খেলা ও ধুলা

‘এই আঙুলটা আর কখনোই শতভাগ ঠিক হবে না’

অস্ট্রেলিয়ান শল্যবিদকে আঙুলের অবস্থা দেখানো এবং পরবর্তী করণীয় ঠিক করার জন্যে অস্ট্রেলিয়ায় উড়াল দেয়ার আগে গতকাল একটা দুঃসংবাদই জানিয়ে গেলেন সাকিব আল হাসান। ইনজুরি আক্রান্ত বাম হাতের কণিষ্ঠা আঙুলটা নাকি আর কখনোই আগের মতো পুরোপুরি ভালো হবে না তার। আঙুলের ভাঙা হাড়টাও পুরোপুরি জোড়া লাগবে না কখনও। ডাক্তারদের হাতে এখন খুব বেশি কিছু নেই, তারা বড়জোড় সেটাকে মোটামুটি এমন একটা জায়গায় এনে দিতে পারবেন, যাতে সাকিব ব্যাটটা ভালো ভালোভাবে ধরতে পারেন, ক্রিকেটটা চালিয়ে যেতে পারেন…

সাকিব যখন কথা বলছিলেন সাংবাদিকদের সঙ্গে, মুখে লেগে ছিল স্মিত একটুকরো হাসি। সেই হাসির আড়ালের বিষাদটা অবশ্য পড়া যাচ্ছিল খুব সহজেই। হাসিটা মুখে ঝুলিয়ে রেখেই সাকিব মজার কোন গল্প বলার মতো করে বলে গেলেন-

“আঙুলের সংক্রমণটাই সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার জায়গা। ওটা যতক্ষণ পর্যন্ত জিরো পার্সেন্টে না আসবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো সার্জন অস্ত্রোপচার করবে না। ওখানে হাত দিলে হাড়ে চলে যাবে, আর হাড়ে চলে গেলে পুরো হাত নষ্ট! এখন আসল ব্যাপারটা হচ্ছে কীভাবে সংক্রমণটা কমানো যায়। এই আঙুলটা আর কখনোই শতভাগ ঠিক হবে না। যেহেতু নরম হাড়, আর কখনো জোড়া লাগার সম্ভাবনা নেই। পুরোপুরি ঠিক হবে না। অস্ত্রোপচার করে ওরা এমন একটা অবস্থায় এনে দেবে হাতটা, ব্যাট ভালোভাবে ধরতে পারব, ক্রিকেট চালিয়ে যেতে পারব।”

সাকিব আল হাসান, আলায়না হাসান অব্রি, উম্মে আহমেদ শিশির, এশিয়া কাপ, সাকিবের আঙুল

জানুয়ারীতে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনাল ম্যাচ খেলতে গিয়ে আঙুলে চোট পেয়েছিলেন সাকিব, মাঠের বাইরেও ছিলেন বেশ কিছুদিন। এরপরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে সেই ব্যাথাটা আবার ফিরে এসেছিল, তখন ব্যাথানাশক ইনজেকশন নিয়ে খেলেছিলেন সাকিব। ভেবেছিলেন, ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেকে ফিরেই আঙুলের অস্ত্রোপোচার করে ফেলবেন। কিন্ত এশিয়া কাপ তখন কড়া নাড়ছিল দরজায়। সাকিবকে ছাড়া বাংলাদেশ অনেকটাই খর্বশক্তির দল হয়ে যায়, একারণে বোর্ড প্রেসিডেন্টের বিশেষ অনুরোধে সার্জারীর তারিখ পিছিয়ে দিয়েছিলেন সাকিব, এশিয়া কাপের পরেই অস্ত্রপোচারের টেবিলে যাবেন, এমনটাই তখন ভবিতব্য ছিল।

কিন্ত মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক। এশিয়া কাপের সুপার ফোরে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটা খেলার পরেই ব্যাথায় অবশ হয়ে গিয়েছিল সাকিবের সেই আঙুলটা। দলের ফিজিও নিজেও বুঝতে পারেননি কিছুই। আঙুলের অবস্থা খারাপ দেখে তড়িঘড়ি করে দেশে ফিরে আসেন সাকিব, সিঙ্গাপুর বা অন্য কোথাও গিয়ে অপারেশন করাবেন, সেজন্যে। ব্যাথা বাড়তে থাকায় রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি হলে চিকিৎসকেরা আঁতকে উঠেছিলেন সাকিবের আঙুলের অবস্থা দেখে! এই আঙুল নিয়ে তো কোন কাজই করা যায় না, আর সাকিব কিনা ক্রিকেট খেলে বেড়াচ্ছেন! 

ইনফেকশন সারাতে সেই রাতেই পুঁজ বের করা হয় সাকিবের আঙুল থেকে। ডাক্তারেরা জানান, আর কয়েক ঘন্টা দেরী হলে হয়তো চিরদিনের মতো অকেজো হয়ে যেতো সাকিবের হাতটা! আঙুলে অস্ত্রোপোচার হলে মোটামুটি ছয় থেকে আট সপ্তাহ লেগে যাবে সাকিবের মাঠে ফিরতে। তবে অস্ত্রোপোচারটা কবে হবে, সেটাই জানেন না সাকিব। কারণ, অস্ত্রোপোচারের জন্যে সংক্রমণটা দূর করা সবচেয়ে জরুরী। 

সাকিব আল হাসান, ইনজুরি, সাকিবের আঙুলের চিড়, সাকিব বেয়াদব

সাকিব তো অস্ট্রেলিয়া উড়ে গেছেন। আক্রান্ত আঙুল নিয়ে আরও বেশ ক’দিন ভুগতে হবে তাকে। কিন্ত সাকিবের আঙুলের এই অবস্থার জন্যে কি সাকিব নিজে দায়ী? মোটেও না। সাকিব তো এশিয়া কাপে খেলতেই চাননি। ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেকে এসেই আমেরিকা বা অন্য কোথাও গিয়ে আঙুলে সার্জারী করাবেন, এমন ইচ্ছেই ছিল তার। কিন্ত সেটা হতে দেয়নি কিছু মানুষ। বিসিবির উচ্চপদে আসীন কিছু মানুষ, যারা সাকিবকে ক্রিকেটারের চাইতে বেশি বোধহয় গ্ল্যাডিয়েটর ভাবেন, তারা চেয়েছিলেন যে কোন মূল্যে সাকিব যাতে এশিয়া কাপে খেলেন। সাকিবের ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোন মূল্যই ছিল না তাদের কাছে। অনেকটা ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করেই তাকে রাজী করানো হয়েছিল এশিয়া কাপে খেলার জন্যে। দল আর দেশের কথা ভেবে সাকিবও রাজী হয়েছিলেন, কিন্ত মনের অসন্তোষটা চেপে রাখতে পারেননি তিনি।

এশিয়া কাপের আগে একটা সাক্ষাৎকারে সাকিব বলেছিলেন, ম্যাচ খেলার মতো দশ পার্সেন্ট ফিটও নন তিনি। নিজের আঙুল বা শরীরের অবস্থা সাকিবই সবচেয়ে ভালো জানবেন, সেই জ্ঞান থেকেই হয়তো বলেছিলেন কথাটা। কিন্ত তখন সাকিবের ওই কথা নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছিল, কোচ স্টিভ রোডস বলেছিলেন, তার ধারণা সাকিব পঞ্চাশ থেকে ষাটভাগ ফিট আছেন। সাকিবের চাওয়া, সাকিবের ইচ্ছেগুলোকে তারা পাত্তা দেননি। আজ সাকিবের আঙুলের এই অবস্থার দায়ভার কি তারা কেউ নেবেন? 

ভারত বিরাট কোহলিকে বিশ্রাম দিয়েছিল এশিয়া কাপে, টানা খেলার ধকল থেকে দূরে রাখতে। আমরা কি পারতাম না, ইনজুরি আক্রান্ত সাকিবকে বিশ্রাম দিতে? শিরোপাটা আমাদের খুব দরকার, কিন্ত দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটারকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে অবশ্যই নয়। অনেক বছর আগে অতি ব্যবহারে মাশরাফি বিন মুর্তজাকে ধ্বংস করে ফেলেছিল বিসিবি, টগবগে তরুণ এক পেসারকে টানা খেলাতে খেলাতে তাকে ছুঁড়ে ফেলেছিল ভয়ানক ইনজুরির মুখে। সেই দিনগুলোতে আমরা যথেষ্ট পেশাদার ছিলাম না হয়তো। কিন্ত এখনও কেন সাকিবের সাথে একই ঘটনা ঘটবে? এখন তো আমরা পেশাদার হয়েছি, আমাদের দলে প্রশিক্ষিত ফিজিও-ট্রেনার আছেন। তারা কেন ধরতে পারবেন না অবস্থার গুরুত্ব? সাকিবের প্রশ্নের জবাবে ফিজিও কেন ‘ব্যাট না ধরায় আঙুল ফুলে গেছে’ টাইপের অদ্ভুত থিওরির জন্ম দেবেন? 

আমাদের দেশে ক্রিকেটারদের মধ্যে সাকিবের হেটারই বোধহয় সবচেয়ে বেশি। কোন কারণ ছাড়াই একদল মানুষ তার সমালোচনায় মেতে থাকেন। ‘সাকিব দলের জন্যে না খেলে নিজের জন্যে খেলেন’- এটা হচ্ছে তাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় উক্তি। অনেকে তো মানতেই চান না যে সাকিবের ইনজুরি হয়েছে, তাদের ধারণা, বাংলাদেশের হয়ে খেলতে না চাওয়ার জন্যে এগুলো সাকিবের বানানো অজুহাতও হতে পারে! এই অমানুষগুলো কোনদিন ঠিক হবে না, সাকিব নিজের কলিজাটা কেটে রান্না করে দিলেও এরা বলবে, রান্না ভালো হয় নাই, লবন কম হয়েছে!

যাই হোক, এসব অবুঝদের কথা বাদ দিলাম। কিন্ত আমাদের বিসিবির কর্তাব্যক্তিরা তো যথেষ্ট প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি, তারা কেন সাকিবের অবস্থাটা বুঝলেন না, বা বোঝার চেষ্টাও করলেন না? সাকিব তো কোন সার্কাস রিঙের টগবগে ঘোড়া নন যে তাকে দিয়ে যা খুশি করানো যাবে। তিনিও মানুষ, তারও সামর্থ্যের একটা সীমা আছে, এই সাধারণ জিনিসগুলো বুঝতে তারা কেন ভুল করেন বারবার? নাকি তারাও বিশ্বাস করেন যে, সাকিব আসলে ইনজুরির ছুতো বানিয়ে ছুটি কাটাতে চান? নইলে তাদের এমন আচরণের তো আর কোন ব্যাখ্যা খুঁজে পাই না আমরা। সাকিব আমাদের ক্রিকেটের সোনার ডিম পাড়া হাঁস, চটজলদি বড়লোক হবার মিথ্যে আশায় সেই হাঁসটাকে পেট কেটে মেরে ফেলার চিন্তা কেন করছেন তারা? 

আরও পড়ুন- 

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close