ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

শিক্ষামন্ত্রী কীভাবে এই দায় এড়িয়ে যান?

নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময়টিতে দেশের মানুষের মনস্তত্ত্ব ও চিন্তাধারার এক নতুন রূপের দেখা পাওয়া গেল। মুহম্মদ জাফর ইকবাল কিংবা আয়মান সাদিকরা কেন শিক্ষার্থীদের এই যৌক্তিক আন্দোলন নিয়ে কথা বললেন না, একাত্মতা ঘোষণা করলেন না, কিংবা করলেও এত দেরিতে কেন করলেন, এ সকল বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে হাজার হাজার পোস্ট দেখা গেছে।

যারা এইসব পোস্ট লিখেছেন, তাদের বক্তব্য হলো, জাফর ইকবাল স্যার কিংবা আয়মান সাদিকরা যেহেতু দেশের সাধারণ শিক্ষার্থী বা ছাত্রসমাজের প্রতিনিধিত্ব করেন, তাই তাদের এ ব্যাপারে মুখ খোলা আবশ্যক। যেহেতু তারা সময়মত তা করেননি, তাই তারা বিশাল বড় অপরাধ করে ফেলেছেন। একদিকে অগণিত মানুষ যেমন জাফর ইকবাল স্যারের গায়েবানা নামাজের ইভেন্টে গোয়িং দিয়েছে, তেমনি আয়মান সাদিকের ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলে চলেছে সমানে আনলাইক ও আনসাবস্ক্রাইব। সবমিলিয়ে দারুণ একটি খেলাতেই মেতে উঠেছিল মানুষ।

আয়মান সাদিক, ১০ মিনিট স্কুল, অনলাইন স্কুল, 10 minute school

কিন্তু অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করে দেখলাম, সবচেয়ে বেশি যে মানুষটির এই আন্দোলনের ব্যাপারে নিজের একটি ‘স্ট্যান্ড’ নেয়া উচিৎ ছিল, শিক্ষার্থীদের কাঁধে ভরসার হাত রাখার কথা ছিল, সেই মানুষটি শুরু থেকেই ছিলেন আশ্চর্য রকমের নীরব। অথচ তারই তো অন্য যেকোন মানুষের আগে সরব হওয়া উচিৎ ছিল। বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর সাথে সাথেই তার উচিৎ ছিল এ ব্যাপারে বিবৃতি দিয়ে ন্যায়বিচার দাবি করা এবং অফিসিয়ালি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপর চাপ দেয়া। কিন্তু সে-সব কিছুই তাকে করতে দেখিনি আমরা। একটি লম্বা সময় পর্যন্ত মুখে কুলুপ এঁটে বসে ছিলেন তিনি। এবং শেষমেষ তিনি যখন মুখ খুলতে আরম্ভ করলেন, তার তখনকার বক্তব্যগুলোও সব ছিল শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে।

এমনকি এখনও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২ জন শিক্ষার্থীকে পুলিশ বন্দি করে রিমান্ডে নিলেও, তাদের হয়ে কথা বলার বদলে এই বিশেষ ব্যক্তিটি বলছেন, তাদেরকে নাকি কোন রকমের ছাড় দেয়া হবে না! বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন উপাচার্য তার কাছে এই শিক্ষার্থীদের সাধারণ ক্ষমার অনুরোধ জানালেও, তা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন তিনি। কিন্তু তারপরও এই ব্যক্তিকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক আনাও লেখালেখি হয়নি, যতটা হয়েছে জাফর ইকবাল স্যার কিংবা আয়মান সাদিককে নিয়ে।

যার ব্যাপারে কথা বলছি, তিনি হলেন আমাদের দেশের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। যেহেতু তিনি দেশের শিক্ষামন্ত্রী, তাই বলা চলে তিনি দেশের সকল শিক্ষার্থীর- তা তারা সাধারণই হোক কিংবা নির্দিষ্ট কোন দলের অনুসারী! তাদের সকলের অভিভাবক তিনি। অথচ তারপরও তিনি এই শিক্ষার্থীদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন না। শিক্ষামন্ত্রী হওয়ার চেয়েও রাজনৈতিক পরিচয়টিই তার কাছে বড় হয়ে দাঁড়াল। সুতরাং জাফর ইকবাল স্যার কিংবা আয়মান সাদিকের বদলে আমাদের কি এই ব্যক্তিকে নিয়েই বেশি সমালোচনায় মুখর হওয়া উচিৎ ছিল না? তিনি যেহেতু আমাদের অভিভাবক, তাই শিক্ষার্থী হিসেবে আমাদের দাবি-দাওয়া আদায়ের জন্য অন্য কারও বদলে এই ব্যক্তির কাছেই কি সকল আবদার পেশ করা উচিৎ ছিল না? কিন্তু আমরা তা করলাম না। সরাসরি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে যোগাযোগ ও প্রভাব রয়েছে এমন একজন ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে আমরা মেতে রইলাম এমন কয়েকজন ব্যক্তিকে নিয়ে, যাদের হাতে মূলত কোন ক্ষমতাই নেই!

যাইহোক, চলুন এবার একটু খতিয়ে দেখা যাক শিক্ষার্থীদের ন্যায্য আন্দোলনের ব্যাপারে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য কী-রকম ছিল। প্রথম তিনি আন্দোলনের ব্যাপারে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন ৫ আগস্ট। সেদিন তিনি শিক্ষার্থীদের প্রতি আন্দোলন বন্ধ করে ক্লাসে ফিরে যাওয়ার আহবান জানিয়ে বলেন, “মিথ্যা গুজবে শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। কোনো কোনো মহল এর সুবিধা নিতে পারে। তাই শিক্ষার্থীদের এখন ক্লাসে ফিরতে হবে, ঘরে ফিরতে হবে। তাদের দাবি সরকার মেনে নিয়েছে। তার বাস্তবায়নে কাজ চলছে।” এরপর তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের উদ্দেশ্য করে বলেন, “শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের বোঝাতে হবে। প্রধান শিক্ষক হয়ে যদি শিক্ষার্থীদের বোঝাতে না পারেন তাহলে প্রধান শিক্ষক হয়েছেন কেন?”

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ হেলমেট

শিক্ষামন্ত্রী নিজেও হয়ত জানেন না, তার এই বক্তব্য ঠিক কতটা হাস্যকর। যেখানে তিনি নিজেই শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিজের কাজ সঠিকভাবে করতে ব্যর্থ, শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষায় যার কোন মাথাব্যথাই নেই, যার মন্ত্রিত্বকালে দেশে পিএসসি থেকে শুরু করে এইচএসসি পর্যন্ত সকল পাবলিক পরীক্ষায় অবাধে প্রশফাঁস ও গোল্ডেন এ প্লাসের বাণিজ্য চলে এসেছে, যে মানুষটি প্রকাশ্যে সরকারি কর্মকর্তাদের বলেন সহনশীল মাত্রায় ঘুষ খেতে, সেই মানুষটিই কিনা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন! আজ যদি তার সামনে দাঁড়িয়ে কোন কোমলমতি শিক্ষার্থীর অতি নিরীহ প্রশ্ন হয় এমন যে, “শিক্ষামন্ত্রী, আপনি তো প্রশ্নফাঁস আটকাতে পারেন না, এমনকি দেশের কোথাও কোন প্রশ্নফাঁস হয়েছে বলে স্বীকারও করেন না। আপনি তাহলে শিক্ষামন্ত্রী হয়েছেন কেন?” শিক্ষামন্ত্রী কি পারবেন এই প্রশ্নের সদুত্তর দিতে? জানি, পারবেন না তিনি।

তবে সে আলাপ আপাতত মুলতবি রাখি। পুরনো কাসুন্দি এখন না-ই বা ঘাঁটলাম। তারচেয়ে বরং ফিরে আসি বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায়। জাফর ইকবাল স্যার পর্যন্ত আজ তার কলামে লিখেছেন, “প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ক্ষমা করে দিলে কী এমন ক্ষতি হতো?” এখানে একটি বিষয় বলে রাখা ভালো যে, ‘ক্ষমা করে দেয়া’ বিষয়টির সাথে আমি একমত নই। ওই শিক্ষার্থীরা কি আদৌ কোন অপরাধ করেছে যে তাদেরকে ক্ষমা করতে হবে? তারা তো অতি যৌক্তিক একটি দাবি নিয়েই রাস্তায় নেমেছিল। বরং তথাকথিত সরকারদলীয় পেটোয়াবাহিনীই তাদের উপর হামলা চালিয়েছে। সুতরাং তাদের সাথে ক্ষমা করে দেয়ার বিষয়টি একদমই প্রাসঙ্গিক নয়। তবু তর্কের খাতিরে এটিকে আমরা গ্রহণ করছি, কারণ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যাওয়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরাও শিক্ষামন্ত্রীর কাছে অনুরোধকালে এই ক্ষমা শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন।

কিন্তু জবাবে শিক্ষামন্ত্রী কী বললেন? তিনি বললেন, “আমরা কে মাফ করে দেওয়ার? এটা আইন দেখবে।” অর্থাৎ তিনি দেশের ছাত্রসমাজের অভিভাবক হয়েও তাদের এই চরম দুঃসময়ে তাদের দায়িত্ব নিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানালেন। তার এমন বক্তব্যে সচেতন মহলের সকলেই খুবই হতাশ। শুধু হতাশ বললে ভুল বলা হবে; তারা ক্রুদ্ধ ও রাগান্বিতও। যেমন মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল তো বলেই দিয়েছেন, শিক্ষামন্ত্রীর মুখে এমন কথা একেবারেই মানায় না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, “আমি ভীষণভাবে বিচলিত বোধ করেছি যে নাহিদ ভাইয়ের মতো মানুষ, যার সাথে আমরা রাস্তায় হেঁটেছি, ঊনসত্তরে গণআন্দোলন করেছি, মুক্তিযুদ্ধ করেছি, তিনি বলছেন এই ছাত্রদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। নাহিদ ভাইয়ের মুখে এ কথা মানায়? যদি নাহিদ ভাইয়েরা এ রকম কথা বলে, তাহলে আমরা কার কাছে যাব? এমন অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে যে, আমাদের আর কারও কাছে যাওয়ার সুযোগ থাকছে না।”

একই প্রশ্ন এই মুহূর্তে আমাদের ছাত্রসমাজের সকলেরই। স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রীই যখন এমন কথা বলেন, নিজ দায়িত্ব পালনের বদলে সরকারি ও দলীয় স্বার্থকেই বেশি প্রাধান্য দেন, তখন আমরা কার কাছে যাব? কার কাছে আমাদের দাবি উত্থাপন করব?

আরও পড়ুন-

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close