অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

ভয়ংকর-দুধর্ষ স্পার্টান যোদ্ধাদের ‘যোদ্ধা’ হয়ে ওঠার গল্প!

প্রাচীন কিংবদন্তি এক যোদ্ধা জাতি স্পার্টান, হলিউডের কল্যানে যোদ্ধা হিসেবে তাদের কৌশল, দৃঢ়তা ও অসাধারণ বীরত্বের গল্প আমরা অল্পবিস্তর অনেকেই জানি। প্রাচীন পৃথিবীর সবচাইতে সেরা যোদ্ধাদের মাঝে অন্যতম স্পার্টানদের কিংবদন্তিতুল্য অর্জনের পেছনের গল্পটা খুবই কঠিন ও ত্যাগে পূর্ন। স্পার্টান সমাজে একজন আদর্শ যোদ্ধা তৈরি করা হতো কঠিন মানসিক দক্ষতা, কর্তব্যবোধ ও কঠোরতার মধ্য দিয়ে, কিন্তু এই গড়ে তোলার পুরো প্রক্রিয়ায় এমন কিছু ছিল- যা অমানবিক!

১. জন্মের পরই শারীরিক সক্ষমতার প্রমাণ দিতে হতো স্পার্টান শিশুদের!

সদ্য ভুমিষ্ঠ শিশুকে নিয়ে যাওয়া হত পর্যবেক্ষক কাউন্সিলে যেখানে শিশুটিকে পরীক্ষা করে দেখা হত যে যোদ্ধা হিসেবে গড়ে তোলার জন্যে আদর্শ কিনা! পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে ‘আদর্শ’সনদ না পাওয়া শিশুটিকে কতটা করুণ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয় তা কল্পনার অতীত, বলা হয়ে থাকে শিশুটিকে মাউন্ট টেইগাটাসের ফাটলে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়! অবশ্য বেশিরভাগ ঐতিহাসিক এটিকে শুধু মিথ বলেই উড়িয়ে দেন। কিন্তু যেটি নিয়ে খুব একটা দ্বিমত নেই, শিশুটিকে ফেলে রেখে হতো কোন এক নির্জন পাহারের পাদদেশে, সেখানে শিশুটির ভাগ্যে- খাদ্যের অভাবে বা কোন হিংস্র জন্তুর আক্রমণে মৃত্য অথবা সুহৃদ কেউ উদ্ধার ও লালিত হওয়া এসবের যেকোন কিছু হতে পারে। নির্বাচিত শিশুটিকে যেতে হয় এরচেয়ে কম অমানবিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে তবে তাও অনেক কঠিন। নির্বাচিত হওয়ার পর শিশুটিকে গোসল করানো হয় পানির বদলে ওয়াইন দিয়ে, কান্না করলে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না এবং ধীরে ধীরে তাকে শেখানো হয় এই কান্নার কোন গুরুত্বই নেই। মানসিক দক্ষতা বাড়ানোর জন্যে একাকিত্ব, নির্জনতা ও অন্ধকারে ভয় না পাওয়ার জন্যে প্রণোদিত করা হয় নানাভাবে।

২. শিশুকাল থেকেই কঠোর মিলিটারি নিয়মের শিক্ষা ব্যবস্থা

স্পার্টান সমাজে ৫-১১ বয়সকে কৈশোর ও ১২ বছর থেকেই যৌবনকাল হিসেবে ধরা হতো। মাত্র ৭ বছর বয়সেই মা-বাবা থেকে আলাদা করে নিয়ে তাদের জায়গা দেওয়া হতো ব্যারাকে, যেখানে রাষ্ট্রের খরচে শুরু হতো আদর্শ যোদ্ধা ও নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, যেটিকে বলা হয় ‘agoge’। প্রথমেই শেখানো হতো pyrriche, যা অস্ত্র হাতে নিয়ে এক ধরনের নাচ, এই প্রশিক্ষণ তাদের আরো দ্রুতগামি করে তোলে। ব্যারাকে শিশুটিকে লিখতে-পড়তেও শেখানো হয়, পাশাপাশি আরো শেখানো হয় রণকৌশল, শরীরচর্চা, রণসঙ্গীত, শিকার এবং এমনকি চুরিও। ১২ বছর বয়সে শুধুমাত্র লাল কাপড়ের এক টুকরো ছাড়া যেকোনোরকম কাপড় নিষিদ্ধ করা হয় শীত কিংবা বর্ষা যে কোন ঋতুতেই। বাইরে ঘুমাতে বাধ্য করা হয় যেখানে হাতের কাছে পাওয়া জিনিস দিয়েই নিজের বিছানা তৈরি করে নিতে হতো। পেট ভরে নয়, এত কিছুর পরও খাবারের পরিমান ছিল খুবই সীমিত যেন মুটিয়ে না যায়। স্পার্টান সমাজে মোটা ব্যক্তিদের খুবই নিচু হিসেবে দেখা হতো এবং অনেক সময় তাদের রাজ্য থেকে বেরও করে দেওয়া হতো। প্রশিক্ষণরত যোদ্ধাদের চাবুক মেরে শাস্তি দেওয়া হয় খাবার চুরির জন্যে নয়, বরং চুরি করতে গিয়ে ধরার খাওয়ার জন্যে!

স্পার্টান সমাজে পুরুষেরা যোদ্ধা ও নারীরা সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্যেই শুধুমাত্র বিবেচিত, তা সত্বেও মেয়ে শিশুদেরও অনেক কঠোর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিতে হয়। নাচ, গান, শরীরচর্চা এবং চাকতি নিক্ষেপ শিখতে হয় কিশোরকাল থেকে এবং মনে করা হয় মা হিসেবে এটি তাদের শারীরিকভাবে শক্তিশালী করবে।

৩. শিশু স্পার্টানদের ঝগড়া-বিবাদের জন্যে প্ররোচনা দেওয়া

ব্যারাকে স্বাভাবিক শিক্ষার পাশাপাশি চলতো অস্বাভাবিক আচার ব্যবস্থাও। যোদ্ধা হিসেবে গড়ে তুলতে প্রশিক্ষক ও বড়রা শিক্ষানবিশদের নিজেদের মধ্যে মারামারি ও তর্কের জন্যে প্ররোচনা দিতো। গোটা প্রশিক্ষণ পর্ব এমনভাবে ঢেলে সাজানো যেন স্পার্টান যোদ্ধা ঠান্ডা-গরম, ব্যথিত কিংবা ক্ষুধার্ত যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে সেরা হিসেবে প্রমাণ করতে পারে। ভীত এবং দুর্বলরা নিজেদের সহপাঠী ও বড়দের দ্বারা নানাভাবে আক্রান্ত হতে থাকে। সামাজিক ও ধর্মীয় আয়োজনে মেয়েরা এই প্রশিক্ষণ ব্যারাক নিয়ে গান গেয়ে থাকে, অনেক সময় লজ্জা দেওয়ার জন্যে দুর্বলতা দেখানো- বিশেষ কারো নাম ধরেও সমস্বরে সবাই গান গেত। 

৪. একজন স্পার্টান, সারা জীবনের যোদ্ধা

একজন স্পার্টান পুরুষের শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার পর তার যোদ্ধা হওয়া ব্যতীত আর কোন পেশায় যোগ দেওয়ার সুযোগ নেই, আসলে যোদ্ধা হওয়া ব্যতিত বাকি অন্য পেশা তাদের জন্যে ছিল সম্পূর্ণ অবৈধ। একজন স্পার্টান সারা জীবনের জন্যেই যোদ্ধা, যুগের পর যুগ তাদের এই ভূমিকায় থাকতে হয় এবং এমনকি ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত তাদের রিজার্ভ যোদ্ধা হিসেবে ধরা হয়। প্রায় সব স্পার্টান পুরুষ যখন যোদ্ধা তাহলে সমাজের বাকি আবশ্যক কাজগুলো কারা করত?

স্পার্টার যেকোন তৈরি খাত ও কৃষি খাত পরিচালিত হতো সমাজের ‘নিচু শ্রেণীদের’ দ্বারা। ব্যবসা-বানিজ্য, তৈরি শিল্প এবং শ্রমিকের কাজে নিয়োজিত ছিল স্পার্টার আশেপাশে বসবাসরত ‘Perioeci’ নামক স্বাধীন নাগরিকেরা। কিন্তু কৃষিকাজ তথা খাদ্য উৎপাদনের মূল ভূমিকা পালন করত স্পার্টার ‘Helots’ শ্রেণীর লোকেরা যারা মূলত ছিল দাস। এই দাসেরাই ছিল মূলত স্পার্টার সংখ্যাগরিষ্ঠ, স্পার্টানদের শক্তিশালী যোদ্ধা জাতি হিসেবে উত্তানের পিছনে তাদের ভূমিকা রয়েছে। আসলে এই দাস শ্রেণীর বিদ্রোহ ও উত্থানের ভয়েই শুরুতে স্পার্টান শাসকগোষ্ঠী শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তোলে।

৫.The Krypteia, স্পার্টান সিক্রেট সার্ভিস

১৮ বছর থেকেই একজন স্পার্টান পুরুষ সত্যিকার যোদ্ধা হিসেবে পরিচিতি পায়। স্পার্টান বাহিনীর ছিলThe Krypteia নামের গোপন নিষ্ঠুর একদল যোদ্ধা বাহিনী। এই সিক্রেট সার্ভিসে নেওয়া হত ৩০ এর নিচের যোদ্ধাদের এবং যোগ দেওয়ার পূর্বে তাদের সবচেয়ে অমানবিক ও নিষ্ঠুর যে কাজটি করা লাগত তা হল নিরীহ দাসদের হত্যা করা! প্রক্রিয়াটি শুরু হয় একজন স্পার্টান নেতার যেকোনো কারণ দেখিয়ে অথবা ভুয়া বিদ্রোহের ধোয়া তুলে দাস হত্যার নির্দেশ দেওয়ার মাধ্যমে, যা স্পার্টার আইনব্যবস্থায় বৈধ। নির্দেশ পাওয়ার পর স্পার্টান যোদ্ধারা অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বেরিয়ে যেত দাস অধ্যুষিত এলাকায়, বেশিরভাগ সময়ে হত্যার জন্যে গেরিলা কায়দায় আক্রমণ পরিচালনা করা হয় এবং অবশ্যই রাতের অন্ধকারে।

৬. বাৎসরিক চাবুক মারার ভয়ংকর উৎসব

Artemis Orthia মন্দিরের বেদীতে প্রতি বছর ধর্মীয়ভাবে আয়োজন করা হতো ভয়ংকর এক প্রথাগত উৎসব যেটি ‘diamastigosis‘ নামে পরিচিত। এই বাৎসরিক প্রথায় সামরিক প্রশিক্ষণে থাকা স্পার্টান তরুনদের সাহসিকতা, ধৈর্য্য ও ব্যথা সহ্য করার ক্ষমতা পরীক্ষা করা হয় ক্রমাগত চাবুক দিয়ে আঘাত করে। ভয়ংকরভাবে রক্তাক্ত হয়ে উঠে এই উৎসব এবং অনেক সময়ে তরুণ স্পার্টানদের কেউ কেউ যন্ত্রনায় ও রক্তক্ষরণে মারা যেত।

৭. ৩০ বছরের পূর্বে বিয়ে নয়

স্পার্টান সমাজে বিয়ে একপ্রকার রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত ছিল এবং বিয়ে প্রথাটিকে প্রাথমিকভাবে দেখা হয় শুধু মাত্র নতুন যোদ্ধা তৈরির একটি প্রক্রিয়া হিসেবে! পুরুষদের ৩০ বছর ও নারীদের ২০ বছর বয়সে বিয়ে করার নির্দেশ ছিল। একজন স্পার্টান যোদ্ধাকে ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত সামরিক ব্যারাকে কাটাতেই হতো আবশ্যিক ভাবে, তাই ৩০ এর পূর্বে বিয়ে করলেও স্ত্রী থেকে আলাদা বসবাস করতে সে বাধ্য ছিল। সুস্থ ও শক্তিশালী সন্তানের জন্যে মিলিত হওয়ার পূর্বে সবসময় স্বামী-স্ত্রীর শারীরিক সুস্থতা পর্যবেক্ষণ করতে উৎসাহিত করা হতো, কেননা দুর্বল শিশুর কোন স্থান স্পার্টায় নেই। সন্তানহীন স্পার্টান পুরুষকে সামাজিকভাবে হেয় করা হয় যত্রতত্র, এমনকি ধর্মীয় উৎসবেও তাকে অপমান করা হতো জনসম্মুখে।

৮. আত্মসমর্পনে চূড়ান্ত মর্যাদাহানি

স্পার্টানদের যোদ্ধাদের মধ্যে আত্মসমর্পন শব্দটির কোন জায়গা নেই, তাদের সার্বিক কর্তব্য সাহসিকতার সাথে এবং শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রে যদি একজনও অবশিষ্ট থাকে! আত্মসমর্পন করা যোদ্ধার কোন জায়গা নেই স্পার্টান সমাজে, তাকে দেখা হয় ভীত কাপুরুষ হিসেবে এবং সমাজে এত লজ্জা ও অপমানের সম্মুখীন হতে হয় যে প্রায়ই এমন যোদ্ধারা আত্মহত্যা করে থাকে।

স্পার্টান মায়েরাও তাদের সন্তানদের যুদ্ধে পাঠানোর আগে বলে দেয়, “Return with your shield or on it.” যুদ্ধক্ষেত্রে বীরের ন্যায় মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মূলত একজন স্পার্টানের নাগরিক হিসেবে দ্বায়িত্ব পূর্ণ করা হয়। স্পার্টান সমাজে আইন ছিল, শুধুমাত্র দুই শ্রেণীর লোকেদের সমাধিস্থলে তাদের নাম উল্লেখ থাকবে- যে নারী সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা গিয়েছে এবং যুদ্ধক্ষেত্রের শহীদ যোদ্ধা!

তথ্যসূত্র- হিস্টোরিডটকম

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close