অনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছসিনেমা হলের গলি

আমি সাফল্য চাইনি, ব্যর্থতা থেকে মুক্তি চেয়েছিলাম শুধু!

গত সাতাশ বছরে আমার সাথে যা ঘটেছে, আমার জীবনে যতো পরিবর্তন এসেছে, কিংবা আজ যেখানে আমি দাঁড়িয়ে আছি; সবকিছুর মূলে একটাই কারণ, আমার হেরে যাওয়ার ভয়। আমি যতোটা না সফলতা চাইতাম, তারচেয়ে অনেক বেশী ঘৃণা করতাম ব্যর্থতাকে। আমি সারাজীবন শুধু ব্যর্থ হওয়ার হাত থেকে পালাতে চেয়েছিলাম।

খুবই সাধারণ একটা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসেছি আমি। অজস্র ব্যর্থতা দেখেছি আমার জীবনে। আমার বাবা ছিলেন চমৎকার একজন মানুষ, আর আমার চোখে দুনিয়ার সবচেয়ে ব্যর্থ মানুষটা। আমার মা’ও ছিলেন ব্যর্থদের একজন, কারণ তিনি আমার সাথে খুব বেশিদিন কাটাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন, তাকে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল আমি সফলতা পাবার অনেক আগেই। ভারতীয় সিনেমায় আমার পথচলাটা তিনি দেখে যেতে পারেননি।

চাক দে ইন্ডিয়া, শাহরুখ খান

খুব কম বয়সে বাবা-মা’কে হারানোর পরে হুট করেই একদিন আমার মনে হলো, দারিদ্র্যতা জিনিসটাই বোধহয় ব্যর্থতা। তারপর থেকে আমার একটাই স্বপ্ন ছিল, আমাকে ধনী হতে হবে। আমি দারিদ্র্যতাকে আমার সঙ্গী বানাতে চাইনি। তাই যখন আমি প্রথমবার সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পেলাম, কোনরকমের সৃজনশীল কাজের ইচ্ছে থেকে নয়, শুধু পয়সা কামাই করার জন্যেই আমি সেটাকে হ্যাঁ বলেছিলাম। শুধু দারিদ্র্যতার ভয় থেকে বাঁচতেই আমি ফিল্মস্টার হতে চেয়েছিলাম, অন্য কোন কারণে নয়।

শুরুর দিকে আমি যেসব সিনেমায় অভিনয় করেছি, সেগুলোর প্রায় সবকটাই ছিল অন্যান্য বিখ্যাত নায়কদের ছেড়ে দেয়া। তারা সেই সিনেমাগুলোতে অভিনয় করতে রাজী হননি বলেই সেগুলোর অফার আমার কাছে এসেছিল। প্রযোজকেরা আর কাউকে পাননি, শেষে মন্দের ভালো হিসেবে আমাকে খুঁজে নিয়েছিলেন। আমি সেগুলোর গল্পটাও ঠিকঠাকমতো শুনিনি, অভিনয় করতে রাজী হয়ে গিয়েছিলাম। কারণ নিজেকে বেকার হিসেবে দেখতে কখনোই ভালো লাগতো না আমার। আমি কাজ করতে চেয়েছি, সেটা যেমনই হোক; কর্মহীনভাবে পড়ে থাকতে চাইনি।

শাহরুখ খান, মোটিভেশনাল স্পিচ

হয়তো সময়টা আমার পক্ষে ছিল, আমিও নিজের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে কাজগুলো করেছিলাম। সেগুলো মানুষ দেখেছে, পছন্দ করেছে, তারা আমাকে ভালোবেসেছে। তাদের ভালোবাসাতেই আমার নামের পাশে তারকাখ্যাতি যোগ হয়েছে। জীবনটা সবসময় অর্জনে ভরপুর থাকবে না, প্রাপ্তির তালিকাগুলো সবসময় খুব লম্বা হবে না- এই সহজ সত্যিটা আপনাকে জানতে এবং মানতে হবে।

সাফল্য হুটহাট করেই ধরা দেবে না। জীবন কঠিন, ভীষণ কঠিন। প্রতিটা পদক্ষেপে আপনাকে সেই কাঠিন্যের মোকাবেলা করতে হবে। সবকিছুর ওপরে সবসময় আপনার নিয়ন্ত্রণ থাকবে- এমনটাও আশা করবেন না কখনও। নম্রতা আর ভদ্রতার গুণাবলীটা সবার ভেতরে থাকাটা খুব দরকার, এটা আপনাকে জীবনের উত্থান আর পতনের মূহুর্তগুলোতে শান্ত থাকতে শেখাবে। সাফল্য দারুণ একটা ব্যপার, কিন্ত এটাকে হাতে পাওয়া মোটেও সহজ কিছু নয়। সাফল্য পেলে আমরা সেটাকে উপভোগ করি, হয়তো সেটাই উচিত। কিন্ত বেশীরভাগ মানুষই সাফল্যের শীর্ষে থাকার সময়টায় সেই জায়গাটা থেকে কিছু শিখি না, বা শিখতে চাই না।

সাফল্য অর্জনের সবচেয়ে বড় অনুঘটক যেটাকে আমি মনে করি, সেটা হচ্ছে ব্যর্থতাকে ভয় পাওয়া। আপনি যদি ব্যর্থতা ব্যপারটাকে ভয় না করেন, সাফল্য নামের সোনার হরিণটার জন্যে আপনি কখনোই উন্মুখ হবেন না। ব্যর্থতা আমাদের কখনোই আনন্দ দেয় না। এটা খুব কঠিন একটা সময়। আমরা সবাই এই ব্যর্থতার সাক্ষী, প্রয়োজন শুধু ব্যর্থতাটাকে সফলতায় পরিণত করা। সাফল্য অর্জনের জন্যে ব্যর্থ হওয়া প্রয়োজন, কারন এটাই আপনার অবস্থান পাল্টে দেয়ার ইচ্ছেটা তৈরী করে দেবে।

ভয়কে কখনও ভয় করতে নেই, ভয় করুন আপনার ভেতরের ভয়গুলোর বিরুদ্ধে লড়তে না চাওয়ার ইচ্ছেটাকে। ব্যর্থতাকে ভয় পেলেও সমস্যা নেই, কিন্ত ব্যর্থতাকে ঝেড়ে ফেলার ইচ্ছেশক্তিটাকে ভয় পাবেন না কখনও। প্রচলিত নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখাতে ভয় পাবেন না। কখনও ভয় করবেন না ক্ষুধার্ত থাকাকে, কিংবা সাফল্যের বন্ধুর পথে একা চলার সময়টাকে। কারণ দিনশেষে আমরা সবাই একা হাঁটছি যে যার পথে।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close