শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী স্যার এলেক্স কথা বলতে শুরু করেছেন। একাধিক ব্রিটিশ পত্রিকার তথ্যমতে, সম্বিৎ ফিরে পাওয়ার পর তাঁর মুখ থেকে বের হওয়া প্রথম বাক্যটাই নাকি ছিল, “ডনক্যাস্টারের (ডনক্যাস্টার রোভার্স ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় ডিভিশনের একটা দল যার কোচ এলেক্সের পুত্র ড্যারেন ফার্গুসন) কী হাল?”

ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা কতটা তীব্র হলে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়া শেষ হতে না হতেই একজন মানুষের প্রথম জিজ্ঞাস্যই হয় ফুটবলকেন্দ্রিক!

এখানেই নাকি শেষ নয়। পরিবারের লোকজনের কাছে আক্ষেপ করে নাকি তিনি বলেছেন, “কাপ ফাইনালটা আর ধরা গেল না (১৯ তারিখে এফএ কাপের ফাইনালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড খেলবে চেলসির বিরুদ্ধে), কিন্তু কিয়েভ ?” না পাঠক, আপনি ভুল বোঝেননি। গত ৬ই মে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে যেই ৭৬ বছর বয়সী স্কটিশ ভদ্রলোক একটা জটিলতম অস্ত্রোপচারের মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন, আগামী ২৬শে মে চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালটা দেখতে তিনি একটু কিয়েভ যেতে চান।

এলেক্স ফার্গুসনের পরিবারের লোকজন শেষতক সম্ভবত এই পাগলামিকে ফলপ্রসূ হতে দেবে না। কিন্তু এই গল্পটা থেকে খুব স্পষ্টভাবে চেনা যায় স্যার এলেক্স ফার্গুসনকে। প্রায় অতিমানবিক মানসিক শক্তি, চূড়ান্ত আত্মবিশ্বাস আর ফুটবলের প্রতি এক গভীরতম আকর্ষণ- এই তো তার সাফল্যের রহস্য।

স্যার এলেক্স সেরে উঠছেন। তাঁর স্বভাবজাত রসিকতায় আমাদেরকে ভুলিয়ে দিচ্ছেন উৎকণ্ঠার দিনগুলোকে। আজকের এই হাসি-ইয়ার্কিতে ভরা পরিবেশে দাঁড়িয়ে মনে করাই কষ্ট ঠিক একটা সপ্তাহ আগেই গোটা ফুটবল-বিশ্ব কী গভীর শংকা নিয়ে তাকিয়ে ছিল স্যালফোর্ড রয়্যাল হসপিটালের দিকে, যেখানে তখন চিকিৎসকের ছুরির নিচে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিলেন ফুটবল দুনিয়ার জীবন্ত কিংবদন্তী স্যার এলেক্স ফার্গুসন।

এলেক্সকে নিয়ে এই শংকা একেবারেই অমূলক ছিল না।

একে তো মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের মতো জটিল ব্যাপার, তার সঙ্গে এলেক্সের বয়সও বাড়তি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে আবির্ভূত হয়েছিল। এমনিতেও হৃদরোগের জন্য অনেক আগে থেকেই এলেক্স ফার্গুসনকে পেসমেকার বসাতে হয়েছিল। চূড়ান্ত আশাবাদী মানুষটাও নিশ্চয় ভাবতে পারি না এত দ্রুত আমরা ইতিবাচক কোনো খবর পাবো।

গোটা দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ফুটবলপ্রেমী মানুষজন তাদের প্রার্থনা আর শুভকামনা নিয়ে যেভাবে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তাতে স্যারের এলেক্সের পরিবার আপ্লুত বোধ করেছে। এলেক্স ফার্গুসনের পরিবার শুভ কামনা জানানো তাবৎ ফুটবলার, কোচ, বিভিন্ন দলের কর্মকর্তা ও ফুটবলপ্রেমীদের পরিবারের পক্ষে থেকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।

‘স্যারের’ পুরানো ছাত্ররা প্রায় সবাই-ই তাদের শুভকামনা জানিয়েছেন নানাভাবে। ডেভিড বেকহাম টুইটারে পোস্ট করেছেন বহু পুরোনো একটা ছবি, যেখানে দেখা যাচ্ছে কিশোর বেকহাম আর এলেক্সকে। লিখেছেন, “লড়াই চালিয়ে যান, বস। ক্যাথি (বেকহামের স্ত্রী) আর আমার গোটা পরিবার আপনার জন্য প্রার্থনারত।” এককালের ডাকসাইটে গোলকিপার এবং ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ৯৮-৯৯ মৌসুমের ট্রেবলজয়ী দলের অন্যতম স্তম্ভ পিটার স্মাইকেলও জানিয়েছেন তাঁর শুভ কামনা। এক টুইটার বার্তায় পিটার লিখেছেন, “প্লিজ, শক্ত থাকুন। এই লড়াইটা জিতুন।” শুভ কামনা জানিয়েছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, ওয়েইন রুনি, রিও ফার্ডিনান্ড, এশলি ইয়াং, লুক সহ আদনান ইয়ানুজাইসহ আরো অনেক সাবেক শিষ্যই।

তবে তার চেয়েও চমৎকার ব্যাপার হচ্ছে, প্রার্থনা আর শুভ বার্তা নিয়ে এগিয়ে এসেছে নানা ‘শত্রুপক্ষ’ও। এককালে যার সঙ্গে এলেক্স ফার্গুসনের দ্বৈরথ ছিল ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের মূল আকর্ষণ সেই আর্সেন ওয়েঙ্গার মন্তব্য করেছেন,”আমি তাঁর ও তার পরিবারের জন্য শংকিত ও চিন্তিত। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি তাঁর মনের জোর তাঁকে খুব দ্রুতই সুস্থ করে তুলবে।”

শুভেচ্ছা-বার্তা এসেছে শহরের নীল প্রান্ত থেকেও। ম্যানচেস্টার সিটি জানিয়েছে তাদের প্রার্থনা ও শুভকামনা। তবে সবচেয়ে অসাধারণ বার্তাটা সম্ভবত এসেছে ‘চিরশত্রু’ লিভারপুল ক্লাবের কাছ থেকে। এক অফিশিয়াল বার্তায় লিভারপুল জানিয়েছে “লিভারপুল ফুটবল ক্লাবের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবার ভাবনাজুড়ে এই মুহূর্তে স্যার এলেক্স ফার্গুসন ও তাঁর পরিবার আছে। তিনি শুধু দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বীই ছিলেন না, ছিলেন দারুণ বন্ধুও। এই ক্লাবটির সবচেয়ে কঠিন সময়ে যিনি আমাদের সমর্থন দিয়েছেন। আমরা তাঁর পূর্ণ সুস্থতা কামনা করি।”

একটা ভিন্ন প্রসঙ্গে শেষ করা যাক। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এহেন ভক্ত নেই যিনি ‘ফার্গি টাইমের’ সঙ্গে পরিচিত নন। বাজারে এককালে কান-কথা ছিল যে ঘরের মাঠে ইউনাইটেড পিছিয়ে থাকলেই নাকি এলেক্স ফার্গুসন রেফারি আর চতুর্থ রেফারির উপর চাপ সৃষ্টি করতেন। প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়েরা যে সমানে সময় নষ্ট করছে ( তা আসলে করুক আর নাই করুক) তা রেফারিদের বারবার মনে করিয়ে দিতেন। এবং রেফারিরাও নাকি চাপের মুখে বাড়িয়ে দিতেন ইনজুরি টাইম। এই বাড়িয়ে দেওয়া ইনজুরি টাইমকেই বলা হতো ‘ফার্গি টাইম’। ফার্গি টাইমে যে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কত খেলার বদলে দিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই।

আসলে আমরা যারা স্যার এলেক্সের প্রাণ নিয়ে শংকিত হয়ে ছিলাম তারাই একটু বোকা। জীবনের গোধূলী-লগ্নে থাকা স্যার এলেক্সকে ‘ফার্গি টাইম’ না দিয়ে যে মৃত্যুর দূতেরও রেহাই নেই এই কথাটা আমরা বেমালুম ভুলেই গিয়েছিলাম। এবারের ‘ফার্গি টাইম’ দীর্ঘ হোক, এই এখন প্রত্যাশা।

Comments
Spread the love