ডিসকভারিং বাংলাদেশতারুণ্য

সীতাকুণ্ড ভ্রমণ: নিসর্গ আর পুরাণের সাথে একদিন

শিখর

ঘড়িতে তখন সাড়ে নয়টা মতো বাজে। কোনমতে ‘শিখর’-এ চড়ে বসেছি। গুলিস্তানে নেমে সেখান থেকে রিকশা বা অন্য কোন বাসে কমলাপুর রেলস্টেশন যাবো। ভাইয়া ফোনে কার সাথে যেন কথা বলছে। হ্যাঁ, কে কে যাবে? মানে, ও এখনো কনফার্ম করে নি? আচ্ছা, আমি ওকে ফোন দিচ্ছি। ফোন কেটে রেখে আবার ফোন। মিশাল, সিট রাখতে পেরেছ? ট্রেন কোন প্ল্যাটফর্মে আসবে, সেটা কনফার্ম করেছ? আচ্ছা, দেখ। তুমি ইফরিতকে ফোন দাও আগে।

বসে বসে ওর কথাবার্তা শুনছি। হাতে ব্যাগ। সেই ব্যাগ শুধু শীতের কাপড় দিয়ে ভরা। আমার যে এতো শীত লাগে না, সে কথা আর বোঝাতে পারি নি বাসার কাউকে। ফলাফল, বস্তা কাঁধে নিয়েই বেরিয়ে পড়তে হয়েছে।

আমরা যাবো সীতাকুণ্ড। হঠাৎ সেদিন ভাইয়া এসে বললো, ৪ তারিখ সীতাকুণ্ড যাচ্ছি। যাবা? আমি আমতা আমতা করছিলাম। ‘অনেকদিন তো আর বাসা থেকে বের হতে পারবা না। একদিনের জন্যে ঘুরে আসো?’- কী মনে করে রাজি হয়ে গেলাম। কাজেই, আমরা এখন বাসে। ট্রেন ছাড়ার কথা সাড়ে দশটায়। এবং, আমরা এখনো নিশ্চিতভাবে জানি না, আমাদের সাথে ঠিক কতজন যাচ্ছে!

মেইল ট্রেন

রিকশায় করে কমলাপুর বাস স্টেশনে এসে নামার আগেই পাশের রিকশা থেকে আরিফ চিৎকার করে উঠলো, উচ্ছ্বাস ভাই! দেখলাম, আরিফ ওর মাথার হুডি ফেলে দিয়ে ঘাড় কাত করে হাত নাড়ছে। ওকে দেখে ভালো লাগলো। ভাইয়া ছাড়া এই ট্যুরে আমার পরিচিত আর কেউ যাবে বলে জানতাম না। হেসে উঠে পাল্টা হাত নাড়ালাম। রিকশা থেকে নেমে ওর দিকে এগিয়ে গেলাম। পেছনে ফিরে দেখি, ভাইয়া রাতারাতি দৌড়ানোর মতো করে হাঁটছে। আমরাও ছুট দিলাম।

রেলস্টেশনে চার-পাঁচজন গোল হয়ে দাঁড়ানো। ইফরিত আপুকে হাত নাড়তে দেখে ভাইয়া গুলির মতো ছুটে গেলো। গিয়ে দেখি, অভি দা, ইফরিত আপু আর জিহাদ দাঁড়ানো। জিহাদ অবশ্য যাবে না। ইফরিত আপুর সাথে এসেছিল এমনিতেই। ও চলে যাবে, তার আগেই মানবী হাজির। আমি কাউকে চিনি না, কিন্তু বাকি সবাই সবাইকে চেনে। ঘুরে ঘুরে স্টেশনের বইয়ের দোকানগুলো দেখছি, এমন সময় আরিফ ওর গায়ের হুডিটা দেখিয়ে বললো, ভাই, বলেন তো, এই হুডির দাম কতো?

হুডিটা বেশ সুন্দর। কেন যেন মনে হলো, খুব বেশী দামী হবে না। কাজেই মাথা চুলকে সাহস করে বললাম, তিনশ টাকা? 

১২০! ভাবতেছি, এমন হুডি কিনে কিনে একটু বেশী দাম রেখে বিক্রি করবো কিনা! কী বলবো, সেটা ভাবার আগেই দেখি, সবাই প্ল্যাটফর্মে ঢুকছে। জানা গেল, আমাদের সাথে মোট যাবে দশ জন। এর মাঝে একজন এখনো আসে নি। শুভ ভাই।

২ নম্বর প্ল্যাটফর্ম ধরে ছুট দিয়েছি সবাই মিলে। এ সময় মিশাল দা ফোন দিয়ে বললেন, সিট রেখেছেন। পিলার নাম্বার, তিন। পাশে তাকিয়ে দেখি, পিলার নাম্বার ২৪! উল্টা দৌড় দিলাম। কিন্তু পিলার ১৫ তে গিয়ে দেখি ট্রেনের লেজ দেখা যায়! আবার ফোন। আচ্ছা, ৩৬! উল্টো ঘুরে আবার দৌড়। শেষ পর্যন্ত ট্রেনে উঠলাম। যেহেতু মেইল ট্রেন, কাজেই নির্ধারিত সিট নেই। মিশাল ভাই আর রনি ভাই যুদ্ধ করে ৮টা সিট রাখতে পেরেছেন। এর মাঝে একপাশে আবার ট্রেনের জানালা ভাঙ্গা। বাইরে তখন তাপমাত্রা ১৬ ডিগ্রির মতো। শুনছি, ওদিকে তাপমাত্রা হবে ১২ ডিগ্রি। কিন্তু ট্রেন ছাড়ার পরে জমে যাবো কিনা, সে নিয়ে দেখি কারো কোন চিন্তা নেই। সবাই এক হয়েছে, কাজেই দশজনের সবার দেখা পাওয়া গেল।

শিবলী ভাই, আমি, রনি ভাই, মিশাল ভাই, তহুরা, ইফরিত আপু, মানবী, অভিদা, শুভ ভাই আর আরিফ- এই হচ্ছে আমাদের দল। সবাই খেয়ে এসেছে। একমাত্র অভিদা কিছুই খেতে পারেন নি। ট্রেন আবার ছেড়ে দেয়ার সময়ও হয়ে এসেছে। প্ল্যাটফর্মে নেমে দেখি, কলা-রুটি কেনার মতো কেউও নেই। কী আর করা!

ট্রেন ছেড়ে দেয়ার পরে সবাই মিলে এক দফা চা-বিস্কুট খাওয়া হলো। এরই মাঝে আরিফ আবার জিজ্ঞাসা করেছিল ভাইয়াকে, এই হুডির দাম কতো হতে পারে, বলেন তো ভাই?

৩০ টাকা!
বেচারা বাক্যহারা হয়ে সম্ভবত ভাবছিল, কোন দুঃখে জিজ্ঞাসা করতে গেলাম!

আড্ডা জমে গেছে। আরিফের সাথে কথা শুরু হয়েছিল শাহাদুজ্জামানকে নিয়ে। সে কথা এখন গিয়ে ঠেকেছে প্রিডিফাইন্ড রিয়েলিটি আর চিন্তার বিপ্লব নিয়ে। আমি আর অভিদা মিলে জম্পেশ আড্ডা। শুভ ভাই আমাদের মাঝখানে পড়ে স্যান্ডউইচ। ওদিকে ইফরিত আপু, মানবী, ভাইয়া, তহুরা আর মিশাল ভাই। রনি ভাইয়ের উপরে দিয়ে বিশাল ঝড় যাচ্ছিল। আমাদের খরচের সব হিসেব রাখার দায়িত্ব পড়েছে ওনার ঘাড়ে। মানুষটার অবশ্যই বিশাল ধন্যবাদ প্রাপ্য, আমাদের সব হিসাব রাখতে গিয়ে ওনার উপর দিয়ে নিতান্ত কম যায় নি।

আড্ডার মাঝ দিয়ে এপাশে এসে বসলাম। মানবীকে বললাম, একটু উঠে আমাকে জানালার পাশে বসতে দিবে কিনা। ও কী মনে করে যেন রাজি হয়ে গেল। গিয়ে বসলাম জানালার পাশে। ভাঙ্গা জানালা দিয়ে হু হু করে ছুটে আসছে শীতল বাতাস। বাইরে ট্রেনের সাথে পাল্লা দিয়ে উল্টো দিকে ছুটে যাচ্ছে বিশাল সব গাছের দল। একের পর এক স্টেশন পেরিয়ে যাচ্ছে। আমার সামনেই তহুরা। ওর সাথে মাহদি নামের এক পিচ্চির বেশ খাতির হয়ে গেছে। ওরা দুজনে মিলে একটু পরপর জানালা দিয়ে মাথা বের করে দেয়, আর সবাই মিলে ওদের মাথা যাকে বলে, টেনে ভেতরে ঢুকায়। ভৈরব স্টেশনে এসে বেশ কিছুক্ষণ বিরতি। আরেক দফা কেক-কলা খাওয়া হলো। এক ডিম বিক্রেতা এসে বললেন, ব্রিটিশ আমলের ডিম!

জানা গেল, উনি যাদের থেকে ডিম কেনেন, ওদের পল্ট্রি ফার্ম সেই ব্রিটিশ আমলের। উনি নিজেই ডিম বিক্রি করছেন একত্রিশ বছরের বেশী। সবাই মিলে সেই ডিম খাওয়া হলো। তারপর আবার টুকটাক এলোমেলো গল্প। কেমন একটা অদ্ভুত ভালো লাগা। এর মাঝে ইফরিত আপু আর মানবী গান ধরলো। সখী ভাবনা কাহারে বলে/সখী যাতনা কাহারে বলে…। আপুর গলার স্বর অসম্ভব ভালো। কান জুড়ায়।

রাতের আকাশ, গায়ে আছড়ে পড়া বাতাস আর চারপাশের সবার গল্প আর গান শুনতে শুনতে চোখ বন্ধ হয়ে আসে। ভাবলাম, একটু ঘুমিয়ে নেয়া যাক। সকাল সকাল আবার পাহাড় চড়তে হবে!

শিবের পাহাড় চূড়ায়

সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে ট্রেন থেকে নামলাম। একটুখানি দাঁড়িয়ে ছবি তোলার ব্যবস্থা। ট্রেন ততক্ষনে স্টেশন ছেড়ে গেছে। সে সময় প্রথম ঠিক করে অনুভব করা গেল শীতটুকু। একেবারে হাঁড়কাপানো শীত যাকে বলে। শুভ ভাই বা রনি ভাইয়ের কেউ একজন বলছিল, এই শীত তো দেখি উত্তরবঙ্গকেও হার মানিয়ে দিচ্ছে! তা হোক, কিন্তু ছবি না তুললে চলবে কেমন করে? এই মুহুর্তগুলো আর কখনো আসবে কিনা, কে জানে? কাজেই ছবি তোলা হলো। শীতে কাঁপতে কাঁপতে দাঁত বের করে হাসার ভঙ্গি করার জন্য সবাই মিলে চিৎকার দিয়ে বললো, ইলিশ!

ফ্রেশ হয়ে সবাই মিলে বাজারে আসলাম। নাস্তার ব্যবস্থা এখানেই। একটু বেশী করেই খেতে হবে, কারণ, পাহাড়ে চড়তে হবে। কেউ নিল খিচুড়ি, কেউ পরোটা। আমি নিজে পরোটা খেয়েছি চারটা। তারপর চা। বেরিয়ে এসে দামাদামি করে সিএনজি ঠিক করা হলো। গন্তব্য, চার কিলোমিটার দূরের চন্দ্রনাথ পাহাড়।

চন্দ্রনাথ শব্দের অর্থ হচ্ছে শিব। অর্থাৎ, এই পাহাড় হচ্ছে শিবের পাহাড়। কলিযুগে মহাদেব শিবের চন্দ্রনাথের চূড়াতেই আসার কথা। চূড়ায় শিবের একটি মন্দিরও আছে। এর নাম চন্দ্রনাথ মন্দির। পাহাড়ের চূড়ার উচ্চতা ১,১৫৫ ফিট। আমাদের প্রথম গন্তব্যও এটিই।

ঢোকার মুখেই একটা গেট। তার উপরে বড় করে লেখা, সত্যম শীবম। ঢোকার মুখে প্রথমেই সয়ম্ভুনাথের মন্দির। কিছুদূর গিয়েই একটা ঝর্ণা পাওয়া গেল। প্রায় শুকিয়ে গেছে, পানি পড়ছে চুঁইয়ে চুঁইয়ে। কিন্তু পানি পড়ে পড়ে ওঠার জায়গাটা একেবারে পিচ্ছিল হয়ে আছে। আমি, আরিফ আর শুভ ভাই কী মনে করে উঠে গেলাম। ওটার সময় আছাড় খেয়ে ব্যথাও পেয়েছি হাতে। জীবনে প্রথম পাহাড় চড়তে এসেছি, এক-আধটু ব্যথা না পেলে হয়?

ঝর্ণার একেবারে পাশ দিয়েই একটা শক্তিপীঠ। শক্তিপীঠের পেছনের গল্পটা শোনালেন মিশাল ভাই। ওনাকে অবশ্য এরপরে সারাদিনই যন্ত্রণা দিয়েছি। উনিও খুশি মনে যন্ত্রণা সহ্য করে একের পর এক উত্তর দিয়ে গেছেন আমার প্রশ্নের। যাই হোক, গল্পে যাই।

হিন্দু পুরাণ অনুসারে, রাজা দক্ষ একটা যজ্ঞের অনুষ্ঠানে সব দেব-দেবীকে আমন্ত্রণ জানালেও কন্যা সতীকে আমন্ত্রণ করেন নি। মেয়ে তাঁর অমতে গিয়ে শিবকে বিয়ে করেছেন, এটা তাঁর পছন্দ হয় নি। কিন্তু সতী তারপরেও বাবার অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। দক্ষ সতীকে প্রচন্ডরকম অপমান করলে সতী আত্মহত্যা করেন। রাগে ক্ষোভে কাতর শিব এই ঘটনার প্রতিবাদ হিসেবে সীতাকে কাঁধে নিয়ে নাচতে শুরু করেছিলেন। এর নাম প্রলয়নৃত্য। শিবের প্রলয়নৃত্যে পৃথিবী আরেকটু হলে ধ্বংসই হয়ে যেত। সব দেবতাদের অনুরোধে বিষ্ণু তাঁর চক্র ছুঁড়ে মারলে সতীর দেহ ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে পৃথিবীর নানান জায়গায় গিয়ে পড়ে এবং শিব শেষ পর্যন্ত প্রলয়নৃত্য বন্ধ করেন। সতীর দেহের অংশগুলো পাথর হয়ে জমে জমে তৈরি হয়েছে এই শক্তিপীঠ।

পাহাড়ে উঠতে উঠতে গল্প শুনছিলাম। নানারকম কথাবার্তা। মাঝে মাঝে থেমে ছবি তোলা। কিছুক্ষণ পর পা আটকে আসতে চাইলে একটু জিরিয়ে নিয়ে স্যালাইন বা গ্লুকোজ খেয়ে বিশ্রাম নেয়া। মিশাল ভাই আগেই বলেছেন, শিবের চন্দ্রনাথের চূড়ায় ফিরে আসার কথা। কেন, সে কথা বলেন নি। সে কথা বলবেন চন্দ্রনাথের চূড়ায় উঠে। সে আগ্রহ আছে। তাছাড়া, জীবনে প্রথম এমন পাহাড়ে উঠছি। আর, পাহাড়ের উপর থেকে নিচে তাকালে কুয়াশা আর সবুজের মিশেলে যে অসম্ভব সুন্দর দৃশ্য দেখা যায়, সে অনুভূতির তুলনা নেই। সেই তাড়াও আছে। চন্দ্রনাথের চুড়া হচ্ছে চট্টগ্রাম জেলার সবচেয়ে উঁচু চূড়া। সেখান থেকে একবার নিচের দিকে না তাকালে চলবে কেমন করে?

এভাবেই চললো প্রায় ঘন্টা দেড়েক। তারপর একটুখানি বিরতি। মোটামুটি ৯৫০ ফিট মতো উপরে, চন্দ্রনাথের মূল চূড়াতে ওঠার আগে আরো দুটো মন্দির আছে। একটা পুরান বিরুপাক্ষ মন্দির, যেটার ভেতরে ওভাবে ঢোকার উপায় নেই। আরেকটা মন্দিরে উপাসনা চলছে। ওটা বিরুপাক্ষ মন্দির, তীর্থযাত্রীদের জন্যে খোলা। আমাদের মধ্যে তিনজন গিয়ে পূজা দিয়ে আসলেন। বেশ কিছুটা সময় জিরিয়ে নিয়ে বিধ্বস্ত ভাব একটু কাটলো। পাহাড়ের উপর দিকে পুরাটা সময় নিচের দিকে তাকিয়ে বসে ভাবছিলাম এতোক্ষণ ধরে শোনা সবকিছু। শিব, সতী এবং দেবতাদের কথা। ছবিও তোলা হলো। তারপর আবার উপরে ওঠা। মোটামুটি মিনিট বিশেক পরেই উঠে এলাম চন্দ্রনাথের চূড়ায়।

সত্যের পূজারী শিব এ পাহাড়ের চূড়ায় তাঁর অনুসারীদের অপেক্ষায় থাকবেন। যাঁরা যোগ্য এবং সৎ- তাঁরাই শুধু সব বাধা পেরিয়ে উঠে আসতে পারবে এই চূড়ায়। পুরো ব্যাপারটা ভাবলেই কেমন রোমাঞ্চ বোধ হয়! তাছাড়া আমার এটাই প্রথম পাহাড় চড়া, অবশ্য আমাদের অনেকেরই তাই। কী একটা চমৎকার অদ্ভুত অনুভূতি যে হয়, সে কথা ভাষায় প্রকাশের বৃথা চেষ্টা নাহয় থাকুক।

অনেকটুকু ঘুরে এসে পাহাড়ের উল্টো পাশ দিয়ে নামার ব্যবস্থা। নামতে গিয়ে ভাইয়া একবার পড়ে গিয়েছিল। ওর অবশ্য রক্ষা হয়েছে। সমস্যা হয়েছে ইফরিত আপুর। উনি কেমন করে যেন পড়ে মা মচকে ফেলেছেন। তারউপর অনেকটা চামড়া উঠে কেটেও গেছে। কিন্তু আপু এতো সহজে দমে যাওয়ার পাত্রী না। লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশিতে, যাত্রীরা হুঁশিয়ার! কাজেই, আপু একটু থেমে পায়ে মৌজা পরে নিয়ে সোজা হাঁটা শুরু করলেন। কেমন করে উনি এই পা নিয়ে এই হাজারখানেক ফিট রাস্তা নেমে এসেছেন, আমি জানি না।

সবারই ততক্ষণে পা ব্যথা হয়ে গেছে। ঘড়ির কাঁটা দুটোর ঘর পেছনে ফেলে ছুটছে। আমরাও ছুট দিলাম। দুপুরের খাবার খেয়ে নিতে হবে। খেয়ে দেয়ে পরবর্তী গন্তব্যে যেতে হবে। গন্তব্য, গুলিয়াখালি সমুদ্র সৈকত!

সমুদ্র সৈকতে সূর্যাস্ত

গুলিয়াখালি যেতে সিএনজিতে আধাঘন্টা মতো সময় লাগে। নামতে হয় বাঁধের কাছে। সমুদ্রের পানি জোয়ারের সময় এদিকের খালের পানির সাথে সবকিছু যেন গিলে নিতে না পারে, সেজন্যেই এই বাঁধ। তারপর লঞ্চ নিয়ে খাল পেরিয়ে সমুদ্র সৈকত।

লঞ্চে উঠে পুরো জায়গাটা ঘুরে দেখতে দেখতে সুন্দরবনের কথা মনে পড়ে যায়। উপচে পড়া পানিতে স্রোতের সাথে সাথে একটু পরপর চোখে পড়ে শ্বাসমূল। পানি আর পানি, তারমাঝে মাথা তুলে সবুজ গাছেরা কেমন সুন্দর আমন্ত্রণ জানাচ্ছে! কী সুন্দর! এইটুকু দেখে এমনিতেই মুগ্ধ হয়ে আছি, তারপর সমুদ্র সৈকতে নেমে আরো অবাক হয়ে গেলাম। সৈকতের পুরোটা জুড়ে একটু একটু করে সবুজ ঘাসে ভরা মাটি, আর তার মাঝ দিয়ে একটু পরপর পানির চ্যানেল চলে গেছে। এতো সুন্দর! ঠিক উপমা খুঁজে পাচ্ছি না। শুধু মনে হচ্ছিল, নরম সবুজের চাদরে মোড়ানো কেকের টুকরোর মতো। চেখে দেখতে ইচ্ছে করে। চোখ আর মন, দুটাই জুড়িয়ে যায়। তারমাঝে ওপাশটায় উত্তাল সমুদ্রের পানি ছুটে এসে আছড়ে আছড়ে পড়ছে। আর সূর্যটা একটু একটু করে নেমে যাচ্ছে সমুদ্রের বুকে। আহ!

কেউ কেউ ছুটোছুটি করছিল। ভাইয়া গিয়ে বসেছিল সমুদ্রের পাশে। আরিফ ছুটে বেড়াচ্ছিল পুরো জায়গাটায়। নরম ঘাসের বুকে শুয়ে অভিদা কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিয়েছেন। যার জন্যে ক্লান্তি আর আরাম- দুটোই সমানভাবে দায়ী। ইফরিত আপু আর আমি বসেছিলাম ওনার পাশে। এর মাঝে আবার ইফরিত আপু গান ধরেছেন। শুনতে শুনতে আমার এক মুহুর্তের জন্যে মনে হলো, সূর্যের সাথে সাথে সমুদ্রের বুকে ওভাবে হারিয়ে যাওয়া গেলে কী চমৎকারই না হতো!

সূর্যাস্তের সময় ঘনিয়ে আসার পর সবাই সব ফেলে সূর্যের দিকে স্থির তাকিয়ে বসেছিল। সূর্যটা সমুদ্রের বুক টুপ করে ডুব দেয়ার একটুখানি আগ দিয়ে মেঘের হাতে পড়ে গেল। মেঘের মাঝে সূর্য বিসর্জন। আরিফ পাগলটা আরেকবার সূর্যটাকে দেখার জন্যে একটা গাছে উঠে গিয়েছিল!

সব পাখি ঘরে ফেরে…

সূর্যাস্তের পরে শহরে ফিরে এলাম। টিকেট কাটা হলো সাড়ে দশটায়। এতোটা সময় কী করা যায়? একটা হোটেল পাওয়া গেল, ওখানে ঢুকে অর্ডার দিয়ে বসলাম। খাবার আসতে আসতে বেশ একটু সময় লাগবে। তা লাগুক! আবারো আড্ডা। আড্ডার বিষয়, হিন্দু পুরাণ। মূল বক্তা, মিশাল ভাই। মন দিয়ে শুনছি আর একটু পরপর প্রশ্ন করে বিরক্ত করছি। কথা ঘোরে ফেরে। হিন্দু পুরাণ হয়ে গ্রিক সভ্যতা, পুঁজিবাদ কিংবা একটা রিকার্সিভ ফাংশনের বোঝা বয়ে চলা আমাদের ইতিহাস- মিশাল ভাইয়ের পরে অভিদার সাথে আরেক দফা আড্ডা জমে গেল।

সাড়ে দশটা বাজে হানিফে ওঠার আগে চা খেয়েছি সবাই মিলে। তারপর হানিফে উঠে বসেছি একেবারে শুরুর সিটে, এ-২। এফ ওয়ান রেইসিং দেখা। আধো ঘুম। গান শোনা। ঘোর।

অনেক দিন পর পেছনে ফিরে তাকালে এই ১,১৫৫ ফিট পাহাড় আর চমৎকার সমুদ্র সৈকতের চেয়েও বেশী মনে পড়বে এই মানুষগুলোর কথা। দু’দন্ড সময়। শুভ ভাইয়ের ছবি তোলা। রনি ভাইয়ের সাথে সকালের নাস্তা। অভিদা, ইফরিত আপু আর মানবীর সাথে দুপুরের খাবার। মিশাল ভাইয়ের কাছে শোনা গল্প। তহুরার প্রাণোচ্ছল চাঞ্চল্য। আর, আড্ডা।

ভাইয়াকে নিয়ে আলাদা করে কিছু বলতে গেলে লেখাটা আরো বিশাল হয়ে যাবে। শুধু এইটুকু বলা যায়, ও না বললে এবং না নিয়ে গেলে এসব কিছুই হতো না।

ধন্যবাদ, ভাইয়া!

নোট

১. উইকিপিডিয়ার তথ্যানূসারে চন্দ্রনাথ মন্দির ১,১৫৫ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত। এদিকে ভাইয়ার ফোনের অল্টিমিটার মন্দিরের উচ্চতা দেখাচ্ছিল ১০০০ ফিট। কোনটা সঠিক, কে জানে?

২. সীতাকুণ্ড মানে, সীতার স্নানের জায়গা। এই সীতা হলেন রামায়নের সীতা। আর, শক্তিপীঠের ঘটনা মূলত সতীকে কেন্দ্র করে। এই সতী শিবের স্ত্রী। দুজনকে এক করে ফেললে ভুল হবে।

Comments

Tags

Related Articles