিছু চিন্তা করে সেটিকে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। তার দৃষ্টিতে কোন কাজই ছোট নয়, যদি সেটা সৎ উদ্দেশ্য ও মানসিকতা নিয়ে করা হয়।

লোকে বলে সকল সফল পুরুষের পেছনে একজন নারীর ভূমিকা থাকে। কিন্তু সাদিয়ার ভাষ্য ভিন্ন, ‘একজন সফল স্ত্রীর পিছনে একজন স্বামীর ভূমিকা ও সহযোগিতা অপরিহার্য। কারণ স্ত্রীর প্রতিবন্ধকতা বেশি থাকে আমাদের সমাজে। এবং আমার স্বামীর পূর্ন সহযোগিতার কারণেই আজ আমি একজন সফল উদ্যোক্তা।’

স্টাইল ক্যানভাসের ফেসবুক পেজ এই লিংকে

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close