আচ্ছা, একাত্তরের জুনের শুরুতে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল (পরে শেরাটন, বর্তমানে রুপসী বাংলা)-এ ক্র্যাক প্লাটুনের দুর্ধষ গেরিলাদের গ্রেনেড নিয়ে হামলা করার পর পুরোপুরি সতর্ক ও আরো দুর্ভেদ্য হয়ে ওঠা হোটেল ইন্টারকনে আবার হামলা চালানোর অচিন্তনীয় দুঃসাহস কার হতে পারে? এমনিতেই হোটেল ইন্টারকন ছিল পাকিস্তানীদের সবচেয়ে দুর্ভেদ্য দুর্গ, সেখানে একবার হামলার পরে স্বাভাবিকভাবেই আর কড়া প্রহরা আর পাহারার ভেতর আবারো টাইম বোমা নিয়ে ঢুকে পড়ার জন্য বিশাল কলিজার দরকার। কে ছিল সেই অমিত সাহসী যোদ্ধা?

মাত্র ১৮ বছর বয়সী সেই দুর্ধষ বঙ্গশার্দুলের নাম ছিল আবু বকর। অবিশ্বাস্য সাহসে যে টাইম বোমা নিয়ে ঢুকে পড়েছিল হোটেল ইন্টারকনে আগস্টের ১১ তারিখে। আজ তার জন্মদিন।

২৯শে আগস্ট রাজাকার আলবদর বাহিনীর তথ্যে পাকিস্তানী সেনাদের ধরা পড়া ক্র্যাক প্লাটুনের দুর্ধষ বঙ্গশার্দুলদের মধ্যে একমাত্র শহীদ আবু বকরের গল্পটাই আমরা মোটামুটি কিছুই জানি না। বকর সম্পর্কে জানার জন্যই ক্লাব অবসকিওরের পক্ষ থেকে ২০১৫ সালে রাশেদ রনি যোগাযোগ করেন শহীদ বকরের বড় ভাই- মোহাম্মদ আবু মোজাফ্ফর, ছোট দুই ভাই মোহাম্মদ আবু হায়দার এবং মোহাম্মদ আবু আবরারের সাথে। সেখানে উঠে আসা শহীদ বকরের জীবনের নানা ঘটনা এবং তার একাত্তরের বীরত্বগাঁথা নীচে তুলে ধরা হলো-

শহীদ আবু বকরের বাবা আবু জাফর এবং মা আনোয়ারা খাতুন ছিলেন পশ্চিম বঙ্গের মুর্শিদাবাদের বাসিন্দা। বাবা পেশায় সরকারী চাকুরীজীবি ছিলেন, রেলওয়ে-তে ফাইন্যান্স অফিসার; চাকুরীর সুবাদে তিনি মূর্শিবাদ ছেড়ে বৃহত্তর রংপুর জেলায় সৈয়দপুর উপজেলায় চলেন আসেন (বর্তমানে সৈয়দপুর নীলফামারি জেলার অন্তর্ভূক্ত), সেখানেই জায়গা-জমি কিনে স্থায়ী হওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করে । শহীদ বকর বাবা-মায়ের পঞ্চম সন্তান । সাত ভাই তিন বোনের মধ্যে বড় ভাই মোহাম্মদ আবু মোজাফ্ফর এর জন্মই কেবল মূর্শিদাবাদে, বাকিদের জন্ম কারো সৈয়দপুরে, কারো চট্টগ্রামে (বাবা আবু জাফর চাকুরির সুবাদে ১৯৫৮ সালে কয়েক বছরের জন্যে চট্টগ্রামেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন, পরবর্তীতে তিনি আবার পোস্টিং নিয়ে সৈয়দপুর ফিরে যান) ।

শহীদ বকর জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫৩ সালের ৫ই মে, সৈয়দপুরে ।

(শহীদ বকর এর জন্মতারিখ ও জন্মস্থান – এই দুটি তথ্য এতদিন পর্যন্ত অজানাই ছিলো, সম্প্রতি নেয়া সাক্ষাতকারে এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসে, উইকিপিডিয়াতে শহীদ বকর এর জন্ম ঢাকার গুলশানে লেখা আছে, তথ্যটি ভুল।)

১৯৬৯ সালে বাবা আবু জাফর সৈয়দপুরে বাড়ি-জায়গা-জমি বিক্রি করে ঢাকায় চলে আসার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন । এই চলে আসার সিদ্ধান্তের পেছনে মূল ভূমিকা ছিলো বকরের মা – আনোয়ারা খাতুনের, তিনিই আবু জাফর সাহেবকে ছেলে-মেয়েদের ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করানোর জন্যে ঢাকায় স্থায়ী হওয়ার বিষয়টি বুঝিয়ে রাজী করান। বকরের মামারা আগে থেকেই ঢাকায় স্থায়ী হয়েছিলো, তাদের সহযোগিতায় আবু জাফর সাহেব সৈয়দপুরে বাড়ি-জমি বিক্রিকৃত অর্থ দিয়ে ঢাকার গুলশান-২ এর ৯৬ নম্বর সড়কের ৩ নম্বর প্লটটি কিনতে সমর্থ হোন, এবং তিনি তিন রুম বিশিষ্ট একটি একতলা বাড়ি নির্মাণ করে স্থায়ী হোন।

মেধাবী ছাত্র হিসেবে বকরের বেশ সুনাম ছিলো। শহীদ বকর সৈয়দপুর হাই স্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করেন। একাত্তরে তৎকালীন কায়েদ-ই-আযম (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী কলেজ) কলেজ থেকে ইন্টার পাশ করে বিএসসিতে ভর্তি হন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অফিসার্স কোর্সে যোগদানের অপেক্ষাতেও ছিলেন ।

শহীদ বকরের কয়েকটি গুণ ভীষণ প্রখর ছিলো– খুব মিশুক প্রকৃতির কারণে মানুষের সাথে খুব সহজেই সম্পর্ক স্থাপন করতে পারতেন, অন্যকে কনভিন্স করার ক্ষমতা আর সেন্স অব হিউমার ছিলো দূর্দান্ত । ছোটদের সাথে দুষ্টামি স্বার্থে লেগপুলিংটাও খুব আগ্রহ নিয়ে করতো বকর। এছাড়ার অন্য একটি বিশেষ গুণ ছিলো তাঁর- কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই মনোমুদ্ধকর বাঁশী বাজাতে পারতো, কোন গান শুনে ক্ষণিকেই তা বাঁশিতে তুলে ফেলার অপূর্ব গুণটির কথা ছোট ভাই হায়দার বেশ গর্ব করে বলে যান ।

২৫শে মার্চের কালরাত্রিতে পাকিস্থানী মিলিটারি কর্তৃক নিরীহ বাঙালীর উপর সংগঠিত ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম গণহত্যার ঘটনার পর সবকিছু পাল্টে যায় । ২৫শে মার্চের গণহত্যার পর বকর তার এক বন্ধুকে সাথে নিয়ে দেখে এসেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার হত্যা আর ধ্বংসযজ্ঞের নির্মম নির্দশণ । সেই থেকে ১৮ বছর বয়সী বকর ভেতরে ভেতরে পুড়ছিলো, একটি কথাই তাঁর মন থেকে উঠে আসছিলো – এভাবে বেঁচে থাকা যায় না ।

মে মাসের শেষ দিকে বকর মনোস্থির করে যে- সে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে । বকর, বকরের পরেই যে ভাইটি ছোট- মোহাম্মদ আবু হায়দার ও কর্ণেল রেজার ছেলে তালাহ রেজা – এই তিন জন সিদ্ধান্ত নেয় তারা প্রশিক্ষণ তিনি আঁগরতলা হয়ে ভারতে চলে যাবেন । মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেবার জন্যে দুই পিঠাপিঠি ভাই মায়ের অনুমতি চাইতে গেলে অনেক বোঝানোর পর অনুমতি মেলে শুধু বকরের, ছোট ভাই হায়দারকে থেকে যেতে হয় । হায়দারকে ছেড়ে যাওয়ার যথেষ্ট কারণ ছিলো, বকরের বড় ভাই ডাক্তারি পেশায় তখন সৌদি-আরবে কর্মরত, মেজভাই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে এপ্রিলের শেষ দিকেই ভারত চলে যায়, (পরবর্তীতে জানা যায়- মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নেবার জন্যে সীমান্ত পাড়ি দিলেও, সীমান্তবর্তী ক্যাম্পে সেইসময় অনেকেই চলে এসেছিলো, সবাইকে রিক্রুট করার মতো সামর্থ্য তখন ছিলো না, বকরের মেজভাইকে তাই নিরাশ হতে হয়, অতঃপর তিনি “জয় বাংলা” পাসপোর্ট নিয়ে মুর্শিদাবাদে খালাদের কাছে চলে যায়, যুদ্ধকালীন পুরো সময় সেখানেই থাকে)। সঙ্গত কারণেই বড় দুই ভাইয়ের অনুপস্থিতি কারণ এবং বয়স্ক বাবা-মা, বড় দুই বোন সহ ছোট ভাইবোনদের দেখাশোনার দায়িত্বটা বকর চলে গেলে হায়দারের উপরেই পড়ে । বকর ও তালাহ রেজা মেলাঘরের প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে বের হলেও পথিমধ্যে দুজন বিছিন্ন হয়ে যায় । বকর মেলাঘর থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে জুলাইয়ের শুরুতে ঢাকায় ফেরে ।

ক্র্যাকপ্লাটুন, শহীদ আবু বকর, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭১

ছোট ভাই হায়দার সেই ফিরে আসার দিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলছিলেন–

মাসখানেক পর হঠাৎ একদিন দেখি বাড়ীর পেছনের দিকের দেয়াল টপকে ১৫-১৬ বছরের গ্রামের একটি ছেলেকে নিয়ে বকর ভাই আসলেন । এসেই মাকে বললেন- ক্ষিদা লাগছে, গোসল করি- ভাত খেতে দাও । খেয়ে দেয়ে টুয়েন্টি ফোর আওয়ার্স ওঁরা টানা ঘুমিয়েছিলো । সেইবার সাথে নিয়ে আসে স্ট্যানগান আর গ্রেনেড। যাত্রাবাড়ী উলানের ৩২কেভি লাইন উড়িয়ে দিয়ে এসেছিলো ওঁরা, উলান হাইএক্সটেনশন লাইন উড়াতে গিয়ে ওরা দেখে যে এন্টিপার্সোনাল মাইন টাওয়ারে নিচে পোঁতা থাকতো, সেগুলো ডিফিউজ করে ৩০-৩২ তুলে নিয়ে এসেছিলো নৌকার পাটাতনে, এলএমজি, রকেট লান্সার, ডেটোনেটরসহ অনেক কিছু ছিলো । পরে যাত্রাবাড়ী থেকে ওগুলো নৌকায় করে নিয়ে আসা হয় গুলশান লেকে, গুলশান থেকে বড় বস্তায় ভরে সাইকেলে করে বাসায় এনে মাটি পুতে রাখা হয়েছিলো ।

মেলাঘর থেকে প্রশিক্ষণ শেষে অপারেশনের জন্য ঢাকায় এলে বকর বেশির ভাগ সময় নিজ বাড়ীতেই থাকতো, আর তাঁর সার্বক্ষণিক সঙ্গী হিসেবে আশেপাশে থাকতো ছোট দুই ভাই- হায়দার আর আবরার । বকর ভাইদের কাছে বিভিন্ন অপারেশনের ঘটনা খুলে বলতো । যেমন- কুমিল্লার গোমতী নদীর উপর আর্মিরা গানবোর্ডে চড়ে পেট্টোলিং করতো, রাতের বেলায় কুচুরী পানার আড়ালে ভেসে থেকে এসএলআর এর মাথায় রকেট লান্সার লাগিয়ে গানবোর্ডগুলোর উপর চড়াও হওয়ার কয়েকটি ঘটনা ঘটেছিলো । এই অপারেশনগুলো করা হতো মূলত পেট্রোলিংরত আর্মিদের অস্ত্র-টাকা পয়সা লুট করার জন্যে ।

তবে বকর ভাইয়ের কাছ থেকে শোনা আর একটি ঘটনার কথা মনে পড়তেই এতবছর পরও ভাই হায়দারের চোখ ছলছল করে উঠে । ঘটনাটি মুগদাপাড়ার। বকর হঠাৎ জানতে পারে যে- ওখানকার স্থানীয় এক রাজাকার সাধারণ মানুষের উপর অকথ্য নির্যাতন চালাচ্ছে আর লুটপাট করে বেড়াচ্ছে। এই খবর জানার পরই দুএকজনকে সাথে নিয়ে বকর চলে যায় মুগদাপাড়ায়, এক সন্ধ্যায় চাদরের ভেতরে স্টেনগান পেঁচিয়ে একটি ব্রীজের পাশে অপেক্ষায় থাকে বকর, অন্য সঙ্গীরা ব্যাকআপ হিসেবে কিছু দূরে। হাটফেরত সেই রাজাকার ব্রিজের কাছে চলে আসলেই বকর বেরিয়ে এসে চাদরের আড়াল বের করে আনে স্টেনগান, কিছু বুঝে ওঠার আগে স্টেনগানের গুলিতে ঝাজরা হয়ে যায় পাকিস্থানী দালাল রাজাকারটা।

এই লেখার লেখক, অ্যাডিশনাল এসপি মাসরুফ হোসেন এবং অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা তারিক লিংকনের সৌভাগ্য হয়েছিল ক্র্যাক প্লাটুনের দুর্ধষ গেরিলা ফতেহ আলী চৌধুরীর সাক্ষাৎকার নেবার। একাত্তরের অনন্যসাধারণ সেই উপাখ্যান বলার সময় ফতেহ ভাই বারবার বলছিলেন তার অসম্ভব প্রিয় গেরিলা আবু বকরের কথা। সেই স্মৃতির অনুলিখন করেছেন মাসরুফ হোসেন-

”বিপদ এড়ানোর সব রকমের সুযোগ থাকার পরেও সব ছেড়েছুড়ে ও চলে আসল যুদ্ধে- দেশমাতার ঋণ শোধ করার শপথ নিয়ে। ওর একেবারেই নিষ্পাপ চেহারা আর অল্প বয়েস খুব কাজে লাগত গেরিলাদের। ট্রেনিং থেকে শুরু করে পুরোটা সময় ফতেহ চৌধুরীর ভক্ত হয়ে গিয়েছিলো ও, উনি যেখানেই যেতেন ও তার সংগে সংগে ছায়ার মত সে ও লেগে থাকত। প্রথম প্রথম সরাসরি যুদ্ধে ওকে যেতে দেয়া হত না, কিন্তু একই রকমের গুরুত্বপূর্ণ এবং বিপজ্জনক কিছু কাজে ও ছিলো আলটিমেট চয়েস।

এরকম একটা কাজ ছিলো হেড অফ ইন্টার সার্ভিস ইন্টেলিজেন্স(আইএসআই), পূর্ব পাকিস্তান- গ্রুপ ক্যাপ্টেন ইসলামকে পরিবারসহ ভারতে পৌঁছে দেয়া। এই অফিসার পাক ইন্টেলিজেন্সের অন্যতম সিনিয়র অফিসার হলেও হলেও বাংগালী বিধায় পাকিরা তাকে বিশ্বাস করতো না, কঠোর নজরদারীতে রাখতো। এই ভদ্রলোক পরিবারসহ একটা বিয়ে খেতে এসে সেখান থেকে ক্র্যাক প্লাটুনের এক জ্যেষ্ঠ মেম্বারের সহায়তায় পালিয়ে এসে বাসাবোতে একটা সেইফ হাউজে উঠলেন। সেখানে তাঁর সাথে যোগাযোগ হয় বকরের, ফতেহ আর বকরের দায়িত্ব পড়ে তাঁকে ভারতে পৌঁছে দেবার।

এদিকে গ্রুপ ক্যাপ্টেন ইসলাম(পরবর্তীতে বাংলাদেশ এয়ার ফোর্সের এয়ার ভাইস মার্শাল ) নিখোঁজ হবার পর পাগলা কুকুর হয়ে ওঠে পাকিস্তানিরা, হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকে তাঁকে। কারণটা স্বাভাবিক, যিনি ইন্টেলিজেন্সের এত সিনিয়র অফিসার, তাঁর কাছে ওরা নতুন তথ্য না দিলেও ইতোমধ্যে দেয়া বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তো ছিলই- সেগুলোও যুদ্ধে মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে সক্ষম হত। আমাদের দুই “ক্র্যাক” (তারছেঁড়া অর্থে) সদস্য, যাদের বয়স যথাক্রমে ১৮ এবং ২২, সিদ্ধান্ত নিলো এরকম বিপজ্জনক একজন সংগীকে তার পরিবারসহ নিয়ে যাবে ঢাকার বুক থেকে সোজা ভারতে, সব রকমের বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে।

পাঠক, কল্পনা করুন তো, যেখানে যুদ্ধ হচ্ছে সেখানের ইন্টেলিজেন্স ডিপার্টমেন্টের কর্নেল র‍্যাংকের একজন আপনাদের পক্ষে কাজ করার জন্যে পালিয়ে এসেছেন , আর আপনার দায়িত্ব হচ্ছে তাঁকে তাঁর স্ত্রী আর শিশুপুত্রসহ বর্ডার পার করে দেশের বাইরের ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া। স্বয়ং মাসুদ রানাও রীতিমত গর্ববোধ করতো এরকম একটা মিশন সাকসেসফুল করতে- এটা বুঝতে রকেট সায়েন্টিস্ট হবার প্রয়োজন পড়ে না। আমাদের সুপারহিরো ফতেহ আলী চৌধুরী আর তাঁর সংগী বাকের এই কাজটা করেছিলো,পরিবারসহ এভিএম ইসলাম সাহেবকে নিয়ে গিয়েছিলো ভারতের সোনামূড়াতে, যেখানে মুক্তিবাহিনীর একটি মেডিকেল ইউনিট অবস্থিত। খবর পেয়ে ক্যাপ্টেন (ডাক্তার) আখতার এলেন, তিনি খবর দিলেন মেজর খালেদ মোশাররফকে। মেজর খালেদ মোশাররফ ফোনে কি কি জানি ইন্সট্রাকশন দিলেন- পুরো এলাকা গরম হয়ে উঠল। কিছুক্ষণের ভেতরেই ভারতের ব্রিগেডিয়ার সাবেক সিং এলেন, সংগে ডজনখানেক উচ্চপদস্থ অফিসার।

প্রথমে তাঁরা কেউ বিশ্বাস করতে পারেননি এরকম একটা কান্ড ১৮ আর ২২ বছর বয়েসি দুটো বাচ্চা ছেলে ঘটাতে পারে, এত এত চেকপোস্ট ফাঁকি দিয়ে এরকম হাই প্রোফাইল কাউকে বর্ডার পার করে দিতে পারে। ব্যাপারটা এতটাই অবিশ্বাস্য ছিলো যে ফতেহ আর বকরকে আলাদা আলাদা করে জেরা করা হল, নেয়া হল আলাদা আলাদা লিখিত স্টেটমেন্ট। যাচাই বাছাই শেষে সত্যতা প্রমাণের পর ভারতীয় অফিসাররা এভিএম ইসলাম সাহেবের নিরাপত্তার খাতিরে তাঁকে নিয়ে রাখলেন রেড ফোর্টে, সেখান থেকে পাকিস্তানের যাবতীয় ইন্টেলিজেন্স সংগ্রহ করল মিত্রবাহিনী।। ডেপুটি স্পীকার শওকত আলী তখন আশেপাশেই ছিলেন, তিনি ফতেহকে ডেকে বললেন- “ফতে, তুই এইটা কি করছোস! দিলি তো ব্যাটা পাকিস্তান আর্মির বারোটা বাজায়ে!!এই অসম্ভব কাজ তুই কেমনে করলি?”

এই ৪৩ বছর পরে অতি সাধারণ বঙ্গসন্তানের কাছে আমারও একই প্রশ্ন- “আংকেল, এই অসম্ভব কাজ কিভাবে করলেন?”

উত্তর পাননি শওকত আলী, উত্তর পাইনি আমিও, তবে ফতেহ আংকেলের মৃদু হাসির শব্দ কিছু না বলেও অনেক কিছু বলে ফেলেছিলেন। একাত্তর আসলে ছিল এক রূপকথার সময়, আর সেই রূপকথার জিয়নকাঠির ছোঁয়াতে ফতেহ আলীরা হয়ে উঠেছিল একেকজন মৃত্যুঞ্জয়ী রাজকুমার, তলোয়ার হাতে পংখীরাজ ঘোড়ায় যারা সংহার করেছিল বাংলার নরম মাটিতে থাবা বসানো পিশাচ আর দানবের দলকে।

যতই বীরত্ব দেখাক না কেন, বাস্তব জীবন তো আর হলিউড মুভি না- ভয় সবারই লাগে। এরকম দুর্বল মুহূর্তে বকর সব সময় ফতেহ চৌধুরীর কাছে সাহস নিতে চেষ্টা করত। ফতেহ অভয় দিয়ে বলতেন, চিন্তা করিস না বকর, আমি থাকতে কোন কিছু তোকে ছুঁতেও পারবে না। ২৯ আগস্টের অল্প কিছুদিন আগে বড় একটা অস্ত্রের চালান নিয়ে বেংগল রেজিমেন্টের কিছু লোকদের সাথে করে ত্রিমোহনীতে আসে বকর আর ফতেহ, গুরু আর শিষ্য। দুজন কি কারণে আলাদা হয়ে গিয়েছিলো সেদিন, বকর আগেই গিয়েছিলো ফকিরবাড়ি নামের একটা জায়গায়, অস্ত্রশস্ত্র লুকিয়ে রাখতে। হায়, এই বিচ্ছেদই হলো কাল, ক্র্যাক প্লাটুনের বাকি সদস্যদের মত বকরও ধরা পড়ল ২৯ আগস্টে। “মাসরুফ, কথা দিয়েছিলাম আমি জীবিত থাকতে আমার সাথে থাকলে ওর কিচ্ছু হবে না। কিন্তু আমার বকর মারা গেল সেই একাত্তরে, কই এই ৪৩ বছর ধরে আমি তো দিব্যি বেঁচে আছি। বকর, ভাই আমার, তোকে বাঁচাতে পারলাম না…।”

ফতেহ আলী চৌধুরীর গলা ভেঙ্গে আসে হাহাকারে। আর স্তব্ধ আমরা ভাবতে বসি, কী অতুলনীয় সাহস আর দেশের প্রতি নিঃশর্ত প্রচন্ড ভালোবাসা থাকলে ঠিক এইভাবে মৃত্যুকে নিয়ে খেলা যায়, নিশ্চিত মৃত্যু জেনেই ঝাঁপিয়ে পড়া যায় পরম আগ্রহে আর উৎসাহে। বকর জানতো হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে পাকিস্তানীদের কাঁপিয়ে দেওয়া অপারেশনের পর সে ধরা পড়তে পারে যেকোন সময়। পাকিস্তানী হয়ে উঠবে পাগলা কুকুর। হয়েছিলও তাই। ২৯ আগস্ট দিবাগত রাত ৩ টার দিকে শহীদ আবু বকর বীরবিক্রমকে তাঁর বাড়ি থেকে পাকি বাহিনী আটক করে। পরে টর্চার সেলে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে তাঁকে হত্যা করে। রুমী-বদি-আজাদ-জুয়েল-আলতাফ মাহমুদের মত বকরের লাশটাও আর কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। মুক্তিযুদ্ধে সাহস ও বীরত্বের জন্য শহীদ মো. আবু বকরকে মরণোত্তর বীর বিক্রম খেতাবে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৩ সালের গেজেট অনুযায়ী তাঁর বীরত্বভূষণ নম্বর ১৫০।

প্রাণপ্রিয় জীবনটা যারা হাসতে হাসতে বিলিয়ে দিয়েছিল একটা স্বাধীন দেশের জন্য, আমাদের জন্য, মায়ের ডাকে সাড়া দিয়ে, সেই অগুনতি শহীদ বীরদের একজন শহীদ আবু বকর বীর বিক্রমের আজ জন্মদিন ছিল। বাংলাদেশ তাকে মনে রাখেনি, তার স্মরণে দু ফোঁটা চোখের পানিও ফেলেনি কেউ!

তবু হে বিজয়ী বীর মুক্তিসেনা তোমাদের এই ঋণ কোন দিন শোধ হবে না

শুভ জন্মদিন বকর! শুভ জন্মদিন হে বীর!

শহীদ বকরের ছবি কোথাও পাওয়া যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক- অমি রহমান পিয়াল ভাইয়ের কাছে অনুরোধ করলে তার ব্যক্তিগত আর্কাইভ ঘেটে খুঁজে দেন শহীদ বকরের একটি ছবি । প্রাপ্ত ছবিটি ছিলো সাদাকালো, অনেক দিনের পুরোনো বিধায় কিছু জীর্ণ, ক্লাব অবসকিওরের প্রিয় শাওন আপার (Shawan Mahmud) অনুরোধে সেই ছবিটি থেকে এই রঙিন প্রোটেইটটা করে দিয়েছেন আমাদের খুবই পরিচিত ও প্রতিভাবান চিত্রশিল্পী Asim Chandro Roy

Comments
Spread the love