অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

সিঙ্গাপুর স্বাধীনতা চায়নি, বরং জোর করে চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল!

অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেছিলেন, “বঙ্গবন্ধু একটি অনিচ্ছুক জাতিকে নয়মাসে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন।” কথাটা পুরোপুরি মিথ্যে নয়, স্বাধীনতার ছেচল্লিশ বছর পর এসেও এখনও পাকিস্তানী ভূত যায়নি অনেকের মাথা থেকে, কিংবা পাকিস্তানের সঙ্গেই আমরা ভাল ছিলাম, এমন যুক্তি দাঁড় করানোর মানুষও আছে বেশ কিছু। কিন্ত পৃথিবীতে একটি দেশ আছে, যারা স্বাধীনতা চায়নি, বাধ্য হয়েই স্বাধীনতা ঘোষণা করতে হয়েছিল তাদের। এমনকি ফেডারেশন থেকে বের করে দেয়ার ঘটনায় মিডিয়ার সামনে কেঁদে ফেলেছিলেন তাদের প্রেসিডেন্ট, অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল ছোট্ট দেশটা আর এর অধিবাসীদের ভবিষ্যত। কিন্ত সবকিছুই তারা সামলে নিয়েছে দারুণ কৃতিত্বে। মাত্র আড়াইশো বর্গমাইলের সেই দেশটা এখন এশিয়ার বুকে জ্বলজ্বল করে আপন মহিমায়, নাম তার সিঙ্গাপুর।

ফিরে যেতে হবে ষাটের দশকে। বৃটিশরা তখনও সিঙ্গাপুর ছাড়েনি, পাশের দেশ মালয়েশিয়া অবশ্য স্বাধীনতা পেয়ে গিয়েছে বৃটেন থেকে। বৃটিশরা ধীরে ধীরে নিজেদের সাম্রাজ্য গুটিয়ে নিচ্ছিল এশিয়া থেকে, একে একে দেশগুলো স্বাধীনতা অর্জন করছিল তখন। তবে প্রায় সবাইকেই আন্দোলন করতে হয়েছে, রক্ত ঝরাতে হয়েছে মহামূল্যবান স্বাধীনতার জন্যে। সিঙ্গাপুরকে নিয়ে বৃটিশদের ভয় ছিল, এই দ্বীপটা কমিউনিস্টদের আখড়া হয়ে উঠতে পারে। আর তাই যদি বড় কোন গণতান্ত্রিক দেশের সঙ্গে সিঙ্গাপুরের কোয়ালিশন বা ফেডারেশন করে দেয়া যায় সেক্ষেত্রে এই ভয়টা আর থাকছে না। 

ততদিনে বৃটিশদের অধীনেই সিঙ্গাপুরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন সিঙ্গাপুরের পিপলস অ্যাকশন পার্টির জনপ্রিয় নেতা লি কুয়ান ইউ। বৃটিশরা তাঁকে বোঝালো বড় কোন দেশ, বিশেষত মালয়েশিয়ার সঙ্গে ফেডারেশন করার গুরুত্বটা। সিঙ্গাপুরে তখন ভৌত অবকাঠামো বলতে খুব বেশী কিছু নেই, খাদ্যে স্বয়ংস্বম্পূর্ন নয় তারা, শহরকেন্দ্রিক ছোট্ট দেশটাতে নেই তেমন কোন প্রাকৃতিক সম্পদও। মাছ ধরাটাই বেশীরভাগ মানুষের পেশা। লি কুয়ান ইউ বুঝতে পারছিলেন, একা হেঁটে যাওয়াটা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তবে তাঁর মতের বিরোধীতা করার মানুষও ছিল, নিজের দলেই এই মতের বিরুদ্ধাচরণ করেছিলেন কেউ কেউ। আর তাই গণভোটের আয়োজন করা হলো দেশে। লি কুয়ান ইউ এবং তাঁর দল মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রচারণা চালালেন মালয়েশিয়ার সঙ্গে ফেডারেশন গঠনের ব্যাপারে, তিনটি ভিন্ন জাতিস্বত্ত্বার দেশ সিঙ্গাপুরের সর্বশ্রেণীর মানুষের কাছে নিজেদের কথা এবং কোয়ালিশন গঠনের সুবিধার ব্যাপারে জানাতে রেডিওতে গণসংযোগ করলেন, গেলেন মানুষের ঘরে ঘরে। সেটার ফলও মিললো, বিপুল ভোটে জনগণ রায় দিলো ফেডারেশন গঠনের পক্ষে।

সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সুবাহ এবং সারাওয়াক দ্বীপের নেতারা একসঙ্গে বসে ঠিক করলেন ১৯৬৩ সালের ৩১শে আগস্ট ফেডারেশন গঠিত হবে, সেই অনুযায়ী জুলাই মাসে চুক্তিও করা হলো। সবকিছুই প্ল্যনমাফিক চলছিল, বৃটেন সিঙ্গাপুরকে স্বাধীনতা দিলো ৩১শে আগস্ট, সেদিনই ফেডারেশনে যোগ দেয়ার কথা তাদের। কিন্ত জাতিসংঘকে এই ফেডারেশনের বিষয়ে পর্যাপ্ত সমীক্ষা চালানোর সুযোগ দিতে সময় বাড়ালেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী টেঙ্কু আবদুর রহমান। দেশের ভেতরেও বিরোধের সূত্রপাত ঘটলো, পিপলস অ্যাকশন পার্টি ২১শে সেপ্টেম্বর আবার নির্বাচনের ঘোষনা দিলো। কিন্ত অভিযোগ আছে বিরোধী নেতাদের ধরে ধরে জেলে বন্দী করেছিল ক্ষমতাসীন সরকার, মালয়ী পুলিশ এবং বৃটিশ নিরাপত্তাকর্মীরা। এরমধ্যে আবার ইন্দোনেশিয়ার বাঁধার মুখেও পড়তে হয়েছে ফেডারেশনের দেশগুলোকে। জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা রায় দিলেন, এই দ্বীপগুলোর অধিকাংশ মানুষ চায় মালয়েশিয়ার সঙ্গে যোগ দিতে, ইন্দোনেশিয়া তখ মালয়েশিয়া এবং বাকী তিন দ্বীপরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করেছিল। ১৯৬৩ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর ফেডারেশনে যোগ দিলো সিঙ্গাপুর, আনুষ্ঠানিকভাবে পরিণত হলো মালয়েশিয়ার অংশে। 

তবে মালয়ীরা কখনোই সিঙ্গাপুরের অধিবাসীদের স্বদেশী ভাবতে পারেনি। সিঙ্গাপুরের মানুষজন নিজেরাই ছিল তিনটি আলাদা জাতিস্বত্বার, তাই এদের মধ্যে বন্ধনটাও তুলনামূলক কম ছিল। ফেডারেশন গঠন করাটা ছিল ভুল সিদ্ধান্ত, প্রথম এক বছরে সিঙ্গাপুরে উন্নয়নের কোন ছোঁয়া লাগেনি, আড়াইশো বর্গমাইলের এই দ্বীপটি ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের সুদৃষ্টি থেকে পুরোপুরি অবহেলিত। সিঙ্গাপুরের উন্নয়নের বিষয়ে অনেক গালভরা কথাবার্তা চুক্তিতে থাকলেও, বাস্তবে সেগুলো ছিল পুরোপুরি অনুপস্থিত। উল্টো কেন্দ্রীয় সরকার সিঙ্গাপুরের রাজস্বের সিংহভাগ দাবী করে বসে, সেনাবাহিনীর উন্নয়নের জন্যে। রাজনৈতিক বৈরীতাও বাড়ছিল। কেন্দ্রীয় নির্বাচনের ফলাফল বয়কট করেছিল পিপলস অ্যাকশন পার্টি। আগুনে ঘি ঢেলে দিল মালয়ী আর সিঙ্গাপুরের চায়নীজদের মধ্যেকার রায়টের ঘটনা, মুসলিমদের ধর্মীয় উৎসবের দিনে হওয়া এই রায়টে মারা গিয়েছিল বিশজনের বেশী মানুষ, আহত হয়েছিল শতাধিক। মালয়েশিয়ার ভেতরেই ফেডারেশন থেকে সিঙ্গাপুরকে বাদ দেয়ার দাবী উঠতে লাগলো, সিঙ্গাপুরের অধিবাসীরাও যে খুব খুশী ছিল ফেডারেশনে, এমনটাও নয়।

১৯৬৫ সালে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী টেঙ্কু আবদুর রহমান প্রস্তাব করলেন সিঙ্গাপুরকে ফেডারেশন থেকে বের করে দেয়ার। প্রতিনিধিদের মধ্যে ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হলো, ১২৬-০ ভোটে মত এলো সিঙ্গাপুরকে বাদ দেয়ার। সেই মোতাবেক ১৯৬৫ সালের ৬ আগস্ট আবদুর রহমান ঘোষনা দিলেন মালয়েশিয়ার নেতৃত্বে গঠিত ফেডারেশনের অংশ অয়ে আর থাকছে না সিঙ্গাপুর, ৯ আগস্ট অশ্রুসিক্ত নয়নে সিঙ্গাপুরের স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন লি কুয়ান ইউ, যে স্বাধীনতা সিঙ্গাপুরের বেশীরভাগ মানুষই চাননি! ছোট্ট জায়গায় বিশাল জনগোষ্ঠী, দেশজুড়ে বেকারত্ব সমস্যা প্রকট, নেই কাজের সন্ধান, কোন প্রাকৃতিক সম্পদও নেই- এমন অবস্থায় স্বাধীনতা তো একটি আপদের নাম!

তবে সিঙ্গাপুর নিজেদের গুছিয়ে নিয়েছিল বেশ দ্রুত। চারপাশে সাগরবেষ্টিত এই দেশটি নীল জলরাশিকেই বানিয়েছে উন্নতির সোপান। সমুদ্রকে আর সামুদ্রিক যোগাযোগব্যবস্থাকে পুঁজি করেই ব্যবসা গড়ে ওঠে এই দেশে। সরকারের দারুণ কিছু বছরভিত্তিক পরিকল্পনা আর জণগনের হাড়ভাঙা খাটুনীতে দ্রুত উন্নতির পথে হাঁটতে থাকে সিঙ্গাপুর, মাত্র এক প্রজন্মেই অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে গিয়েছিল দেশের মানুষ। জোর করে চাপিয়ে দেয়া সেই স্বাধীনতা আগলে রেখে কাজ করে গিয়েছে তারা, অর্জন করেছে সমৃদ্ধি। দেশভর্তি বেকারের সেই মানুষগুলোর মাথাপিছু আয় এখন নব্বই হাজার ডলারের বেশী! এশিয়াতে যেটা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, সমগ্র বিশ্বে তৃতীয়! নিজেদের সামর্থ্যকে পুরোপুরি ব্যবহার করেই আজকের এই জায়গায় এসেছে সিঙ্গাপুর, কুড়িয়ে পাওয়া স্বাধীনতাকে অবহেলায় নষ্ট হতে দেয়নি। সিঙ্গাপুর তাই আজ বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যে রোল মডেল।

তথ্যসূত্র- 

১) https://www.economist.com/blogs/economist-explains/2015/03/economist-explains-22
২) http://countrystudies.us/singapore/10.htm

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close