ইনসাইড বাংলাদেশমনের অন্দরমহলরক্তাক্ত একাত্তর

গণজাগরণের এক ক্ষুদ্র স্ফুলিঙ্গের গল্প!

আজ ৫ই ফেব্রুয়ারি! ঠিক ৫ বছর আগে আজকের দিনটায় জন্ম হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম অসামান্য এবং কিংবদন্তী এক ইতিহাসের। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর বঙ্গবন্ধু সরকার যে বিশেষ আইনের মাধ্যমে রাজাকার আলবদরদের গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিলেন, ১৯৯২ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম জামায়াত ক্ষমতায় থাকার পরেও যে রাজাকার আলবদরদের বিচারের দাবীতে গণআদালত গঠন করেছিলেন, ২০১৩ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি সেই রাজাকার-আলবদরদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবীতে রাস্তায় নেমে এসেছিল হাজারো লাখো তরুণ-তরুণী, নারী-পুরুষ, আবাল বৃদ্ধবনিতা নির্বিশেষে সকলে! সৃষ্টি হয়েছিল এক অভুতপুর্ব গণজাগরণের!

ভার্সিটির ফোর্থ ইয়ারের স্টুডেন্ট তখন আমি, একটা ক্লাস শেষ করে ডিপার্টমেন্টের তিনতলা থেকে নামছি, হঠাৎ জানতে পারলাম, কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকেরা। অবাক এবং স্তম্ভিত হবার পালা সামলাতে না সামলাতেই ক্যান্টিনে ঢুকে দেখি টিভিতে শুয়োরটা দুই আঙ্গুল তুলে বিজয়ের ভি চিহ্ন দেখাচ্ছে। বিস্ময়ের জায়গা এসে দখল করলো প্রবল ক্রোধ, মাথায় স্রেফ আগুন ধরে গেল। এক বন্ধু ফোন দিয়ে বললো, অনলাইনে তো বহুত হইল, চল এইবার রাস্তায় নামি। আমি যাইতাছি, তুই চাইলে আইতে পারোস শাহবাগ! সেকেন্ড মিড এক্সাম ছিল পরের দুই ক্লাসে, ফার্স্ট মিড খারাপ করায় এই পরীক্ষাটায় ভালো করা জরুরী ছিল গ্রেডের জন্য, লাঞ্চ অর্ডার করেছিলাম,সবকিছু স্রেফ একপাশে ফেলে বাসে উঠে গেলাম। তারপর কিভাবে কি হলো ঠিক জানি না, নিজেকে আবিষ্কার করলাম শাহবাগে, একদল বিক্ষুদ্ধ তরুণ শাহবাগের চত্ত্বরের ঠিক মাঝখানটা ঘিরে বসে পড়েছে ততক্ষণে, আমিই বরং দেরি করে ফেলেছি অনেকটা। যখন মিশে গেলাম সেই জনস্রোতের একজন হয়ে, টেরও পাইনি নিজের অজান্তেই জীবনের গতিপথটা একেবারেই পাল্টে দিয়েছিলাম সেইমুহুর্তে! কাদের মোল্লার ফাঁসীর দাবীতে, সকল রাজাকার যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসীর দাবীতে যারা সেদিন অচিন্তনীয় সেই জনসমুদ্রে মিশে গিয়েছিল, তাদের অনেকেরই জীবনটা পাল্টে গিয়েছিল সেই মুহুর্তে, এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল অজান্তেই!

তারপর ধীরে ধীরে পানি অনেকদূরে গড়িয়ে গেছে, অজস্র বিক্ষুদ্ধ জনতার নির্ভেজাল গণজাগরণ পরিণত হয়েছে গণজাগরণ মঞ্চে, রাজাকারের ফাঁসীর দাবীর সাথে প্রথমে যোগ হয়েছে আরো নানা দাবী, তারপর সেই নানা দাবীর পথ এসেছে নানা মত এবং নানা লাভ-ক্ষতির হিসেব। জন্ম শত্রু হলেও স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, জামায়াত-শিবির সেই একাত্তরে যে ইসলামের নামে গণহত্যা চালিয়েছিল, এবারো তারা সেই একই কার্যকরী কৌশল নিয়ে এগিয়েছিল, তারা জানতো যে ত্রিশ লাখ মানুষকে ইসলামের নাম ব্যবহার করে মেরে ফেলার পরেও এই দেশের মানুষ সব ভুলে গেছে, তারা আবারো জামায়াতের খুব সুকৌশলে বপন করা আস্তিক-নাস্তিক বিতর্কের ফাঁদে পা দেবে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাওয়া ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ আর নেই, এই বাংলাদেশে খুব সহজেই ধর্মের কার্ড খেলে মুহুর্তের ভেতর পাল্টে দেওয়া যায় সব হিসেব, মৌলবাদ আর ধর্মান্ধতায় অন্ধ করে ফেলা যায় অসংখ্য সুস্থ-স্বাভাবিক নৈতিক বিবেচক মানুষকে। কিন্তু হেরে গিয়েছিলাম আমরা, যারা রাজাকারের ফাঁসীর দাবীতে হাতে হাত মিলিয়ে এক হবার পরেও পা দিয়েছিলাম একাত্তরের বেঈমান নরপিশাচের দল জামায়াতের পাতা ফাঁদে, নিজেদের ভেতরের ঐক্যটা ছিঁড়ে জামায়াত-শিবিরের প্রোপ্যাগান্ডায় ভুলে ভাই-বন্ধু, চেনা সহযোদ্ধাকে ধর্মের পরিচয়ে শত্রু বানিয়ে দূরে ঠেলে গণজাগরণকে ফেলে এসেছিলাম বিচিত্র এক মঞ্চের ভেতর, চোখের পলকে অস্বীকার করেছিলাম দুইটা সপ্তাহ ধরে সামনের সারির চেনামুখ সহযোদ্ধা রাজীব হায়দারের লাশ! তারপর থেকেই গণজাগরণ হয়ে গেল উদ্ভট এক মঞ্চ, হিসেব মেলানোর আর লাভক্ষতি বুঝে নেওয়ার জায়গা! কি অদ্ভুত, কি বিচিত্র, কি নিদারুণ যন্ত্রণা আর অপচয়!

একইসাথে যেন নির্দিস্ট হয়ে গেল কিছু মানুষের ফেইট! রাজীব হায়দারের মৃত্যুর পর তারা অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করলো, তারা একেবারেই একা। এমন না যে তারা জানতো না তাদের পরিণতি। খুব ভালোভাবেই তারা জানতো, এই জমিনে যারা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের কথা বলেছে, গণতান্ত্রিক বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী ধর্মনিরপেক্ষ আর অসাম্প্রদায়িক একটা স্বাধীন বাংলাদেশের কথা বলেছে, তাদের গল্পটা লেখা হয়েছে টকটকে লাল রক্তে। এই জমিনকে অস্তিত্বের সবটুকু দিয়ে যারাই ধারণ করেছে, আর বাকি সবার চেয়ে যাদের মাথাটা সবসময় উঁচু ছিল, তাদেরই বরণ করতে হয়েছে অমোঘ মৃত্যু, সেই একাত্তর থেকেই…

গণজাগরণের সেই উত্তাল সময়টায়ই সবকিছু পরিস্কার হয়ে গিয়েছিল। নাস্তিকতার দোহাই দিয়ে যাদের জবাই করে হচ্ছিল, তাদের সবাই রাজাকারের ফাঁসীর দাবীতে উত্তাল গণজাগরণের অংশ ছিল, ছিল সামনের সারির চেনা মুখ। যুদ্ধটা তো আসলে সেই ৪৫ বছরের পুরনো, শত্রুও সেই চেনা পুরোনো, আলবদরের উত্তরসূরীরা, পার্থক্য শুধু তখন ওরা জবাই করতো হিন্দুস্তানের দালাল তকমা দিয়ে, ভারতের পা চাটা কুকুর বলে, আর আজ ওরা জবাই করে নাস্তিক তকমা দিয়ে। তখন ওদের চেনা যেত দিনের আলোয়, মুখোমুখি, আজ ওরা মিশে থাকে মিশমিশে কালো অন্ধকারে, নিকৃষ্ট কাপুরুষের মত পেছন থেকে এসে কোপ বসায় ঘাড়ে, সামনে এসে লড়াইয়ের সাহস নেই এ শুয়োরদের। আফসোস একাত্তরের সেই অসমসাহসী মানুষগুলোকে আজ আর খুঁজে পাওয়া যায় না, প্রতিরোধ তো দূরে থাক, সামান্য প্রতিবাদটুকু করবার আগেও আজ আস্তিক-নাস্তিক হিসেব কষে মানুষ, ঠিক যেটাই চেয়েছিল এই ধর্মান্ধ মৌলবাদীরা।

আমাকে নিয়ে প্রবল দুশ্চিন্তা হত বাসায়। কাউকেই তো ওরা ছাড়লো না। রাজীব হায়দার গণজাগরণ আন্দোলনের একেবারে সামনের সারির মুখ ছিল, তাকে জবাই করে একসাথে দুটো পাখি শিকার করেছিল ওরা, ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকাণ্ডের যে মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে এগোচ্ছিল আলবদরেরা, সেই অসমাপ্ত কাজটা শুরু করেছিল আর রাজাকারের ফাঁসীর দাবীতে গণজাগরণকে নাস্তিকের আন্দোলন বলে প্রচার করেছিল জোরেসোরে। সেই যে শুরু হল, চাপাতি থামলো না। রাজীব হায়দার, অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর রহমান বাবু, অনন্ত বিজয় দাশ, নিলয় নীল, ফয়সাল আরেফিন দীপন, নাজিমুদ্দিন সামাদ- ওরা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল ওদের অভীষ্ট লক্ষ্যে। আর সবাই “নাস্তিক মরলে আমরার কি?” বলে এড়িয়ে যাচ্ছে সামনে পড়ে থাকা জলজ্যান্ত লাশ। অথচ এই খুনগুলো যে ছিল স্রেফ ক্ষেত্র প্রস্তুত করা, নাস্তিকদের মেরে ফেলার ছদ্মবেশে ওরা যে একাত্তরের পক্ষের শক্তিদের একে একে শেষ করে দিচ্ছে, এরপরের আঘাতটা যে আর আস্তিক না নাস্তিক সেই হিসেব করে আসবে না, আমরা কেউই সেটা ভাবিনি। ফলে ধীরে ধীরে ক্ষেত্র প্রস্তুত করার পর ধর্মান্ধ মৌলবাদী জঙ্গীরা আক্রমণ চালালো রাজধানীর সবচেয়ে সুরক্ষিত এলাকাগুলোর একটায়, গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে। ভয়ংকর নির্মমতা আর বীভৎস হত্যাকান্ড চালালো ওরা, চিৎকার করে আমরা যে দিনটা আসবে বলে সতর্ক করছিলাম, সেই দিনটা অবশেষে চলেই এলো, সবাই হঠাৎ উপলব্দি করলো, জঙ্গীরা শুধু নাস্তিকদেরই মারছে না, মারছে সবাইকে, আস্তিকতা-নাস্তিকতার বিতর্ক স্রেফ একটা ধোঁকাবাজি ছিল এই ধর্মান্ধ জঙ্গীদের।

একাত্তরে কেউ ধর্ম দেখেনি, বর্ণ দেখেনি, শত্রু-মিত্র বিচার করতে যায়নি, কাঁধে কাধ মিলিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এদের বিরুদ্ধে। সে কারনেই জামায়াতের আলবদর রাজাকারেরা হেরে গিয়েছিল। তাই একাত্তরের পর থেকে এই ধর্মান্ধগোষ্ঠী একটু একটু করে ধর্মান্ধতার বিষবাষ্প ঢুকিয়েছে ওরা এই দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, যেন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ার মত মানুষ আর খুঁজে পাওয়া না যায়। আজ ওরা নিশ্চিন্ত, জানে এই বাঙলাদেশ একাত্তরের সেই অসাম্প্রদায়িক বীর বাঙ্গালীর বাঙলাদেশ নয়…

শাহবাগ, গণজাগরণ মঞ্চ, রাজাকারের ফাঁসি

আমাকে তখন সবাই লেখালেখি থামিয়ে দিতে বলতো। আমি পারতাম না, চাইলেও অনেককিছুই পারে না মানুষ। পরিবারের মানুষগুলো ভয়ংকর দুশ্চিন্তায় থাকতো। এলাকায় আমার যত ফ্রেন্ড ছিল, যাদের সাথে সেই ছোটবেলা থেকে একসাথে বড় হয়েছি , ফেব্রুয়ারির পাঁচ তারিখের পর থেকে সবাই কেমন যেন অচেনা হয়ে গেল। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজী ছিলাম, শাহবাগ থেকে ফেরার পর প্রতিদিন নামাজ শেষে  “নাস্তিকের আবার কিসের নামাজ” বাক্যটা শুনতে হত। বাহাস করতে হত সমবয়েসী-বড় সবার সাথে “গণজাগরণকে কেন নাস্তিকদের আড্ডাখানা” বলা হচ্ছে তার প্রতিবাদে, প্রতি ওয়াক্তে… শেষপর্যন্ত আমি মসজিদে যাওয়া বাদ দিয়ে ঘরেই নামাজ আদায় করতে শুরু করলাম কেবল এদের চেহারা দেখতে হবে বলে, ফলাফল হলো উল্টো। আমার বাবা আওয়ামীলিগের একনিষ্ঠ কর্মী অর্থাৎ সেই হিসেবে ভারতের দালাল, আর তার ছেলে হলো আত্মস্বীকৃত নাস্তিক। আত্মস্বীকৃত কারণ সে ইসলামের কান্ডারী ফুটন্ত গোলাপ বৃদ্ধ মানুষগুলোর ফাঁসী চায়, একাত্তরের পুরান গন্ডগোলের ইতিহাস টেনে দেশে জামায়াতী ইসলামীর মত ইসলামিক দল অর্থাৎ ইসলামকেই ধ্বংস করার দাবী জানায়। প্রত্যেকটা জবাইয়ের পর মহল্লার চেনামুখগুলো বিদ্রুপের হাসি হেসে বলতো, কি রে, উইকেট তো আরেকটা গেল, আয় কয়দিন? তোর হিসাব কিন্তু সব সুদে-আসলে জমা হইতেছে…

বাপ-মার, ছোট বোনটা আমাকে নিয়ে কতটা কষ্ট পাচ্ছে, ভাবতে বড় যন্ত্রনা হত তখন। বড় প্রার্থিত সন্তান ছিলাম আমি, ছোটবেলা থেকে এমনভাবে আদর-যত্নে আগলে রেখেছিল আমাকে ওরা যে মাঝে মাঝে আমার মনে হত আব্বু-আম্মু যদি একটা বড় সিন্দুকের ভেতর আমাকে তালা মেরে চাবিটা গিলে ফেলতে পারতো, তাহলে বোধহয় একটু স্বস্তি পেতো। গণজাগরণের পর লিস্ট ধরে ধরে চাপাতি হাতে জঙ্গীদের উৎসবে স্বভাবতই বাবা-মার রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেল। অন্তত বিজয় দাসকে যেদিন মেরে ফেললো ওরা, তার পরেরদিনটা সারাদিন বাসার মানুষগুলো বুঝিয়েছিল আমাকে, প্রথমে নরম ভাষায়, তারপর রেগে গিয়ে , তারপর চিৎকার করে… নিঃশব্দে কাঁদছিল আম্মু,তার চোখের পানি দেখিয়ে আব্বু বলছিল, “তবুও কি তুই থামবি না? তোকে যে মানুষটা জন্ম দিছে, এতো বছর ধরে আদরে ভালোবাসায় বড় করছে, তার প্রতি কি তোর বিন্দুমাত্র মায়া দয়া নাই? তোর জীবন, তুই মরবি কি বাঁচবি, তোর ব্যাপার। কিন্তু এই যে মানুষটা তোকে আঁকড়ে বেঁচে আছে আজ এতোগুলো বছর, তুই যদি কাল জবাই হয়ে যাস, তবে তার কি হবে, ভেবেছিস কখনো?”

আমার মুখে কোন কথা যোগায়নি। আসলেই তো, ১৯৭১ রে জামায়াতের শান্তি কমিটির নেতা মাওলানা আবদুস সুবহান যখন আমার নানাকে বীভৎসভাবে হত্যা করেছিল, তখন আম্মু ছিল নানীর পেটে। জন্মের পর থেকে বাবাকে না দেখা, ভাইয়ের সংসারে অনাদরে-অবহেলায় মানুষ হওয়া মা’র পুরো পৃথিবীটা ছিলাম আমি। ছোট বোনটা হাওমাও করতে কাঁদতে কাঁদতে আমার হাত নিজের মাথায় রেখে বললো, “প্লিজ কসম কাট, তুই আর লেখালেখি করবি না, সব লেখা মুছে ফেল।আমার মাথা ছুঁয়ে কসম কাট।” আপনজনদের এতোটা অসহায় আর কখনো দেখিনি আমি, কখনো দেখতে চাইনি।

বোনকে দেয়া কসম রাখতে পারিনি। বড় বিচিত্র এ নেশা, চোখের সামনে ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তে গড়া এই জমিনটা ধীরে ধীরে প্রো-পাকিস্তানী ধর্মান্ধদের দখলে চলে যাচ্ছে, ভাবতে গেলেই চিন্তা-ভাবনার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতাম। হাতের কাছে প্রতিবাদের একটাই অস্ত্র ছিল তখন, আঙ্গুল নিশপিশ করতো, চাইলেও থামতে পারতাম না। প্রতিবার বোনের হাহাকার, বাবার দীর্ঘশ্বাস আর মায়ের নিঃশব্দ আকুতির পর প্রতিজ্ঞা করতাম, এই শেষ, আর লেখালেখি করবে না। আপনজনদের চেয়ে বড় তো আর কিছু হয় না, তাই না? কতবার আইডি ডিএকটিভ করেছি, ব্লগের লেখাগুলো সরিয়ে নিয়েছিলাম, মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক সব লেখা সরিয়ে ফেলেছিলাম, নিজেকে আটকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছি, দীপনদা আর টুটুলদার উপর হামলার পর তো ছোট বোনটা নিজে বসে খুঁজে খুঁজে আমার লেখাগুলো একটা একটা করে সরিয়েছে। তবুও লাভ হয়নি। কখন যেন নিজের অজান্তেই হাতে তুলে নিয়েছে কি-বোর্ড, প্রাণের চেয়েও প্রিয় এই দেশটাকে নিয়ে অহনির্শ আক্ষেপ আর ক্ষোভ বেরিয়েছে আঙ্গুল ফুঁড়ে। তারপর বোনের অসহায় মুখটা মনে পড়তেই লজ্জায় কুঁকড়ে গেছি, এসএসসি-এইচএসসিতে অসাধারণ রেজাল্ট করে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হবার কথা ছিল ছোট বোনটার, স্রেফ আমার জন্য দিনরাত দুশ্চিন্তা আর দুর্ভাবনায় একটা ঘন্টা স্থির হয়ে বসতে পারেনি মেয়েটা, পড়াশোনা তো দূরে থাক! একটা করে জবাইয়ের খবর আসে, বোনটা পাগলের মত ছটফট করে, আম্মুকে লুকোয়, বলে আরে ধুর, এটা অন্য ঘটনা, অন্যকারনে মারা গেছে। কিন্তু আব্বুকে তো লুকোনো যায় না। আব্বুর বিবর্ণ মুখ দেখে আম্মু বুঝে ফেলে সব। ছোট্ট একটা মানুষ, কি ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের ভেতর দিয়ে কেটেছে ওর সেই দিনগুলো, ভাবতেও বুক কাঁপে। আর আমি? পরিবারকে ন্যুনতম ভরসা দেওয়া তো দূরে থাক, চোখের সামনে ক্যারিয়ারটা এলোমেলো যেতে দেখেও কিছু করতে পারিনি। অনেক স্বপ্ন ছিল, অনেক বড় কিছু হবার ইচ্ছে ছিল, গণজাগরণের পর সব হিসেব পাল্টে গেল। থার্ড ইয়ার পর্যন্ত চমৎকার রেজাল্ট ছিল, ফোর্থ ইয়ারে কোনরকমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে পড়াশোনা শেষ করে চাকরী শুরু করেও ছেড়ে দিতে হল, একদিন ছাড়তে হলো এলাকাটাই…

সাথের বন্ধুরা যখন সবাই ধাই ধাই করে উপরে উঠে যাচ্ছে, আমি তখনো চেষ্টা করছে বেঁচে থাকার। যে দেশে রাজাকারের ফাঁসী চাইবার, লেখালেখি করবার শাস্তি হুট করে জবাই হয়ে যাওয়া, সেখানে যে বেঁচে থাকাটাই অনেক কিছু। সমাজ-সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন সেই একটা একটা করে দিন বেঁচে থাকার মুহুর্তগুলো বড় অবিশ্বাস্য লাগে এখন। যে জমিনকে আমরা প্রাণের সবটুকু দিয়ে ধারন করেছিলাম অন্তরের অন্তঃস্থলে, ভালোবেসেছিলাম, সেই দেশের কাছে, রাষ্ট্রের কাছে,সমাজ-সংসারের কাছে, আমার মত এমন অসংখ্যজন, “ব্লগার” নামের এক উদ্ভট জঘন্য চিড়িয়া হিশেবেই পরিচিত হয়ে রইল। তবুও আমি একটু হলেও ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছি, জীবনটা আবার নতুন করে শুরু করতে পেরেছি, কিন্তু স্রেফ রাজাকারের ফাঁসীর দাবী চাইতে গিয়ে কত অসংখ্য তরুণ ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের টার্গেটে পরিণত হয়েছে, পাশে থাকা তো দূরে থাক, সরকার আর সাধারণ জনগণের অবহেলা আর প্রবল ঘৃণায় “নাস্তিক” ট্যাগ মাথায় নিয়ে কত তরুণের জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেছে, তার হিসেব ক’জন রেখেছে? নিজের দেশকে, জমিনকে ভালোবেসে, রক্তাক্ত জন্মইতিহাসের উত্তরসূরী হিসেবে একাত্তরের বেঈমানদের বিচার চাইতে গিয়ে ইসলামের নামে চাপাতির নীচে জবাই হওয়া এবং একটা সময় নিজের দেশ-সমাজ-সংসারের কাছে অচ্ছুৎ আবর্জনায় পরিণত হওয়া এই মানুষগুলোর গল্প কি আমরা কখনো শুনতে চেয়েছি? জন্য কি আমরা কখনো একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেলেছি?

– দেশবিরোধী ধর্মান্ধ রাজাকার আলবদর আলশামস যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি ঘৃণা জানানো, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা।
– ধর্মের লেবাসে আর ধর্মভিত্তিক রাজনীতির খোলসে সব কিছুকে বিচার আর জায়েজ করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা। 

-মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে, পাকিস্তানকে ঘৃণা করার প্রশ্নে, একাত্তরের গণহত্যার বিচার চাওয়া প্রশ্নে পাকিস্তানীদের ধর্মীয় পরিচয় এবং মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই টাইপের জঘন্য অজুহাত আনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা।
– জাত গোত্র ধর্ম নির্বিশেষে সবার জন্য, সবার অংশগ্রহণে যে মুক্তিযুদ্ধ, সেই মুক্তিযুদ্ধের অর্জিত বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের চেতনায় ফিরে যাওয়া।

গণজাগরণের এই মুখ্য বিষয়গুলো আমরা কতোটা ধারণ করতে পেরেছি, সেটাই আসল। আমরা যারা ২০১৩ সালে রাজাকারের ফাঁসীর দাবীতে গড়ে ওঠা অভাবিত গণজাগরণের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্ফুলিঙ্গ ছিলাম, আমরা “নাস্তিক” ট্যাগ মাথায় নিয়ে জবাই হয়ে গেলেও, দেশ ও জাতির, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের শত্রু হিসেবে বিবেচিত হলেও, একাত্তরের স্বজন হারা শহীদদের রক্তের দায় মেটাতে বেঈমান রাজাকার ফাঁসীতে ঝোলাতে গিয়ে খুব নীরবে হারিয়ে গেলেও গণজাগরণ বেঁচে থাকবে যতদিন বাংলাদেশ আছে। আর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে যাবে গণজাগরণের চেতনা। আমরা হয়তো হারিয়ে যাবো, ধর্মের নামে আমার ভাই-বন্ধু-সহযোদ্ধাদের সেই একাত্তরের নরপিশাচদের উত্তরসূরীদের হাতেই মরতে হবে প্রতিবার, কিন্তু আমাদের বিনাশ নাই। আমরা আবার ফিরে আসবো, একাত্তরের সেই হার না মানা মাথা না নোয়ানো অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হয়ে, আবার হয়তো নতুন কোন ভোরে, আবার হয়তো নতুন কোন গণজাগরণে!

 

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close