সাকিব আল হাসান – এই মুহূর্তে ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ততম সংস্করণ টি-টোয়েন্টির অধিনায়ক। এবং বাংলাদেশ বর্তমানে একটি টি-টোয়েন্টি সিরিজই খেলছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় বসে দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। যেহেতু তিনি একজন ক্রিকেটার, এবং ক্রিকেট খেলায় দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য দূরদেশে অবস্থান করছেন, তাই তিনি কেন দেশের বর্তমান বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে মুখ খুলছেন না বা কোন বিবৃতি দিচ্ছেন না, সেটিকে ইস্যু করে ফেসবুকে কথা বলতে দেখা যায়নি কাউকে। অন্তত নিজের কাজটি তো সাকিব করছেন, তাতেই দেশবাসী খুশি। কিংবা খুশি না হলেও অখুশি নয় মোটেই।

তারপরও ফেসবুকে একটি পোস্টের মাধ্যমে দেশের বর্তমান অবস্থা নিয়ে কথা বলেছেন সাকিব। তার পোস্ট দেখে নড়েচড়ে বসেছে সকলেই। কারণ সাকিবের মত একজন সর্বজনীন তারকা একটি জাতীয় ইস্যুতে কী বলবেন, সে-ব্যাপারে কমবেশি আগ্রহ রয়েছে সকলেরই।

শুরুটাই সাকিব করেছেন বর্তমানে ফ্লোরিডায় থাকার কথা জানিয়ে। এরপর জানিয়েছেন গত রবিবার বাসচাপায় দুই স্কুল শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় তিনি কতটা মর্মাহত হয়েছেন। এ তথ্য শত বেদনার মাঝেও আমাদের মনে এক চিলতে ভালো লাগার পরশ বুলিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের জান, বাংলাদেশের প্রাণ বলে আমরা মানি যেই লোকটিকে, তিনি হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও ভুলে যাননি নিজের দেশের কথা, দেশের মানুষের কথা। গুরুত্বপূর্ণ একটি সিরিজ খেলার ব্যস্ততার মাঝেও দেশের মানুষের কথা ভেবে তার মন কাঁদে। সত্যিই ভালো লাগার মত একটি বিষয়।

সাকিব আল হাসান, ছাত্র আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক চাই

এবং এই ঘটনায় দেশের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা যে বিচারের দাবিতে রাস্তায় নেমে এসেছে এবং আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে, এ বিষয়টিকেও প্রশংসার চোখে দেখেছেন তিনি। এই ছেলেমেয়েগুলোকে নিয়ে তিনি কতটা গর্বিত সে-কথা বলেছেন অকুন্ঠ চিত্তে। দারুণ একটি উপমাও দিয়েছেন তিনি। যে ছেলেমেয়েরা তাকে দেখলেই অটোগ্রাফের আবদার করে, তাদের প্রতি আজ তার মুগ্ধতার মাত্রা এতটাই আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে যে দেশে থাকলে তিনি নিজেই নাকি ছুটে গিয়ে তাদের কাছে অটোগ্রাফ চাইতেন। এই কথায় আবেগের আতিশয্য থাকলেও, পড়ে ভালো লেগেছে। ময়নার ছেলেমানুষি কথায় আমাদের মুখে মৃদু হাসির রেখা উঁকি দিয়েছে।

তবে এরপর তিনি যা বললেন, তাতে মুখের হাসির রেখা মুছে গিয়ে কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়তে খুব বেশি সময় লাগেনি। বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার বললেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিহত পরিবারকে আর্থিক সহায়তা ছাড়াও নিরাপদ সড়ক আইন করতে আন্তরিকভাবে কাজ করছেন। ইতোমধ্যে অভিযুক্ত পরিবহনের রুট পারমিট বাতিল সহ পাঁচ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ অবস্থায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উচিৎ হবে রাজপথ ছেড়ে ক্লাসে ফিরে যাওয়া, পড়াশোনায় মনোনিবেশ করা। খুব খটকা লাগল এই লাইনগুলো পড়ে। তার পোস্টের শুরুতে যতটা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনের অভিব্যক্তি প্রতিধ্বনিত হয়েছে, পরবর্তী অংশ ঠিক ততটাই যথেষ্ট সাধারণ মানুষকে দূরে ঠেলে দেয়ার জন্য।

সাকিব বললেন নিহত পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেয়ার কথা। হ্যাঁ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০ লক্ষ টাকা দিয়েছেন বটে, কিন্তু কী যায় আসে তাতে! ফুলের মত পবিত্র, অফুরান সম্ভাবনাময় জীবনগুলোর দাম ২০ লক্ষ টাকা! যে মায়ের কোল খালি হলো, যে বাবা হারালেন তার ভবিষ্যতের অবলম্বন, তার বিনিময়ে ২০ লক্ষ টাকা হাতে ধরিয়ে দিলেই কি তাদের মনের দুঃখ দূর হয়ে যাবে? এছাড়াও তিনি বললেন নিরাপদ সড়ক আইন প্রণয়নের কথা। এই নতুন আইন সম্পর্কে তার কি ন্যূনতম ধারণা আছে?

সাকিব আল হাসান, ছাত্র আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক চাই

আমরা যতদূর জানি, নতুন আইন অনুযায়ী বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর কারণে কিংবা প্রতিযোগিতা করে গাড়ি চালানোর কারণে মৃত্যু ঘটালে তিন বছর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হতে পারে। এরচেয়ে বড় কৌতুক কি আর কিছু হতে পারে? চালকেরা রাস্তায় বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালাবেন, প্রতিযোগিতা করবেন, আর তার খেসারত হিসেবে কেউ মারা গেলেও তাদের সাজা মাত্র তিন বছর। সিরিয়াসলি! এখানে আরও একটি বিষয় আছে, তিন বছরের সাজাও মওকুফ হয়ে যেতে পারে যদি ২৫ লক্ষ টাকা জরিমানা দেয়া হয়। তার মানে দাঁড়াল, এই দেশে একটি মানুষের জীবনের মূল্য এতটা, হ্যাঁ এতটা কম! চালকেরা যখন জানবেন যে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে মানুষ মেরে ফেললেও তাদের খুব বড় কোন শাস্তি ভোগ করতে হবে না, তখন কি আর তারা নিরাপদে গাড়ি চালানোর কথা ভাববে? মোটেই না। সুতরাং নতুন প্রস্তাবিত আইন চালকদের হাতে এক প্রকার খুনের লাইসেন্স তুলে দেয়ারই নামান্তর।

এছাড়াও সাকিব বললেন অভিযুক্ত বাস কোম্পানির রুট পারমিট বাতিল করার কথা। কী হবে রুট পারমিট বাতিল করে, যদি সমস্যার গভীরে গিয়ে সমাধান না করা হয়? আজ যে মালিকের রুট পারমিট বাতিল করা হলো, সে তো পরিস্থিতি ঠান্ডা হলে অন্য কোন নামে রুট পারমিট নিয়ে, নতুন কোন নামে রাস্তায় সেই একই বাসগুলোই নামিয়ে দেবে। তাহলে কাজের কাজ কিছু কি হবে? হবে না। আর যে পাঁচ জনকে গ্রেপ্তারের কথা বললেন তিনি, তাদেরই বা কতটুকু শাস্তি হবে বর্তমান আইনে, কিংবা অদূর ভবিষ্যতে আইনের সামান্য কিছুটা রদবদলও ঘটে।

সুতরাং সাকিব যে-কয়টি কারণ দর্শালেন শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ইস্তফা দিয়ে ক্লাসে ফিরে যাওয়ার, তার একটিও যৌক্তিক নয়, ধোপে টেকার মত নয়। তিনি বলেছেন, শিক্ষার্থীরা যা করেছে তা নাকি এদেশে ইতিহাস হয়ে থাকবে। হ্যাঁ, ১৬/১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজের ইউনিফর্ম গায়ে দিয়ে রাস্তায় নেমে আসা অনাগত ভবিষ্যতে ইতিহাসের অংশ হবে বৈকি, কিন্তু সেই ইতিহাস হবে সাফল্যের নাকি ব্যর্থতার, তা নিরুপণের সময় যে এখনও আসেনি। এই ছেলেমেয়েগুলো যে নয় দফা দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমেছে, তার একটি দাবিও কিন্তু অযৌক্তিক বা অন্যায্য কোন দাবি নয়। এবং তাদের এ আন্দোলন সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ, একদমই সহিংস নয়। তাহলে নয় দফা দাবির একটি দাবিও অপূর্ণ থাকার আগে কেন তারা রাস্তা ছেড়ে উঠে পড়বে? পড়াশোনা করা জরুরি ঠিকই, কিন্তু পড়াশোনা করেই বা কী লাভ যদি স্কুল-কলেজে আসা-যাওয়ার পথে তাদেরকে বেঘোরে প্রাণ হারাতে হয়! তারচেয়ে আরও কয়েকটা দিন পড়াশোনার বারোটা বাজিয়ে হলেও যদি তারা তাদের বেঁচে থাকার অধিকার আদায় করে নিতে পারে, সেটিই কি অনেক বেশি লাভজনক নয়!

নিদহাস ট্রফি, ফাইনাল, সৌম্য সরকার

সাকিবের এই পোস্টটির সাহিত্যিক মূল্য অনেক। খুবই ভদ্র ও মার্জিত ভাষায়, কোন পক্ষকে চটিয়ে না দিয়ে, পুরোপুরি পলিটিক্যালি কারেক্ট থেকে পোস্টটি দেয়ার চেষ্টা করেছেন সাকিব। কিন্তু কোন লাভ হয়নি তাতে। এমন চাতুরি আজকাল ভালোই বুঝতে পারি আমরা। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে আমাদের মনে যে প্রশ্নটি আসে তা হলো, কী দরকার ছিল এভাবে পলিটিক্যালি কারেক্ট থেকে পোস্ট দেয়ার? যেমনটি আগেই বলেছি, মুহাম্মদ জাফর ইকবাল বা আয়মান সাদিকরা শুরুতে আন্দোলনে সামিল না হওয়ায় বা এ ব্যাপারে কথা না বলায় তাদেরকে যতটা জনরোষের সম্মুখীন হতে হয়েছে, সাকিবকে তার এক আনাও পড়তে হয়নি। এবং পড়তে হতোও না। কারণ তিনি দেশের স্বার্থেই দূরদেশে রয়েছেন। খেলায় মনোনিবেশই তার প্রধান দায়িত্ব। যত বড় জাতীয় ইস্যুই হোক, সে-ব্যাপারে তার কথা বলা আবশ্যক ছিল না। কিন্তু তবু তিনি বললেন, এবং এমন কিছু কথা বললেন যার মাধ্যমে আর কোন সন্দেহই থাকল না যে তিনি মূলত কোন পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করতে চান। আর তাই সাকিবের একনিষ্ঠ ভক্তদেরও আজ হতাশ হতে হলো।

সাকিবের কাছ থেকে এমন কিছু আমরা সত্যিই আশা করিনি। কোন দরকার ছিল না এমন একটি পোস্টের। ভবিষ্যতে হয়ত তিনি রাজনীতিতে নাম লেখাবেন। তখন আর তার কাছ থেকে নিরপেক্ষতা আশা করবে না কেউ। কিন্তু এখনও যেহেতু তিনি সক্রিয়ভাবে কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য নন, তাই এখন অন্তত এমন নগ্নভাবে পলিটিক্যালি কারেক্ট থাকতে চাওয়ার বিন্দুমাত্র প্রয়োজন ছিল না। এরপর থেকে সাকিব যখনই বল হাতে একটু বেশি রান দেবেন, ব্যাট হাতে কম রানে আউট হয়ে যাবেন, কিংবা ফিল্ডিংয়ে হাত ফসকাবেন – তার পারফরম্যান্সকে ছাপিয়েও মানুষ কথা বলতে শুরু করবে জাতীয় ইস্যুতে তার বর্তমান অবস্থান নিয়ে। গালাগালি আর কটুকথায় ছেয়ে যাবে গোটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। শুরু থেকেই সাকিবের পাশে ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন যারা, তাদের জন্য ভবিষ্যৎ দিনগুলো তাই আরও কঠিন ও অসহনীয় হয়ে পড়বে। তাই আবারও বলতে বাধ্য হচ্ছি, কী দরকার ছিল সাকিব, নিজের ভাবমূর্তিকে এইভাবে জলাঞ্জলি দেওয়ার?

Comments
Spread the love