ফেসবুকে ছবিটা দেখে আঁতকে ওঠেননি, এমন মানুষ খুব কমই আছেন বোধহয়। সাকিব আল হাসানের চোটগ্রস্থ আঙুলের একটা ছবি মোটামুটি ভাইরাল হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, সেটার কথাই বলছিলাম। কণিষ্ঠা আঙুলে সেলাইয়ের দাগ, জায়গাটা খানিকটা ফুলে আছে, কালো রঙ ধারণ করেছে সেটা। ক্রিকেট খেলতে গিয়ে এরচেয়ে ভয়াবহ অনেক ইনজুরির ইতিহাস আছে, ক্রিকেট মাঠে মৃত্যুর ঘটনাও তো কয়েকটা দেখেছে ক্রিকেটবিশ্ব। সেই তুলনায় এটা হয়তো তেমন কিছুই নয়, সেরে যাবে সপ্তাহখানেকের মধ্যেই। কিন্ত মানুষটার নাম সাকিব আল হাসান বলেই এমন দৃশ্য হজম করতে কষ্ট হয়, বুকটা কেঁপে ওঠা অজানা আশঙ্কায়।

বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রথম ইন্টারন্যাশনাল সুপারস্টার তিনি, এই মানুষটাকে নিয়ে কিছু লোকের অভিযোগের অন্ত নেই। সবার তাকে নিয়ে গর্ব করার কথা ছিল, অথচ দেশের অর্ধেক মানুষ বোধহয় তাকে ‘অহংকারী’ আর ‘বেয়াদব’ হিসেবেই জানে। জিজ্ঞেস করুন, সে কি বেয়াদবি করেছে লোকের সঙ্গে? উত্তর আসবে, তার অনেক টাকা, তার বউ পর্দা করে না….ব্লা ব্লা ব্লা। অযৌক্তিক সব কথাবার্তা। অনেক টাকাপয়সা থাকাটা এটা নাকি তার দোষ!

এই দেশে এমন একশোটা মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না, যিনি রাস্তায় হাজার টাকার একটা নোট কুড়িয়ে পেলে সেটা আলগোছে পকেটে ঢুকিয়ে নিতে দ্বিধা করবেন না, তারাই যখন সাকিব টাকাপয়সার গরম দেখান বলে হাস্যকর একটা অভিযোগ আনে, সেই অভিযোগ তোলা আঙুলগুলোতে কতখানি ময়লা লেগে আছে সেটা ঘেঁটে দেখতে ইচ্ছে হয়। একসময় এসব আজগুবি কথাবার্তা শুনলে হাসি পেতো, এখন সেইসব মূর্খ মানুষগুলোর জন্যে করুণা হয়। স্রষ্টা তাদের মাথার ভেতর লবনের চামচে এক চামচ ঘিলুও দেননি বলে!

শিক্ষিত দর্শকদের মধ্যে যারা সাকিবকে পছন্দ করেন না, তাদের আবার আরেকটা অভিযোগ আছে- সাকিব দলের জন্যে খেলেন না, শুধু নিজের জন্যে খেলেন। বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারের তকমাটা ধরে রাখার জন্যে তিনি নাকি দলের চাহিদাকে বিসর্জন দিয়ে ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানের উন্নতি ঘটাতেই ব্যাস্ত থাকেন। এদের কথা শুনলে ‘চোখ থাকিতে অন্ধ’ বাগধারাটার কথা মনে পড়ে। লোকজন এই যুগে, প্রযুক্তির উৎকর্ষের এই সময়টাতেও ক্রিকেটীয় পরিসংখ্যান না ঘেঁটে শুধুমাত্র একটা মিথ্যে ধারণা প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে কিভাবে চোখের সামনে টিনের চশমা লাগিয়ে রাখতে পারে, সেটা না দেখলে বিশ্বাস হয় না।

আরেকটা দল আছে এখন, তারা ‘ইয়ান’ প্রজাতির অন্তর্ভূক্ত। এই মানুষগুলোকে দেখলে আমার ‘এলিয়েন’ দেখার সাধ মিটে যায়। এমনটা নয় যে আপনি কারো ভক্ত হতে পারবেন না, কাউকে সমর্থন করতে পারবেন না- এরকম কোন নিয়ম নেই। কিন্ত অন্ধ ভক্তি কিংবা অন্ধ ঘৃণা, দুটোই ক্ষতিকর। এখনকার ‘ইয়ান’ সমাজের অবস্থা দেখা যায় ফেসবুকের ক্রিকেটীয় গ্রুপগুলোতে, মাশরাফির অন্ধভক্ত সাকিবের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করছেন, আবার সাকিবের অন্ধভক্তরা সমানে গালি দিচ্ছেন তামিম/মুশফিককে। অথচ মাঠে এই খেলোয়াড়েরা একজন আরেকজনের সেরা বন্ধু, তাদের মধ্যে রক্তের সম্পর্ক নেই, কিন্ত আত্মার বাঁধনটা এরচেয়েও বেশী দৃঢ়। সেটা তো ভক্ত নামধারী কিছু মানুষ বোঝেন না, বুঝতেও চান না।

সাকিব আল হাসান, সাকিবের ইনজুরি, সাকিবের নিবেদন

ওয়ানডেতে সাকিবের ব্যাটিং গড় ছত্রিশ। অথচ সাকিবের খেলা যে ম্যাচগুলোতে বাংলাদেশ জিতেছে সেগুলোয় তার গড় পঞ্চাশ! বিশ্বাস হয়? সাকিবের সাত সেঞ্চুরীর ছয়টাই বাংলাদেশকে ম্যাচ জিতিয়েছে। ওয়ানডেতেও একই অবস্থা। ক্যারিয়ারের ২৩৫ উইকেটের মধ্যে ১২৯টিই তিনি নিয়েছেন বাংলাদেশের জেতা ম্যাচে। অথচ জেতা ম্যাচের সংখ্যা হেরে যাওয়া ম্যাচের চেয়ে অনেক কম। অস্ট্রেলিয়াকে টেস্ট ম্যাচে হারানোর কথাটা মনে করুন, দুই ইনিংসেই সাকিব পাঁচ উইকেট করে না নিলে স্মরণীয় সেই জয় কল্পনাতেই থেকে যেতো নিশ্চিত। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনাল কিংবা টেস্ট সিরিজ- সাকিবের অভাবটা অনুভূত হয়েছে প্রবলভাবে। একজন সাকিব আল হাসানের অভাব তো পূরণ হবার নয়।

অথচ এই ছেলেটাকেই নিজের দেশে হাজারটা বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। ক্রিকেট খেলাটা তার কাছে পেশা, ফ্রি তো তিনি খেলবেন না নিশ্চয়ই। তার আয় করা প্রতিটা পয়সার হিসাব আছে, প্রতিটা টাকাই পরিশ্রম করে কামাই করেন তিনি। সেই টাকা দিয়ে তিনি প্লেন ভাড়া করবেন, নাকি স্ত্রীকে নিয়ে ঘুরতে যাবেন অথবা অন্যকিছু করবেন, সেসব তো আপনার-আমার অনুমতি নিয়ে করতে হবে না। তার একটা জীবন আছে, সেই জীবনটায় তাকে থাকতে দিন। ক্রিকেট খেলে তো তিনি অপরাধ করে ফেলেননি যে তাকে সমানে গালিগালাজ করতে হবে, তার ফেসবুক পেজের কমেন্ট অপশনে গিয়ে সাকিবপত্নীকে পর্দা করার ব্যপারে ওয়াজ-নসিহত করে আসতে হবে।

একটা রান বাঁচানোর জন্যে সাকিব ঝাঁপ দিয়েছিলেন সেদিন। সেই একটা রানে হয়তো বেশীকিছু ব্যবধান হতো না। কিন্ত এটাই সাকিব, দলের জন্যে যিনি নিজেকে উজাড় করে দেন, একটা রান আটকে দেয়াও যার কাছে অনেক কিছু। ম্যাচশেষে যেন এই একটা রানের আক্ষেপে পুড়তে না হয়, সেটা নিয়ে তিনি সচেতন। একই কথাটা দলের বাকীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এই যে তাসকিন হুটহাট বাজে লাইন লেন্থে বোলিং করেন, সৌম্য ভালো শট খেলতে ভুলে যান, কোনটাই তো ইচ্ছাকৃত নয়। তাদের টেকনিকে সমস্যা আছে, কেউ হয়তোবা নিজের দুর্বলতাগুলো নিয়ে সচেতন নয়- কিন্ত এটা তো নিশ্চিত যে দেশের জার্সি গায়ে কেউই খারাপ খেলতে চায় না। মাশরাফি যেমন না শুভাগত হোমও না।

নিজেদের মধ্যে কেউ বেশী ওপরে উঠে গেলে, বিশ্বজয় করে ফেললে আমাদের কেউ কেউ সেটা মেনে নিতে পারি না। আমরা নিজেদের ব্যর্থতার ঝাল।মেটাতে চাই তাকে গালি দিয়ে। এই ধরণের মানুষের অভাব নেই আশেপাশে। সাকিব আল হাসান এমন বিবেকহীন অন্ধ মানুষগুলোর ঘৃণার শিকারই হচ্ছেন, হয়েছেন, আর কিছুই নয়। অথচ সাকিবকে নিয়ে দলমত নির্বিশেষে আমিরা গর্ব করতে পারতাম, তার অর্জনে আনন্দে উদ্বেলিত হতে পারতাম, কিন্ত কিছু মানুষ আমাদের আনন্দে শরীক হতে চান না। তারা গালিতেই সুখ খুঁজে পান। তাতে অবশ্য সাকিবের কিছু আসে যায় না। তিনি জানেন, এগুলো কিভাবে এড়িয়ে যেতে হয়।

ইনজুরিতে পড়ার আগে দারুণ ছন্দে ছিলেন, খেলছিলেন দুর্দান্ত। সাকিব আল হাসান আবার এই দুর্দান্ত রূপেই ফিরবেন বলে আশা রাখি। আমরা জানি, তিনি ফিরবেন, প্রতিপক্ষের জন্যে ভয়াবহ একটা রূপ।নিয়েই ফিরবেন। তিনি তো জাত লড়াকু, তিনি একজন চ্যাম্পিয়ন!

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-