এবছরের জানুয়ারীতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে ফিল্ডিঙের সময় ডাইভ দিতে গিয়ে আঙুলে চোট পেয়েছিলেন সাকিব আল হাসান। চোটটা বেশ ভালোই ভুগিয়েছে তাকে, অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে ব্যাথানাশক ইনজেকশন নিতে হয়েছিল সাকিবকে, ব্যাথায় কুঁকড়ে যাওয়া সাকিবের চেহারাটা দেখে আমরা তখন আঁতকে উঠেছিলাম।

এরপরে ত্রিদেশীয় নিদহাস ট্রফিতে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, ফাইনালে তুলেছেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজ খেলেছেন। টি-২০ সিরিজ চলাকালে সেই ব্যাথাটা ফিরে এসেছিল আবার, ব্যাথার তীব্রতা এতটাই ছিল যে, ফ্লোরিডার ম্যাচ দুটোতে সাকিবকে খেলতে হয়েছে কর্টিজন ইনজেকশন নিয়ে। টি-২০ দলের অধিনায়ক তিনি, কষ্ট হলেও ম্যাচ না খেলে বসে থাকতে চাননি তিনি। 

সাকিব ভক্ত, সাকিব বেয়াদব, সাকিব অহংকারী

টেস্ট সিরিজে ভরাডুবির পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে আর টি-২০ সিরিজ জিতেছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে এসেছে দুঃসংবাদও। সাকিবের আঙুলে জরুরী ভিত্তিতে সার্জারী করাতে হবে। সার্জারী করালেও যে আঙুলের অবস্থা একদম আগের মতো হয়ে যাবে, সেরকমটা নয়। হয়তো ৬০-৭০ ভাগ রিকভারি হতে পারে। সেটার জন্যে সাকিবকে মাঠের বাইরে থাকতে হবে কমপক্ষে দুই মাস।

বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের যে ব্যাস্ত সূচি, তাতে সাকিব দুই মাস মাঠের বাইরে থাকলে সেটা বাংলাদেশের জন্যে ভয়ের ব্যাপার। সাকিবকে ছাড়া যে বাংলাদেশ পুরোপুরি নখদন্তহীন বাঘ, সেটা তো নতুন করে বলার কিছুই নেই। আগামী মাসে এশিয়া কাপ আছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে, এরপরে জিম্বাবুয়ে সিরিজ। জিম্বাবুয়ে গেলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ আসবে বাংলাদেশে, তার পরপরই আবার বিপিএল শুরু হয়ে যাবে। এরপর টানা দেশের বাইরে খেলা। নিউজিল্যান্ড-আয়ারল্যান্ড হয়ে ইংল্যান্ডে বিশ্বকাপ। কাজেই, সাকিবের হাতে অফুরন্ত সময় নেই। 

মাশরাফি বিন মুর্তজা, বাংলাদেশ, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ওয়ানডে

সাকিব বলেছেন, শতভাগ ফিট হয়েই মাঠে নামতে চান তিনি। আর সেজন্যেই যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব সার্জারী করিয়ে ফেলতে চান তিনি। আর সেরকমটা হলে আসন্ন এশিয়া কাপ আর জিম্বাবুয়ে সিরিজে সাকিবকে পাবে না বাংলাদেশ দল। জিম্বাবুয়ে সিরিজ নিয়ে হয়তো দুশ্চিন্তা নেই, তবে এশিয়া কাপে সাকিবকে না পাওয়া গেলে সেটা হবে বড়সড় একটা ধাক্কা।

সাকিব নিজে সার্জারীটা যতো দ্রুত সম্ভব করিয়ে ফেলতে চাইছেন। সম্ভব হলে এখনই। তবে বিসিবির সায় নেই তাতে। বোর্ড প্রেসিডেন্ট নাজমুল হাসান পাপন বলেছেন- “সাকিবের যে অস্ত্রোপচার, সেটা এশিয়া কাপের আগেও হতে পারে, পরেও হতে পারে। জিম্বাবুয়ে সিরিজের সময়, অক্টোবরেও হতে পারে। ও এশিয়া কাপের কথাই বলেছে, আমি বলেছি এশিয়া কাপের চেয়ে ভালো হয় যদি জিম্বাবুয়ে সিরিজের সময় করা হয়। সাকিবের জায়গায় তাহলে আমরা নতুন কয়েকজনকে পরীক্ষা করে দেখতে পারবো তখন। এশিয়া কাপে এবার এমনিতেই হার্ড কন্টেস্ট হবে, তার ওপর সাকিবের মতো ক্রিকেটার না থাকলে আমরা মেন্টালি অনেক পিছিয়ে যাবো… তাই আমার মনে হয় এটা(সার্জারী) এশিয়া কাপের পরে করলেই ভালো হবে।”

বিসিবি, ক্রিকেটার, কেন্দ্রীয় চুক্তি

বিসিবি প্রেসিডেন্ট আমাদের ক্রিকেটের অভিভাবক, তিনি দলের ভালো চিন্তা করবেন, এটাই স্বাভাবিক। এশিয়া কাপে সাকিব না খেলতে পারলে সেটা বাংলাদেশের জন্যে দারুণ হতাশার ব্যাপার হবে অবশ্যই। সাকিবের মতো বোলিং-ব্যাটিং দুই সেকশনেই সমানভাবে পারদর্শী খেলোয়াড় তো পুরো বিশ্বেই আর কেউ নেই। নাজমুল হাসান পাপন তার চিন্তার জায়গা থেকেই জিম্বাবুয়ে সিরিজের সময় সার্জারীর কথা বলেছেন। এটা নিয়ে দুই-একদিনের মধ্যে তিনি সাকিবের সঙ্গে বসবেন বলেও জানিয়েছেন। 

তবে সমস্যাটা যেহেতু শারিরীক, সেহেতু সাকিবের সিদ্ধান্তের ওপর জোর না করাটাই শ্রেয়। ব্যাথা সয়ে সাকিব খেলেছেন আগেও, তিনি যদি এশিয়া কাপেও ইনজেকশন নিয়ে খেলতে রাজী থাকেন, তাহলে তো কোন কথাই নেই, আর যদি তিনি সার্জারী করাবেন বলে মনস্থির করেই ফেলেন, সেই সিদ্ধান্তটাকেও সম্মান জানানো দরকার। দেশের হয়ে প্রতিটা খেলোয়াড়ই চান সবগুলো ম্যাচে মাঠে নামতে। আঙুলের ব্যাথাটা অসহনীয় পর্যায়ে না গেলে সাকিব নিশ্চয়ই এই সময়ে সার্জারীর কথাটা বলতেন না। 

সাকিব আল হাসান, নাজমুল হাসান পাপন, বিসিবি, ইনজুরি, সার্জারী, এশিয়া কাপ

শেষমেশ দেখা যাবে, সাকিব হয়তো সার্জারীটা পিছিয়ে দেবেন কয়েক মাস। হাতের ব্যাথা সয়ে ইনজেকশন নিয়ে খেলবেন, বাংলাদেশের জার্সি গায়ে উইকেট নেবেন, রান করবেন। তবুও দল হারলে, কিংবা কোন ম্যাচে একটু উনিশ-বিশ পারফর্ম করলেই আমরা সাকিবকে তুলধুনো করবো, অযথা তার নামে বিতর্ক ছড়াবো, গুজব রটাবো, ‘সাকিব টাকার জন্যে খেলেন’ বলে অপবাদ দেবো! পেছনের এই গল্পগুলো আমরা জানবো না, তীব্র যন্ত্রণা সয়ে ব্যাথানাশক ইনজেকশন নিয়ে খেলতে নামার ঘটনাগুলো আড়ালে থেকে যাবে, ভাইরাল হবে শুধু সাকিব কবে কোন ভক্তের দিকে তেড়ে গিয়েছেন, সেসবের ভিডিও!

Comments
Spread the love