একটার পর একটা ইস্যু আসে। আমরা নিত্যনতুন ইস্যু ধরতে গিয়ে আগের ঘটনার কথা ভুলে যাই বেমালুম। চ্যালেঞ্জিং টাইমের মহড়া চলছে ফেসবুক জুড়ে, নিউজফিড থেকে মোটামুটি উধাও হয়ে গেছে নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের রেশ। রাজধানীর পথেঘাটেও খুব একটা দেখা মিলছে না নাগরিক সচেতনতার, যে সচেতনতা তৈরির জন্যে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী কয়েকটা দিন সবাইকে চোখে আঙুল দিয়ে ট্র‍্যাফিক রুলস শিখিয়ে গিয়েছিল। সেই আগের মতোই ফুট ওভারব্রীজের নীচে দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে সবাই, ফুটপাথে উঠে পড়ছে মোটরসাইকেল।

নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনে যুক্ত থাকা এবং ‘পুলিশের ওপর হামলা ও নাশকতা’র অভিযোগে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইশজন ছাত্রকে গ্রেফতারের পর রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। এদের সবাই ইস্ট ওয়েস্ট, নর্থ সাউথ, সাউথ ইস্ট এবং ব্র‍্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। স্বজনেরা অভিযোগ করেছেন, পুলিশ নাকি তাদের পিটিয়ে আহত করেছেন, আবার পুলিশ বলেছে, আটকের সময় ধস্তাধস্তির কারণে তারা সামান্য আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। এদের কয়েকজনকে তো শিবির আর জঙ্গী বলেও উল্লেখ করেছে পুলিশ! ভার্সিটিগুলোর বেশিরভাগেই এখন সেমিস্টার ফাইনাল শুরু হবার সময়। অথচ ছেলেগুলো এখন পুলিশি হেফাজতে রিমান্ডে আছে! 

গত পরশু আদালতে তোলা হয়েছিল ওদের, সেখানেই পুলিশ রিমান্ডের আবেদন করেছিল। আদালত সেই রিমান্ড মঞ্জুরও করেছে। আদালত প্রাঙ্গনেই কান্নায় ভেঙে পড়েছিল ছাত্ররা, কাঁদছিল তাদের স্বজনেরাও। দড়ি দিয়ে বেঁধে আদালতে আনা হয়েছে ছাত্রদের। অভিযোগ আছে, এই বাইশজনের অনেককেই নাকি বাসার সামনে বা রাস্তা থেকে ভার্সিটির আইডি কার্ড দেখেই গ্রেফতার করা হয়েছে, বেশ কয়েকজনের স্বজনেরা দাবী করেছেন, পুলিশের ওপর তাদের সন্তানেরা হামলা চালায়নি। আর পুলিশের দাবী, বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা বাড্ডা থানার ওসির গাড়ি ভাংচুর করেছেন, এমনকি বাড্ডা পুলিশ ফাঁড়িতে আগুন দেয়ার চেষ্টাও নাকি তারা করেছিলেন!

পুলিশের অভিযোগটাকে সত্যি বলেই মেনে নিলাম। তর্কের খাতিরে ধরলাম এই বাইশজন ছাত্র পুলিশের ওপর হামলায় জড়িত ছিলেন। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, পুলিশের সঙ্গে মিশে থেকে যেসব ‘আততায়ীরা’ সেদিন ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা করলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের অংশটা ভেঙে চুরমার করে দিলো, ইটের টুকরো ছুঁড়ে ছাত্রদের আহত করলো, তাদের কেউ কি গ্রেফতার হয়েছে? ছবিতে কয়েকজন পুলিশের মাঝখানে দাঁড়িয়ে লুঙ্গিপরা যে লোকটাকে ইট ছুঁড়ে মারতে দেখা যাচ্ছে, তাকে কি গ্রেফতার করা হয়েছে? তার রিমান্ডের আবেদন কি কেউ করেছে? 

ধানমন্ডিতে ছাত্রদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে, সেই হামলার সঙ্গে সরকারদলীয় নেতাকর্মীরাই জড়িত ছিলেন বলে বেশিরভাগ সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। আহত ছাত্র-ছাত্রীদের মিছিল লম্বা হয়েছে, আওয়ামীলীগের কয়েকজন কর্মীও আহত হয়েছেন সংঘর্ষে। খুন, আটকে রাখা বা ধর্ষণের গুজব ছড়িয়ে যে হামলা চালানো হলো, সেই গুজব সৃষ্টিকারীদের কয়জনকে ধরেছে পুলিশ? কয়জন রিমান্ডে গিয়েছেন? পত্রিকায় দেখলাম, হোলি আর্টিজানের হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে আটক হওয়া হাসনার করিমকে অব্যহতি দিয়েছেন আদালত। এদেশে হাসনাত করিমেরা ছাড়া পেয়ে যান, আটক হয় শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাই।

সায়েন্স ল্যাবরেটরির মোড়ে এক ফটো সাংবাদিককে এলোপাথাড়ি মেরেছে ‘দুর্বৃত্ত’রা, এই দুর্বৃত্ত কারা, সেটা পুলিশ খুঁজে বের করতে পারছে না কেন? সবার ছবি আছে, ভিডিও আছে, তবুও কেন তারা নাগালের বাইরে? তারা কি মহাপরাক্রমশালী? সাংবাদিকদের ওপর হামলা হয়েছে কয়েকবার, মোবাইল-ক্যামেরা কেড়ে নেয়া হয়েছে, সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। পুলিশি হামলার অভিযোগও এনেছেন কয়েকজন সাংবাদিক। এসব ঘটনায় কি কেউ গ্রেফতার হয়েছে? রোষটা কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ওপর কেন পড়লো তাহলে? ওরা হেলমেট বাহিনীর কেউ নয়, এজন্যেই কি ভাংচুরের সবটুকু দায় ওদের? আর নিরাপত্তাবাহিনীর ছত্রছায়ায় থেকে যারা ত্রাসের রাজত্ব চালিয়েছে, ছাত্র-ছাত্রীদের আহত করেছে, তাদের কোন দোষ নেই? 

জিগাতলা, সায়েন্সল্যাব, হামলা, ছাত্রলীগ, পুলিশ, ছাত্র আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক চাই

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেমিস্টার ফাইনাল শুরু হচ্ছে, কোথাও কোথাও শুরু হয়েও গিয়েছে। সেই সময়টায় এই বাইশজন জেলে বন্দী। ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে বা বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় যে তাণ্ডবলীলা চালানো হয়েছে, সেই ঘটনায় কোন ‘দুর্বৃত্ত’ গ্রেফতার হয়েছে কিনা আমি জানিনা, কিন্ত ছাত্রদের গ্রেফতার করা হয়েছে, রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। এটা কি অবিচার নয়? ছাত্ররা পুলিশের মার খেয়েছে, ক্যাম্পাসের ভেতরে টিয়ারশেলের ঝাঁঝ সয়েছে, রাবার বুলেটের আঘাত সহ্য করেছে, এখন গ্রেফতার, মামলা আর রিমান্ডের বোঝাও সইতে হচ্ছে ওদের, শিক্ষাজীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে মূল্যবান সময়। অথচ শুধু রাজনৈতিক কারণে হয়তো হেলমেট পরিহিত দুর্বৃত্তবাহিনী থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে!

ফিচার্ড ইমেজ কৃতজ্ঞতা- প্রথম আলো

Comments
Spread the love