পেশায় তিনি একজন ভ্যানচালক। টাকাপয়সা বা জমিজমা তেমন কিছুই নেই। নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। কিন্ত আর দশটা মানুষের চেয়ে শহিদুল ইসলাম লোকটা আলাদা, অনেকখানি আলাদা। আকাশের সমান বড় একটা হৃদয় আছে তার, যেটা সবার নেই। এই মানুষটা নিজের দারিদ্র্যতাকে একপাশে রেখে হাসি ফুটিয়ে চলেছেন নিজের এলাকার হাজারো মানুষের মুখে, অনেক বছর ধরেই এলাকার দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ালেখার খরচ যোগাচ্ছেন এই মহামানব।

যশোরের সদর উপজেলার কৃষ্ণবাটি গ্রামে থাকেন শহিদুল ইসলাম। খুব ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছিলেন তিনি। দারিদ্র্যের কষাঘাতে পড়ালেখা বেশীদূর করতে পারেননি, কাজে নেমে যেতে হয়েছিল খুব অল্প বয়সে। ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়তে পেরেছিলেন। কিন্ত পড়ালেখা করতে না পারার অতৃপ্তিটা ভুলতে পারেননি তিনি। আর তাইতো নিজের যৎসামান্য আয়ের একটা বড় অংশ হাতে নিয়ে নেমে গেছেন গরীব ছাত্র-ছাত্রীদের সাহায্য করতে।

শহিদুলের মা ফুলজান বিবি মানুষের বাড়িতে কাজ করে ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করিয়েছিলেন। কিন্ত খরচ চালিয়ে যেতে পারেননি। সংসারে তখন ভীষণ অভাব, দু’বেলা খাবারটাও জোটে না। চতুর্থ শ্রেণী থেকে প্রথম স্থান অধিকার করে পঞ্চম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন শহিদুল। কিন্ত এরপরে আর স্কুলে যেতে পারেননি তিনি বইখাতা নিয়ে। স্বপ্নগুলোকে মাটিচাপা দিয়ে লেগে যেতে হয়েছিল কাজে। ছোটবেলা থেকেই শহিদুল মুদি দোকানে কাজ করেছেন, জমিতে চাষবাস করেছেন। এখন তিনি রিক্সা-ভ্যান চালান। কোনদিন রিক্সা নিয়ে চুক্তিতে ভাড়া খাটেন, কখনও ভ্যানে করে প্লাস্টিকের তৈরি জিনিসপত্র নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় বিক্রি করেন।

মা’কে অনেক আগেই বলে রেখেছিলেন শহিদুল- “আমি তো লেখাপড়া করতে পারি নাই, আমার মতো কাউকে যদি আমি পাই, যারা টাকার অভাবে পড়ালেখা করতে পারছে না, তাদেরকে টাকাপয়সা দিয়ে একটু সাহায্য করতে চাই মা।” মা তার এই কথায় আপত্তি করেননি একটুও। আপত্তি করেননি শহিদুলের সহধর্মিনী বিউটিও। তিনি বলেন- আমার মানুষটা পড়ালেখা করতে পারেননি, এজন্যে যারা লেখাপড়া করে তাদের জন্যে উনার এত টান। আমাদের সংসারে অভাব তো আছে, কিন্ত আমরা এটাতে কিছু মনে করি না।

শহিদুল, রিক্সাচালক, নিরক্ষরতা দূরীকরণ

পরিবারের সদস্যদের সায় পেয়ে পুরোদমে কাজে নেমে পড়েছিলেন শহিদুল। সারাদিনে তার আয় হয় ৩০০-৪০০ টাকা। সেখান থেকে অল্প কিছু টাকা আলাদা করে রাখেন পরিবারের খরচের জন্য। তার নিজের মেয়েটাও পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ছে এখন। টাকা নিয়ে তিনি ছুটে যান শহরের সরকারী স্কুল কিংবা এতিমখানাগুলোতে। যশোরের প্রায় দুইশো বা তারও বেশি দরিদ্র্য ছাত্র-ছাত্রীর পড়ালেখার খরচ একাই চালান শহিদুল। তাদেরকে তিনি বই কিনে দেন নিজের টাকায়, এমনকি তাদের অনেকের স্কুলের ড্রেসও কেনা হয় তার দেয়া অর্থে। অথচ শহিদুল নিজে রংচটা ছেঁড়া জামাকাপড় পরে প্রতিদিন রিক্সা-ভ্যান নিয়ে বের হন। এতে শহিদুলের কোন আপত্তি নেই, বরং মানুষের উপকারে আসতে পেরে ভীষণ একটা ভালোলাগা কাজ করে তার মধ্যে।

শহর আর উপজেলাগুলোর বিভিন্ন স্কুলে স্কুলে গিয়ে গরীব ছাত্র-ছাত্রীদের তালিকা তৈরি করেন শহিদুল নিজেই। দশ বছর ধরে শহিদুল লেগে আছেন মহতি এই কাজের সঙ্গে, প্রায় দুই হাজার ছেলেমেয়েকে তিনি জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত করেছেন তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়। স্কুলের শিক্ষকেরাও তাকে ভীষণ ভালোবাসেন, নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে খোঁজ নেন, কারো কোন সমস্যা থাকলে শহিদুলকে জানান তারা।

যশোরের বাদশাহ ফয়সাল ইনস্টিটিউট থেকে এসএসসি পাশ করা হোসেন আলীর পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যাবার জোগাড় হয়েছিল অর্থাভাবে। তার বাবা ইন্তাজ আলী কাজ করতেন একটা হোটেলে। যা বেতন পেতেন, সেটা দিয়ে সংসারই চলতো না, ছেলেমেয়ের লেখাপড়া তো সেখানে বিলাসিতা! হুট করেই একদিন ফেরেশতার মতো করে শহিদুল হাজির হলেন বাদশাহ ফয়সাল ইন্সটিটিউটে, কাপড়ের একটা ব্যাগে এক রিম সাদা কাগজ আর বিশটা কলম। হোসেনকে খুঁজে বের করে বললেন-  ‘আমি চার-পাঁচ মাসের খাতা-কলম দিয়ে গেলাম। এরপর এসে বছরের খাতা-কলম দিয়ে যাব। তুমি লেখাপড়া চালিয়ে যাও। আমি তোমার পাশে আছি।’

যশোর কমার্শিয়াল কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্রী নার্গিস খাতুন। বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই মেয়েটার, থাকে একটা এতিমখানায়। তার লেখাপড়ার খরচ কে দেবে? শহিদুল নার্গিসের খোঁজ পেয়ে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। বলেছেন, “তোমার সব খাতা-কলম, পড়ার খরচ আমি দেব। তুমি শুধু পড়ালেখাটা চালিয়ে যাও।” যশোরের নিউ টাউনের আসাদুজ্জামান, বাবা হারানো এই ছেলেটার মা অন্য একজনকে বিয়ে করেছেন, সেই সংসারে জায়গা হয়নি আসাদের। ফুপুর বাড়িতে থাকে সে। দু’বেলা দু’মুঠো খাবার জোটে, এটাই তো বেশি। আসাদও বাদশাহ ফয়সাল ইনস্টিটিউটের ছাত্র। শহিদুল এসে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, তাকে কিছু টাকা আর বই-খাতা কিনে দিয়ে গেছেন।

শহিদুল, রিক্সাচালক, নিরক্ষরতা দূরীকরণ

বিপ্লব-নাজমা-সোহেল-মুকুল-লাবনী, এরকম আরও হাজারো ছেলেমেয়ে আছে যশোরে, যারা শহিদুলের সাহায্য নিয়ে পড়ালেখা করছে, কারো পড়ালেখা হয়তো শেষ হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই। কেউবা এখন ছোটখাটো চাকুরিও করছে। শহিদুলের ঋণ ওরা কোনদিন শোধ করতে পারবে না। ওরা ভীষণ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে শহিদুলের অবদান। হসেন আলীর বাবা ইন্তাজ আলী যেমন বলছিলেন- “শহিদুলকে দেখে নিজেকে মানুষ মনে হয় না। মনে হয়, আমি জন্তু। শহিদুলই প্রকৃত মানুষ।”

শহিদুল অবশ্য হেসে উড়িয়ে দেন এসব প্রশংসা। তার ইচ্ছা পুরো এলাকাটাকে নিরক্ষরতার অন্ধকার থেকে মুক্ত করা। সেই লক্ষ্যেই খুব ভোরে ভ্যান নিয়ে বেরিয়ে যান তিনি। সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেন, সময় বের করে ছুটে যান স্কুলগুলোতে, কারো জন্যে বইখাতা নিয়ে কারো হাতে তুলে দেন নগদ টাকা। টাকাপয়সার অভাবে শহিদুল পড়ালেখা করতে পারেননি, তার মতো দুর্ভচাগ্য যেন আর কাউকে বরণ করে নিতে না হয়, নিজের ক্ষুদ্র সামর্থ্যে সেই চেষ্টাই নিরন্তর করে চলেছেন শহিদুল।

চারদিকে খুন আর ধর্ষণের খবরের মাঝে হঠাৎ করে যখন শহিদুলের খবরগুলো চোখে পড়ে, মনটা অদ্ভুত এক ভালোলাগায় আক্রান্ত হয়। সবাই রোগা, কালো আর শতচ্ছিন্ন জামা পরিহিত একজন দরিদ্র ভ্যানচালক শহিদুলকে দেখে, আর আমি তার মধ্যে দেখতে পাই একজন দেবদূতকে, যার শরীর থেকে অদ্ভুত একটা আলোকরশ্মি ছিটকে বেরুচ্ছে; সেই আলোর দ্যুতিতে ম্লান হয়ে যাচ্ছে নিরক্ষরতার অন্ধকার! এই দেশটাতে আরও হাজার হাজার শহিদুলকে দরকার, ভীষণ দরকার।

তথ্যসূত্র কৃতজ্ঞতা- কালের কণ্ঠ

Comments
Spread the love