তাঁর প্রথম সিনেমার নাম ‘জখমি ইনসান’। বলিউডে নায়ক হওয়া খুব কঠিন। আর যদি কোনো ফিল্মি পরিবারের সন্তান না হয়ে থাকে তো একজন নতুন মুখের জন্য বলিউড কোনো নরকের চাইতে কম যন্ত্রণাদায়ক নয়। অথচ ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা থেকে পাশ করে আশা পাঞ্জাবী পরিবারের ছেলেটি প্রথম সিনেমায় পেয়েছিল ট্রিপল রোল। একে তো নায়ক তার ওপর তিন তিনটি চরিত্র। মন-প্রাণ দিয়ে অভিনয় করেছিল সেই তরুণটি। ম্যাটিনি শোর সময়ে হলে ঢোকার সাহসে পর্যন্ত কুলায়নি তার। অবশ্য যদি ভেতরে ঢুকতেন দেখতে পেতেন পুরো হল খালি, কোনো দর্শক নেই। তাই ১২টায় শুরু হওয়ার কথা থাকলেও প্রথম শোটা অাসলে শুরুই হয়নি। আধা ঘন্টা মাথায় হল থেকে নেমে যায় ‘জখমি ইনসান’। পরবতী জীবনে আর কোনোদিন নায়ক হওয়া হয়নি সেই তরুণের। না, নায়ক হতে পারেননি বলে তার বিন্দুমাত্র দুঃখ নেই। কারণ ৮০ এবং ৯০ দশকে বলিউডের ভিলেন চরিত্রে দর্শক পছন্দের সবচেয়ে ওপরের নামটি তাঁর। তিনি শক্তি কাপুর।

১৯৭৫ সাল থেকে ছোট-খাট চরিত্র করছিলেন শক্তি। অবশ্য তখনো তিনি নিজের আসল নাম সুনিল কাপুর হিসেবেই অভিনয় করেছেন। স্ট্রাগল বলতে কি বোঝায়, কত প্রকার ও কি কি উদাহরণসহই তিনি তা বুঝেও ফেলেছেন। একটা ১০ ফুট বাই ১০ ফুট ঘরে ছয় জন থাকতেন। সারাদিনের খাওয়া বলতে স্রেফ একটা বড় রুটি। তাও কোনো কোনো দিন এই একটি রুটি-ই ভাগ করে খেয়েছেন একই রুমে থাকা বন্ধু মিঠুন চক্রবর্তীর সঙ্গে। আর তা খেয়েই সারাদিন পরে থাকতেন স্টুডিওগুলোতে। যদি একটু কাজের সন্ধান হয়, কেউ যদি অভিনয়ের জন্য ডাকে। একটা দুটো ছোট চরিত্র করতে করতে (কখনো নায়কের বন্ধু হিসেবে এক বা দুটি দৃশ্যে, কখনো বা ডাকাত দলের সদস্য হিসেবে ঘোড়ার ওপরে…) একদিন ডাক পেলেন সুনিল দত্তের অফিস থেকে। সুনিল দত্ত তাঁর ছেলে সঞ্জয়কে বলিউডে লঞ্চ করবেন। তরুণ নায়কের বিপরীতে একজন তরুণ ভিলেন দরকার। রাজকুমার কোহলির ‘জানি দুশমন’ সিনেমায় নায়ক ছিলেন সুনিল। সেই সিনেমায় ছোট একটি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন শক্তি। সেই ছেলেটার চেহারা মাথায় ছিল দত্ত সাহেবের। সেই ঘোড়ার ওপরে বসা কয়েক সেকেন্ডের চরিত্রটির জন্য ‘রকি’ সিনেমায় ‘আর.ডি.’ চরিত্রের মধ্যদিয়ে বলিউডে নতুন করে অভিষেক হলো শক্তি কাপুরের। নতুন অভিষেক বলছি কারণ, এই সিনেমার মধ্য দিয়েই সুনিল কাপুর হয়ে গেলেন শক্তি কাপুর। নামটি বদলে দিলেন দত্ত সাহেবই। কারণ তাঁর মনে হয়েছিল ‘সুনিল’ নামটা ভিলেন চরিত্রের সঙ্গে যায় না। নিজের নাম বদলানোর ইচ্ছা না থাকলেও দত্ত সাহেবকে না বলতে পারলেন না সুনিল সিকান্দারলাল কাপুর। জন্ম হলো শক্তি কাপুরের।

শুটিং শেষ করে হেটেই ফিরতেন বাড়িতে। একদিন সন্ধ্যার পর স্টুডিও থেকে বের হয়ে বেশ খানিকটা পথ হেটে সামনের দিকে যাচ্ছিলেন। হঠাৎই পেছন থেকে গাড়ির হর্ন। রাস্তাটা একটু শুরু হওয়ায় সড়তে পারছিলেন না তিনি। কিন্তু পেছনের দামি গাড়িটির চালকের হয়তো বেশ তাড়া ছিল তাই অনেকটা চাপিয়েই পাশ কাটিয়ে বের হয়ে গেল। একে তো পাঞ্জাবি রক্ত, তারওপর সারাদিনে খাটুনির প্রভাবে বেশ টায়ার্ড। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ড্রাইভারের উদ্দেশে তাই একরাশ গালি ছুড়ে দিলেন শক্তি। গাড়িচালক গ্লাস নামিয়ে যে তাকে দেখেছেন বিষয়টি খেয়ালই করলেন না। পরদিন স্টুডিওতে আসার সঙ্গে সঙ্গে রকি সিনেমার প্রোডাকশন ম্যানেজার শক্তিকে জানালেন, সকাল থেকে দত্ত সাহেবকে বেশ কয়েকবার ফোন দিয়েছেন ফিরোজ খান। অবিলম্বে শক্তিকে দেখা করতে বলেছেন। খুশিতে প্রায় নাচতে নাচতে ফিরোজ খানের অফিসে গেলেন শক্তি। কিন্তু অফিসের বাইরে গিয়েই বুঝতে পারলেন নিজের ভুল। কাল রাতে যে গাড়ির ড্রাইভারকে মা-বাপ তুলে গালি দিয়েছেন তিনি আর অন্য কেউ নন, স্বয়ং ফিরোজ খান। পুরো বলিউড যার মেজাজকে সমীহ করে চলে। মনে মনে সৃষ্টিকর্তা আর মা’কে স্মরণ করে অফিসে ঢুকলেন। ফিরোজ খান প্রথমেই যা বললেন তা শুনে রীতিমতো চমকে গেলেন শক্তি। ফিরোজ সেদিন বলেছিলেন, ‘তোমার চাহনী অসাধারণ। এমন শক্তিশালি আর কঠিন চাহনী অনেকদিন আমার চোখে পরেনি। স্বয়ং শয়তান তোমার চোখে খেলা করে, আমার পরবর্তী সিনেমায় প্রধান ভিলেন হিসেবে তোমাকে ভেবেছি, করবে?’

আক্ষরিক অর্থেই ‘কুরবানি’ সিনেমার বিক্রম সিং চরিত্রটি বদলে দিয়েছিল শক্তি কাপুরের জীবন। না, তাকে আর কোনোদিন পায়ে হেঁটে চলতে হয়নি, একটি রুটি ভাগাভাগি করেও খেতে হয়নি। এই একটি সিনেমা রাতারাতি তাকে তারকা খ্যাতি এনে দেয়। বদলে দেয় তার পুরো জীবন। এরপর নিজের ক্যারিয়ারের চারটি দশক পার করেছেন, ভিলেন হিসেবে তো বটেই, কমিক চরিত্রেও নিজের করে নিয়েছেন পুরো পর্দা। বলিউডের পর্দায় কমিক-ভিলেন ধারাটিও তিনি প্রথম হাজির করলেন তেলুগু ‘দেবতা’ সিনেমার রিমেক ‘তোফা’ সিনেমা দিয়ে। সেই সিনেমা ‘আউউ লোলিতা’ ৩৪ বছর পরও এখনো ভক্তদের মুখে। অথচ মূল সিনেমার মোহর বাবুর সেই সংলাপ কেউ মনে রাখেনি, যদিও সেটিও সুপারহিট ছিল। এরপর থেকে প্রায় প্রতিটা সিনেমায় এমনই এক-একটি অনন্য ‘ওয়ান লাইনার’ সংলাপ শোনা গেছে শক্তি কাপুরের মুখে। যার কোনোটি ভয় ধরানো তো কোনোটা ছিল পেটে ফিল ধরানোর মতো। জীবনের একমাত্র ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কারটিও সেই কমিক চরিত্রের জন্যই (রাজাবাবু)। অাশ্চর্য হলেও সত্যি, পর্দায় খারাপ থেকে খারাপতর চরিত্র করলেও প্রেম কিন্তু করেছেন নায়িকার সঙ্গেই। শিভাঙ্গি কোলাপুরি অবশ্য নায়িকা হয়েছিলেন একটি সিনেমাতেই। এরপরই প্রেম এবং অনেকটা জেদের বশেই তিনি বিয়ে করেছিলেন শক্তিকে। যদিও অধিকাংশ পত্রিকার দাবি ছিল এই বিয়ে টিকবে সর্বোচ্চ তিন মাস। নিন্দুকের মুখে ঝামা ঘষে শক্তি-শিভাঙ্গি সংসার করে যাচ্ছেন ৩৬ বছর। শক্তিকে নিয়ে নানা ধরনের স্ক্যান্ডালের পরও তাদের ভালোবাসা কমেনি বিন্দুমাত্র।

বয়স ৬৫ চলছে, এরইমধ্যে দুই সন্তানই সিনেমায় নাম লিখিয়ে ফেলেছেন। যদিও ছেলে সিদ্ধান্ত এখনো নিজেকে প্রমাণ করতে পারেননি। কিন্তু মেয়ে শ্রদ্ধা এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠিত। শক্তি এখন আর আগের মতো অভিনয়ও করছেন না। তবে যে কোনো অনুষ্ঠানের মধ্যমনি তিনি। এখনো ঘনিষ্ঠ বন্ধু মিঠুন আর ঋশি কাপুরের বাসায় দিনভর আড্ডা দিতে বিন্দুমাত্র ক্লান্তি বোধ করেন না তিনি। প্রিয়মুখ গোবিন্দর ডাকের জন্য সবসময় প্রস্তুত রাখেন নিজেকে। নিজের চার দশকের ক্যারিয়ারের জন্য অত্যন্ত পরিষ্কার কন্ঠে স্বীকার করেন সুনিল দত্ত, ফিরোজ খান, কাদের খান এবং গোবিন্দর নাম। আর শ্রদ্ধা ভরে উল্লেখ করেন ভক্তদের। যাদের ভালোবাসায় তিনি শক্তি কাপুর। বলিউডের ইতিহাসের অন্যতম ওয়েল ড্রেসড, নাচ পারদর্শী ভিলেন… ওহ না ভুল হলো, অভিনেতা… ‘একজন অভিনেতা’- এভাবেই নিজের পরিচয় দেন শক্তি, শক্তি কাপুর।

Comments
Spread the love