খেলা ও ধুলা

একজন ‘আন্ডাররেটেড’ সাকিব!

ইংরেজি আন্ডাররেটেড শব্দটির ভালো বাংলা কী হতে পারে? যার প্রতিভার বা গুরুত্বের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় না। অর্থাৎ যে তার প্রাপ্য সম্মানটা পুরোপুরি পায় না। কারও কি অর্থটা বুঝতে কষ্ট হচ্ছে? আচ্ছা, তবে আপনার জন্য কাজটা আরও সহজ করে দিই। যেহেতু চলছে ফ্র্যাঞ্চাইজি ভিত্তিক টি-২০ ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় আর জমজমাট আসর ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল), তাই কথা বলা যাক এখানে দুই ফরম্যাটের বিশ্বসেরা আর বাকি অন্য ফরম্যাটের তৃতীয় সেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের চাহিদা, গুরুত্ব ও প্রাপ্ত মর্যাদা নিয়ে। বাজি ধরে বলতে পারি, এই লেখা শেষ হওয়ার আগেই আন্ডাররেটেড শব্দটির অর্থ আজীবনের জন্য গেঁথে যাবে আপনার মস্তিষ্কে।

নিঃসন্দেহেই বলা যায়, সানরাইজার্স হায়দরাবাদ ছিল এবারের আসরের নিলাম অনুষ্ঠানের সবচেয়ে ভাগ্যবান দলগুলোর একটি। এবং তারা নিশ্চয়ই সেটি স্বীকারও করবে। কারণ সাকিব আল হাসানকে কিনতে তাদের কত খরচ হয়েছে, জানেন? মাত্র দুই কোটি ভারতীয় রুপি!

ক্রিকেট দুনিয়ার সবচেয়ে বিরল প্রজাতি হলো সেইসব জেনুইন অলরাউন্ডারেরা, যারা তাদের ব্যাটিং, বোলিং কিংবা ফিল্ডিং যেকোন একটি বিভাগের দক্ষতা দিয়েই বিশ্বের যেকোন একাদশে জায়গা করে নিতে পারে। আর জেনুইন অলরাউন্ডার শব্দটির আগে যদি ভালো, চমৎকার কিংবা কার্যকরীর মত বিশেষণগুলো বসানোর বিলাসিতা কেউ দেখান, তবে অনেক খুঁজে পেতে যাদেরকে পাওয়া যাবে, তারা তো আরও বিরল।

এই দাবির স্বপক্ষে প্রমাণ পাওয়া যাবে এবারের আইপিএলে খেলা তেমনই কিছু অলরাউন্ডারের মূল্যতালিকার দিকে চোখ বোলালেই। 

বেন স্টোকস – ১২.৫০ কোটি রুপি
আন্দ্রে রাসেল – ৮.৫০ কোটি রুপি
হার্দিক পান্ডিয়া – ১১ কোটি রুপি
ক্রুনাল পান্ডিয়া – ৮.৮ কোটি রুপি

বোঝাই যাচ্ছে, এই খেলোয়াড়দের প্রত্যেককে নিয়ে নিলাম টেবিলে কী ভীষণ কাড়াকাড়ি হয়েছে। নইলে শুধু শুধু তো আর তার দর এমন আকাশ ছোঁয়নি! অথচ সাকিবের বেলায় আগ্রহই দেখিয়েছিল মাত্র দুইটি ফ্র্যাঞ্চাইজি – রাজাস্থান রয়্যালস আর হায়দরাবাদ। আর শেষমেষ হায়দরাবাদ তাদেরকে যে দামে দলে নিয়েছে, তা স্টোকস-হার্দিকদের দামের ছয় ভাগের এক ভাগ, এবং ক্রুনাল-রাসেলদের দামের চার ভাগের এক ভাগ।

এখন পর্যন্ত মনীশ পান্ডে, ইউসুফ পাঠান ও ঋদ্ধিমান সাহাকে নিয়ে গড়ে তোলা সানরাইজার্স মিডল অর্ডার তাদের প্রতি আশার ন্যূনতম প্রতিদানও দিতে সক্ষম হয়নি। এবং আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে রশিদ খানও এবারের আইপিএলে একটু বেশিই খরুচে বোলিং করছেন তিনি। আর তাই নিজের নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজির হয়ে সাকিবের জ্বলে ওঠাটা ছিল খুবই জরুরি। এবং হ্যাঁ, তিনি জ্বলে উঠেছেনও।

হায়দরাবাদের হয়ে ঠিক কতটা অসাধারণ সাকিব? এখন পর্যন্ত তিনি যে ১২টি উইকেট নিজের ঝুলিতে পুরেছেন, তার মধ্যে চারটি এসেছে পাওয়ার প্লেতে। এবং পাওয়ার প্লেতে তার ইকোনমি মাত্র ৭.৮০, আর তার ডট বলের হার তো আরও চোখ-ধাঁধানোঃ ৪১.৬৬! খেলার প্রথম ছয় ওভারগুলোতে সাকিব প্রতি পাঁচ বলে মাত্র একটি বাউন্ডারি দিয়েছেন।

রাজস্থানের বিপক্ষে ২/২৩ এর মাধ্যমে সাকিবের কার্যকারিতার প্রাথমিক কিছু ঝলকের দেখা মিলেছিল। এবং সেখানেই তিনি থেমে থাকেননি। এরপরেই নিজের সাবেক দল কলকাতার বিপক্ষে ব্যাট হাতে যেমন খেলেছেন ২৭ রানের একটি ক্যামিও ইনিংস, তেমনি বল হাতেও ২১ রানের বিনিময়ে তুলে নিয়েছেন দুইটি উইকেট।

১১৯ রান তাড়া করতে নেমে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের মাত্র ৮৭ রানে গুটিয়ে যাওয়ায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল সাকিবের ১৬ রানের বিনিময়ে পাওয়া এক উইকেটের। পাঞ্জাবের বিপক্ষে ১৩২ রানের ছোট রান ডিফেন্ড করার ক্ষেত্রেও সাকিব ছিলেন সমান উজ্জ্বল, ১৮ রানে নিয়েছেন দুই উইকেট। রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোরের বিপক্ষে পাওয়া জয়টিও মূলত সাকিবেরই কল্যাণে। সেই ম্যাচে সাকিব প্রতিকূল ব্যাটিং কন্ডিশনে ৩২ বলে ৩৫ রানের চমৎকার একটি ইনিংস যেমন খেলেছেন, তেমনই ৩৬ রানের খরচায় দুইটি উইকেটও নিজের করে নিয়েছেন।

শুধু পরিসংখ্যান আর সংখ্যাতত্ত্বের মাধ্যমেও বোধকরি সাকিবের কার্যকারিতার পুরোটা প্রমাণ করা যাবে না। কিন্তু মনে রাখবেন, অধিনায়ক কেইন উইলিয়ামসন কিন্তু আর কাউকে নন, কেবল সাকিবকেই ম্যাচের পর ম্যাচ ভরসা করে গেছেন, তার হাতে বল তুলে দিয়েছেন পাওয়ার প্লের ওভারগুলোতে। এবং সাকিবও সেই ভরসার যথাযথ প্রতিদান দিতে বিন্দুমাত্র ভুল করেননি। অন্যপ্রান্ত থেকে ব্যাটসম্যানদের উপর পেসারদের চাপকে একটুও বিলীন হতে দেননি তিনি। বরং একাধারে যেমন রানের গতিকে টেনে নামিয়েছেন, তেমনি জীবন সহজ করে দিয়েছেন আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভুগতে থাকা রশিদ খানেরও।

যে বিষয়টি সানরাইজার্সের জন্য সাকিবকে আরও অনন্য সাধারণ করে তুলেছে তা হলো, সাকিবের প্রধান কাজ কখনোই উইকেট নেয়া নয়। সে কাজের জন্য একাদশে ভুবনেশ্বর কুমার ও রশিদ খান রয়েছেন। সাকিবের মূল কাজ হলো প্রতিপক্ষের রানের বন্যায় বাঁধ বসানো। এবং ৭.৭২ ইমোনমি রেটের মাধ্যমে সাকিব সে কাজটি খুব ভালোভাবেই করেছেন। এর পাশাপাশি বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতৃত্ব প্রদানের মাধ্যমে যে অভিজ্ঞতা তিনি অর্জন করেছেন, সেটিও অনেক সাহায্য করেছে কেইন উইলিয়ামসনকে।

এবং অবশ্যই, টি-২০ হলো ক্রিকেটের এমন একটি সংস্করণ যেখানে রান তোলা যখন দুরূহ হয়ে পড়ে, ব্যাটসম্যানরা একটা না একটা ভুল করতে বাধ্য। এবং সাকিবের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের ফলে ব্যাটসম্যানরা সেই ভুলের খেসারত দিয়ে গেছেন নিয়মিত। কখনও সাকিবের নিজের বলেই, কিংবা কখনও অন্য বোলারদের কাছে। তাই তো এখন পর্যন্ত এ মৌসুমের সেরা বোলিং আক্রমণের মালিকানা হায়দরাবাদেরই।

যেমনটি আগেই বলেছি, পরিসংখ্যান আর সংখ্যাতত্ত্ব দিয়ে সাকিবকে বিচার করতে যাওয়া অমূলক। খালি চোখে আমরা কেবল দেখব যে স্টোকস, হার্দিক, ক্রুনাল বা রাসেলদের চেয়ে সাকিবের রানের পরিমাণ কম। কিন্তু ভুলে যাবেন না, সাকিব তার ম্যাচসংখ্যার অর্ধেকই খেলেছেন হায়দরাবাদের রাজিব গান্ধী স্টেডিয়ামে, যেটি কিনা অতিমাত্রায় বোলিং-বান্ধব।

অন্য দলগুলোর অলরাউন্ডারদের কাছে চাওয়া থাকে কেবলই একটি ম্যাচ জেতানোর মত ইনিংস বা স্পেল। কিন্তু সাকিব হলো সেই ব্যক্তি যার কাছে তার দলের চাওয়া আরও অনেক বেশি। ব্যাটিং হোক কিংবা বোলিং, যেখানেই তার দলের একজন যোগ্য পারফরমারের চাহিদা অনুভূত হয়েছে, সাকিবকে ডাকা হয়েছে সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে। এবং প্রত্যাশার চাপে কখনও ভেঙে পড়েননি সাকিব। ঠিকমতই প্রতিদান দিয়ে গেছেন।

এই মৌসুমে হায়দরাবাদের যে দুর্দমনীয় এগিয়ে চলা, তার পেছনে সাকিবের অবদানই তো সবচেয়ে বেশি। কিন্তু তারপরও… সাকিবের জায়গায় অন্য কোন খেলোয়াড় হলে তাকে নিয়ে যতটা মাতামাতি হতো, সাকিবকে নিয়ে কি তার ছিঁটেফোঁটাও হয়েছে? হয়নি।

তাহলে পাঠক, বুঝলেন তো আন্ডাররেটেড শব্দের প্রকৃত অর্থ কী?

ক্রিকইনফো অবলম্বনে

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close