নিজের দেশ বা দেশের মানুষের নাম জড়িয়ে আছে এমন কোন অর্জন শুনতেই ভালো লাগে। গর্বে ভরে যায় মন। সে, যে ক্ষেত্রেই হোক না কেন, চিকিৎসা, বিজ্ঞান, ব্যবসা-বাণিজ্য  খেলাধুলা। সম্প্রতি জানা গেছে চিকিৎসা ক্ষেত্রে উদ্ভাবিত এক পদ্ধতির কথা, যার উদ্ভাবক আমাদের দেশেরই একজন কৃতি চিকিৎসক। যদি এখনও না শুনে থাকেন তার নাম ও কৃতিত্ব, চলুন জেনে আসি।

এইতো গত আগস্টেই ব্যাপকভাবে আলোচনায় এলো বাংলাদেশী একজন চিকিৎসক অধ্যাপক সায়েবা আক্তারের উদ্ভাবিত স্বল্পমূল্যের এক চিকিৎসা পদ্ধতি। চিকিৎসা পদ্ধতিটি অবশ্য আরও অনেক আগে ২০০২-২০০৩ সালের দিকে উদ্ভাবন করেন অধ্যাপক সায়েবা আক্তার। সায়েবাস মেথড নামে পরিচিত এই চিকিৎসা পদ্ধতি মেয়েদের প্রসবকালীন রক্তক্ষরণ বন্ধে বেশ কার্যকর। সারা বিশ্বের অনেক দেশে আজ সায়েবা আক্তারের উদ্ভাবিত এই “সায়েবাস মেথড” অল্প খরচে অসংখ্য প্রসূতি মায়ের জীবন বাঁচাতে সহায়তা করছে।

নতুন একটা খুশির সংবাদ জানতে পারলাম গতকাল। সায়েবা আক্তারের মতো বাংলাদেশের আরও একজন চিকিৎসক ড: মোহাম্মদ জোবায়ের চিশতী নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের বাঁচানোর জন্য স্বল্পমূল্যের আরও এক চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। প্রতি বছর স্বল্প খরচে সারাবিশ্বের নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত অসংখ্য শিশুর জীবন বাঁচানো সম্ভব তার এই পদ্ধতি ব্যবহার করে।

১৯৯৬ সালে ড. মোহাম্মদ জোবায়ের চিশতী কাজ করছিলেন বাংলাদেশের সিলেট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগে। শিক্ষাধীন চিকিৎসক হিসাবে কাজ শুরু করার প্রথম রাতেই চোখের সামনে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত তিনটি বাচ্চার মৃত্যু দেখেছিলেন তিনি। এত অসহায় বোধ করছিলেন সেদিন যে কষ্টে কেঁদেই ফেলেছিলেন। সেইদিনই নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, নিউমোনিয়া থেকে শিশুদের বাঁচানোর জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন।

প্রতিবছর সারাবিশ্বে প্রায় ৯ লক্ষ ২০ হাজার শিশু মারা যায় নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে। দক্ষিণ এশিয়া এবং সাহারা মরুভূমির দক্ষিণে অবস্থিত আফ্রিকা মহাদেশে শিশুমৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি।

দুই দশক যাবত গবেষণা করার পর, ড. জোবায়ের চিশতী উদ্ভাবন করেছেন একেবারেই সস্তা একটি পদ্ধতি যা রক্ষা করতে পারে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হাজারো শিশুর জীবন।

নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয় ফুসফুস। স্ট্রেপটোকক্কাস জাতীয় ব্যাকটেরিয়া কিংবা শ্বাসযন্ত্রের সিনসিশিয়াল ভাইরাস (আরএসভি)সংক্রমণ ঘটায় ফুসফুসে। ফলে, ফুলে ওঠে ফুসফুস, ভরে ওঠে পুঁজে বা তরল পদার্থে। যা বাতাস থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে নিঃশ্বাস নেওয়ার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

উন্নত দেশের হাসপাতালগুলোতে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত বাচ্চাদের জন্য ভেন্টিলেটরের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে শ্বাস নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু সেই যন্ত্রগুলির প্রতিটির মূল্য ১৫ হাজার ডলার এবং যন্ত্রগুলি চালানোর জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত কর্মী প্রয়োজন। যার ফলে পুরো ব্যাপারটা অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়ায় বাংলাদেশের মতো উন্নতিশীল দেশের হাসপাতালগুলোতে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কম খরচের যেসব পদ্ধতি প্রচলিত আছে, সেগুলোর মাধ্যমে অল্পমাত্রায় অক্সিজেনের যোগান দেওয়া সম্ভব হলেও তা তীব্র নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার অপ্রতুল। একারণে এসব পদ্ধতি ব্যবহার করে চিকিৎসা দেয়ার সময় তীব্র নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের প্রতি সাতজনে একজনের মৃত্যু ঘটে।

অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে কাজ করার সময় ড. জোবায়ের চিশতী একটি বুদবুদ তৈরির সিপিএপি যন্ত্র দেখেছিলেন। যন্ত্রটি ফুসফুসে নিয়মিত বায়ুর যোগান দিয়ে ইতিবাচক চাপ তৈরি করে যাতে ফুসফুস কাজ করা থামিয়ে না দেয়। শরীরেও পর্যাপ্ত পরিমাণে অক্সিজেন পৌঁছায়। কিন্তু সেই যন্ত্রটিও বেশ দামী।

এরপর তিনি দেশে ফিরে কাজ করতে শুরু করেন আইসিডিডিআরবিতে। সেখানে তিনি কাজ করতে শুরু করেছিলেন সহজ, সস্তা একটি বাবল সিপিএপি যন্ত্র তৈরির ব্যাপারে।

এক সহকর্মীর সঙ্গে তিনি, হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট থেকে ফেলে দেওয়া একটি প্লাস্টিকের শ্যাম্পুর বোতল নিয়ে গবেষণা কাজ শুরু করেন। বোতলটিতে পানি ভরে তার একপ্রান্ত সংযুক্ত করেন একটি প্লাস্টিকের টিউবের সাথে।

‘নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুরা প্রথমে একটি পাত্র থেকে অক্সিজেন টেনে নেয় এবং তা ত্যাগ করে টিউবটির মাধ্যমে যা ডোবানো থাকে পানির বোতলের মধ্যে। এর ফলে বাতাসে বোতলের পানিতে বুদবুদ সৃষ্টি হয়। এই বুদবুদ থেকে সৃষ্ট চাপ ফুসফুসের ভেতরের ছোট বায়ুথলিগুলিকে খুলে রাখতে সাহায্য করে।’- এভাবেই নিজের উদ্ভাবিত পদ্ধতির বর্ণনা দিয়েছেন ড. মোহাম্মদ জোবায়ের চিশতী।

প্রথমদিকে, চার-পাঁচটি রুগ্ন বাচ্চার ওপর এ পদ্ধতি প্রয়োগ করে আশাতীত উন্নতি দেখতে পান তিনি। এরপর দু-বছর এই বিষয়ে পড়াশোনা করে ড. জোবায়ের চিশতী তার পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করেছিলেন দ্য ল্যান্সেট নামক এক মেডিকেল জার্নালে। তাঁর পরীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত বাচ্চাদের যন্ত্রের মাধ্যমে অল্পমাত্রায় অক্সিজেন সরবরাহের চেয়েও, এই বাবল সিপিএপি যন্ত্রের মাধ্যমে চিকিৎসা বেশি কার্যকর। এ পদ্ধতিতে চিকিৎসা করিয়ে শিশুমৃত্যুর হার ৭৫ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব। এবং সেটাও মাত্র ১.২৫ ডলার বা ১ পাউন্ড খরচে। আর এই নতুন যন্ত্রটি অক্সিজেনের ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অনেক বেশি দক্ষতা দেখিয়েছিল। আগে বছর যেখানে ৩০ হাজার ডলার খরচ হচ্ছিল, এই যন্ত্রের ব্যবহারে তা নেমে এসেছিল ৬০০০ ডলার বা ৪ হাজার ৬০ পাউন্ডে।

আদ-দিন মহিলা মেডিক্যাল কলেজের শিশু বিভাগের অধ্যাপক, ড. এআরএম লুৎফুল কবীর জানিয়েছেন, দেশব্যাপী এবিষয়ে আরও বেশি পরীক্ষা নিরীক্ষা প্রয়োজন। কিন্তু, এখন পর্যন্ত যা ফল পাওয়া গিয়েছে, সেটাও যথেষ্ট উৎসাহজনক।

এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০০ বাচ্চা উপকৃত হয়েছে এই কমদামী যন্ত্রের ব্যবহারে।

ড. মোহাম্মদ জোবায়ের চিশতীর পদোন্নতি হয়েছে। নিজের হাসপাতালে তিনি এখন ক্লিনিক্যাল রিসার্চ বিভাগের প্রধান। কিন্তু তিন সন্তানের জনক ব্যস্ত এই চিকিৎসক এখনও হাসপাতালের ওয়ার্ডে বাচ্চাদের সঙ্গে খেলাধুলা করার সময় ঠিকই বের করে ফেলেন।

যখন তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়, কুড়ি বছর আগের প্রতিজ্ঞা পালন করতে পেরে কেমন লাগছে, উত্তরে তিনি বলেন, সেই অনুভূতি প্রকাশের কোন ভাষা নেই তার। উন্নয়নশীল দেশগুলির প্রতিটি হাসপাতালে তিনি এই সিপিএপি যন্ত্রটি দেখতে চান। হাসপাতালগুলি যাতে এই যন্ত্রটি সুলভে পেতে পারে তার ব্যবস্থাও করতে চান।

সেই সুদিন হয়ত বেশি দূরে নেই যেদিন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া শিশুর সংখ্যা শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে।

বিবিসি অবলম্বনে

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য লেখাগুলো