Shahidul Kabir Mahin:

স্যার আর্থার কোনান ডয়েল যখন প্রথম শার্লক হোমস লেখা শুরু করেন, তখন শার্লকের নাম শার্লক ছিলো না। ইন ফ্যাক্ট শার্লকের নাম বেশ কয়েকবার বদলানো হয়েছে। আর অনেক আগে রচিত এই কিংবদন্তীতুল্য চরিত্রের নামকরণ নিয়ে অনেক রিউমারও ছড়িয়েছে সময়ের সাথে।

প্রথমে কোনান তাঁর সৃষ্ট গোয়েন্দা চরিত্রের নাম দিয়েছিলেন শেরিনফোর্ড হোপ। ‘হোপ’ ছিলো মূলত একটা তিমিশিকারী জাহাজের নাম যেটা স্কটল্যান্ডের পিটারহেড থেকে গ্রিনল্যান্ডের নৌপথে চলাচল করতো। এটা অনুমান করা হয় যে ১৮৮০ সালে পড়ালেখার প্রতি বিরক্ত হয়ে ডয়েল ঐ জাহাজে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু সত্য হলো যে তখনকার সময়ে মেডিক্যাল ছাত্ররা প্রায়ই এসকল জাহাজে সেবা প্রদান করতো কারণ এতে করে তারা তাদের ভবিষ্যত পেশা এখানে অনুশীলন করতে পারতো আর বিপদজনক কাজ করা তিমিশিকারীদের সাহায্য করতে পারতো।

ডয়েলের এক সহপাঠী ‘হোপ’ এ কাজ করার জন্য নিয়োজিত হয়েছিলেন কিন্তু তিনি কাজে অংশগ্রহণ করতে না পারায় ডয়েলকে বলেন আর ডয়েল তার পরিবর্তে ‘হোপ’ এ কাজ করতে যান। ‘হোপ’ এ কাজ করা সময়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে ডয়েল একটি ডায়রী লিখেন যা পরবর্তীতে Dangerous Work : Diary of an Arctic Adventure নামে প্রকাশিত হয়।

‌শেষ পর্যন্ত শেরিনফোর্ড হোপ নামটি পরিবর্তন করা হয় ডয়েলের প্রথম স্ত্রী লুইসার কারণে। লুইসার মতে ‘হোপ’ নামটা অসুন্দর তাই তিনি তাঁর স্বামীকে পরামর্শ দেন নামটা বদলাতে আর ডয়েল তার গোয়েন্দা চরিত্রের নাম দেন শেরিনফোর্ড হোমস।

শার্লক যখন লেখা হচ্ছিলো তখন মূলত মডেল হিসেবে নেওয়া হয় জোসেফ বেল নামক একজন স্কটিশ চিকিৎসককে। আবার তার পারিবারিক নাম হোমস আরেকজন আমেরিকান ডাক্তারের প্রতি ট্রিবিউট। তিনি হলেন অলিভার ওয়েন্ডেল হোমস। তিনি ছিলেন একাধারে একজন লেকচারার, সমাজসংস্কারক, বিশিষ্ট ঔপন্যাসিক এবং কবি। তাঁর বিচারবোধ ছিলো তীক্ষ্ণ। তিনি মনে করতেন ডাক্তারদের সুবিবেচনাপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ভালো অনুমান করতে পারার ক্ষমতা থাকা উচিত। তাঁর মতে হোমিওপ্যাথি ভুল বিজ্ঞান এবং এ ব্যাপারে তিনি তাঁর যুক্তি তুলে ধরেছিলেন।

যদিও শার্লককে স্যার আর্থার কোনান ডয়েল একজন একাকীত্ব পছন্দ করা জিনিয়াস হিসেবে তুলে ধরেছেন তাঁর উপন্যাসে, কিন্তু তার আদর্শ দুইজন ঠিকই বিবাহিত ছিলেন এবং তাঁদের সন্তান ছিলো।

শার্লক হোমস, স্যার আর্থার কোনান ডয়েল

শার্লকের নাম বস্তুত শুধু শেরিনফোর্ড ছিলো না, অনেক সময়ই ডয়েল শার্লকের নামের ক্ষেত্রে Sherrinford এর জায়গায় Sherringford ব্যবহার করতেন এবং নামের দুইটা ভার্সনই তাঁর প্রিয় ছিলো। আমরা হয়তো বর্তমানে The Adventures of Sherringford Holmes নামেই তার গল্পগুলো পড়তাম কিন্তু প্রকাশকরা এই তা রিজেক্ট করে দেয়। ফলে ডয়েল বৃটিশদের কানে শ্রুতিমধুর শোনানো শার্লক নাম দেন তাঁর চরিত্রকে এবং প্রকাশক তাঁর গল্প প্রকাশ করতে রাজি হয়। যদিও Sherlock Holmes society of London এর মতে শার্লকের নামের ক্ষেত্রে ইন্সপিরেশন ছিলেন বিখ্যাত ভায়োলিনবাদক আলফ্রেড শার্লক। আবার ডয়েল ছিলেন ক্রিকেটানুরাগী, তাই তৎকালীন দুইজন ব্রিটিশ ক্রিকেটার Mordecai Sherwin এবং Frank Shacklock এর নাম হতেও শার্লকের নামের উৎপত্তি হতে পারে। SHERwin + shackLock = SHERLOCK

Sherlock শব্দের আবার পুরাতন ইংলিশ অরিজিন আছে। সে অনুসারে Sherlock মানে উজ্জ্বল চুলবিশিষ্ট, ছোট চুলবিশিষ্ট বা যে চুলকে দুই ভাগে বিভক্ত করে রাখে। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য যে যখন জেরেমি ব্রেটকে দ্যা অ্যাডভেঞ্চার্স অফ শার্লক হোমসে অভিনয় করার জন্য বলা হয়, তখন তিনি উজ্জ্বল চুলবিশিষ্ট লুকের কথা ভাবেন। তাঁর মতে উজ্জ্বল চুল শার্লকের প্রখর বুদ্ধিকে প্রকাশ করে। আবার মূল বইয়ে যেসব চিত্র ব্যবহৃত হয়েছিলো, সেগুলোতে চিত্রকর সিডনি প্যাজেট চিত্রাঙ্কনের সময় ছোট এবং কালো চুলের এমনকি টাক মাথার শার্লক এঁকেছিলেন। যদিও অনস্ক্রিন আর ইলাস্ট্রেশনে বিভিন্ন অ্যাডাপ্টেশনে শার্লকের বিভিন্ন ধরণের চুল ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। যেমন অ্যান্থনি হিগিন্স যখন ১৯৯৩-১৯৯৪ এ টিভি মুভি শার্লক হোমস রিটার্ন্সে শার্লক হিসেবে অভিনয় করেন, তখন লম্বা চুলের শার্লককে পোট্রে করেন। আবার BBC এর শার্লকে বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচকে দেখে যায় কোঁকড়া মোটামুটি লম্বা চুলের শার্লককে পোট্রে করতে।

এছাড়া শার্লকের কাহিনীর বিশ্বস্ত বর্ণনাকারী জন ওয়াটসনের নামও পরিবর্তিত হয়েছে। প্রথমে তার নাম ছিলো ওরম্যান্ড স্যাকার। যদিও জন ওয়াটসনের চরিত্র স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের নিজের ওপর বেইসড তবুও তিনি জনের চরিত্রের ক্ষেত্রে প্যাট্রিক ওয়াটসনকে ইন্সপিরেশন হিসেবে নেন। এই প্যাট্রিক ওয়াটসন ছিলেন শার্লকের ইন্সপিরেশন জোসেফ বেলের সহকর্মী এবং কাছের বন্ধু।

কিছু অ্যাডাপ্টেশনে উইলিয়াম শার্লক হোমস স্কটকে শার্লকের পুরো নাম হিসেবে ব্যবহার করা হয়, BBC এর টিভি শোতে বলা হয়েছে তার পুরো নাম উইলিয়াম শার্লক স্কট হোমস যদিও স্যার আর্থার কোনানের মূল লেখায় এই নামের অস্তিত্ব নেই। উনি সবসময় তাঁর হিরোকে শার্লক হোমস নামেই ডেকেছেন।

‌সময়ের সাথে সাথে শার্লক হোমস হয়েছে আইকনিক। গোয়েন্দা গল্পের জনরাকে করেছে ডিফাইন, এই সাহিত্যকে করেছে সমৃদ্ধ। এখনো বিভিন্ন দেশে নতুন রিক্রুট করা শিক্ষানবিশ গোয়েন্দাদের শার্লক হোমস পড়তে দেওয়া হয় আর তদন্তাধীন কোন অপরাধস্থলে যে ‘Do not cross’ টেপগুলো ব্যবহৃত হয়, সেগুলোর কথা প্রথম ভাবেন স্যার আর্থার কোনান ডয়েলই।

শার্লক হোমসকে নিয়ে এতকিছু লেখার কারণ শার্লক হোমস ১৮৫৪ সালের ৬ই জানুয়ারী জন্মগ্রহণ করেন। এটা শার্লক হোমস সোসাইটি দ্বারাও স্বীকৃত। শুভ ১৬৪ তম জন্মদিন, শার্লক! একটু দেরী হয়ে গেল জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে, তবু ভুলে তো যাইনি!

যদি শার্লক সত্যি সত্যি থাকতো, তাহলে জ্যাক দ্যা রিপারের সঙ্গে কাহিনী জমতো!

Comments
Spread the love