আজকাল ভারতীয় বিভিন্ন নাটক সিনেমায় প্রায়ই পুনর্জন্মের কথা শোনা যায়। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকে দিল্লিতে যখন ছোট্ট একটা মেয়ের পুনর্জন্মের কথা শোনা গিয়েছিল তখন চারিদিকে হইচই পড়ে গিয়েছিল। ছোট্ট মেয়েটা প্রথমদিকে কেবল স্থানীয়দের কাছেই বিস্ময় ছিল। কিন্তু তার পুনর্জন্মের খবর ধীরে ধীরে যখন ছড়িয়ে পড়তে থাকে, তখন তা দেশের সীমা ছাড়িয়ে সারা বিশ্বে আলোড়ন তুলেছিল। অবশ্য এ ঘটনা বা গল্পের সত্যতা নিয়ে অনেকেই মধ্যে বর্তমানে তো বটেই, সে সময়ও সন্দেহ ছিল। এখানে যে মেয়েটার কথা বলা হচ্ছে তার নাম শান্তি দেবী। ১৯২৬ সালে জন্ম নেওয়া এই মেয়েটার জীবন ঘিরেই ছিল বিভিন্ন ধরনের জল্পনা-কল্পনা যার সুরাহা হয়নি আজও।

১৯০২ সালে ভারতের মাথুরায় চতুর্ভূজ নামে এক বাড়িতে এক মেয়ের জন্ম হয়। মেয়েটির নাম রাখা হয় লুগদি। লুগদির বয়স যখন মাত্র দশ বছর তখনই তার বিয়ে হয় মাথুরার কেদারনাথ নামক একজন ব্যবসায়ীর সাথে। লুগদি খুব ধার্মিক ছিলো এবং সেই অল্প বয়সেই সে বিভিন্ন তীর্থস্থান ভ্রমণ করেছিল। বিয়ের পরে লুগদি প্রথমবারের মত যখন গর্ভবতী হয়, সিজার করে তার পেট থেকে একটি মৃত সন্তান বের করা হয়। এরপর যখন সে দ্বিতীয়বারের মত গর্ভবতী হয়, তখন তার স্বামী তাকে আগ্রার একটি হাসপাতালে নিয়ে যায় যাতে নিরাপদে তাদের সন্তান পৃথিবীর আলো দেখতে পায়। সেখানেই সিজারের মাধ্যমে লুগদির একটি ছেলে সন্তান জন্মলাভ করে ১৯২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর। ছেলের জন্মের নয়দিন পরে ৪ঠা অক্টোবর লুগদির অবস্থা এতোটাই খারাপ হয়ে পরে যে শেষ পর্যন্ত মারা যায় সে।

এ তো গেল সহজ-স্বভাবিক এক ভারতীয় বধূ লুগদির জীবনের সাধারণ গল্প। এই সাধারণ গল্পটাই অসাধারণ এবং অবিশ্বাস্য হয়ে ওঠে দিল্লির এক ছোট্ট এলাকায় শান্তি দেবী নামের এক মেয়ের জন্মের সাথে সাথে। লুগদির জন্মের ঠিক এক বছর দশ মাস এবং সাত দিন পর ১১ই ডিসেম্বর ১৯২৬ সালে দিল্লিতে চিড়াওয়ালা মহল্লা নামের এক এলাকায় বাবু রঙ বাহাদুর মাথুর নামের এক ভদ্রলোকের ঘরে জন্ম নেয় এক কন্যা সন্তান। নাম রাখা হয় শান্তি দেবী। যতদিন পর্যন্ত ভালোভাবে কথা বলতে শিখেনি ততদিন পর্যন্ত শান্তি দেবী অন্য আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতই ছিল। চার বছর বয়সে যখন সে ভালোমত কথা বলা শিখল তখন থেকেই শুরূ হলো অস্বাভাবিকতা।

চার বছর বয়সের ছোট্ট মেয়ে শান্তিদেবী বার বার তার স্বামী আর সন্তানের কথা বলতে থাকল! সে বলত যে তার বাড়ি মাথুরায়। সেখানে তার স্বামী আর সন্তান আছে। তার স্বামীর একটা কাপড়ের দোকান আছে! প্রখমদিকে শান্তির বাবা-মা মনে করল, এটা তাদের ছোট্ট মেয়ের কল্পনার জগৎ বুঝি। এবং তারা সেটাকে পাত্তা দিতে চাইল না। কিন্তু সময়ের সাথে শান্তির গল্পের বিস্তার যখন বাড়তেই থাকল তখন তারা চিন্তায় পরে গেল। শান্তি দেবী মাথুরায় তার স্বামী, সন্তান এবং সংসারের খুঁটিনাটি বর্ণনা এত নিখুঁতভাবে দিতে থাকল যে সেটাকে আর অবহেলা করা গেল না। যেমন, খেতে গিয়ে হঠাৎ সে বলে ওঠে, মাথুরায় আমার বাড়িতে আমরা অনেক রকমের মিষ্টান্ন খাই। বা যখন তার মা তাকে কাপড় পরাতে যায়, সে কোন ধরণের কাপড় আগে পড়ত সেই গল্প শুরু করে দেয়। কখনও কখনও সে তার স্বামীর বর্ণনা দেয়, বলে তার স্বামী দেখতে সুন্দর, গালে একটা আঁচিল আছে এবং সে চশমা পড়ে। আবার তার স্বামীর দোকান যে একটা মন্দিরের সামনে অবস্থিত একথাও সে বলে।

এমনি করেই শান্তি দেবীর বয়স ছয় বছর হয়। তার বাবা-মা তার কথা-বার্তা আর ভঙ্গিতে হতবিহবল্ হয়ে পরে। ছোট্ট মেয়েটি, কিভাবে বাচ্চা জন্ম দিতে গিয়ে মারা গিয়েছিল সে বর্ণনাও করে নিখুঁতভাবে। এসব গল্পে ভয় পেয়ে শান্তির বাবা-মা ডাক্তারের স্মরণাপন্ন হয়। ডাক্তার ভদ্রলোকও অবাক হযে যায় এতটুকু বাচ্চার কথা শুনে। কি করে বাচ্চা মেয়েটি জটিল ধরনের সিজারিয়ান অপারেশনের কথা এত সহজভাবে গুছিয়ে বলে! এভাবেই রহস্য জট পাকাতে থাকে। শেষ পর্যন্ত শান্তি দেবীর বাবা-মাও বিশ্বাস করতে শুরু করে, হতে পারে এগুলো তাদের মেয়ের পূর্ব জন্মের গল্প।

শান্তি দেবী বড় হতে থাকলে বাবা-মার সাথে জিদ ধরে তাকে মাথুরায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। আট-নয় বছর বয়স থেকে শান্তি তার স্বামীর নাম উচ্চারণ করা বন্ধ করে দেয়। কেননা, সেসময় ভারতে একটা প্রথা ছিলো এমন যে, স্বামীর নাম মুখে নিলে পাপ হয়। যখন তাকে স্বামীর কথা জিজ্ঞেস করা হত, সে লজ্জায় লাল হয়ে যেত। বলত, তাকে মাথুরায় নিয়ে গেলে সে তার স্বামীকে দেখিয়ে দিবে, কিন্তু নাম বলতে পারবে না।

এমন সময় একদিন দিল্লির দাঁড়াগঞ্জের রামজেশ উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক, শান্তি দেবীদের দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়, বাবু ভীষণচাঁদ এলো শান্তি দেবীকে দেখতে। সে শান্তিকে বলল, যদি সে তার স্বামীর নাম বলে তবে তাকে সে মাথুরা নিয়ে যাবে। একথায় প্রভাবিত হয়ে শান্তি ভীষণচাঁদের কানে কানে ফিসফিস করে বলল তার স্বামীর নাম। ভীষণচাঁদ শান্তিকে আশ্বাস দিল সে খোঁজখবর নিয়ে তারপর শান্তিকে স্বামীর বাড়ি মাথুরায় নিয়ে যাবে।

ভীষণচাঁদ কেদারনাথের কাছে শান্তির সম্পর্কে সবকিছু জানিয়ে একটি চিঠি লিখল এবং তাকে একবার দিল্লিতে আসার জন্য অনুরোধ করল। কেদারনাথ চিঠির উত্তরে তার এক আত্মীয় পন্ডিত কামজিলালের মাধ্যমে জানালো যে শান্তি দেবীর বেশিরভাগ দাবীই সত্যি। পন্ডিত কামজিলাল যখন শান্তি দেবীর সাথে দেখা করতে এলো শান্তি দেবী তাকে তৎক্ষণাৎ চিনে ফেলল তার স্বামীর কাজিন হিসেবে। শান্তি মাথুরায় কামজিলালের বাড়ি কোথায়, সে কি করে, এমনকি লুগদি কোথায় তার জমানো টাকা লুকিয়ে রেখেছিল তাও ঠিক ঠিক বলে দিল। কামজিলাল এসব দেখে-শুনে এত বিস্মিত হলো যে সে মাথুরায় ফিরে কেদারনাথকে দিল্লিতে আসার জন্য রাজী করিয়ে ফেলল।

কেদারনাথ তার এবং লুগদির একমাত্র পুত্র নাভনিদ লাল ও তার বর্তমান স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে দিল্লিতে এলো ১২ই নভেম্বর ১৯৩৫ সালে। সে শান্তিদের বাড়িতে এলো এর পরের দিন। শান্তি দেবীর বাবা শান্তিকে পরীক্ষা করার জন্য কেদারনাথকে তার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল লুগদির ভাসুর হিসেবে। কিন্তু কেদারনাথকে দেখা মাত্র শান্তি লজ্জায় লাল হয়ে গেল এবং একপাশে সরে দাঁড়ালো। কেন সে ভাসুরকে দেখে এত লজ্জা পাচ্ছে জিজ্ঞেস করলে শান্তি উত্তর দিল, সে আমার ভাসুর নয়, আমার স্বামী। এরপর সে তার মায়ের দিকে ঘুরে বলল, “আমি তোমাকে বলেছিলাম না সে দেখতে সুন্দর আর তার বা দিকের গালে কানের কাছে একটা আঁচিল আছে।”

এরপর শান্তি তার মাকে বলল মেহমানদের জন্য খাবার তৈরি করতে। মা যখন জানতে চাইল কি খাবার বানাবে, শান্তি বলল, সে আলুর পরোটা আর কুমড়োর তরকারী খুব ভালবাসে। কেদারনাথ একথা শুনে বোকা বনে গেল, কেননা, সত্যিই এগুলো তার প্রিয় খাবার। তবু কেদারনাথ আরও সুস্পষ্ট কোন প্রমাণ দিতে বললে, শান্তি বলল, মাথুরায় তাদের বাড়ির উঠোনে একটা কুয়া আছে, সেখানে সে গোসল করত। তার আগের জন্মে জন্ম নেওয়া পুত্র সন্তান নাভনিদকে দেখে শান্তি খুবই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ল। সে তাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল। শান্তি তার মাকে বলল তার সব খেলনা এনে তার ছেলে নাভনিদকে দিতে। এবং মায়ের জন্য দেরী না করে সে তৎক্ষণাত নিজেই গিয়ে খেলনাগুলো নিয়ে এলো ছেলেকে দেওয়ার জন্য।

কেদারনাথ শান্তিকে জিজ্ঞেস করল, আগের জন্মে মৃত্যুর আগে সে তো মাত্র একবার ছেলেকে দেখেছে, তাও আবার জন্মের পরপরই, তাহলে এখন সে কি করে তার ছেলেকে চিনতে পারল? শান্তি ব্যাখ্যা শুনে কেদারনাথ হতভম্ব হয়ে গেল। শান্তি বলল যে তার ছেলে তো তারই আত্মার অংশ, নিজের আত্মাকে চিনতে তাই তার কোন কষ্ট হয়নি। খাওয়া-দাওয়ার পরে কেদারনাথের বর্তমান স্ত্রীকে দেখিয়ে শান্তি জিজ্ঞেস করল, “আপনি কেন তাকে বিয়ে করেছেন? আমরা কি ঠিক করেছিলাম না যে আপনি অন্য কাউকে বিয়ে করবেন না।” একথার উত্তরে কেদারনাথ বাকরুদ্ধ হয়ে গেল।

দিল্লিতে থাকতে থাকতেই কেদারনাথ লক্ষ্য করল শান্তির আচার-আচরণ হুবহু তার মৃত স্ত্রী লুগদির মত। দিল্লি ছাড়ার আগের রাতে কেদারনাথ শান্তির সাথে একান্তে কিছু সময় কথা বলতে চাইল এবং বাড়ি ফিরে যাবার আগে সে পুরোপুরি বিশ্বাস করল যে শান্তি দেবী তার মৃত স্ত্রী লুগদীর পুনর্জন্ম। কেননা শান্তি কেদারনাথকে তাদের সংসার জীবনের এমন এমন সব কথা বলেছিল যা তার স্ত্রী ভিন্ন অন্য কারো পক্ষে জানা সম্ভব নয়।

দু’দিন পর ১৫ই নভেম্বর যখন কেদারনাথ মাথুরায় ফিরে গেল শান্তি দেবী অশান্ত হয়ে উঠল। সে মাথুরায় কেদারনাথের কাছে যেতে চাইল কিন্তু তার বাবা-মা তাকে আটকালো। তার এ কাহিনী ধীরে ধীরে পুরো ভারতে ছড়িয়ে পড়ল। অনেক সংবাদমাধ্যম এবং বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেও এ ঘটনা আলোড়ন তুলল। এভাবেই একসময় মহাত্মা গান্ধীর কানে পৌঁছলো এ ঘটনা। তিনি শান্তি দেবীকে ডাকলেন, তার সাথে কথা বললেন এবং তাকে তার আশ্রমে থাকার জন্য অনুরোধ জানালেন। মহাত্মা গান্ধী সমাজের নামীদামী ১৫ জন বিশিষ্ট নাগরিককে নিয়ে এ ঘটনা তদন্ত করার জন্য একটি কমিঠি গঠন করলেন, যাদের মধ্যে ছিল সাংসদ, জাতীয় নেতা, এবং সংবাদকর্মীরা। এ কমিটির সদস্যদের তিনি মাথুরা পাঠালেন ২৪ নভেম্বর ১৯৩৫ সালে। তিনি শান্তি দেবীকেও পাঠালেন কমিটির সদস্যদের সাথে মাথুরায়। কমিটির সদস্যরা ফিরে এসে যা বর্ণনা করল সেসব বিস্ময়কর।

শান্তি মাথুরায় গিয়ে তার শ্বশুর বাড়ি, স্বামীর বাড়ি, আগের জন্মের বাবার বাড়ি, বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি, আত্মীয় স্বজন সবাইকেই একমূহুর্তেই ঠিক ঠিক চিনতে পারে। তার কোন ঘটনার বর্ণনাই মিথ্যা বলে চিহ্নিত করা যায় না। ছোট-খাট সব বর্ণনাই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মিলে যায়। মহাত্মা গান্ধীর নির্বাচিত কমিটির সদস্যরা মাথুরা থেকে ফিরে এসে তদন্তের প্রতিবেদন পেশ করেন। তারা শান্তি দেবীকে লুগদি দেবীর যথার্থ জন্মান্তর হিসেবে দেখিয়ে উপসংহার টানেন। তাদের এ প্রতিবেদন যখন প্রকাশিত হয় সারা ভারতে হইচই পরে যায়। অনেক বুদ্ধিজীবী, মনোবিজ্ঞানী, যুক্তিবিদ, ডাক্তার, সমালোচক উঠেপড়ে লেগে যায় এ ঘটনাকে মিথ্যা প্রমাণ করতে। কিন্তু কেউই এ ঘটনা মিথ্যা প্রমাণ করতে পারে নি।

শান্তি দেবী আজীবন অবিবাহিতা ছিলেন। ১৯৫০ এর দশকে তিনি তাঁর কাহিনী আবারও বলেন। ১৯৮৬ তে তিনি আয়ান স্টিভেনসন ও কে.এস. রাউতকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে লুগদি দেবীর মৃত্যু-পূর্ব অভিজ্ঞতাসমূহ বর্ণনা করেন। কে.এস. রাউত তাঁর তদন্ত ১৯৮৭ তেও চালিয়ে যান এবং শেষ সাক্ষাৎকারটি ২৭ ডিসেম্বর, ১৯৮৭ তে শান্তি দেবীর মৃত্যুর চারদিন পূর্বে নেওয়া হয়।

এক সুইডিশ লেখক স্টুর লুনারস্ট্রান্ট যখন এ ঘটনা শোনেন, তিনি এ ঘটনা মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য সুদূর সুইডেন থেকে ভারতে আসেন। কিন্তু ভালোভাবে তদন্তের পরে তিনি এ ঘটনাকে শুধু এক ভাবেই ব্যাখ্যা করতে সমর্থ হন। তিনি জীবনকালে দু’বার শান্তি দেবীর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। শান্তি দেবীর মৃত্যুর পর তিনি তাকে নিয়ে ১৯৯৪ সালে একটি বই প্রকাশ করেন; এর ইংরেজি অনুবাদ ১৯৯৮ এ বের হয়। তিনি এ বইয়ে শান্তি দেবীকে লুগদি দেবীর পুনর্জন্ম বলে স্বীকার করেন।

তথ্যসূত্র-

Comments
Spread the love