খেলা ও ধুলা

‘ভাব মারায়’ সাকিব ও আমাদের সেলফি-বাতিক

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তৃতীয় টি-২০ ম্যাচশেষে অটোগ্রাফ চাওয়া এক ভক্তের দিকে তেড়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশ দলনায়ক সাকিব আল হাসান- এরকম একটা ভিডিও ভাইরাল হয়েছে আজ। সেখানে আবার কেউ কেউ মনমতো ক্যাপশন জুড়ে দিচ্ছেন, মনগড়া কাহিনী বানাচ্ছেন। সাকিবের কাছে নাকি কলেজপড়ুয়া ছাত্রদের ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের ব্যাপারে প্রশ্ন করাতেই নাকি এমন ক্ষেপে গিয়েছিলেন সাকিব! অথচ পেছনের সত্যিটা জানার ব্যাপারে খুব বেশি মানুষের আগ্রহ নেই, মিথ্যে গুজব ছড়ানোতেই যেন সবটুকু সুখ!

যে ব্যক্তির দিকে সাকিব তেড়ে গিয়েছিলেন, তিনি সাকিবের সাথে সেলফি তুলেছেন, অটোগ্রাফের বায়না ধরেছেন, তারপর আবার ভিডিও করার আবদার করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই, ম্যাচ খেলে আসা সাকিব তাতে বিরক্ত হয়েছেন, তিনি ওই লোকের মামাবাড়ির আবদার পূরণ না করেই হাঁটা দিয়েছিলেন। সেই সময় তাকে পেছন থেকে বলা হয়েছে- ‘ভাব মারায়!’ স্বভাবতই সাকিব ক্ষেপেছেন, আপনি বা আমিও হলেও ক্ষেপে যেতাম। সেলফি, পাশাপাশি দাড়িঁয়ে ছবি তোলা, অটোগ্রাফ, আবার ভিফিওগ্রাফি, একটা মানুষের এতরকমের আবদার সামলানোর দায়িত্ব তো সাকিবের নয়। 

সাকিব আল হাসান, মাঙ্কিগেট কেলেঙ্কারি, নিদহাস ট্রফ্রি

আচ্ছা, আমাদের মধ্যে কেউ কেউ ক্রিকেটারদের ব্যাক্তিগত সম্পত্তি মনে করি কেন? তারা তারকা, আমাদের চাহিদা থাকতেই পারে তাদের সাথে ছবি তোলার, একটা অটোগ্রাফের। কিন্ত তাই বলে তাদের ‘পাবলিক প্রোপার্টি’ ভাবতে হবে কেন? তারাও তো মানুষ, ভক্তদের আবদার তারা সাধ্যমতো পূরণ করার চেষ্টা করেন, তবুও হয়তো কেউ কেউ বাদ পড়ে যান, অনেকের অনুরোধই রক্ষা করা সম্ভব হয় না, সব ভক্তের সাথে ছবি তোলা হয়ে ওঠে না সবসময়। পছন্দের খেলোয়াড় সেলফি বা ছবি তুলতে রাজী না হলেই তাকে গালি দিতে হবে কেন? সেলফি বা অটোগ্রাফের পরে আরও কিছু চেয়েও না পেলে পেছন থেকে ‘ভাব মারায়’ বলে টিটকারী দিতে হবে কেন?

সেলিব্রেটিদের ধারেকাছে পেলে আমাদের অনেকেরই মাথায় শর্ট সার্কিট হয়ে যায়। কি করবে কি না করবে সেটা বুঝে উঠতে পারে না অনেকেই। একই মানুষ সেলফি তুলছে, আরেকজনের হাতে ক্যামেরা ধরিয়ে দিয়ে কয়েক পোজে ছবি তুলছে, আবার আবদার করছে, ভাই আমার কাঁধে একটু হাত রাখেন! যেন সেই সেলিব্রেটি তার কাঁধে হাত রেখে ছবি তুললেই সেই ছবিটা কোন ফটো এক্সিবিশনে কোটি টাকায় বিক্রি করা যাবে! আবদারের কোন শেষ নেই এসব মানুষের।

সেলিব্রেটি বলতে এখানে শুধু ক্রিকেটারদের কথাই বলছি না। কিছুদিন আগে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করতে বলিউড তারকা প্রিয়াঙ্কা চোপড়া এসেছিলেন কক্সবাজারে, সেখানেই তিনি এমন অদ্ভুত সেলফি শিকারীদের পাল্লায় পড়েছিলেন। নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে এসে কয়েকজন তার গায়ের ওপর উঠে গিয়ে সেলফি তোলায় মত্ত হয়েছিলেন সেদিন, যেন প্রিয়াঙ্কার সাথে একটা সেলফি তুলতে না পারলে চাকরী থাকবে না, মান ইজ্জত ধুলোয় লুটিয়ে পড়বে, কারো সামনে মুখ দেখাতে পারবেন না জীবনে! সেদিনের সেই ঘটনার পরে প্রিয়াঙ্কা বাকী যে সময়টুকু বাংলাদেশে ছিলেন, নিরাপত্তাকর্মী ছাড়া কাউকেই নিজের আশেপাশে ভিড়তে দেননি। এমনকি এই সেলফি শিকারীদের প্রতি নিজের বিরক্তিও প্রকাশ করেছিলেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। 

সাকিব আল হাসান, সেলফি, গালি, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, মাশরাফি বিন মুর্তজা

মাশরাফি বিন মুর্তজা প্রায়ই বলেন, এখনকার মানুষের মধ্যে আবেগটা অনেক কমে গেছে। কোথাও ভক্তদের সঙ্গে দেখা হলে সবাই সেলফি তুলতে ব্যস্ত হয়ে যান, অথচ হ্যান্ডশেক করে কেউ এটাও জিজ্ঞেস করেন না যে ভালো আছেন কিনা! মাশরাফির ভাষায়, ভক্তদের সঙ্গে কোলাকুলি করতেও তার আপত্তি নেই, কিন্ত সেলফি জিনিসটা তার বড় বিরক্ত লাগে। ধুম করে আসছে, ‘ভাই একটা সেলফি’ বলে কয়েকটা ছবি তুলেই আবার গায়েব হয়ে যাচ্ছে।

প্রিয়াঙ্কা, মাশরাফি কিংবা সাকিব, অথবা অন্য সেলিব্রেটিরাও, তারা তো মানুষ। তাদেরও ভালো লাগা বা মন্দ লাগা আছে। তাদেরও মন-মেজাজ খারাপ থাকতে পারে কোন না কোন সময়, খেলার বাইরেও ব্যক্তিগত জীবনের অনেক বিষয় নিয়ে তারা চিন্তিত থাকতে পারেন। সেটা হয়তো আমি বা আপনি জানি না। কিন্ত যখন তখন মাঠে, এয়ারপোর্টে বা অন্য কোন জায়গায় হুট করেই ‘ভাই একটা সেলফি’ বলে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়াটা কতটুকু যুক্তিযুক্ত? সেটুকুও নাহয় মেনে নেয়া গেল, কিন্ত কেউ যদি কারো সাথে সেলফি তুলতে না চান, ছবি তোলার ইচ্ছে যদি কারো না থাকে তাহলে আপনি তাকে জোর করেন কোন যুক্তিতে? আর কেউ ছবি তুলতে রাজী না হলেই কেন তাকে গালি দিতে হবে? এটা কেমন ব্যবহার?

ক্রিকেটারদের কথাই বলি, চল্লিশ ওভারের একটা ম্যাচে নিজের সবটুকু সামর্থ্য নিংড়ে দিয়ে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ার পরে শরীর বিশ্রাম চায়। তখন সেলফির আবদার করা যায়, কিন্ত কোন খেলোয়াড় সেলফি তুলতে রাজী নাহলেই কেন তাকে ‘ভাব মারায়’ টাইপের বাজে কথা শুনতে হবে? একেকটা ম্যাচ বা ট্রেনিং সেশনের পরে ক্রিকেটারেরা কতটুকু ক্লান্ত থাকেন সেটা অনেকেই বোঝে না, কিন্ত মিরপুর স্টেডিয়াম থেকে বেরুনোর পরেই সেলফিশিকারীরা ঘিরে ধরেন ক্রিকেটারদের। সেটা মাশরাফি, সাকিব, সৌম্য বা মিরাজ, যেই হোন না কেন। 

সাকিব বাজে ব্যবহার, সাকিব বেয়াদব

সেলফি শিকারীদের ভাব দেখলে মনে হয়, ক্রিকেটারেরা বুঝি এতক্ষণ ভেতর থেকে আড্ডা মেরে বের হলেন। তবুও আমাদের ক্রিকেটারেরা সাধ্যমতো তাদের চাহিদা পূরণ করে যান। একদিন না করলেই কেন আজেবাজে ক্যাপশন দিয়ে ভিডিও ভাইরাল করতে হবে? কেন অযথা বাজে গুজব ছড়াতে হবে? ক্রিকেটারদের গালি দিয়ে কিছু মানুষ কি বিমলানন্দ পান, সেটা বুঝে উঠতে পারি না। 

আর সাকিব আল হাসানকে গালি দিতে তো কোন কারণই লাগে না অনেকের। কেন তার এত টাকা, কেন তিনি স্ত্রীকে নিয়ে দেশবিদেশে ঘুরে বেড়ান, কেন তিনি আইপিএলে খেলেন, কেন তার স্ত্রী ‘পর্দা’ করেন না, কেন তিনি হেলিকপ্টারে চড়ে মাগুরায় যান, আরও কত অজুহাত! নিরাপদ সড়কের দাবীতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ঘরে ফেরার অনুরোধ করে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন সাকিব, সেখানে মোটামুটি গালির বহর বয়ে গিয়েছিল। সাকিবের ধারণার সাথে আপনি একমত না হতেই পারেন, কিন্ত গালি দিতে হবে কেন? মানুষটার নাম সাকিব আল হাসান বলে?

সাকিব একজন ইন্টারন্যাশনাল আইকন, এভাবে প্রকাশ্যে রাগ দেখানোটা তার উচিত হয়নি। এসব ঘটনা যেহেতু বিতর্কের জন্ম দেয়, এই জায়গায় তার আরেকটু পরিণত আচরণ করা উচিত ছিল বলেই মনে হয়। কিন্ত আমরা যারা ভক্ত-সমর্থক, তাদের দায়টাই এখানে বেশি। ক্রিকেটারদের, বা সেলিব্রেটিদের সরকারী সম্পত্তি বলে বিবেচনা করবেন না প্লিজ। তারাও মানুষ, আপনার আর আমার মতো। তাদেরও ইচ্ছা অনিচ্ছা আছে, ভালো লাগা খারাপ লাগা আছে। সেগুলোকে সম্মান করতে শিখুন দয়া করে। তাতে আপনার, বা আপনাদের সম্মান কমে যাবে না একটুও। 

আরও পড়ুন- সাকিব যে কারণে অমন রেগে গিয়েছিলেন…

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close