শাহরুখের রইস: মিয়াভাইয়ের ‘দিমাগ’

১)

শাহরুখ খান লোকটা যতোখানি সুপারস্টার, তার চেয়ে বেশি একজন বুদ্ধিমান ব্যবসায়ী।

কেন? একটু ব্যাখ্যা করি।

মার্কেটিং-এর ভাষায় “ব্রেক ইভেন পয়েন্ট” নামে একটা টার্ম আছে।

ধরেন, আপনি কোনো একটা ব্যবসায় টাকা বিনিয়োগ করলেন। শুরুতেই কিন্তু আপনি টাকাটা রিটার্ন পাবেন না। শুরুতে ব্যবসা লসের দিকেই থাকবে, এরপর আস্তে আস্তে ব্যবসাতে গতি চলে আসলে এরপর টাকা রিটার্ন আসা শুরু করবে।

এইভাবে টাকা আসতে আসতে এমন একটা সময় আসবে, যখন আপনার বিনিয়োগ আর সেটার রিটার্ন সমান সমান হয়ে যাবে। মানে হচ্ছে, যা টাকা ঢেলেছিলেন, সেটা উঠিয়ে নিয়ে আসা মাত্রই আপনি চলে যাবেন “ব্রেক ইভেন পয়েন্টে”। এই পয়েন্টে যাওয়া মাত্রই আর লসের কোনো সম্ভাবনা থাকে না।

এরপর বাকী ব্যবসাটা শুধু লাভের ব্যবসা। যা পাবেন তাই লাভ।

(২)

যারা বিগত কিছুদিন হলো শাহরুখের আজেবাজে সব ছবি দেখে হাউকাউ করছেন যেঃ কী শুরু করলো শাহরুখ ? দিলওয়ালে, চেন্নাই এক্সপ্রেস, হ্যাপি নিউ ইয়ার, ফ্যান- এগুলো একটা জাতের ছবি হলো ? শাহরুখের সাথে এসব ছবি যায় ?

কথা সত্যি। এগুলো আসলেই শাহরুখের ফিল্ম হিসাবে খুব বাজে ধরনের ফিল্ম। কিন্তু খেয়াল করে দেখেন, শাহরুখ তার ক্যারিয়ারের একটা চমৎকার ব্রেক ইভেন পয়েন্টে আছে। সেজন্যই সে এই স্ট্র্যাটেজি হাতে নিয়েছে।

বলিউডের নীতিমালা হলোঃ ফিল্মস্টারের জীবন হচ্ছে বেশ্যার জীবন। যৌবন শেষ তো কাহিনী শেষ। কালকেই যদি মার্কেট তোমার ফেভারে না থাকে, তাহলে পরশুদিনই তোমাকে এখান থেকে বের হয়ে যেতে হবে।

বয়স তো শাহরুখেরও থেমে নাই, পঞ্চাশের দিকে ঘুরঘুর করছেন। তো এই সময় এইধরনের সিনেমাতে অভিনয় করাই তার দরকার ছিলো। শাহরুখ বেসিক্যালি রোম্যান্টিক হিরো। মোটামুটি ভালো ফিল্ম হিসাবে রোম্যান্টিক হিরো ক্যারেক্টারে তার লাস্ট ফিল্ম ছিলো “জাব তাক হ্যায় জান।”

ওইটাই শেষ। শাহরুখকে আর কোনোদিন কোনো ভালো ছবিতে সেভাবে রোম্যান্টিক হিরো ক্যারেক্টারে আমরা দেখতে পাবো না। এখন যেহেতু বয়স হয়েছে, চামড়ায় বয়সের দাগ পড়েছে, গাল ভেঙ্গে গেছে – তাই তাকে তুলনামূলক বয়স্ক ক্যারেক্টার প্লে করতে হবে। কিন্তু রোম্যান্টিক হিরোর ভূমিকা ছাড়া শাহরুখকে দেখতে তো আমরা অভ্যস্ত না। তাহলে এখন কী করা যাবে ?

(৩)

বাঁচার উপায় দেখিয়ে গিয়েছেন দুইজনঃ অমিতাভ বচ্চন আর মিঠুন চক্রবর্তী।

বয়স বাড়ার সাথে সাথে এনারা রোম্যান্টিক হিরোর ভূমিকা থেকে বের হয়ে আসার জন্য স্ট্র্যাটেজি পাল্টালেন। মিঠুন শুরু করলেন “ফাটাকেষ্ট” ধরনের ছবি করা, আর অমিতাভ শুরু করলেন বিভিন্ন কমিক্যাল ক্যারেক্টারে অভিনয় করা।

এনাদের যে দর্শকরা ছিলো, তারা মিঠুন বা অমিতাভ নাম শুনে ছবিগুলো দেখলো ঠিকই, কিন্তু ছবিগুলো দেখার পরেই তাদের প্রতিক্রিয়া হলোঃ তোমাদের তো বয়স হয়ে গেছে, এখন হয় অবসরে যাও, অথবা নতুন কিছু দেখো।

এরপর অমিতাভ “মেজর সাব” ছবি দিয়ে বয়স্ক ক্যারেক্টার করা শুরু করলেন, আর মিঠুন বিভিন্ন ছবিতে বাবার ভূমিকায় অভিনয় করা শুরু করলেন। এই পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন জন্যই এখনও তাদের মার্কেট টিকে আছে, আর এক সময়কার তুমুল জনপ্রিয় ধর্মেন্দ্র বা জিতেন্দ্ররা মার্কেটে সুবিধা করতে পারেননি।

তো এইরকম একটা ট্রাঞ্জিশন ফিল্ম থাকতে হয় সবার, যে ফিল্মের মাধ্যমে রোম্যান্টিক নায়কের “রোম্যান্টিক” ভাবমূর্তি ফাইনালি ভেঙ্গে ফেলা হয়, এবং তাকে অন্য ধরনের চরিত্র গ্রহণ করার লাইনে নিয়ে যাওয়া হয়। চাক দে ইন্ডিয়া, মাই নেম ইজ খান দিয়ে শাহরুখ ওই রাস্তায় অলরেডি ছাপ ফেলে দিয়েছেন।

আমার মতে, শাহরুখের রোম্যান্টিক ইমেজের সর্বশেষ সমাপ্তি ঘটাচ্ছে তার নতুন ফিল্মঃ রইস। ফিল্মটার ট্রেইলার বের হয়েছে, অনেকেই দেখে ফেলেছেন ইতোমধ্যে।

এই ফিল্ম হচ্ছে শাহরুখের “ব্রেক ইভেন পয়েন্ট”।

(৪)

আমার ধারণা ঠিকঠাক হলে, রইস একটা চমৎকার মশলাদার একশন ছবি হতে যাচ্ছে।

সম্ভাবনা আছে যে, এই ছবির গল্পটাও খুব ভালো হবে। সে যাই হোক, ট্রেইলার দেখে যতোটুকু বোঝা গেলো, গুজরাতের একজন মুসলিম ব্যবসায়ীর অবৈধ ব্যবসা নিয়ে গল্পের প্লট বানানো হয়েছে।

এখানে শাহরুখ স্টাইলিশ দাড়িওয়ালা হয়ে স্ক্রিনে আসবেন প্রথমবার। মেকাপ, সাজগোজ দিয়ে যা বোঝা যাচ্ছে, এটাই তার ট্রাঞ্জিশন ফিল্ম। এই ফিল্ম তার ভবিষ্যতে বয়স্ক রোলগুলো করার একটা সম্ভাবনার চিহ্ন হয়ে থাকবে।

ফিল্মে ভালো ডায়লগ আছে। উদাহরণঃ “গুজরাতের হাওয়াতে ব্যবসা আছে, সাহেব। আমাকে হয়তো তুমি মেরে ফেলবে, কিন্তু এই হাওয়াকে কীভাবে আটকাবে ?”

– এই ডায়লগ কঠিন বাস্তবসম্মত ডায়লগ। গুজরাত, রাজস্থান, পাঞ্জাব – এগুলো ইন্ডিয়ার বেসিক ব্যবসায়ী এলাকা। বিশেষ করে গুজরাত। এদের চেয়ে ব্যবসা কেউই ভালো বোঝে না।

ফিল্মের মিউজিকও ভালো। বিশেষ করে কল্যাণজী-আনন্দজী’র কম্পোজ করা বিখ্যাত গান “লায়লা ম্যায় লায়লা” রিমিক্সের সাথে সানি লিওনের নাচ তো খুবই চমৎকার লাগলো। সানি লিওনকে সম্ভবত এই প্রথমবার মাংসের টুকরা হিসাবে উপস্থাপন না করে প্রকৃত একজন ডান্সার হিসাবে কোনো ফিল্মে দেখানো হলো।

সাথে বলিউডের মার্কা মারা “মুসলিম গ্যাংস্টার” গেটাপে শাহরুখকে দেখা যাবে। পাঠানদের মতো আফগানি কামিজ-সালোয়ার, গলায় তাবিজ, চোখে সুরমা-চশমা, ঊর্দু-হিন্দি মিশিয়ে কথা বলা – সব মিলিয়ে দুর্দান্ত লাগছে শাহরুখকে।

বলিউড মুসলমানদের দীর্ঘদিন ধরে এইরকম জেনারালাইজড সাজে উপস্থাপন করে আসছে, যদিও ইন্ডিয়ার মুসলমানদের এক পার্সেন্টও এরকম সাজ-পোশাকে ঘোরাফেরা করে না। তারপরেও, মুসলমানদের আলাদাভাবে চিহ্নিত করার জন্য এই গেটাপই সম্ভবত বলিউডের একমাত্র হাতিয়ার।

ছবি যাই হোক, ফিল্মটা দেখা দরকার একটাই কারণেঃ এই ফিল্ম শাহরুখের ইমেজ পরিবর্তনে বিশাল ভূমিকা রাখবে বলে আমার ধারণা। তাই এই পরিবর্তনের স্বাক্ষী থাকার জন্য হলেও “রইস” ফিল্মটা দেখা দরকার। যদি “রইস” হিট করে, বোঝা যাবে শাহরুখের ব্যবসায়িক স্ট্র্যাটেজিও হিট করেছে। আমার ফিল্ম সম্পর্কিত ধারণা যদ্দুর যায়, “রইস” একটা শিওর শট হিট ফিল্ম হতে যাচ্ছে।

পরিশিষ্টঃ

“ডার্টি পিকচার” ছবিতে বলা হয়েছিলো, ফিল্ম নাকি শুধু তিনটা জিনিসের জন্য চলে। এন্টারটেইনমেন্ট, এন্টারটেইনমেন্ট আর এন্টারটেইনমেন্ট। – কথাটা ভুল।

জায়গাটা যখন বলিউড, আর উদ্দেশ্যটা যখন ব্যবসা, তখন ফিল্ম একটাই জিনিসের কারণে চলে।

সেটা হচ্ছে- শাহরুখ খান, শাহরুখ খান এবং শাহরুখ খান।

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-