সিনেমা হলের গলি

সেলুলয়েডের পর্দায় ক্যাম্পাস ঐতিহ্য ‘শাটল ট্রেন’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা শুনলেই সবার আগে মাথায় আসে শাটল ট্রেনের নাম। আমরা যারা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি না, তাদের কাছেও শাটল ট্রেনের ঐতিহ্যের গল্প শুনতে ভাল লাগে। এবার ভিজুয়াল ফিকশনেও চট্টগ্রামের শাটল ট্রেনের গল্প উঠে আসছে। নির্মাতারা গল্পে গল্পে বলতে চেয়েছেন শাটল ট্রেনের আখ্যান।

সিনেমাটির নামই ‘শাটল ট্রেন’। পরিচালনা করছেন প্রদীপ ঘোষ আর মূল গল্প মোহছেনা ঝর্ণার।

পরিচালক প্রদীপ ঘোষের হৃদয়জুড়ে এখনো গেঁথে আছে শাটল ট্রেনের দিনগুলি। তিনি বলেন, বিশ্বে একমাত্র চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পরিবহনের জন্য নিজস্ব ট্রেন আছে। প্রতিদিন নির্দিষ্ট কয়েকটি সময়ে এটি শহর ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া আসা করে। এতে শিক্ষার্থীদের কোন টিকেটের প্রয়োজন হয় না এবং কোন টিটিও থাকে না। বিষয়টি অনেক মজার। 

শাটল ট্রেন সিনেমা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

পুরো সিনেমা জুড়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য শাটল ট্রেনকেন্দ্রিক হাসি কান্না, বেদনা, সুরের মূর্ছনা, বন্ধুত্ব, তারুণ্যের গল্প – সব মিলিয়ে এটা শাটল ট্রেনের রোজকার গল্পের এক ভিজুয়্যাল ফিকশন। আর সাথে আছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাহাড়, ঝর্ণার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রদর্শনী।

শহর থেকে ক্যাম্পাস ২২ কিলোমিটার দূরে হওয়ার কারণে ১৯৮৪ সালের দিকে চালু হয় ছাত্রছাত্রীদের চলাচলের জন্য দুটি শাটল ট্রেন। পৃথিবীর আর কোনো দেশেই নেই এই ঐতিহ্য। শাটল ট্রেনের প্রত্যেকটা বগি যেন গল্পের একেকটা গুদামঘর। এখান থেকেই গড়ে ওঠে প্রেম, ঘন সবুজ পাহাড়ি, গ্রাম্য রেললাইন ধরে চলে শাটলের চাকা, চলতে থাকে জীবনের বিবিধ সুখ দুখের উপাখ্যান।

মজার ব্যাপার হচ্ছে প্রত্যেকটা বগির আছে বিভিন্ন নাম। যেমন- উল্কা, একাকার, সিএফসি, এপিটাফ, ওরিয়ন, সাম্পান, মহাপাপী, সিক্সটি নাইন, খাইট্টা খা, ককপিট, ফাইট ক্লাব ইত্যাদি। এই বগি সাধারণ কোনো বগি নয়। এখান থেকে জন্ম নেয় উদীয়মান বিতার্কিক, গায়ক, নায়ক, প্রেমিক, রাজনীতিবিদ। কোনো কোনো বগিতে বসে গানের আসর। সুরে সুরে মুখরিত শাটল ট্রেন। প্রেমিক যুগলরা উদাস হয়, রোমান্টিক হয়, চলতে থাকে দূর্বার প্রেম। এভাবেই মিশে যায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ছাত্রের অন্তরে। 

শাটল ট্রেন সিনেমা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

শাটল ট্রেন অনেকের কাছে চলন্ত এক বিশ্ববিদ্যালয়। পড়ালেখা, আড্ডা, পরচর্চা, প্রেম, মান অভিমান সব কিছুই চলতে থাকে ট্রেনের ঝিক ঝিক শব্দের তালে তালে। এই শাটল ট্রেন নিয়ে কবিতা, গল্প সবই হয়েছে। অপূর্ণতা ছিল একটা সিনেমার, এবার সেটিও হলো। যিনি এই সিনেমার নির্মাতা, প্রদীপ ঘোষ, তিনি নিজেও বিশ্ববিদ্যালয়টির চারুকলা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। চিত্রনাট্য হয়েছে আরেক চবি শিক্ষার্থী মোহেছিনা ঝর্ণার ‘বহে সমান্তরাল’ বই থেকে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসে ৫ থেকে ৬টি বছর কাটিয়ে যান। এই পাঁচ ছয় বছর জমতে থাকে নানান রকম স্মৃতি। শাটল ট্রেন সেই স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর এই স্মৃতি ও বাস্তব অভিজ্ঞতা এতে চিত্রায়ন করা হয়েছে। পহেলা ফাল্গুন চলচ্চিত্রটির শুটিং শুরু হয়ে ইতোমধ্যে কয়েক দফা শুটিং শেষ হয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাহাড়, ঝর্ণার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিভিন্ন রুপ দেখাতেই কয়েকটি ঋতুতে শ্যুটিং এর পরিকল্পনা করা হয়েছে এই সিনেমার জন্য।

পরিচালকের বক্তব্য – “চলচ্চিত্রটির নাম শাটল ট্রেন হলেও এতে শুধু শাটল ট্রেনের গল্পই থাকবে না, বরং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্য্য ও রূপ বৈচিত্র উঠে আসবে এই চলচ্চিত্রে । চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরুপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য বিভিন্ন ঋতুতে বিভিন্ন আকার ধারন করে, চলচ্চিত্রে এই সৌন্দর্য তুলে ধরতে আমরা চলচ্চিত্রটির শুটিং সব ঋতুতে করার চেষ্টা।” 

শাটল ট্রেন সিনেমা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

গণ অর্থায়নে হচ্ছে এই সিনেমার, প্রায় বিশজনের মতো মানুষ এই সিনেমার জন্য কন্ট্রিবিউট করছেন। তারা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, যারা অভিনয় করছেন তারাও সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, এবং কেউই অভিনয়ের জন্য কোনো অর্থ নিচ্ছেন না। এটি যেন তাদের নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি একটি দায়বদ্ধতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য গল্পে গল্পে সংরক্ষণের একটি প্রচেষ্টা। এই প্রচেষ্টা সফল হোক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এই সিনেমা নিয়ে বেশ উচ্ছ্বসিত। তারাও আছেন নিজেদের ঐতিহ্য, প্রাণের ক্যাম্পাসকে সেলুলয়েডের পর্দায় দেখবার অপেক্ষায়। সিনেমাটির টিজার ও সঙ্গীত ইতিমধ্যে ইউটিউবে প্রকাশিত হয়েছে। খুব শীঘ্রই মুক্তির দিনক্ষণ জানানো হবে “শাটল ট্রেন চলচ্চিত্র” ফেসবুক পেজে।

টিজার- 

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close