সবার রক্ত লাল, তাঁর রক্তও লাল। সবার চামড়া হয় সাদা নয় কালো বা এর মাঝামাঝি, কিন্তু তাঁর চামড়া লাল। কারো হৃদয়ের কোনো রং হয় না, তাঁর হৃদয়ের রং লাল। সবার জীবনের রং একেকসময় একেকরকম হয়, তাঁর জীবনের রং সবসময়ই লাল।

১৯৮০ সালের ৩০ মে ইংল্যান্ডের মার্সিসাইডের হুইনস্টনে জন্ম নেয়া বাচ্চাটি মাত্র ৯ বছর বয়সেই মার্সিসাইড তথা ইংল্যান্ডের সেরা ক্লাব লিভারপুলের একাডেমিতে জায়গা পেয়ে গেল। ছেলেটার নাম স্টিভেন জেরার্ড। ১৯৯৭ সালের ৫ নভেম্বর লিভারপুলের হয়ে প্রথম প্রফেসনাল কন্ট্রাক্ট করার সাথে সাথেই হয়তো ঠিক হয়ে গিয়েছিল এই ছেলে একদিন মহীরুহ হবে। হলোও তাই।

১৯৯৮ সালের ২৯ নভেম্বর প্রিমিয়ার লিগে ব্ল্যাকবার্ন রোভার্সের বিপক্ষে অভিষেক ঘটল স্টিভেনের। সেই থেকে শুরু। লিভারপুলের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে উঠলেন জেরার্ড। জেরার্ড মানেই লাল, জেরার্ড মানেই লালের উচ্ছাসে ভেসে যাওয়া তারুণ্যের উদ্দমীপনা, জেরার্ড মানেই লিভারপুল।

জেরার্ড যখন লিভারপুলে যোগ দেন তখন লিভারপুলের সুদিন অনেক আগেই পিছনে পড়ে গেছে, আগের সেই দোর্দন্ড প্রতাপ ছিল না, ১৯৯২ সালে প্রিমিয়ার লিগ নামকরণ হবার পর থেকে ছিল না কোনো শিরোপা, এখনো নেই তবে তাতে জেরার্ডের থেকে প্রিমিয়ার লিগ ট্রফিটারই আক্ষেপ বেশি হবার কথা। লিভারপুলের হয়ে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ড করেই বিদায় নিয়েছেন স্টিভি জি।

লিভারপুলের লালের সাথে নিজেকে এতটাই বিলিয়ে দিয়েছিলেন জেরার্ড যে ২০০৫ সালে চেলসি তাঁদের ক্লাব রেকর্ড সাপ্তাহিক ১ লাখ পাউন্ডে তাঁকে দলে টানতে চাইলেও জেরার্ড সোজাসুজি না বলে দিয়েছিলেন।

২০০৫ এর চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল কিংবা ২০০৬ সালের এফএ কাপের ফাইনালগুলো ছিল জেরার্ডময়। লিভারপুলকে শুধু খেলোয়াড় হিসেব নয় বরং পরামর্শক, নেতা কিংবা ব্যক্তিত্ব দিয়েও প্রভাবিত করে গেছেন পুরোটা ক্যারিয়ার। ব্যক্তি জেরার্ডের মহিমা এতই বেশি যে তাঁর একটি কথায় জেগে উঠত পুরো দল। প্রতি মৌসুমে নতুন খেলোয়াড় আসতো দলে, চলেও যেতো কয়েকজন।

কিন্তু জেরার্ড থেকে গেছেন জেরার্ডেই। নতুনদের সাথে পুরোনোদের সম্পর্ক মজবুত করার দায়িত্ব নিজের কাঁধেই তুলে নিয়েছিলেন স্বেচ্ছায়। আর তাতে কি দারুণভাবেই না সফল স্টিভি! স্টিভির লিভারপুলকে কখনো বিতর্ক ছুঁতেও পারেনি। একজন নেতা জেরার্ড ছিলেন বটবৃক্ষের মতোই, যিনি শত ঝড়েও নিজে সব ঝাপটা সহ্য করে দলের শাখা-প্রশাখা গুলোকে নিরাপদ ছায়ায় রেখেছেন।

নেতা জেরার্ডের থেকে খেলোয়াড় জেরার্ডও পিছিয়ে ছিলেন না। পিএফএ টিম অব দ্যা ইয়ারে জায়গা পেয়েছেন রেকর্ডসংখ্যক ৮ বার। উয়েফা টিম অব দ্যা ইয়ারেও জায়গা পেয়েছেন ৩ বার. পিএফএ প্লেয়ার অব দ্যা ইয়ার হয়েছেন ১ বার, উয়েফা ক্লাব ফুটবলার লব দ্যা ইয়ারের পুরস্কার পেয়েছেন ২০০৫ সালে।

স্টিভেন জেরার্ড, লিভারপুল, অ্যানফিল্ড, মার্সিসাইড, ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগ

২০০৭ সালে ফিফা বিশ্ব একাদশে রোনালদিনহোর সাথে জায়গা করে নেয়া জেরার্ড সম্পর্কে স্বয়ং রোনি বলেছিলেন- “Gerrard is for me, in the position he plays, one of the very best in the world. He has a huge impact. For the job he performs, for me, he is one of the greatest.”

২০০৯ সালে বর্তমান রিয়াল মাদ্রিদ কোচ জিনেদিন জিদান জেরার্ড কে নিয়ে বলেছেন- “Is he the best in the world? He might not get the attention of Messi and Ronaldo but yes, I think he just might be. He has great passing ability, can tackle and scores goals, but most importantly he gives the players around him confidence and belief. You can’t learn that – players like him are just born with that presence.”

২০১৩-২০১৪ মৌসুমে লিভারপুলকে প্রিমিয়ার লিগ শিরোপার খুব কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু অ্যানফিল্ডে চেলসির বিপক্ষে তাঁর এক পা হড়াকানোই লিভারপুলকে প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা বিসর্জন দিতে বাধ্য করে। তাতে কি! একটা পা হড়কানো জেরার্ডের কিংবদন্তিত্বের পথে বাঁধা হতে পারেনি।

কেউ যখন লিভারপুল কিংবা অ্যানফিল্ডের নাম নেয় সাথে সাথে জেরার্ডের নামটাও এসে পড়ে। লিভারপুলের হয়ে সবমিলিয়ে ৭১০ ম্যাচে ১৮৬ গোল করেছেন, সাথে অগুনিত অ্যাসিস্ট। জাতীয় দল ইংল্যান্ডের নেতৃত্ব দিয়েছেন দীর্ঘ সময়। ইংল্যান্ডের হয়ে ১১৪ ম্যাচে করেছেন ২১ গোল।

শৈল্পিক ফুটবলের প্রতীক ইনিয়েস্তা, পাওয়ার ফুটবলের প্রতীক বলা যায় ডেভিড ব্যাকহাম কে। কিন্তু শিল্প আর পাওয়ার ফুটবলকে একই ছন্দে বেঁধেছেন যিনি তিনি হলেন স্টিভেন জেরার্ড। প্রয়োজনের মূহুর্তেই সবচেয়ে বেশি জ্বলে উঠেছেন স্টিভি জি। প্রতিপক্ষ হয়তো ম্যাচ শেষ হবার পর জেতার উল্লাস করার কথা ভাবছে, ঠিক তখনি স্টিভির একটা ৩৫ গজি মিসাইল তাঁদের ডিফেন্সের হৃদপিন্ড ভেদ করে ছুটে গিয়ে জড়াতো জালে। বহুবার তাঁর ৫০ মিটার দূরত্বের একটা থ্রু পাসে ভেঙ্গে গিয়েছে বিপক্ষ দলের অচলায়তন। স্ট্রাইকারদের জন্য তাঁর ক্রস কিংবা পাসগুলো ছিল পাতে তুলে দেয়া খাবার, বেড়ে দেয়াই আছে শুধু মুখে তুলে নিলেই হলো!

দলের প্রয়োজনে খেলেছেন মিডফিল্ডের বিভিন্ন জায়গায়। কখনো সেন্ট্রাল মিড তো কখনো ডিফেন্সিভ মিড, আবার কখনো অ্যাটাকিং মিড তো কখনো প্লে-মেকারের ভূমিকা পালন করে গেছেন অবিশ্রান্ত।

জেরার্ডের মহিমা এখানেই, নিজের সমসাময়িক তো বটেই ফুটবল ইতিহাসেরই অন্যতম সেরা হয়েও নিজেকে আড়াল রাখতেই বেশি পছন্দ করেন। বর্তমানে খেলছেন আমেরিকান ক্লাব এলএ গ্যালাক্সি তে। তাঁর বিদায়ী ম্যাচে অ্যানফিল্ডের ৫০ হাজার দর্শকের স্টিভি, স্টিভি চিৎকার পৌঁছে গিয়েছিল বিশ্বের প্রতিটি গলিতে ছড়িয়ে থাকা লিভারপুল আর জেরার্ড ভক্তদের কানে।

লিভারপুল ছেড়ে গেছেন, কিন্তু লিভারপুল তাঁকে ছাড়েনি। নিজের মন থেকেও মুছতে পারেন নি লাল রংটা। কিভাবে পারবেনই বা বলুন! একজন রেড যে সবসময়ই রেড। অলরেডদের তিনি যা দিয়েছেন তার কোনো তুলনা হয় না। একদিন জেরার্ড আবার ফিরবেন এই অ্যানফিল্ডে, খেলোয়াড় হিসেবে নয়। হয়তো অন্য কোনো ভূমিকায়, আবারও প্রিয় স্টিভি জি’র নামে প্রকম্পিত হবে অ্যানফিল্ডের গ্যালারি। অ্যানফিল্ডের সবুজ ঘাস মুখরিত হয়ে উঠবে জেরার্ডের পায়ের ধ্বনিতে।

সেদিনের অপেক্ষায় রইলাম।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-