যে দেশের স্বাধীনতার জন্য আপনার বাবা-মা তাদের জীবনটা বিলিয়ে দিলেন, সেই দেশের মানুষগুলো যদি আপনার বাবার বুকে ২৮টা বুলেট উপহার দেয়, আপনার পুরো ফ্যামিলির উপর ভয়ংকরতম নিষ্ঠুরতায় নির্বিচার হত্যাকান্ড চালায়, আপনি এবং আপনার ছোট বোন সৌভাগ্যক্রমে বিদেশে থাকায় বেঁচে যান এবং আপনাদের মেরে ফেলার জন্য প্রতি মুহুর্তেই সুযোগ খুঁজতে থাকে ঘাতকেরা এবং এতে যদি সেই দেশের মানুষের কোনকিছু যায় আসে না এমন একটা নির্লিপ্ত আচরণ দেখেন, আপনি কি আপনার আপনজনের হত্যাকারী বেইমান আর মুনাফেকে ভরা সেই দেশে জেনেশুনে আত্মহত্যা করতে ফিরবেন?

কেন এই দেশে ফিরেছিলেন তিনি? কী দরকার ছিল তার ফেরার? একদম সাধারণ একজন মানুষ হিসেবে যদি বিবেচনা করে দেখি আমরা সে কি দিয়েছে এই দেশ তাকে? আপনজনকে চরম নিষ্ঠুরতায় মেরে ফেলেছে, একটা মানুষকেও ছাড়েনি, যে পিতা একটা স্বাধীন দেশ এনে দিলেন তাকে থেকে শুরু করে একদম নিষ্পাপ ছোট ভাইটা পর্যন্ত, সৌভাগ্যক্রমে তিনি সেদিন দেশের বাইরে ছিলেন বলে বেঁচে গিয়েছিলেন, এরপর দেশে ফিরে যখন দলের হাল ধরলেন, গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে ভূমিকা রাখতে শুরু করলেন, শুরু হলো তাকে মেরে ফেলার চেষ্টা! একে একে ১৯বার হামলা হলো তার উপর, বারবার বুলেট-বোমা-গ্রেনেডের সামনে বিশাল মানবপ্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে তাকে রক্ষা করলো তার লক্ষ ভাইয়েরা, একটা সময় দেশ পরিচালনার ভার হাতে আসার পর তিনি প্রথমেই যুদ্ধাপরাধী রাজাকারদের বিচার করলেন, এরপর সীমিত সুযোগ আর অজস্র প্রতিকূলতার ভেতরেও দেশকে এনে দিতে শুরু করলেন একে একে সাফল্য আর গর্বের উপলক্ষ। তবুও আজো তাকে হত্যা করতে খুঁজে বেড়ায় সেই পরাজিত বেইমান আর মুনাফেকের দল! কেন এই দেশকে ভালোবাসবেন শেখ হাসিনা? যুক্তিটা কোথায়?

যুক্তিটা সম্ভবত মিশে আছে মানুষটার রক্তে। তার বাবা ছিলেন এমন, নিঃশর্তে কোন প্রতিদানের আশা না রেখেই সারাটা জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন এই জাতির জন্য, মানুষের মুক্তির জন্য, স্বাধীনতার জন্য। জীবনের ১২-১৩ বছর জেলেই কেটে গিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর, কারণ স্রেফ একটাই। সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টকে দেয়া সাক্ষাৎকারে সেই কারণটা বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু ‘My strength is I love my people, my weakness is I love them too much’, শেখ হাসিনাও বাবার মত দেশের মানুষের টান, তাদের প্রতি একপ্রকার দায়বদ্ধতার টান থেকে কখনোই বের হতে পারেন নাই। আর তাই সেই রক্তের ডাকে সাড়া দিয়ে মানুষটা ফিরেছিলেন ১৯৮১ সালের ১৭ই মে!

অথচ তার আগের ছয়টা বছর কি ভয়ংকর দুঃসহ যন্ত্রনায় কেটেছে শেখ হাসিনা আর শেখ রেহানার, কল্পনা করতেও ভয় লাগবে আজ আমাদের! ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বেলজিয়ামের ব্রাসেলস থেকে শেখ হাসিনা ও ওয়াজেদ পরিবারের যাবার কথা ছিল প্যারিসে, ভোর ৬টার দিকে হঠাৎ জার্মানির বনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী ফোন করে জানালেন, বাংলাদেশে একটি মিলিটারি ক্যু হয়েছে, কোনভাবেই প্যারিসের দিকে না গিয়ে তারা যেন তখুনি জার্মানী চলে আসেন। এই খবরটা পাওয়া মাত্র বেলজিয়ামে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সানাউল হক বেইমানি করে বসলো, ওয়াজেদ পরিবার ও শেখ রেহানাকে তার বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলে, বেলজিয়ামে বাংলাদেশের অ্যাম্বাসি থেকে কোন ধরণের সাহায্য সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানায়, এমনকি জার্মানী যাবার জন্য একটা গাড়িরও ব্যবস্থা করে দেয়নি। ফলে শেষ পর্যন্ত বহু কষ্টে তারা যখন জার্মানীতে হুমায়ূন রশীদ সাহেবের কাছে পৌঁছলেন, তখন নিরাপদ জায়গায় না পৌছানো পর্যন্ত শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে কিছু জানানো হবে না এই মর্মে ডঃ ওয়াজেদ নিশ্চয়তা দিলে হুমায়ূন রশীদ তাকে জানান, বিবিসির এক ভাষ্যানুসারে বেগম মুজিব ও রাসেল ছাড়া সবাইকে হত্যা করা হয়েছে, আর ব্রিটিশ মিশন প্রচার করেছে যে কেউই বেঁচে নেই।

হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার নিরাপত্তা নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন ছিলেন। তিনি নিশ্চিত ছিলেন, তারা যদি পৃথিবীর কোথাও নিরাপদ থাকে, সেটি ভারত। তিনি পশ্চিম জার্মানিতে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত মিঃ ওয়াই কে পুরীর সাথে দেখা করলেন। মিঃ পুরী জানালেন, ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় পাবার প্রক্রিয়াটি খুবই দীর্ঘ এবং জটিল। তিনি ইন্দিরা গান্ধীর পছন্দের দুইজন পরামর্শদাতা ডি পি ধর এবং পি এন হাক্সর এর সাথে যোগাযোগ করবার পরামর্শ দেন হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীকে, দুর্ভাগ্যবশত দুজনই তখন ভারতের বাইরে অবস্থান করছিলেন। জনাব চৌধুরী খুবই দ্বিধাগ্রস্ত বোধ করতে লাগলেন, কারণ একমাত্র সরাসরি ইন্দিরা গান্ধীকে ফোন করা ছাড়া তার আর কোন উপায় ছিলো না। ইন্দিরা গান্ধী তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী, আর তিনি বাংলাদেশের একজন সাধারণ রাষ্ট্রদূত। তাছাড়াও, ভারতে যখন জরুরী অবস্থা বিরাজমান। মিঃ পুরীর থেকে নাম্বার নিয়ে তিনি একদিন ফোন দিলেন, শেষ চেষ্টা হিসেবে। সৌভাগ্যই বলতে হবে, ফোন অপারেটর না, বরং ইন্দিরা গান্ধী নিজেই সেদিন ফোনটি রিসিভ করেছিলেন। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী পুরো ঘটনা খুলে বলা মাত্র ইন্দিরা গান্ধী এক বিন্দু সময় নষ্ট না করে বললেন, শেখ মুজিবের দুই কন্যা ও তার পরিবারকে যতো দ্রুত সম্ভব ভারতে পৌছাবার ব্যবস্থা করতে। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী সময় নষ্ট না করে ওয়াজেদ মিয়াকে নিয়ে ভারতীয় দুতাবাসে নিয়ে যান। ওয়াজেদ মিয়ার সাথে তখন তেমন কোন অর্থ কড়ি ছিলো না। শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশ থেকে মাত্র ২৫ ডলার সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন। হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী তাদেরকে হাজারখানেক জার্মান মুদ্রা প্রদান করেন। ২৪ আগস্ট সকাল ৯টায় পরিকল্পনা অনুযায়ী দুতাবাসের কর্মকর্তা অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে তাদেরকে ফ্র্যাংকফুর্ট বিমানবন্দর নিয়ে যান, একটি এয়ার ইন্ডিয়া বিমানে করে তারা সকাল সাড়ে ৮টায় দিল্লীর পালাম বিমানবন্দর পৌছান। শুরু হয় শেখ হাসিনার রিফিউজি জীবন।

ভারতে আসবার পরে তাকে তার বোন আর স্বামী-সন্তান সহ লাজপাত নগর এর ৫৬ রিং রোডে একটি ছোট বাসায় থাকতে দেয়া হয়েছিলো, সেফ হোম হিসেবে। ১০দিন পর্যন্ত শেখ হাসিনার মনে ক্ষীণ আশা ছিলো, হয়তো মা আর রাসেলকে ওরা মারেনি। কিন্তু ৪ঠা সেপ্টেম্বর সফদরজং রোডে ইন্দিরা গান্ধীর বাসবভনে রাত ৮টার দিকে পৌঁছানোর পর সব হিসেব এলোমেলো হয়ে যায়। ১০ মিনিট পরে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এসে হাসিনার পাশে বসেন। তাকে জিজ্ঞেস করেন, ১৫ আগস্টের ঘটনা সম্পর্কে সে পুরোপুরি অবগত কি না। হাসিনা শূন্য  চোখে তাকিয়ে থাকে। ডঃ ওয়াজেদ বলেন, রয়টার্স আর ব্রিটিশ মিশন কর্তৃক প্রচারিত দুইটি ভাষ্য ছাড়া তারা তেমন কিছু জানেন না। ইন্দিরা গান্দী তাঁর এক কর্মকর্তাকে জানান, উপস্থিত সকলকে সম্পুর্ণ ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করতে। কর্মকর্তাটি পুরো ঘটনা বলবার মধ্যে বলে উঠলেন যে বেগম ফজিলাতুন্নেসা ও রাসেলও জীবিত নেই। হাসিনা আর সহ্য করতে পারেননি, কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তিনি, শেষ আশাটুকুও নিভে যায় তার। ভগ্ন হৃদয়ে ইন্দিরা গান্ধী তাকে জড়িয়ে ধরেন। তাকে বলেন, ‘তুমি যা হারিয়েছো, তা কোনভাবেই পুরণ করা যাবে না। তোমার একটি শিশু ছেলে ও মেয়ে আছে, এখন থেকে তোমার ছেলেকেই তোমার আব্বা, তোমার মেয়েকেই তোমার আম্মা হিসেবে ভাবতে হবে। তোমার ছোট বোন ও তোমার স্বামী রয়েছে তোমার সঙ্গে। তোমার ছোট বোন, ছেলেমেয়েকে মানুষ করবার দায়িত্ব তোমার, তোমাকেই নিতে হবে। এখন তোমার কোন অবস্থাতেই ভেঙ্গে পড়লে চলবে না।‘

শেখ হাসিনা যখন ভারতে এসে পৌছান, ভারতে তখন জরুরী অবস্থা বিরাজমান। শেখ হাসিনার বাড়ির বাইরে সব সময় দুইজন বডি গার্ড থাকেন, একজন ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ থেকে নিয়ে আসা সত্য ঘোষ, আরেকজন পি কে সেন। এই দুইজন অফিসার ছায়ার মতো শেখ হাসিনার সঙ্গে থাকতেন। এছাড়াও, শেখ হাসিনার একজন এসিসট্যান্ট ছিলেন, যার নাম এ এল খতিব। এ এল খতিব এর আরেকটি বড় পরিচয় হলো, তিনি একটি বই লিখেছিলেন, ‘Who Killed Mujib?’ শিরোনামে, যেটি বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে অত্যন্ত মুল্যবান একটি দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে।

শেখ রেহানার দ্বাদশ শ্রেণিতে পরীক্ষা দেবার কথা ছিলো, কিন্তু পারলেন না। তাকে ’৭৬ সালে শান্তিনিকেতনে ভর্তির ব্যবস্থা করে দেয়া হলেও নিরাপত্তাজনিত কারণে সে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে নৈনিতাল এর সেইন্ট জোসেফ স্কুল এ ভর্তি করানো হয়। পরবর্তীতে তামিল নাড়ুর কোদাইকানাল ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে সে পড়াশুনা করে। পরে ব্যাংগালোর ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্স এ পড়াশোনা শেষ করে ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাসে এ উচ্চতর পড়াশুনা করতে যান। স্বামী ডঃ ওয়াজেদ মিয়াকে ’৭৫ এর ১লা অক্টোবর পরমানু শক্তি বিভাগে ফেলোশিপ প্রদান করা হয়। ’৭৬ এর ২৪শে জুলাই, ছোটবোন শেখ রেহানার বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়, পাত্র লন্ডন প্রবাসী শফিক সিদ্দিকের সাথে। কিন্তু সে বিয়েতে শেখ হাসিনা ও তার স্বামী ওয়াজেদ মিয়া নিরাপত্তাজনিত কারণে অংশ নিতে পারেননি। ভারতে সে সময় শেখ হাসিনার সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিলেন সে সময়কার ডেপুটি মিনিস্টার মিঃ প্রণব মুখার্জি আর তার স্ত্রী শ্রীমতি শুভ্রা মুখার্জি। তারা শুধু দেখা সাক্ষাতই নয়, বরং হাসিনা পরিবারকে পিকনিকেও তাদের সাথে নিয়ে যেতেন। বলা যায়, পরিবারের বাইরে প্রণব-শুভ্রা পরিবারটি হয়েছিলো, হাসিনাদের সবচেয়ে আপনজন।

১৯৮০ সালে আবারও ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতায় ফিরে আসেন, সে বছর শেখ হাসিনা সন্তানদের নিয়ে লন্ডনে যান তার বোনের কাছে। ইতিহাসে ১৯৮০ সালটা খুব গুরুত্বপুর্ণ এই কারণে, কারণ এই বছরেই শেখ হাসিনা প্রথম পাবলিক স্পীচ প্রদান করেন, তারিখটা হলো ১৬ই আগস্ট, ১৯৮০। স্থানঃ ইয়র্ক হল, লন্ডন। শেখ হাসিনার রাজনীতিতে সাহসিক আগমনের আগামবার্তা এই সময়টাকে বলাই যায়, কারণে যে সময়ে তিনি পাবলিকলি স্পীচ দিয়েছেন, সে সময়ে লন্ডনের ব্রিকলেনে যুদ্ধাপরাধীরা ছুরি হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছিলো হাসিনাকে হত্যা করবার জন্য।

স্রেফ ভাবুন তো, পাঁচ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরেও শেখ হাসিনাকে তারা ছাড়েনি, রাজনীতিতে তিনি তখনো আসেননি, স্রেফ একটা বক্তব্য দিয়েছেন কেবল, কিন্তু ওরা ঠিকই তাকে খুঁজছে মেরে ফেলার জন্য। এমন ভয়ংকর দুঃসময়ে অন্য কোন রাজনৈতিক নেতা হলে কি করতেন জানি না, কিন্তু শেখ হাসিনা তখনো রাজনীতিতে না আসা সত্ত্বেও এক মুহুর্তের জন্যও পিছু হটলেন না । ১৯৮০ সালে, ভারতে শেখ হাসিনার বাড়িতে আওয়ামীলীগের নেতা কর্মীরা আসতে লাগলেন। তারা তাকে ক্রমাগত বোঝাতে লাগলেন, তার কেনো দেশে ফেরা উচিৎ এই মুহুর্তে, তাকে শক্ত হাতে দলের দায়িত্ব নিতে হবে। শেখ হাসিনা বলতেন, আমি বঙ্গবন্ধুর মেয়ে, এটাই আমার জন্য সবচেয়ে বড় গৌরব। আমার আর কিছু চাওয়ার নেই।

১৯৮১ সালের ১৪-১৬ ফেব্রুয়ারী, ঢাকায় আওয়ামীলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সে সম্মেলনে আওয়ামীলীগ তার রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সিদ্ধান্তটি নেয়, সিদ্ধান্তটি ছিলো, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জ্যেষ্ঠ কন্যা, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ এর সভাপতি নির্বাচন। সেদিন শেখ রেহানা লন্ডন থেকে ভারতে এসে শেখ হাসিনাকে খবরটি দেন। পরবর্তীতে আসে সেই মাহেন্দ্রাক্ষন, ১৭ই মে, ১৯৮১। আওয়ামীলীগের দুই নেতা আব্দুস সামাদ আজাদ আর কোরবান আলীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি রওনা দেন ঢাকায়। সেইদিনটি ছিলো রবিবার, বৃষ্টিস্নাত এক দিন। প্রায় পনের লক্ষ জনতা সেদিন ঢাকা বিমানবন্দরে তাকে অভিনন্দন জানাতে ছুটে আসে। দেশের মাটিতে নেমে কান্নায় ভেঙ্গে পরে শেখ হাসিনা। তিনি দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে বলেন, ‘’যেদিন আমি বাংলাদেশ ছেড়ে যাচ্ছিলাম, সেদিন আমার সবাই ছিলো। আমার মা-বাবা, আমার ভাইয়েরা, ছোট্ট রাসেল সবাই বিদায় জানাতে এয়ারপোর্টে এসেছিলো। আজকে আমি যখন ফিরে এসেছি, হাজার হাজার মানুষ আমাকে দেখতে এসেছেন, স্বাগত জানাতে এসেছেন, কিন্তু আমার সেই মানুষগুলো আর নেই। তারা চিরতরে চলে গেছেন।‘

দীর্ঘ ছয় বছর নির্বাসনে থাকার পর মানুষটা দেশে ফিরেছিলেন, পরিবারের সবগুলো আপনজনকে হারানোর সময় দেশবাসীর নির্লিপ্ততার যে ব্যাথা, তার উপর এই অজস্র মানুষের শুভেচ্ছায় একটু হলেও প্রলেপ পড়েছিল। কিন্তু এই ব্যাথা যে কখনোই মুছতে দেওয়া হবে না, সেটা প্রমাণ করে দিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কুশীলব ও রাজাকার-যুদ্ধাপরাধীদের এই বাংলার মাটিতে পূনর্বাসনকারী খুনী জেনারেল জিয়াউর রহমান। ঢাকা বিমানবন্দর থেকে শেখ হাসিনা সরাসরি গিয়েছিলেন তাদের বাড়ি ধানমন্ডি ৩২ এ, কিন্তু হায়! প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাকে সে বাড়িতে ঢুকতে বাধা দেয়। আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হয় যাতে শেখ হাসিনা সেই বাড়িতে না ঢুকতে পারে।

আপনার বাবা-মা, তিনটা ভাইসহ পরিবারের সবাইকে মেরে ফেলেছে, ছয় বছর আপনাকে নির্বাসনে থাকতে বাধ্য করেছে, শেষ পর্যন্ত আপনি যখন জেনারেল জিয়ার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে, খুনী ফারুক-রশিদদের মৃত্যু হুমকি উপেক্ষা করে দেশে ফিরলেন, তখন আপনাকে আপনার পরিবারের শহীদ স্বজনদের রক্তমাখা বাড়িটায় একবার যেতেও দেয়নি! কতটা অবিচার আর অন্যায় করা হয়েছিল শেখ হাসিনার সাথে? ভাবতে পারেন? স্বজনহারা মানুষটা বুকফাটা আর্তনাদে সেদিন ৩২ নম্বরের সামনের রাস্তাতে বসেই সবার জন্য দোয়া করেছিলেন,আত্মার মাগফেরাত কামনা করেছিলেন। এরপরেও শেখ হাসিনা ধানমন্ডি লেকের পাড়ে, বাড়ির দরজার এসে বসে থাকতেন। তার নিজের বাবার বাড়ি তার জন্য নিষিদ্ধ ছিলো। যে বঙ্গবন্ধু এই দেশের স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন, যে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি সারা বাংলার সাড়ে সাত কোটি সন্তানের জন্য সবসময় খোলা থাকতো, সেই ৩২ নম্বর বাড়ি তার সন্তানের জন্য নিষিদ্ধ ছিল! একটা বিশাল সময় ধরে…

সেদিনের সেই ১৭ই মে, শেখ হাসিনার আরেকটি নতুন জীবনের শুরু। ঢাকা বিমানবন্দরে নামার পর যেসব শ্লোগান শুনেছিলেন, তার একটি ছিলো ‘হাসিনা তোমার ভয় নাই, আমরা আছি লাখো ভাই’। শ্লোগানকে শ্লোগান হিসেবে নেওয়াই দস্তুর। নেতানেত্রীরা তাই নেন। কারণ রাজনৈতিক শ্লোগানে ছেলেও বাবাকে ভাই ডাকে। সাত বছর পর শেখ হাসিনা নিশ্চয়ই বিস্ময়ভরে আবিষ্কার করেছিলেন, কথাগুলো নেহাতই কথার কথা ছিলো না।

১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি। লালদিঘির ময়দানে সেদিন আওয়ামী লীগের জনসভা ছিলো। শেখ হাসিনার ওপর সেদিন নির্বিচার গুলি ছুড়েছিলো এরশাদ সরকারের পুলিশ ও সাদা পোষাকধারীরা। কিন্তু গুলি তাকে ছোঁয়নি। দেয়ালে বিধেছে। মানুষের সে দেয়াল থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়েছে। হাসিনার ভাইদের দেয়াল। মাথায় গুলি খেয়ে সীতাকুন্ড কলেজের জিএস যখন উল্টে পড়েছেন, তার জায়গা নিয়েছেন একজন শ্রমিক নেতা। রক্তাক্ত সে দেয়ালের নিরেট দূর্ভেদ্যতা অটুট ছিলো। একটা ইট খসে গেলে সেখানে বসেছে আরেকটি ইট। শেখ হাসিনা নিরাপদ ছিলেন। সেদিন আমাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল ছিলো রণক্ষেত্র- জান দেবো, লাশ দেবো না। রাত বারোটা পর্যন্ত চলেছে থ্রি নট থ্রি আর এসএলআরের বিরুদ্ধে ইট পাটকেলের লড়াই।

১৬ বছর পর, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আবার ভাইদের কাছে ঋণী হয়েছেন হাসিনা। এদিনকার হামলা আরো ভয়ানক ছিলো। গুলির পাশাপাশি ছিলো আর্জেস গ্রেনেড। তুমুল বিস্ফোরণেও হাসিনার ভাইয়েরা ভুলে যায়নি তাদের প্রতিজ্ঞা। শরীরে অজস্র স্প্লিন্টার আর বুলেটের গর্ত নিয়েও দাঁড়িয়ে গেছে মানব দেওয়াল। মৃত্যু দিয়ে বোনের নিশ্চিত মৃত্যুকে ফিরিয়েছেন তারা।

স্বীকৃতির পরোয়া করে না এসব মৃত্যু। আত্মাহুতির বিনিময়ে প্রতিদান চায় না। আক্রমণ থেমে থাকবে না। আরো হবে। হুমকি আসে জনসভা থেকে। জাতির জনকের মৃত্যুদিনে বিশাল কেক কেটে আনন্দ উদযাপন করিয়েরা হুমকি দেয় আবারও। শেখ পরিবারকে নির্বংশ করার সেই মিশন থেকে তারা সরবে না। বোকা এই খুনীগুলো, তাদের মুখপাত্রগুলো ভুলে যায় সেই ভাইদের কথা। হাসিনার বুলেটপ্রুফ ভেস্ট পর্যন্ত যাওয়ার আগে কতগুলো শরীর ভেদ করতে হবে তাদের ছোঁড়া গুলিকে। এত বুলেট কোথায় পাবি তোরা! তাদের পারুল বোনটির জন্য সাত ভাই চম্পারা যে শত শত, হাজার হাজার, লাখ লাখ হয়ে যায়…

তাই ১৭ই মে, ১৯৮১ ছিল এই জাতির জন্য একটা বিশেষ দিন। কারণ সেইদিন যদি শেখ হাসিনা এই বাংলাদেশে ফিরে না আসতেন, তাহলে পরাজিত পাকিস্তানী শক্তি, রাজাকার-যুদ্ধাপরাধীদের ধর্মান্ধ মৌলবাদী শক্তি জামায়াতে ইসলাম, নেজামে ইসলাম ইত্যাদি আজ থাকতো রাষ্ট্রক্ষমতায়, বহু আগেই অন্ধকারের একশো বছরে প্রবেশ করতাম আমরা, আজ পৃথিবীর ব্যর্থ রাষ্ট্রগুলোর শীর্ষে থাকতো বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ আর একাত্তর শব্দ দুটো পরিণত হতো রূপকথায়… তাই আজকের দিনটি নিয়ে যাদের সমস্যা, যারা মনে করেন যে কেন এই দিনটি নিয়ে এতো কথা বলতে হবে, কেন এই দিনটাকে এতো গুরুত্ব দিতে হবে, তাদের কাছে প্রশ্ন- সেদিন শেখ হাসিনার জায়গায় আপনি থাকলে কি করতেন? নিজের পরিবারকে নির্মমভাবে মেরে ফেলার ছয় বছর পর আপনি কি করতেন? সেদিন শেখ হাসিনা না ফিরলে আজ ধর্মান্ধ মৌলবাদী পাকিস্তানের চেয়েও নিকৃষ্ট পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যর্থ রাষ্ট্রের একটার নাগরিক হিসেবে আপনার অনুভূতি কি হতো?

তথ্য কৃতজ্ঞতাঃ

১) এসেছো জ্যোতির্ময়

২) ‘যেভাবে কেটেছিলো দিল্লীতে শেখ হাসিনার নির্বাসিত জীবনের সেই দিনগুলি’, বিবিসি ডট কম (১১এপ্রিল, ২০১৭)

৩) ‘যেভাবে পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে জেনেছিলেন শেখ হাসিনা’ বিবিসি ডট কম (১৬ আগস্ট, ২০১৭)

৪) ‘The time Delhi gave shelter to Sheikh Hasina’ by Vivek Shukla, DNA INDIA (April 7, 2017)

৫) ‘Tearful PM tells exile story’, BDNEWS24.COM (17 may, 2014)

৬) ‘Hasina revisits Delhi, her home from 1975-81’, BDNEWS24.COM (January 11, 2010)

৭) ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ’, ডঃ ওয়াজেদ মিয়া (১৯৯৩)

৮) Bangabandhu’s Daughters by Noman Rashid Chawdhury (son of Mr. Humayun Rashid Chawdhury), The Daily Star (15 August, 2014)

বিশেষ কৃতজ্ঞতাঃ নিশম সরকার, অমি রহমান পিয়াল, আবেদ খান, রুহেল আহমেদ

Comments
Spread the love