রফিক এই মুহুর্তে তার আম্মাকে নিয়ে হাসপাতালে। তার আম্মার পেপটিক আলসারের সমস্যা বিকট আকার ধারণ করেছে। গতকাল রাতে পেট ব্যাথা, বমি করে খুব খারাপ অবস্থা। ভোর বেলায় সেহেরি করেই চলে এসেছে তাই হাসপাতালে।

– রফিক।
– আম্মা বলেন। 
– সারাটাদিন কি দেখস এই মোবাইলটাতে, তুই বল তো আমারে! 
– আপনে বুঝবেন না আম্মা। কিছু খাবেন?
– অল্প কইরা ভাত আন।
– ভাত হাসপাতাল থেইকাই দিবো। 
– তাইলে ইট্টু কইরা স্যুপ আন।

রফিক মোবাইল পকেটে ঢুকাতে ঢুকাতে বের হয় বাইরে। গতকাল সে একটা ভিডিও শেয়ার দিয়েছে। ৩২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর এর নির্দেশে লালমাটিয়া এলাকায় মাইকিং করা হচ্ছে যেনো সব খাবার দোকান, টং এর দোকান সব বন্ধ রাখা হয় দিনের বেলায়। সেই ভিডিওটা ‘বাঘের বাচ্চা’ লিখে শেয়ার দিয়েছিলো সে, ১৮০০ লাইক আর দুশো কমেন্ট! দেখেই ভালো লাগছে।

রাস্তায় এসে সে প্রকৃত অর্থেই বোকা বনে গেলো! একটা খাবারের দোকানও খোলা নেই। রিকশা নিয়ে পুরো এলাকা চক্কর দিলো, কোন দোকান খোলা নেই। সে হাসপাতালের ক্যান্টিনে গেলো, ক্যান্টিন বন্ধ। ছোলা সিদ্ধ দিয়েছে, ইফতারীর জন্য। সে শুকনা মুখে জিজ্ঞাসা করলো, ‘ভাত কি হইছে? আমার আম্মা অসুস্থ, উনার একটু আগে আগে খাওয়া দরকার’। ক্যান্টিনের লোকটা হতাশ হয়ে বললো, ‘বাবুর্চি চলে গেছে। বলছিলাম অল্প স্বল্প করে রান্না করতে। সে বললো, রোজা রেখে এই কাজ করতে পারবে না। আমিও বেশী জোড়াজুড়ি করি নাই ভাই। চিপস আছে, চিপস নিয়া যান।’

কয়েকটা নাস্তিকের বাচ্চা ফেসবুকে বারবার লিখছিলো, যারা অসুস্থ, যারা অমুসলিম তারা কোথায় খাবে, তারা কিভাবে না খেয়ে থাকবে। তখন গালিগালাজ করে আজকে নিজে এই ঝামেলায় পরবে, রফিক স্বপ্নেও ভাবেনি। রফিক তার কলেজ জীবনের এক হিন্দু বন্ধুকে ফোন দেয়, কলেজ জীবনে এই বন্ধুকে ওরা ‘আকাটা’ বলে ক্ষেপাতো।

রোজা, সংযম, রোজাদার

– কি রে এতোদিন পরে হঠাত? 
– একটা দরকারে ফোন দিলাম।
– বল।
– আম্মা অসুস্থ খুব।
– খালাম্মা কই?
– হাসপাতালে। তোদের বাসা থেকে একটু ভাত দিতে পারবি?
– আকাটাদের ভাত খাবি? পাপ হবে না তো?

রফিক চুপ করে থাকে, আস্তে করে বলে, ‘না। তুই বক্সে ভর। আমি আসতেছি’।

(এইটা শুধুই একটা গল্প। কোন হাসপাতালেই এরকম হওয়া সম্ভব না। বোঝানোর জন্য লিখলাম যে অসুস্থ, নন-মুসলিমরাও মানুষ। জোর করে তাদেরকে না খাইয়ে রাখাটা কোন ভাল কাজ হতে পারে না। আর ৩২নং ওয়ার্ডের ঘটনাটা সত্যি। সেখানে আসলেই দোকান বন্ধ রাখবার জন্য মাইকিং করা হয়েছে। আমি খালি চিন্তা করি, আমরা রোজা রাখি, হোটেল – খাওয়ার দোকান খোলা থাকলে আমাদের সংযমের বারোটা বেজে যায়! আর আমাদের আম্মারা যুগযুগ ধরে রোজা রেখে রান্নাঘরে একের পর এক রান্না করে যায়, উনাদের সংযমে কোন সমস্যা হয় না।)

Comments
Spread the love