ফুটবলবিশ্ব এর আগে কখনোই যা দেখেনি, সেটাই ঘটে গেল ২০০২ সালে। এশিয়ার মাটিতে আয়োজিত হলো বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর, বিশ্বকাপের! চার বছর আগেই ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত হওয়া ফিফার কংগ্রেসে অনুমোদন পেয়েছিল স্বাগতিক দেশ হিসেবে জাপান আর দক্ষিণ কোরিয়ার নাম।

ফুটবল পরাশক্তিদের মধ্যে কয়েকটা দল অবশ্য আয়োজকদের নাম শুনেই নাক সিঁটকেছিল। স্বাগতিক হবার দৌড়ে থাকা জার্মানী বা স্পেনের মতো দলের তারকারা মন্তব্য করেছিলেন, বিশ্বকাপের আয়োজক না হলে এই দুই দেশ তো সরাসরি খেলার সুযোগটাও পেত না! ১৯৯৮ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো মূল মঞ্চে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল জাপান। পরের আসরেই তাদের স্বাগতিক হয়ে যাওয়াটা খানিকটা অবাক করার মতোই ছিল। কিন্ত এশিয়াতে ফুটবলকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্যে ফিফা যে পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল, সেটা বাস্তবায়নের জন্যেই ২০০২ বিশ্বকাপ আয়োজনের ভার তুলে দেয়া হয় এই দুই দলের কাঁধে।

কেমন হয়েছিল ২০০২ বিশ্বকাপের আয়োজন? মাঠের বাইরের হিসেবটা যদি ধরা হয়, তাহলে এক কথায় চমৎকার! আর মাঠের ফুটবল? সেখানে ব্রাজিলের একচ্ছত্র আধিপত্য। রোনালদোর পায়ের জাদুতে পঞ্চমবারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা নিজেদের ঘরে তোলা। অঘটনের শিকার হয়েছিল দুই হট ফেবারিট ফ্রান্স আর আর্জেন্টিনা, অপ্রত্যাশিত রকমের ভালো ফল করেছিল আফ্রিকান প্রতিনিধি সেনেগাল। আর চমক দেখিয়েছিল স্বাগতিক দুই দল, জাপান পৌঁছে গিয়েছিল দ্বিতীয় রাউন্ডে, আর দক্ষিণ কোরিয়া তো রচনা করেছিল ইতিহাস! প্রথম এশীয় দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের শেষ চাপে পৌঁছে গিয়েছিল ওরা।

দক্ষিণ কোরিয়া, বিশ্বকাপ ফুটবল ২০০২, বিশ্বকাপ বিতর্ক, সেপ ব্ল্যাটার

সাফল্যের পিছু নিয়েই নাকি বিতর্ক আসে। দক্ষিণ কোরিয়ার এই সাফল্যটাও কম বিতর্কিত নয়। রেফারীর আনুকূল্য পেয়েই এমন অসাধারণ ফলাফল করেছিল দলটা, এমন অভিযোগ প্রতিপক্ষ দলগুলোর, বিশেষ করে স্পেন আর ইতালীর। এই দুই দলকেই যে বাজে রেফারিঙের শিকার হয়ে স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় পুড়তে হয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে! ইউরোপের দুটো বড় দল, টানা দুই ম্যাচে পরাজিত হলো স্বাগতিকদের কাছে, দুই দলই মাশুল গুনেছে রেফারির ভুল সিদ্ধান্তের!

গোলমালের শুরুটা নকআউট পর্ব থেকেই। দ্বিতীয় রাউন্ডের মতাচে মুখোমুখি কোরিয়া-ইতালী। ইকুয়েডরের রেফারি বায়রন মোরেনো’র স্পষ্ট পক্ষপাতিত্ব যে স্বাগতিকদের প্রতি ছিল, মাঠের দর্শকেরাও সেটা বুঝতে পারছিলেন। এরমধ্যে ইতালীর একটা পরিস্কার গোল বাতিল করা হলো অফসাইডের অজুহাতে, প্রতিবাদ করতে গিয়ে হলুদ কার্ড হজম করলেন ফ্রান্সেসকো টট্টি। খানিক বাদেই সেই হলুদ কার্ড পরিণত হলো লালকার্ডে, বাকিটা সময় দশজন নিয়েই খেলতে হলো ইতালীকে। নির্ধারিত সময়ে ১-১ গোলে সমতায় থাকা ম্যাচটা অতিরিক্ত সময়ের গোল্ডেন গোলে জিতে নিয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়া।

এই ম্যাচের পরে বাজে রেফারিঙের অভিযোগ নিয়ে ফিফার কাছে গিয়েছিল ইতালী, দাবী জানিয়েছিল অভিযুক্ত রেফারীকে বহিস্কারের। ফিফা সভাপতি সেপ ব্ল্যাটার তখন তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বলেছিলেন, “রেফারীরাও মানুষ, ওদেরও ভুল হতে পারে। আর ইতালীকে তো শুধু রেফারী হারায়নি। নিজেদের ডিফেন্স আর অ্যাটাকের ভুলেই ওরা হেরেছে!”

হ্যাঁ, রেফারীরাও মানুষ, ওদেরও ভুল হতে পারে- সেপ ব্ল্যাটারের এই কথাটা মেনে নেয়া যেত, যদি না দক্ষিণ কোরিয়া তাদের পরের ম্যাচটাতেও রেফারীর অবৈধ আনুকূল্য না পেতো। কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি হয়েছিল কোরিয়া। আর সেই ম্যাচটা জন্ম দিয়েছিল আগের ম্যাচের চাইতেও বেশী বিতর্কের! মিশরের রেফারী গামাল আল গান্ধুর সেদিন ম্যাচ পরিচালনা করেছিলেন, নাকি আগে থেকে ঠিক করে রাখা নাটক মঞ্চস্থ করেছিলেন, সেটা বোঝা দায়!

ম্যাচে দুটো গোল বাতিল হলো স্পেনের, স্প্যানিশ ফরোয়ার্ডেরা বল নিয়ে আক্রমণে উঠলেই অফসাইডের বাঁশি বাজালেন লাইনম্যানেরা। এর মধ্যে ক’টা সত্যিকারের অফসাইড ছিল, সেটা আঙুলে গুনে বলে দেয়া যাবে। কোরিয়া তাদের ডিফেন্সটা সামলে রাখলো ঠিকঠাক, রেফারীরাও খেল দেখালেন চমৎকার! এই দুইয়ে মিলে নির্ধারিত সময়ে গোলশূন্য সমতায় থাকলো ম্যাচ। টাইব্রেকারে স্পেনকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লো দক্ষিণ কোরিয়া, তবে সেই ইতিহাসের উল্টোপাশটায় প্রতারণার কালো ছায়ার আঁকিবুকি!

দক্ষিণ কোরিয়া, বিশ্বকাপ ফুটবল ২০০২, বিশ্বকাপ বিতর্ক, সেপ ব্ল্যাটার

সেই দুই রেফারী বায়রন মোরেনো আর গামাল আল গান্ধুরের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগ খতিয়ে দেখেছিল ফিফার তদন্ত কমিটি। প্রমাণ মেলে, বিশ্বকাপের পরে কোরিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের এক উচ্চপদস্থ কর্তা এই দুজনকে ব্যক্তিগত খরচে দামী গাড়ি উপহার দিয়েছিলেন! বিশ্বকাপের ম্যাচে কোরিয়ার পক্ষে সিদ্ধান্ত দেয়ার পুরস্কারই ছিল হয়তো গাড়িগুলো। দুই রেফারী আজীবনের জন্যে নিষিদ্ধ হন। কিন্ত তাতে তো ম্যাচের ফল বদলে যায়নি। রেকর্ডবুকে লেখা থাকবে, ২০০২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট দক্ষিণ কোরিয়া। কিন্ত ওদের এই যাত্রাপথটা যে অসততায় ভরা ছিল, সেটা কোথাও লেখা থাকে না।

স্বাগতিক হবার সুবিধা সবাই নিতে চায়, অতীতেও অনেকেই নিয়েছে। মুসোলিনির ইতালী যেমন, স্বৈরশাসক ভিদেলার আর্জেন্টিনা যেমন, কিংবা ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ফ্রান্স যেমন নিয়েছিল। কিন্ত ওরা সবাই বিশ্বকাপ জেতার মতো যথেষ্ট ভালো দল ছিল, বাড়তি সুবিধাটা কাজে লাগিয়ে শিরোপাটা ঘরে তুলেছিল ওরা। কিন্ত ২০০২ বিশ্বকাপে স্বাগতিক হবার সুবিধা নিয়ে কোরিয়া যেটা করে দেখিয়েছিল, এমন অসাধারণ সাফল্য কি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রাপ্য ছিল?

তথ্যসূত্র- দ্য গার্ডিয়ান, ব্লেচার রিপোর্ট, ইউরোস্পোর্ট ডটকম। 

*

এখন ঘরে বসেই অনলাইনে কিনুন ক্যাসপারস্কি ল্যাবের সব পণ্য, খুব সহজে। অনলাইনে পেমেন্ট, অনলাইনেই ডেলিভারি!

Comments
Spread the love