একটা ছোট্ট ঘটনা বলি। আমার জীবনের। আমি তখন বেশ ছোট, ৬-৭ বছর বয়েস। কলোনিতে থাকতাম, মাঠে খেলতে যেত সবাই, আমি যেতাম না। ভয় লাগতো কেন জানি মানুষ দেখলে। আমি জানালার গ্রিল ধরে সবার খেলা দেখতাম। একদিন আম্মা জোর করে খেলতে পাঠাল, একা একা রুমে বসে থাকে কেউ?

মাঠে গেলাম, আমি নতুন ছেলে সবার ভেতর। যারা মাঠে খেলছিলো তারা আমার থেকে বেশ বড়। আমি বুঝতে পারছিলাম না আমার কি করা উচিত, এগিয়ে যাবো? বলবো, আমাকে খেলায় নেবে? নাকি বাসায় ফিরে আসবো? না, সেদিন কোন খেলাই হয়নি আর।

পাসপোর্টে আমার আইডেন্টিফিকেশন মার্ক দেয়া আছে -’ ডান ভ্রুর নিচে কাটা দাগ’। দাগটা সেদিন হয়েছিলো। কেন যেন সবাই মিলে আমাকে মারলো। এমন মার দিলো যে আমার মাথা ফেটে গলগল করে রক্ত পড়ছিল। কে যেন ইট দিয়ে চোখে বাড়ি দিলো। চোখ বেঁচে গেল অল্পের জন্য, কাঁটা দাগ রয়ে গেল ভ্রুতে। জ্ঞান হারানোর আগে অস্পষ্ট স্মৃতি – আমি রক্তাক্ত অবস্থায় কান ধরে উঠ বস করানো হচ্ছে। খেলতে গিয়ে ২২ টা সেলাই নিয়ে ঘরে ফিরেছিলাম। মজার ব্যাপার হল, মাঠের পাশে থাকা কেউই আমাকে বাঁচাতে আসেনি।

আমি সেদিন দুটি জিনিষ বুঝেছিলাম। পৃথিবী নরম ভদ্র দুর্বলের জায়গা না। এক অদ্ভুত জায়গা এই পৃথিবী। আর প্রতিটি মানুষের চেহারার পেছনে লুকিয়ে আছে এক হিংস্র পশু।

আমি ভুগতে শুরু করলাম সোশ্যাল এংজাইটি ডিজঅরডারে। আমি ভুগতাম না, এখনো ভুগে যাচ্ছি। ছোট বেলায় একবার বিস্কুট দৌড়ে প্রথম হয়েছিলাম। পুরুস্কার আনতে মাইকে আমার নাম ডাকা হল। স্টেজে উঠতে হবে এক দুই হাজার লোকের সামনে। আমি যাবো না না না না, চোখ মুছতে মুছতে আব্বুকে বললাম, আমার পুরুস্কার লাগবে না। আমার প্রাইজ আব্বু নিয়ে আসছে স্টেজে উঠে। আমি দূরে এক কোনায় দাড়িয়ে দাড়িয়ে নখ কাটছিলাম।

কোন পাবলিক গ্যাদারিং এ আপনার যেতে হবে। কিন্ত যখনই ভাবছেন যে ওখানে অনেক মানুষ থাকবে, সবাই আপনার দিকে তাকাবে। আপনার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে, হাত পা ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগছে। মনে শুধু একটাই ভাবনা, তারা আমাকে দেখে কি ভাবছে। আমাকে দেখতে কি মার্জিত লাগছে? আমি এমন কিছু করে বসবো না তো যা হিউমিলিয়েটিং হবে আমার জন্য! আমার এমব্যারেস্মেন্টে লোকেরা হাসাহাসি করবে না তো?

আমি কোনদিন কনসার্টে যাইনি। কোনদিন স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে যাইনি। কেন যাইনি কিংবা কেন যাওয়া হয়ে ওঠে না, এর কোন সঠিক উত্তর আমার কাছে নেই। কিশোর বয়সে যখন সবাই মেয়েদের সাথে জমপেশ আড্ডা মারতো, তখন আমি ঐ আড্ডা এড়িয়ে দূর দিয়ে বাড়ি ফিরতাম। হাত ঘামতো, গলা কাঁপতো।

সোশ্যাল এংজাইটি ডিজঅর্ডারে ভোগা লোকগুলো নিজের একটা গুড ইমেজ তৈরি করার চেষ্টা করে, যাতে তাঁর কোন ক্ষুত ধরে কেউ হাসাহাসি না করতে পারে। তারা সহজে কাউকে না বলতে পারে না। আনুরধে তারা বাস ট্রাকও গিলতে রাজি আছে। আমি একবার একটা প্যাকেজ পৌঁছে দিতে মিরপুর গিয়ে সারা দিন রাস্তায় দাড়িয়ে ছিলাম। তাও না বলতে পারিনি।

জীবনে কোনদিন রেজাল্ট আনতে স্কুল কলেজে যাইনি। অনেক মানুষ আসবে আর বাই এনি চান্স আমি যদি ধরা খাই, দায়িত্ব পড়তো আব্বার উপর।

কত আন্দোলন, কত মিছিল সমাবেশ। কিন্তু কোথাও আমার ছবি নেই। ৮-৯ বছর ফেসবুক কাটিয়েছি কোন ছবি না দিয়েই। নিজেকে উপস্থাপন যোগ্য মনে হতো না সবার সামনে। টিভি চ্যানেল রেডিও-কে একবাক্যে না বলা, বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে পালিয়ে বাঁচতাম কোন রকমে।

ডেটিং, পার্টি, ইন্টার্ভিউ, অপরিচিতদের সাথে কথা বলা আমাদের মতো মানুষদের জন্য পাহাড় কাটার মতো কঠিন। আমরা ইজি হতে পারি না সবার সাথে। সবার চোখে ক্ষ্যাত, আনস্মার্ট হয়ে ঘরে বসে থাকি। চৌকশ তুখোড় দুর্দান্ত কেউ হয়ে ওঠা হয় না আমাদের। কথা জড়িয়ে যায়, হাত ঘেমে ওঠে অপরিচিত মেয়েটা যখন বাসে পাশের সিটে বসে। ভালবাসি কথাটা বলার সাহস যোগাতে যোগাতে মেয়েটা বিয়ে শাদি করে বাচ্চা স্কুলে পাঠায়।

আমি সোশাল এংজাইটিকে হ্যান্ডেল করেছি ভিন্নভাবে। আমার হিউমার দিয়ে। বড় হতে লাগলাম আর দেখতে লাগলাম, আমার হিউমার মারাত্মক। আমি লোক হাসিয়ে গড়াগড়ি খাওয়াতে পারি। দেন আই স্টারটেড ইউজিং হিউমার এজ এ কোপিং মেকানিজম। আমি আগেই আড্ডাতে বসে সবাইকে হাসাতাম। এতে আমিও নরমাল হতাম আর সবাই আর আমাকে নিয়ে ভাববার অবকাশ পেত না।

হিউমার আমার ঢাল হলো, সমাজের ছিদ্রান্বেষী হিংস্র বাচ্চা এক ছেলের মাথা ফাটিয়ে দেয়া মানুষগুলোর টিটকারি হাসাহাসি অপমানের হাত থেকে বাঁচবার ঢাল, অস্ত্র।

আমি আমার পথ খুঁজে পেয়েছি। কিন্তু আজও বহু ছেলে মেয়ে রুমের ভেতর একা বসে আছে, যারা মিশতে পারে না সবার সাথে, উইয়ারড ফ্রিক এবনরমাল খেতাব পাওয়া ছেলেপেলে গুলো খাবি খাচ্ছে, সমাজ যাদের এলিয়েন বানিয়ে রেখেছে। যে দেশে ইভ টিজিং করা স্মারটনেস, সে দেশে এরকম দু চারটা এলিয়েনের প্রচণ্ড প্রয়োজন।

পাসপোর্টে ভ্রুর নিচে কাঁটা দাগ আমার আইডেন্টিফিকেশন মার্ক লেখা দেখে সব মনে পড়ে গেল। হ্যাপি ফেসবুকিং!

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-