অনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছতারুণ্য

এমন মায়ের সন্তানেরা হারতে পারে না!

ঘটনাটা গতকালের, সায়েন্সল্যাবের, সময় দুপুর দুইটার আশেপাশে। এক ভদ্রমহিলা বড়সড় একটা বাটি নিয়ে বসে আছেন, সেই বাটিতে খিচুড়ি বা এরকম কিছু আছে। ছেলেমেয়েরা আসছে তার কাছে, তিনি একজন একজন করে লোকমা তুলে খাইয়ে দিচ্ছেন সবাইকে। তিনি একজন মা, তার ছেলে বা মেয়ে হয়তো গলা ফাটিয়ে স্লোগান দিচ্ছে বাকীদের সঙ্গে। সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে তিনিও ছুটে এসেছেন শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যোগ দিতে, এসেছেন সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবী নিয়ে। সেখানেই সব ছেলেমেয়েকে প্রবল স্নেহে নিজের সন্তান বানিয়ে নিয়েছেন তিনি।

সায়েন্স ল্যাবরেটরির পাশেই গ্রীনরোড। সেখান্ব রাস্তায় লাইসেন্স চেক করছিল আইডিয়াল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রীও ছিলেন তাদের সঙ্গে। আর ছিলেন কয়েকজন অভিভাবক। এমনও হয়তো মা আছেন, যিনি নিজের সন্তানকে একা রাস্তায় ছাড়েন না কখনও, স্কুল-কলেজেও একা যেতে দেন না। সেই সন্তান অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে রাস্তায় নামতে চেয়েছে বন্ধুদের সাথে। মা কি করে তাকে বেঁধে রাখেন? তাই তিনিও ছুটে এসেছেন বুকের মানিকের সঙ্গে। 

ছাত্র প্রতিবাদ, শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ, মা, প্রতিবাদ, আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক চাই

ছেলেমেয়েরা একটা একটা করে গাড়ি ছাড়ছে লাইসেন্স দেখে দেখে, আর মায়েরা ফুটপাথে বসে ছিলেন পানির বোতল আর চিপস-বিস্কুট-কেকের প্যাকেট হাতে নিয়ে। কিছুক্ষণ পর ছুটে এসে এসে ছেলেমেয়েদের হাতে খাবার তুলে দিচ্ছেন, বোতলের মুখ খুলে পানি ঢেলে দিচ্ছেন! মায়েরা হয়তো নিজের সন্তান ছাড়া বাকীদের চেনেনও না, জীবনে কোনদিন দেখেনওনি, কিন্ত মায়া আর ভালোবাসার সবটুকু সবাইকে বিলিয়ে দিতে একটুও দ্বিধা করছেন না তারা। এমন অদ্ভুত সব মমতাময় দৃশ্যের অবতারণা গত দুই-তিনদিন ধরেই হচ্ছে রাজধানী ঢাকায়।

ঢাকা শহর এখন উত্তাল নিরাপদ সড়কের দাবীতে। সতেরো-আঠারো বছর বয়েসী কলেজ ছাত্ররা অসাধারণ একটা বিপ্লব করে ফেলেছে। পুরো শহরের ট্র‍্যাফিক সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণ এখন ওদের হাতে। প্রতিটা গাড়ির লাইসেন্স চেক করছে তারা, লাইসেন্স না পেলে ছাড়ছে না মন্ত্রীর গাড়িও! এমনকি পুলিশ আর বিজিবির গাড়িওও আটকে দিচ্ছে তারা। ওদের কথা একটাই, লাইসেন্স ছাড়া এই শহরে একটাও গাড়ি চলবে না। যে কাজটা ট্র‍্যাফিক পুলিশের করার কথা ছিল, সেটা এই বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলো করছে। বিশাল প্রাডো জীপ বা মাইক্রোর সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে ছোটখাটো গড়নের মেয়েটা, বুকের ভেতরে সাহসের জ্বলন্ত একটা আগ্নেয়গিরি লুকিয়ে রেখেছে যে!

একদম লাইন বাই লাইন মেন্টেইন করে গাড়ির সারি তৈরি করছে ওরা। তিন চাকার বাহন এক সারিতে, চার চকার বাহন একপাশে। সাইকেল আর মোটরসাইকেলের জন্যে আলাদা একটা ছোট লেন তৈরি করা হয়েছে। আরেকটা লেন আছে, তবে সেটা ফাঁকাই থাকে প্রায়। সেটাকে আপনি ভিআইপি লেনও বলতে পারেন। 

ছাত্র প্রতিবাদ, শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ, মা, প্রতিবাদ, আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক চাই

তবে কাগজে কলমে সেই লেনের নাম ইমার্জেন্সি লেন, সেটা বিশ্বের সব উন্নত দেশগুলোতে আছে, কিন্ত বাংলাদেশে কোনদিন হবে, এমনিটা বোধহয় কারো ভাবনাতেও ছিল না। এই লেন দিয়ে জরুরী যানবাহনগুলো যাবে, সেটা অ্যাম্বুলেন্স হতে পারে, সেটা ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি হতে পারে, সেটা পুলিশের গাড়িও হতে পারে। এই কিশোর-কিশোরীদের কল্যানে এমন অভাবনীয় দৃশ্যও দেখে ফেলেছি আমরা!

রোদে পুড়ছে, বৃষ্টিতে ভিজছে ওরা। সারাদিন না খাওয়া, কেউ হয়তো পানির বোতলটা এগিয়ে দিচ্ছে, একটা বাটারবান ভাগ করে তিনজন খাচ্ছে, তবুও ছেলেগুলো রাজপথ ছাড়ছে না, সবগুলো দাবী মেনে নেয়ার আগে রাস্তা ছাড়বে না বলে ঘোষণাও দিয়েছে। পুলিশ মারছে, পরিবহন শ্রমিকেরা মারছে, কলেজ থেকে টিসির ভয় দেখানো হচ্ছে, তবুও ছেলেগুলো দমে যাচ্ছে না। ওদের বাবা-মায়েরা যে ওদের পাশে আছেন ছায়া হয়ে, ভরসার বিশাল এক আশ্রয়স্থল হয়ে।

এই আন্দোলনটার সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গাই বোধহয় এটা। এই যে বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েরা রাস্তায় নেমে এসেছে, পুরোটা শহর ওরা কি দারুণভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে, পুলিশ বা ট্রাফিক পুলিশও যেটা ওত বছরে করতে পারেনি কোনদিন, সেটা ওরা তিন দিনে করে দেখিয়েছে। ওদের পেছনে শক্তি হয়ে আছেন অভিভাবকেরা। রাস্তায় ছাত্র-ছাত্রীদের পাশে তারাও শামিল হচ্ছেন, স্লোগান দিচ্ছেন, প্ল্যাকার্ড হাতে তারাও দাঁড়াচ্ছেন, খাবার কিনে দিচ্ছেন, কেউবা মুখে তুলে খাইয়ে দিচ্ছেন। সেই ভালোবাসা আর মমতাকে সঙ্গী করে ছেলে-মেয়েরা নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ছে আন্দোলনে। মিরপুরে আজ অভিভাবকেরা মিলে মানববন্ধনও করেছেন। 

ছাত্র প্রতিবাদ, শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ, মা, প্রতিবাদ, আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক চাই

আদমজী ক্যান্টনমেন্ট স্কুল এন্ড কলেজের এক শিক্ষার্থীর মা ফেসবুকে জানতে চেয়েছেন, সেকেন্ড ইয়ারে কোন ছাত্রকে টিসি দেয়া হলে তার অন্য কলেজে ভর্তির কি ব্যবস্থা, সেটা জানতে। তার মোবাইলে কলেজ থেকে মেসেজ পাঠানো হয়েছে, কোন ছাত্রকে রাস্তায় পাইয়া গেলেই টিসি দেয়া হবে। সেটার ভয়ে তিনি ছেলেকে ঘরে বেঁধে রাখতে চাননি। ছেলেমেয়েরা বেঁচে থাকার জন্যে আন্দোলন করছে, জীবনের নিরাপত্তার দাবীতে আন্দোলন করছে। সামান্য টিসি দেয়ার হুমকিতে তিনি ভয় পাননি, ছেলেকে রাস্তায় পাঠিয়ে দিয়েছেন।

এই মায়েরা জানেন না, আগামীকাল তার ছেলেটাকে স্কুল-কলেজে পাঠালে সে সুস্থ-স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারবে কিনা। মীম বা রাজীবের জীবন কেড়ে নিয়েছে ঘাতক বাস, এমন করুণ পরিণতি যাতে আর কাউকে বরণ করে নিতে না হয়, সেজন্যেই হাজার হাজার ছাত্র আন্দোলন করছে শহরজুড়ে। তারা জীবনের নিরাপত্তা চায়, শহরটাকে মৃত্যুকূপ হতে দিতে ওদের ভীষণ আপত্তি। আমি জানি, এই আন্দোলনে ওরা সফল হবেই হবে, ওদের মাথার ওপরে ছায়া হয়ে ওদের মায়েরা আছেন, অভিভাবকেরা আছেন, এই ছেলেমেয়েগুলো হারতে পারে না, কোনভাবেই না!

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close