চলুন, কিছু সময়ের জন্য ভুলে যাই ঘটমান বর্তমানকে, কিংবা সাম্প্রতিক অতীতকে। ফিরে যাই ২৪ বছর, অর্থাৎ প্রায় সিকি শতক পূর্বে। সদ্যই পারস্পরিক ভালো লাগা সম্ভাব্য প্রণয়ে রূপ নিতে শুরু করেছে বনি কাপুর ও শ্রীদেবীর মধ্যে। তেমনই একটা সময়ের কথা।

বনি ছিলেন মুম্বাইয়ে। আর শ্রীদেবী ব্যাঙ্গালোরে। বনির ভাই অনিল কাপুরের সাথে মি. ইন্ডিয়া ছবির শুটিংয়ে। মধ্যরাতে শ্রীদেবীকে টেলিফোনে কল দিয়েছিলেন বনি। কথা হচ্ছিল দুজনের মধ্যে। খুব জরুরী কোন কথা, তেমনটা নয় মোটেই। নিছকই খোশগল্প বলা চলে। কপোত-কপোতীরা যেমনটা করে থাকে আরকি!

পরদিন সকাল সকাল শ্রীদেবীর শুটিং আছে। সারাদিন কাজের পর তিনি যথেষ্ট ক্লান্তও। এই মুহূর্তে একটু ঘুমিয়ে নিয়ে শরীরটাকে ফের পরদিনের কাজের জন্য চাঙ্গা করে তোলা খুবই জরুরী। তাই বারবার বনির কাছে অনুনয় বিনয় করছিলেন ফোন ছাড়ার জন্য। কিন্তু বনি তাতে নারাজ। নতুন করে কিছু বলার নেই শ্রীদেবীকে তার। কিন্তু তবু রিসিভারের ওপাশ থেকে ভেসে আসা প্রিয়জনের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ, কিংবা নিছক নীরবতাকেই যেন গভীরভাবে অনুভব করতে চান তিনি। এবং তা করলেনও।

কিন্তু এক পর্যায়ে আর না পেরে ফোন রেখে দিতে বাধ্য হলেন শ্রীদেবী। তাতে কি মনে মনে কিছুটা নাখোশ হলেন বনি? না, বিষয়টা আসলে সেরকম না। শ্রীদেবীর প্রেমে তখন তিনি এতটাই অন্ধ যে অন্য আর কিছু দেখার বা ভাবার সময় নেই তার হাতে। তিনি শুধু চান শ্রীদেবীর সঙ্গ। তাই মুহূর্তের মধ্যেই পরিকল্পনা সাজিয়ে ফেললেন তিনি। আর তা বাস্তবায়নও করলেন।

পরদিন ভোরবেলা শ্রীদেবী ঘুম থেকে উঠে, টানা দুই ঘন্টা ধরে মেক-আপ করে যখন হোটেল তাজ ওয়েস্ট-এন্ডে নিজের রুমের বাইরে বেরিয়ে এলেন, তখন তার জন্য অপেক্ষা করছে জীবনের অন্যতম বড় বিস্ময়টি। দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং বনি! মাত্র কয়েক ঘন্টা আগেও মুম্বাইয়ে বসে তার সাথে কথা বলছিলেন যিনি।

আসলে বিষয়টা হয়েছে কি, শ্রীদেবী ফোন রেখে দেয়ার পরই বনির মনে হয়েছিল, আর বেশিক্ষণ শ্রীদেবীকে না দেখে থাকতে হলে তিনি বুঝি মারাই যাবেন! তাই তো সঙ্গে সঙ্গে এয়ারপোর্টে গিয়ে ব্যাঙ্গালোরের একটা ফ্লাইট পেয়ে তাতে উঠে বসেছিলেন তিনি। আর তারপর খুব ভোরে হোটেল ওয়েস্ট-এন্ডে পৌঁছে শ্রীদেবী যে রুমে আছেন, তার পাশের রুমটিই বুক করেছিলেন তিনি। সেই থেকে অপেক্ষা করছিলেন শ্রীদেবীকে চমকে দেয়ার।

বলাই বাহুল্য, বাস্তবিকই অনেক চমকে গিয়েছিলেন শ্রীদেবী। এবং বনি যে তাকে কীরকম পাগলের মত ভালোবাসেন, তার হাতেনাতে প্রমাণও পেয়েছিলেন। অবশ্য শুটিং ইউনিটের অন্য কারও কাছেই তখন পর্যন্ত বনির হঠাৎ ব্যাঙ্গালোর উড়ে আসার আসল রহস্য উন্মোচিত হয়নি। সবাই ধরেই নিয়েছিল, ভাই অনিলের সাথে কোন বিশেষ দরকারেই বুঝি এসেছেন তিনি। তলে তলে যে শ্রীদেবীর সাথে তিনি প্রেমের খেলায় মেতেছেন, ঘুণাক্ষরেও তা আঁচ করতে পারেনি কেউ। কীভাবেই বা পারবে! বনি যে বিবাহিত, আর স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে আপাতদৃষ্টিতে একটি বেশ সুখের সংসারই রয়েছে তার।

যাইহোক, ২৪ বছর আগের এই ঘটনাটার স্পষ্টতই মিল রয়েছে সাম্প্রতিক সময়ের আরও একটা ঘটনার। সেটি হলো হঠাৎ করেই বনি কাপুরের দুবাইয়ে উড়ে যাওয়া। উদ্দেশ্য সেই একই, শ্রীদেবীকে চমকে দেয়া। তবে হ্যাঁ, এখন শ্রীদেবী তার প্রেমিকা নন, স্বয়ং স্ত্রী!

২০ ফেব্রুয়ারি বনির ভাতিজা মোহিত মারওয়াহর বিয়েতে এসেছিলেন তারা। এরপর বনি ২২ তারিখ লখনৌতে একটা জরুরি মিটিংয়ে যোগ দিতে দেশে ফিরে গেলেও, রয়ে গিয়েছিলেন শ্রীদেবী। মেয়ে জাহ্নবীর জন্য শপিং করবেন বলে। ২১ তারিখেই শপিং সেরে ফেলার কথা ছিল তার। কিন্তু জাহ্নবীর দেয়া শপিং লিস্টটা তিনি সেভ করে রেখেছিলেন নিজের একটা সেল ফোনে, যেটা আবার তিনি ভুলবশত বিয়ের ভেন্যু রাস-আল খাই মাতে ফেলে এসেছিলেন। তাই ২১ তারিখ আর শপিং করা হয়ে ওঠেনি। আগের দিনের প্রচন্ড ব্যস্ততার পর এ দিনটা হোটেল রুমেই শুয়ে-বসে কাটিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। ২২ তারিখও তিনি একইভাবেই কাটান। তবে এদিন তার সঙ্গে ছিলেন কাছের এক বন্ধু। এবং তার এই আলস্য চলতে থাকে ২৩ তারিখও। তাই বনিকে দিয়ে ভারত ফেরার টিকিট পরিবর্তনও করান তিনি।

২৪ তারিখ সকালে বনির সাথে কথা হয় শ্রীদেবীর। তিনি জানান, বনিকে অনেক মিস করছেন তিনি। বনিও বলেন তাকে মিস করছেন তিনি। তবে তখন আর স্ত্রীকে এ কথা জানাননি তিনি যে সন্ধ্যার মধ্যেই দুবাইয়ে পৌঁছে যাবেন। কারণ, বরাবরই স্ত্রীকে চমকে দিতে পছন্দ করেন তিনি। কিন্তু তিনি জানতেন না, তার জন্যও এদিন অপেক্ষা করছে বিশাল বড় একটা চমক।

যাইহোক, বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে দুবাইয়ের ফ্লাইট বুক করার পর বোম্বে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের লাউঞ্জে বসে শ্রীদেবীকে ফোন দেন বনি। কিন্তু যেহেতু তিনি চেয়েছিলেন স্ত্রীকে চমক দেবেন, তাই দুবাইয়ে যাওয়ার কথাটা চেপে গিয়ে বলেন, পরের কয়েক ঘন্টা একটা মিটিংয়ে ব্যস্ত থাকবেন তিনি, এজন্য ফোন সুইচড অফ থাকবে তার। আরও বলেছিলেন, শ্রীদেবী যেন ভয় না পান। মিটিং শেষে ফ্রি হলেই তাকে কল দেবেন। আসলে বনির পরিকল্পনা ছিল, একবারে দুবাইয়ের জুমেইরা এমিরেটস হোটেলে পৌঁছেই শ্রীদেবীর সামনে দেখা দেবেন তিনি। হোটেলে পৌঁছে রিসেপশনে সব ফর্মালিটি শেষ করেন তিনি, এবং শ্রীদেবীর রুমের একটা বাড়তি চাবিও সংগ্রহ করেন। সেই চাবি দিয়েই বাইরে থেকে শ্রীদেবীর কক্ষ খোলেন তিনি। হঠাৎ তাকে দেখতে পেয়ে বাচ্চা মেয়েদের মত আনন্দে চিৎকার করে ওঠেন শ্রীদেবী, এবং তারা দীর্ঘ সময় ধরে একে অপরকে আলিঙ্গন করেন। এরপর শ্রীদেবীকে বলেন, তিনি নাকি আগে থেকেই একটু একটু আঁচ করতে পারছিলেন যে বনি হয়ত তাকে নিয়ে যেতে আসবেন।

এরপর বনি ফ্রেশ হতে বাথরুমে যান, এবং বাথরুম থেকে বেরিয়ে শ্রীদেবীকে বলেন যে রাতে তারা একটি রোমান্টিক ডিনারে যাবেন। তিনি আরও বলেন, শ্রীদেবী যেন মেয়ের জন্য শপিং করা পরের দিন পর্যন্ত মুলতবি রাখেন। অর্থাৎ প্রাথমিকভাবে ২৫ তারিখ সকালে ভারত ফেরার কথা থাকলেও, এ দম্পতি ঠিক করেন সকালে না গিয়ে ওইদিন রাতে দেশে ফিরবেন। এবং সেজন্য আরও একবার রিটার্ন টিকিট পরিবর্তন করতে হবে।

সব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে গেলে শ্রীদেবী পাশের রুমের মাস্টার বাথরুমে চলে যান গোসল করে তৈরি হতে রোমান্টিক ডিনারে যাওয়ার জন্য। এদিকে বনি লিভিং রুমে বসে ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচ দেখতে শুরু করেন। চার-পাঁচ মিনিট দেখার পর ভালো না লাগায় তিনি অন্য একটা চ্যানেলে দেন, যেখানে পাকিস্তান সুপার লিগের হাইলাইটস দেখানো হচ্ছিল। ১৫-২০ মিনিট সেই হাইলাইটস দেখে কাটান তিনি। কিন্তু তখনও শ্রীদেবী গোসল করে না বের হওয়ায় ধীরে ধীরে অধৈর্য হতে শুরু করেন তিনি।

ইতিমধ্যেই রাত আটটার মত বেজে গিয়েছিল, আর বনি জানতেন শনিবার হওয়ায় এদিন রেস্টুরেন্টগুলোতে অনেক ভীড় হবে। আগে না গেলে জায়গা পাওয়া যাবে না। তাই লিভিং রুমে বসেই তিনি দুইবার চিৎকার করে শ্রীদেবীকে বলেন তাড়াতাড়ি করতে। এরপর টিভির ভলিউম কমিয়ে আরও কয়েকবার ডাক দেন তিনি। কিন্তু একবারও কোন সাড়া না পাওয়ায় চিন্তিত হয়ে পড়েন তিনি।

উঠে গিয়ে বাথরুমের দরজায় নক করেন এবং ‘জান, জান’ বলে ডাকতে থাকেন বনি। এরপরও কোন সাড়া পান না তিনি। শুধু বাথরুমের ভিতর থেকে ট্যাপের পানি পড়ার শব্দ ভেসে আসছিল। এবার আর দেড়ি না করে বাথরুমের দরজা খুলে ফেলেন তিনি। দরজা লক করা ছিল না, তাই শুধু নব ঘোরাতেই দরজা খুলে যায়। ভিতরে গিয়ে তিনি যা দেখতে পান তার জন্য একদমই প্রস্তুত ছিলেন না তিনি।

বাথটাব পুরোপুরি পূর্ণ হয়ে পানি উপচে পড়ছে। আর তার ভেতর পড়ে রয়েছে শ্রীদেবীর নিথর দেহ। ডুবে গিয়েছেন তিনি! আর এর মাধ্যমে মাত্র কিছুক্ষণ আগেই স্ত্রীকে বড়সড় একটা চমক দিয়ে আত্মতৃপ্তিতে ভুগতে থাকা বনি নিজেই পেয়ে যান তার জীবনের সবচেয়ে বড় চমক!

Comments
Spread the love