জুলাইয়ের এক সকাল। ওয়েলসের উপকূলে ছুটি কাটাচ্ছেন এক ভদ্রলোক। যিনি কিছুক্ষণ আগেই একটি ভয়াবহ কাজ করে ফেলেছেন। ইমার্জেন্সি হটলাইনে ফোন দিয়ে অপারেটরকে তিনি বললেন, ‘আমি সম্ভবত আমার বউকে খুন করেছি!’

দশ মিনিট পরেই পুলিশ ঘটনাস্থলে চলে আসলো। তারা এসে দেখলো ফোন কল করা সেই ভদ্রলোক, যার নাম ব্রিয়েন থমাস, কাঁদছেন। তিনি গত রাতের অভিজ্ঞতার কথা পুলিশকে জানালেন।

তার বক্তব্যটি ছিল এরকম যে, তিনি এবং তার স্ত্রী গত রাতে ক্যাম্পিং ভ্যানের মধ্যে ঘুমিয়ে আছেন। তিনি দেখলেন কিছু যুবক তার ভ্যানের আশেপাশে রেসিং করছে। কয়েক ঘন্টা পর আধো আলো অন্ধকারে ব্রিয়েন থমাস যখন জেগে উঠলেন তার মনে হলো, একটি যুবক যার পরনে জিনস প্যান্ট এবং ভেড়ার লোমের পোষাক, সে যুবকটি তার স্ত্রীর উপর শুয়ে আছে!

এই দৃশ্য দেখে তিনি সইতে পারলেন না। উত্তেজনায় তার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। তিনি যুবকটির দিকে বিকট স্বরে চিৎকার দিয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরলেন এবং গলা টেনেহিঁচড়ে নামানোর চেষ্টা করছিলেন। তার মনে হতে থাকলো, তিনি যেন যন্ত্রচালিত মানব, যা করছেন, স্বয়ংক্রিয়ভাবেই করে যাচ্ছেন। যুবকটি যতই নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে থমাস তাকে ততই চেপে ধরছে। যুবকটি লড়াই করে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেও থমাস তাকে কিছুতেই ছাড়ছে না। কিছুক্ষণ বাদে থমাস বুঝতে পারল, যুবকটির আর নড়াচড়া করার ক্ষমতা নেই।

কিন্তু চেতনা কিছুটা ফিরে আসতেই থমাস বুঝতে পারল, তার দুই হাতে নির্লিপ্ত হয়ে যে শরীরটি নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে সেটা আর কেউ নয়, তার স্ত্রী। তার মাথা খারাপ হওয়ার মতোই অবস্থা! সে তার স্ত্রীকে কয়েকবার নাড়া দিয়ে সাড়া পাওয়ার চেষ্টা করছিল এবং বারবার জিজ্ঞেস করছে, তুমি ঠিক আছো তো! তুমি ঠিক আছো তো!

থমাস পুলিশকে এই কথা বলতে বলতেই নিজেই অস্ফুট স্বরে বলছিল, ‘ও ছিল আমার দুনিয়া।’ 

পরের দশ মাস তাকে কারাগারে থাকতে হলো। কিন্তু কেন এমন ঘটনা ঘটলো থমাসের জীবনে? কেনই নিজের স্ত্রীকে হত্যা করে পুলিশকে জানালেন! সমস্যাটা কোথায়?

*

সমস্যাটা আসলে ঘুমের মধ্যে। থমাসের এই সমস্যাটাকে বলা হয় ‘স্লিপ টেরর’। ‘স্লিপ টেরর’-এর সাথে ‘স্লিপ ওয়াকিং’-এর কিছুটা মিল থাকলেও একটু পার্থক্যও আছে।

‘স্লিপ ওয়াকিং’ মানে হলো, ঘুমের মধ্যে হাঁটা। সিনেমাতে কিংবা বিভিন্ন আর্টিকেলেও হয়ত স্লিপ ওয়াকিং নিয়ে জেনেছেন। ব্যাপারটাকে খুব সহজে ব্যাখ্যা করতে গেলে বলতে হয়, একজন মানুষ যিনি ঘুমিয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ করেই হাঁটতে বের হন, কথা বলেন, খাওয়া দাওয়া করেন ইত্যাদি। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো পুরো ব্যাপারটাই ঘটে ঘুমের মধ্যে। সবগুলো ঘটনাই তিনি সত্যি সত্যিই করে থাকেন, এগুলো স্বপ্ন নয়। যখন এই কাজগুলো করেন তখন হয়ত তার কাছে স্বপ্নই মনে হতে পারে তবে জেগে উঠবার পর তার কিছুই মনে থাকে না।

আমার আপন ফুফুই ছোটবেলায় ঘুমের ঘোরে হাঁটতেন। গ্রামের নিশুতি রাত। নির্জন এ রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। ঝিঁ ঝিঁ পোকারাও ক্লান্ত এমনই এক প্রহরে ফুফু নিজেই দরজা খুলে বেরিয়ে গেলেন। হাঁটছেন তো হাঁটছেন৷ কিছুক্ষণ পর বাড়ির কেউ একজন টের পেল তিনি ঘরে নেই। সাথে সাথে টর্চের বাতি নিয়ে ফুফুকে খোঁজার জন্য বের হলো কয়েকজন। পুকুর পাড়ে খুঁজে পাওয়া গেল না, আশেপাশের কোথাও তাকে পাওয়া যাচ্ছিল না। শেষমেষ ফুফুকে পাওয়া গেল কবরস্থানে। অথচ, তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হলো, তিনি যেন আকাশ থেকে পড়লেন, কিছুই জানেন না।

এরকম সমস্যা অনেকেরই আছে। কীভাবে হয় এটি?

ঘুমের মূলত চারটি স্তর আছে। চতুর্থ স্তরটিকে বলা হয় নন- র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট। এই স্তরে এসেই মানুষ বিভিন্ন স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। এই সময় মানুষকে ঘুম থেকে জাগানো সহজ নয়, যদি জেগেও যায় তাহলেও সে এক ধরণের ঘোরের মধ্যে থাকে। স্লিপওয়াকিং সাধারণত এই স্তরেই হয়ে থাকে।

স্লিপ টেররে যেটা হয়, মানুষ যখন ঘুম ভেঙ্গে উঠে তখন প্রচণ্ড চিৎকার করতে থাকে। এক ধরণের প্যানিকের মধ্যে থাকে। প্রচন্ড ঘামতে থাকে। দ্রুত নিঃশ্বাস ফেলে। ফলে এই সময়ে তার পক্ষে যেকোনো হঠকারী কাজই সম্ভব। যারা স্লিপ টেররে থাকে তারা খুব বিভ্রান্ত থাকে। যে ঘোরের মধ্যে থাকে তখন সে পাশের পরিচিত মানুষকেও চিনতে পারে না। জেগে উঠে যাকে দেখে তাকে দেখে যদি সে ভয় পায় তাহলে সে ওই মানুষটার উপর আক্রমনাত্মক হয়ে যেতে পারে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সকালবেলায় কিছুই মনে করতে পারে না সে।

*

থমাসও স্লিপ টেররে আক্রান্ত ছিলেন। ছোট বেলা থেকেই ঘুমের মধ্যে হাঁটতেন। নিজের খেলনা নিয়ে খেলতেন এমনকি খাবার পর্যন্ত খেতেন। কিন্তু পরের সকালে কিছুই তার মনে থাকতো না। বিয়ের পরেও এই সমস্যা থেকে তিনি মুক্ত হতে পারেননি।

পুলিশ যদিও থমাসকে মার্ডার কেসের জন্য অভিযুক্ত করেছে কিন্তু তদন্ত করে জানা গেল, থমাসের দাম্পত্য জীবন বেশ সুখের ছিল। তাই এই খুনটা যে সে ইচ্ছা করেই করেছে, সেটা প্রমাণ করা যায়নি।

তথ্যসূত্র – দ্য পাওয়ার অফ হ্যাবিট (লেখক- চার্লস ডুহিগ)

আরও পড়ুন-

Comments
Spread the love