বছর কয়েক আগে ঢাকায় মাদকাসক্ত ঐশীর হাতে যখন পুলিশ কর্মকর্তা বাবা আর গৃহিনী মা খুন হলেন, তখন দেশের মানুষ আঁতকে উঠেছিল, এমনটাও কি বাস্তবে সম্ভব! সম্ভব তো বটেই, সেটা তো ডিবি কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান সস্ত্রীক খুনের ঘটনাতেই প্রমাণ হয়েছে। ঐশী মাদকাসক্ত ছিল, খুনের ঘটনার সময় তার বয়সও ছিল আঠারোর কম। নাবালিকা হওয়ার কারণে সিকি-আধুলী পরিমাণ হলেও সমাজের একটা অংশের সহমর্মিতা সে পেয়েছিল।

কিন্ত ভারতের রাজকোটের এক অধ্যাপক যা করেছেন, সেটা ছাড়িয়ে গেছে নির্মমতার সকল সীমা-পরিসীমাই। অসুস্থ মা’কে ঠান্ডা মাথায় ছাদ থেকে ফেলে হত্যা করেছেন সন্তানরূপী এই পাষণ্ড ব্যক্তিটি, তারপর আবার সেটাকে দূর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টাও করেছেন মাস তিনেক ধরে! অবশেষে পুলিশের জেরায় বেরিয়ে এসেছে এই নির্মম সত্যিটা, সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণকৃত একটা ভিডিও ক্লিপও এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে অন্তর্জালে, যেটা দেখেই পুলিশ নিশ্চিত হয়েছিল যে, সন্দীপ নাথওয়ানি নামের সেই কুলাঙ্গার যুবক নিজেই তার জন্মদাত্রীকে ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করেছেন।

ঘটনাটা প্রায় তিন মাস আগের, গতবছরের ২৯শে সেপ্টেম্বর চৌষট্টি বছর বয়স্ক জয়শ্রীবেন নাথওয়ানির মৃত্যু হয় ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে। পরিবার থেকে জানানো হয়, ব্রেইন হ্যামারেজে ভুগছিলেন বৃদ্ধা। ছাদে উঠে টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যান, কিংবা আত্মহত্যাও করে থাকতে পারেন। পুলিশও সেই সময়ে পরিবারের সদস্যদের স্টেটমেন্ট নিয়ে ক্ষান্ত দেয়, এর পেছনে যে অন্য কোন রহস্য থাকতে পারে, সেটা মাথায় আসেনি কারো। সত্যিই তো, নিজের মা’কে ‘যন্ত্রণা’ ভেবে ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে খুন করতে পারে শিক্ষিত সমাজের কেউ, এটা ভাবতেও তো বুকের পাটা লাগে!

সন্দ্বীপ নাথওয়ালি, রাজকোট, ছেলের হাতে মা খুন, ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে মা'কে খুন, ঐশী

কিন্ত ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেয় একটা বেনামী চিঠি। রাজকোট পুলিশের কাছে পাঠানো সেই চিঠিতে অনুরোধ করা হিয়েছিল, সেই অ্যাপার্টমেন্টের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজগুলো যাতে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখা হয়। সেই চিঠি পেয়েই নড়েচড়ে বসে পুলিশ, আনা হয় ভিডিও ফুটেজগুলো। ক্যামেরায় ধারণকৃত সেদিনের ভিডিও দেখেই চমকে ওঠেন গোয়েন্দারা! সেখানে দেখা যায়, সন্দ্বীপ নিজেই তার অসুস্থ মা’কে ধরে সিঁড়ি বেয়ে ছাদের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর একাই ফিরে এসে ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল সে। তারও কয়েক মিনিট বাদে অ্যাপার্টমেন্টের নিচে থেকে এক যুবক হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে সন্দ্বীপদের ফ্ল্যাটে, সম্ভবত সে’ই খবর এনেছিল যে জয়শ্রীবেন ছাদ থেকে নীচে পড়ে গেছেন। অবাক হবার ভান করে ভালোমানুষের মুখোশ পরে তার সঙ্গে ছুটে গিয়েছিলেন সন্দ্বীপ!

পুলিশ আবার ডাকলো সন্দ্বীপকে, কিন্ত এত সহজে নিজের কৃতকর্ম স্বীকার করল না সন্দ্বীপ নাথওয়ানি। পুলিশের কাছে প্রথমে সে দাবী করেছিল, মা’কে পূজোর জন্যে ছাদে নিয়ে গিয়েছিল। মা তাকে জল আনতে বলায় নীচে নামে সে। তাই তার পড়ে যাওয়ার কথা জানতেই পারেনি। কিন্ত সাক্ষ্যপ্রমাণের সঙ্গে ভিডিও ফুটেজ মিলছিল না কিছুই, একারণে পুলিশি হেফাজতেই রাখা হয়েছিল তাকে। যে মহিলা একা বিছানা থেকে উঠতে পারেন না, বাথরুমে যেতেও অন্যের সাহায্যের প্রয়োজন হয়, তার হঠাৎ পূজো দেয়ার ইচ্ছে হলো কেন? মায়ের চটিজুতো পরে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখা গেছে সন্দ্বীপকে, এই বিষয়েও কোন সদুত্তর দিতে পারেনি সে। ক্রমাগত জেরার এক পর্যায়ে নিজের মা’কে হত্যার কথা স্বীকার করে সন্দ্বীপ।

সন্দ্বীপ নাথওয়ালি, রাজকোট, ছেলের হাতে মা খুন, ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে মা'কে খুন, ঐশী

জয়শ্রীবেন মৃত্যুর আগে তিনমাসেরও বেশী সময় ধরে ব্রেইন হ্যামারেজে ভুগছিলেন, মোটামুটি পক্ষাঘাতগ্রস্থ হয়ে পড়েছিলেন তিনি। সারাক্ষণ তাঁকে দেখে রাখতে হতো, তার পাশে কাউকে না কাউকে থাকতে হতো, বিছানায় একা একা পাশ ফিরতেও কষ্ট হতো তার। এসব নিয়েই সন্দ্বীপের স্ত্রী খিটিমিটি শুরু করেছিলেন ঘরে, নিজের মা’কে অসহ্য লাগছিল সন্দ্বীপেরও। বোনের বিয়ে দেয়া নিয়েও নাকি ঝামেলা হচ্ছিল সংসারে। আর এসব ‘ঝামেলা’ থেকে মুক্তি পেতেই জয়শ্রীবেনকে খুন করার পরিকল্পনা করেছিল সন্দ্বীপ। সেই পরিকল্পনা মোতাবেকই তাঁকে ছাদে নিয়ে গিয়ে ধাক্কা দিয়ে নীচে ফেলে দেয় সন্দ্বীপ। সুন্দর একটা নাটকও সাজিয়ে ফেলেছিল সে, কিন্ত প্রকৃতির বিচারে ধরা পড়ে গেল এই কাপুরুষটা।

যে মা দশটা মাস শত যন্ত্রণা সহ্য করে সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেছেন, বছরের পর বছর ধরে হাজারটা ঝড় ঝাপটা সামনে আগলে রেখেছেন বুকের মানিককে, তাকেই ‘ঝামেলা’ ভেবে নির্মমভাবে খুন করে সন্তান! কই, মায়ের কাছে তো কোনদিন সন্তানকে ‘ঝামেলা’ মনে হয়নি, হলে তো সন্দ্বীপের এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকারই কথা না। এই লোক নাকি পেশায় শিক্ষক, কোন এক কলেজের অ্যাসিস্টেন্ট প্রফেসর; শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেয়া নাকি তার কাজ! এমন নজিরই তিনি স্থাপন করলেন দুনিয়ার বুকে, যে কীর্তির কথা শুনলেও শিউরে উঠতে হয়!

Comments
Spread the love