১৯৭২ সাল। মিউনিখ অলিম্পিক। জার্মান এমব্যাসির অ্যাসিস্টেন্ট টু অ্যাম্ব্যাসেডর রুহেল আহমেদ বাবু ভাইয়ের অলিম্পিক দেখার খুব শখ। কিন্তু সম্পর্কে চাচা পশ্চিম জার্মানির রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী প্রতিদিন তার সামনে অলিম্পিকের ভিভিআইপি টিকিট দেখিয়ে ঘুরে বেড়ান। বাবু ভাই কাতর স্বরে বলেন, অন্তত একটা টিকিট দেন, অলিম্পিক দেইখা আসি, নাতিপুতিতে কইতে পারুম শেষ বয়সে যে অলিম্পিক দেখছিলাম! শুনে খুনসুটির সুরে হাসতে হাসতে হুমায়ূন বলেন, নট ইন ইয়োর লাইফটাইম ডিয়ার, নট ইন ইউর লাইফটাইম…

মুক্তিযুদ্ধে চার নম্বর সেক্টরের সাবসেক্টর কমান্ডার রুহেল আহমেদ বাবু ভাইয়ের একটা পা উড়ে গিয়েছিল সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের দিকে। ভারতে চিকিৎসা করানো হয়েছিল তাৎক্ষণিকভাবে, কিন্তু তেমন লাভ হয়নি। ‘৭২ রে বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার পর প্রথম যে ২৫ জন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাকে সরকারী খরচে ট্রিটমেন্টের জন্য পূর্ব জার্মানীতে পাঠানো হয়, তাদেরই একজন বাবু ভাই। পূর্ব জার্মানীতে ট্রিটমেন্ট শেষ হবার পর তাকে পশ্চিম জার্মানীতে নিয়ে আসেন হূমায়ূন রশীদ চৌধুরী, তিনি নিযুক্ত হন অ্যাসিস্টেন্ট টু অ্যাম্ব্যাসেডর পদে। এদিকে অলিম্পিকের তারিখ এগিয়ে আসছে, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের অলিম্পিকে অংশ নেওয়া হয়তো সুদূরতম কল্পনা, কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে হূমায়ুন রশীদ সস্ত্রীক অংশ নেবার আমন্ত্রণপত্র পেয়েছেন, ভিভিআইপি টিকেট। সেটা নিয়েই সারাদিন চলে তার বড়াই!

বাবু ভাইয়ের মন খারাপ হয়, মাঝে মাঝে ভাবেন নিজেই চলে যাবেন টিকেট কিনতে, কিন্তু চাইলেই তো আর হয় না! অলিম্পিকের টিকেট পাওয়া এতো সোজা! হঠাৎ একদিন অফিসে এসেই তার ডাক পড়ল চাচার রুমে। ঢোকামাত্র টিকিটের গোছা তার দিকে ছুড়ে দিলেন রাষ্ট্রদূত, থমথমে চেহারা। জানা গেল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অসুস্থ, ডাক্তার বলেছেন, স্ট্রেস প্রবলেম, আরো কিছু সমস্যা, এক মাস রেস্ট নিতে হবে। তাই সপরিবারে চলে এসেছিলেন সুইজারল্যান্ড। কিন্তু হাজার হাজার মানুষের মাঝে দিন কাটে যার, তিনি কি প্রবাসে একা থাকতে পারেন? অগত্যা ডাকো ইউরোপের সব রাষ্ট্রদূতদের। ব্যাস, হুমায়ূন রশিদের অলিম্পিক দেখা শিকেয় উঠলো, মাঝখান থেকে ভিভিআইপি টিকিটের গোছা নিয়ে মনের আনন্দে মিউনিখ চলে গেলেন রুহেল ভাই।

এর মাঝে হঠাৎ একদিন খবর এল এক ভিআইপি গেস্ট এসেছেন, তাকে অভ্যর্থনা জানাতে হবে। হোটেলের রুমে নক করার পর যিনি দরজা খুললেন, তাকে দেখে বাবু ভাই অবাক, আর বাবু ভাইকে দেখে তার চেয়েও বেশি অবাক গেস্ট দেখে-

—”কামাল, তুই?

বহুদিন পর দেখা হয়ে গেল দুই বন্ধুর। এক সাথে অলিম্পিক দেখেন, গল্প করেন, কামাল তাকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের নানা ঘটনা বলেন। একদিন সন্ধ্যায় বাবু ভাই কামালকে আস্তে করে বললেন,

– কামাল চল ডিস্কোতে যাই।

— নাইটক্লাবে গিয়া কি করুম?

— প্রিটি গার্লস উইল বি কামিং দেয়ার! তারা নাচবে, গাইবে, একটা সময় ড্রেস খুলে ফেলবে। আমরা ড্রিংক্স করবো, মজা হবে দোস্ত! চল যাই!

— ছি ছি বাবু , তোর এতো অধঃপতন! কি বলিস এইগুলা? কখনো দেখছস আমারে এইসব জায়গায় যাইতে!

— তাইলে ডিস্কোতে চল!

— ওইখানে আবার কি?

— ভালো ভালো মেয়েরা আসবে, ডিংক্স করবো আর তাদের সাথে টাংকি মারবো। কে জানে, ভাগ্য ভালো হলে ডেটও জুতে যেতে পারে!

— এইগুলা কি কইতাছস তুই? বিদেশে এসে তুই তো ব্যাটা পুরাই নষ্ট হয়ে গেছস, পুরাই খবিশ…খালু জানে যে এইখানে এইসব কইরা বেড়াইতাছস? আর তুই তো জানস যে সুলতানা ছাড়া আমি আর কারো দিকে তাকাইতে পারি না।

শুনে কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন বাবু ভাই। সবই জানেন তিনি। আজ অনেকদিন ধরেই সুলতানাকে মনের কথা খুলে বলতে পারছে না কামাল, এমনকি ডলি জহুরকে দিয়েও বলাবার চেষ্টা করেছে, সুলতানা স্পস্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যদি সে ভালোই বাসবে, তবে মুখে বলার সাহস নেই কেন? লাজুক মুখচোরা কামাল সে প্রশ্নের জবাব দিতে পারেনি। এখনো ভালোবাসি বলা হয়ে ওঠেনি।

একদিন তারা ফুটবল ম্যাচ দেখছিলেন। ইয়োহান ভন ক্রুইফের খেলা দেখতে দেখতে হঠাৎ শেখ কামাল বললেন, দোস্ত, একটা ফুটবল ক্লাব দিছি। আমাদের সাথে তুর্যও (ফুটবলার গাজী সালাউদ্দিন) আছে। আমরা বেশ ভালো খেলতেছি, বেশ কয়েকটা ম্যাচ জিতছি।

বাবু ভাই বলেন, কি নাম দিছস?

কামাল জবাব দিলেন, আবাহনী ক্রীড়াচক্র! বাবু ভাই অবাক হয়ে বললেন, এইটা কেমন নাম? ফুটবল ক্লাবের নাম হয় আজাদ স্পোর্টিং ক্লাব, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব! নামের মধ্যেই একটা স্পোর্টিং ভাব! কামাল বললেন, আরে,পুরা বাংলা নাম, একেবারে ইউনিক।

তুর্যও আছে আমাদের সাথে। তুর্য’র কথা শুনে খুশি হন রুহেল ভাই, বলেন, জার্সি কি কালারের বানাইছস? কামাল বলেন, এখনো তো ঠিক করি নাই। তখন জার্সি বলতে ছিল লম্বা শার্ট, টি-শার্টের যুগ শুরু হয়েছে মাত্র। দুজনে দাড়িয়ে ছিলেন বিখ্যাত জার্মান ব্র্যান্ড বায়ারিশ মোটর ভেহিকেল (বিএমডব্লিউ) এর কার্যালয়ের সামনে। রুহেল ভাই হঠাৎ পিছনে তাকিয়ে কামালকে দেখিয়ে বললেন, দেখ তো, আকাশী নীল আর সাদার এই কম্বিনেশনটা জার্সি কালার হিসেবে কেমন?

কামাল একটু চিন্তিত স্বরে বললেন, একটু মাইল্ড হয়ে যায় না?

রুহেল ভাই বললেন, আরে এইটা ডিফারেন্ট হবে। জার্সি তো সবই বেশি রংচংয়ের। আর এইটারে মাইল্ড কস? তুই কি পইড়া আছস ব্যাটা! ফকিরনীর মতো লাগতেছে! পুরাই মান্ধাতার আমলের!

কামাল একই সাথে বিস্মিত ও বিরক্ত হয়ে বললেন, কি কস না কস! স্রেফ দেশের বাইরে আসতে হবে বলে নিউমার্কেটের মাস্টার্স টেইলার্স থেকে ১৫০০ টাকা খরচ করে এই কমপ্লিট স্যুট পিস বানাইতে হইছে, তাও সবার জোরাজুরির কারণে। আমার নাকি ভালো কোন জামাকাপড় নাই। তুই কখনো দেখছস আমি এত দামি কাপড় পড়ছি? আর তুই কস কিনা ফকিরনীর মত লাগতেছে?

কামালকে নিয়ে অ্যাডিডাসের শো রুমে গেলেন বাবু ভাই। কামাল তো স্রেফ অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখছেন সব। ফুটবল, জার্সি, নানা রকমের জিনিস। তাকে দেখেই মনে হচ্ছে যে তার খুব কিনতে ইচ্ছা করছে। বাবু ভাই বললেন, বল কোনটা কিনে দিবো? কামাল ভ্রু কুঁচকে বললেন, এগুলো অবশ্যই অনেক দামী হবে, তুই টাকা পাবি কই? বাবু ভাই হাত দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে বললেন, আরে টাকার চিন্তা তো তোরে করতে হবে না। অ্যাম্বাসী থেকে আমাকে ৫০০০ মার্ক দিয়েছে খরচ করার জন্য, সারাদিন খরচ করলেও শেষ হবে না। বল কি কিনবি?

— মজা করস তুই? দেশের টাকা খরচ করে আমি আমার ক্লাবের জন্য জিনিস কিনবো কেন? আমাদের থাকা ফ্রি, টিকেট ফ্রি, চলাফেরা ফ্রি, স্রেফ বাইরে খাওয়ার জন্য কিছু খরচ করতে হয়। এর বাইরে আর কোন খরচ নাই আমাদের, আর তুই আসছস সরকারী টাকায় বাজে খরচ করতে? আশ্চর্য তো!

আসলে আশ্চর্য এবার হবার কথা বাবু ভাইয়ের! ভিআইপি গেস্ট আসছেন, তাই তাকে ৫০০০ মার্ক দিয়ে অ্যাম্বাসী থেকে বলা হয়েছিল, যত লাগে, যেভাবে লাগে, যেখানে লাগে খরচ করবেন। কোন হিসেব দিতে হবে না, লাগলে আরো নিয়ে যাবেন। প্রাইমমিনিস্টারের ছেলে, তার যেন কোন অসুবিধা না হয়। অথচ গত কয়েকদিন ধরে ডিস্কো, নাইটক্লাব, এইখানে সেইখানে এতো চেষ্টা করেও পাঁচটা মার্কও তিনি কামালের পেছনে খরচ করতে পারেননি। তার একটাই কথা, আমার প্রয়োজন আমি দেশের টাকা দিয়ে কেন মেটাবো? এমন অদ্ভুত কেন ছেলেটা!

শেষ পর্যন্ত অ্যাডিডাসের শোরুম থেকে ১১টা টিশার্ট কিনে কামালকে গিফট দিলেন তিনি। স্কাই ব্লু, কাঁধের উপর তিনটা স্ট্র্যাপ দেওয়া এই টিশার্টগুলোর আদলেই পরবর্তীতে বাংলাদেশের বিখ্যাত ফুটবল দল আবাহনী ক্রীড়াচক্রের জার্সি তৈরি হয়েছিল। আর সব দলের চেয়ে আলাদা, আর সব দলের চেয়ে আধুনিক। আর এই ১১টি টিশার্টের দাম বাবু ভাইকে দিয়েছিলেন ভিআইপির গাইড হিসেবে তার প্রতিদিনের টিএডিএ হিসেবে পাওয়া ৫২ মার্ক থেকে। খুব সাবধানে সেটা শিউর হয়েই টিশার্টগুলো নিয়েছিল কামাল, নিজের প্রয়োজনে যে কখনো দেশের পাঁচটা টাকাও খরচ করেনি!

আজ ৪৭ বছর পর বাবু ভাইয়েরা তাই অবাক হয়ে ভাবেন, একজন রাষ্ট্রপ্রধানের সন্তান হিসেবে বাধ্য হয়ে জীবনে একটাই দামী পোশাক বানিয়েছিলেন তিনি, সেই কথা কখনো ভোলেননি, এমনভাবেই ব্যাপারটা মনে খচখচ করতো যে বাবু ভাইয়ের কাছেও বলে ফেলেছিলেন অকপটে! ৫০০০ মার্ক গড়াগড়ি খাচ্ছে তার সামনে, স্রেফ তার খরচের জন্য, কিন্তু পাঁচটা মার্কও তার পেছনে খরচ করা যায়নি। কখনো কোন মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকাতেনও না, গোলগাল চশমার ফ্রেমের পেছনে সরল সাধারণ চোখের লাজুক সজ্জন মানুষটা ভালোবাসার মানুষকে ভালোবাসি বলতে সাহস করে উঠতে পারেননি, দুই বছর সাধনার পর শেষমেষ ভালোবাসি বলতে পেরেছিলেন। অথচ তার নামে ছড়ানো হলো, এই লোকটা নাকি ব্যাংক ডাকাত, অন্যের স্ত্রীকে তুলে নিয়ে যায় গভীর রাতে… কী বিচিত্র অপপ্রচার, কী অদ্ভুত মিথ্যাচার…

স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরে আজ শেখ কামালদের গৌরবউজ্জ্বল অবদান ইতিহাসের বিস্মৃত পাতা মাত্র। দেশের প্রতি অসামান্য ভালবাসা বুকে নিয়ে চলে যাওয়া শেখ কামালদের প্রজন্ম চেনে ব্যাংক ডাকাত হিসেবে, লম্পট হিসেবে, নিকৃষ্ট মানুষ হিসেবে। কী অসাধারন সম্মান! কী অভুতপুর্ব শ্রদ্ধা!

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য লেখাগুলো