এবার একজন এমপিপুত্র ঠাণ্ডা মাথায় একজন পথচারীর উপর গাড়ি তুলে দিয়ে পিষে মেরে ফেলেও বেঁচে যাচ্ছে স্রেফ ক্ষমতার জোরে! গতকাল রাতে ঘটনা ঘটার পর প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান এবং প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও সে এখনো গ্রেফতার হয়নি, হবে বলেও মনে হয় না। কারণ ইতিমধ্যেই তাকে বাঁচানোর জন্য নানা জায়গায় থেকে চেষ্টা ও তদবির শুরু হয়ে গেছে। এবং আইন শৃংখলা বাহিনীর আন্তরিকতা কিংবা চেষ্টাতেও লক্ষ্য করা যাচ্ছে বিশাল ঘাটতি!

কাফরুল থানার এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, গত মঙ্গলবার ১৯শে জুন রাতে ঢাকা মেট্রো ১৩-৭৬৫৫ নম্বরের প্রাইভেটকারটি সেলিম মোল্লা(৪৫) নামে এক ব্যাক্তিকে ফ্লাইওভারের ওপর চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। চাপা দেওয়ার পরে গাড়িটি খুব দ্রুত বিজয় সরণীর দিকে পালিয়ে যায়। গাড়িটি নোয়াখালীর একজন সংসদ সদস্যের ছেলে চালাচ্ছিলেন। ঘটনার পর পুলিশ লাশ উদ্ধার করে কাফরুল থানায় নিয়ে যায়। তবে গাড়িচালক ও গাড়িটি আটক রাখা হয়নি। এই ঘটনায় পুলিশ একটি সড়ক দুর্ঘটনার মামলা করেছে।

পরবর্তীতে সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে যে, গাড়িটির মালিক কামরুন্নাহার শিউলি। তিনি নোয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য একরামুল করীম চৌধুরীর স্ত্রী ও নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার চেয়ারম্যান। তবে ওই দুর্ঘটনার পর গাড়িটি দ্রুত এসে সংসদ ভবনের উল্টো দিকের ন্যাম ফ্ল্যাটে যখন ঢোকে তখন সেটিকে অনুসরণ করেন একজন মোটরসাইকেল আরোহী ও আরেকজন প্রাইভেট কার আরোহী। তারা জানিয়েছেন, গাড়িটি ওই ভবনে ঢোকার পর একজন তরুণ গাড়িটি থেকে নামেন। ভবনটির আনসার ও প্রহরীরা জানিয়েছেন, ওই তরুণের নাম শাবাব চৌধুরী। তিনি কামরুন্নাহার শিউলি ও সংসদ সদস্য একরাম চৌধুরীর একমাত্র ছেলে। গাড়িটি তিনিই চালাচ্ছিলেন।

শাবাব, এমপিপুত্র, একরামুল করিম চৌধুরি, এমপি পুত্রের গাড়িচাপা

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন শামীম আশরাফী সংবাদ মাধ্যম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, দুর্ঘটনাটি যখন ঘটে তখন ওই প্রাইভেট কারটির পেছনে ছিলেন একজন মোটরসাইকেল আরোহী। দ্রুত পালানো গাড়িটিকে ওই মোটরসাইকেল আরোহী অনুসরণ করা শুরু করেন এবং চিৎকার করে আশপাশের সবার সহযোগিতা চান। এ সময় কয়েকজন বন্ধুসহ তিনিও (শামীম) একটি প্রাইভেট কারে ওই সড়ক দিয়ে যাচ্ছিলেন। মোটরসাইকেল আরোহীর চিৎকার শুনে তাদের প্রাইভেট কারটিও ঘাতক গাড়িটিকে অনুসরণ করে। তারা দেখতে পান গাড়িটি সংসদ ভবনের উল্টো পাশে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে অবস্থিত ন্যাম ফ্ল্যাটের ভেতরে গিয়ে ঢোকে। ওই মোটরসাইকেল আরোহীর সঙ্গে তারাও ন্যাম ভবনের ভেতরে ঢোকেন।

ওই প্রত্যক্ষদর্শী কাছ থেকে আরো জানা যায়, ‘‘ন্যাম ভবনের ভেতরে ঘাতক গাড়িটি থেকে এক তরুণ নেমে বলে, ‘এটা আমার এলাকা, ‘কে কে আসবি আস।’ এ সময় ওই তরুণের সঙ্গে তাদের কথাকাটাকাটি হয়। তখন আশপাশের লোকজন ছুটে আসে এবং তরুণটিকে শাবাব নাম ধরে ডাকতে থাকে। এ সময় এসব লোকজন ও দায়িত্বরত আনসার ও কেয়ারটেকাররা জানায়, শাবাব এমপি একরাম চৌধুরীর ছেলে। এরপর তাদের ন্যাম ভবন থেকে বের করে দেওয়া হয়।

শাবাব, এমপিপুত্র, একরামুল করিম চৌধুরি, এমপি পুত্রের গাড়িচাপা

কি, একটু অবাক হলেন? তার এই হুমকি দেওয়ার কারণটা হচ্ছে, সে পৈশাচিকভাবে এই দুর্ঘটনাটা ঘটিয়েছে। প্রথমে যখন শাবাব ওই পথচারীর পায়ের ঊপর দিয়ে গাড়ির চাকা তুলে দিয়েছিল। এরপর পালাতে গিয়ে আবারো গাড়ী ব্যাক গিয়ার দিয়ে চালিয়ে দেয় আহত সেলিম মোল্লার উপর! অর্থাৎ এটি আদতে কোন অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনা না, বরং সেকেন্ড অ্যাটেম্পটে ঠান্ডা মাথায় ঘটানো একটা হত্যাকান্ড! এবং সে ন্যাম ভবনে ঢোকার পরেই হুমকি দিতে শুরু করে।

ঘটনার তিন প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, সেলিমের পায়ের ওপর গাড়ি তুলে দেয়ার পর তিনি বাম্পার ধরে ফেলেন। এর পর গাড়িটির চালক শাবাব ব্যাক গিয়ারে এসে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। গতি বাড়িয়ে তিনি আবারও সামনের দিকে এগিয়ে যান। এতে সেলিম ছিটকে ফ্লাইওভারের গার্ডারে গিয়ে পড়েন। মুহূর্তেই মাথা ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায় তার। ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান।

শুধু তাই না, শামীম আরো জানিয়েছেন, ওই মোটরসাইকেল আরোহী ঘটনার সাথে সাথেই গাড়ী ও চালকের ছবি তুলেছিলেন এবং ভিডিও করেছিলেন। কিন্তু পরে ন্যাম ভবন এলাকায় তাকে হুমকিধমকি দিয়ে ছবি ও ভিডিও ফোন থেকে মুছে ফেলতে বাধ্য করা হয়। এর প্রমাণ পাওয়া যাবে ন্যাম ভবনের সিসি ক্যামেরায়।

শামীম আশরাফী দাবি করেন, ‘এটি একটি অডি জিপ গাড়ি। আমি শতভাগ নিশ্চিত ওই তরুণ নোয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য একরামুল হক চৌধুরীর ছেলে শাবাব চৌধুরী। সে নিজেও ন্যাম ভবনের ভেতরে এভাবেই পরিচয় দিচ্ছিল। তার গাড়িটিতে স্টিকার ছিল।’

নিহত সেলিম ব্যাপারীর গ্রামের বাড়ি বরিশালে। তিনি পরিবার নিয়ে উত্তরখান এলাকায় থাকতেন। মঙ্গলবার রাতে তিনি মহাখালী ফ্লাইওভারে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ওই সময় এমপিপুত্র শাবাবের গাড়ির চাপায় নিহত হন তিনি। সেলিম ব্যাপারীর মেয়ে সাদিয়া আক্তার তামান্না বলেন, “বাবা মহাখালীতে একটি ডেভেলপার কোম্পানির এমডির গাড়িচালক ছিলেন। ওই এমডি নাখালপাড়া এলাকায় থাকেন। এমডির বাসায় গাড়ি রেখে আমার বাসায় আসার কথা ছিল বাবার। রাত সাড়ে ৯টার দিকে মোবাইল ফোনে শেষবারের মতো বাবার সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল। মোবাইল ফোনে বাবা আমাকে বলেন, ডিউটি শেষ করে গাড়ি জমা দিয়েছি। গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছি, তোমার বাসায় যাব। এরপর মাকেও ফোন করে বলেছে, তোমরা ঘুমিয়ে পড়, আমি তামান্নার বাসায় যাব। এর কিছুক্ষণ পর রাত ১০টার দিকে আমার শ্বশুরের ফোনে কল করে কে যেন জানিয়েছে যে, বাবা অ্যাকসিডেন্ট করেছে, যেতে হবে।”

শাবাব, এমপিপুত্র, একরামুল করিম চৌধুরি, এমপি পুত্রের গাড়িচাপা

না, সেলিম ব্যাপারী আর তার দেওয়া কথা রাখতে পারেননি। মেয়ের কাছে আর ফেরা হয়নি তার। তার আগেই জীবন প্রদীপ নিভে গেছে তার। হয়তো আরো অনেকদিন বেঁচে থাকবার কথা ছিল তার, নিজের ঘরে আপনজনের মাঝখানে পরম প্রশান্তিতে মৃত্যুবরণ করবার কথা ছিল তার, কিন্তু এক বেপোরোয়া এমপিপুত্র শাদাবের মাথায় চালিয়ে দেওয়া গাড়ীর চাপায় ছিন্নভিন্ন হয়ে মর্মান্তিকভাবে রাস্তার মাঝখানে নিঃসঙ্গ অবস্থায় মরতে হলো তাকে। জীবনে শেষ মুহুর্তগুলোতেও আপনজনের মুখটা শেষবারের মত দেখার সুযোগ হয়নি তার। আর সেই শাদাবকে এখনো পুলিশ গ্রেফতার করেনি, তার গাড়ীটাও বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে সেই ন্যাম ভবনেই! আর এমপি এবং তার স্ত্রী আপ্রাণ চেষ্টা করছেন ছেলেকে বাঁচানোর জন্য, সব দোষ তারা চাপিয়েছেন ড্রাইভার নুরুল আমিনের উপর।

সংসদ সদস্য একরামুল করীম চৌধুরী বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, ‘আমার ছেলে গাড়ি চালায় নাই। চালাইছে আমার ড্রাইভার। এখন এক্সিডেন্ট করছে। এক্সিডেন্ট তো এক্সিডেন্টই। পুলিশ তদন্ত করতেছে। আমার পাঁচ-ছয়টা ড্রাইভার। সবাই তো ছুটিতে গেছিল। আমি নোয়াখালীতে, এখন কোনটা আইসা ডিউটি করতেছে, বলতে পারতেছি না।” আর তার স্ত্রী বিডিনিউজ২৪’এর কাছে দাবি করেছেন, গাড়িটি চালাচ্ছিলেন নুরুল আমিন নামে তাদের গাড়িচালক। উত্তরায় এক বান্ধবীর কাছে একটি পার্সেল পাঠিয়েছিলেন তিনি, সেটা নিয়ে যাচ্ছিলেন নুরুল আমিন। নুরুল আমিন এখন কোথায়- তা জানতে চাইলে শিউলী বলেন, তারাও ওই গাড়িচালককে এখন ‘খুঁজে পাচ্ছেন না’।

শাবাব, এমপিপুত্র, একরামুল করিম চৌধুরি, এমপি পুত্রের গাড়িচাপা

এর আগে ২০১৫ সালের ১৩ এপ্রিল গভীর রাতে সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি পিনু খানের ছেলে বখতিয়ার আলম রনি নেশাগ্রস্ত অবস্থায় রাজধানীর নিউ ইস্কাটনে প্রাডো গাড়ি থেকে তার পিস্তল দিয়ে চার-পাঁচটি গুলি ছোড়ে। এতে রিকশাচালক আবদুল হাকিম ও দৈনিক জনকণ্ঠের অটোরিকশাচালক ইয়াকুব আলী আহত হন। হাকিম ১৫ এপ্রিল ও ইয়াকুব ২৩ এপ্রিল মারা যান। মজার ব্যাপার হচ্ছে এরপর কিছুদিন প্রচন্ড আলোচনা-সমালোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত কয়েকদিন পর স্বাভাবিক নিয়মে সব থিতিয়ে যায় এবং যথারীতি পুরো ব্যাপারটি ধামাচাপা পড়ে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এ বছরের ৮ই মে রনির বিরুদ্ধে হওয়া হত্যামামলার রায় প্রকাশের তারিখ থাকলেও শেষ পর্যন্ত প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক আল মামুনের আদালত রায় ঘোষণার তারিখ পিছিয়েছিলেন। যুক্তিতর্কে বিচারক সন্তুষ্ট না হওয়ায় তা পিছিয়ে আগামী ৪ জুন (সোমবার) অধিকতর যুক্তিতর্কের জন্য দিন ধার্য করেছিলেন আদালত। এখনো সেই মামলার রায়ের ব্যাপারে কোন অগ্রগতি পাওয়া যায়নি। রনির মামলায় তবুও সবাই বিচারের দাবীতে সোচ্চার ছিল, কিন্তু এই ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে প্রায় দুইদিন পার হয়ে গেলেও সেভাবে প্রতিবাদের জোয়ার উঠছে না। এই মামলার কপালে আদৌ বিচার আছে কি না , সে ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে পড়া খুবই স্বাভাবিক।

আর যে দেশে এমপি-মন্ত্রী পুত্ররা প্রথম শ্রেণী আর আমরা বাকি আম-জনতা নিম্নস্তরের শ্রেণী হিসেবে বসবাস করি, সেখানে আসলে এই ধরণের ঘটনা খুবই স্বাভাবিক। একজন এমপি পুত্র অর্থ এখানে সাত রাজার সমান ক্ষমতা, দাপট আর যথেচ্ছ স্বেচ্ছাচারের খতিয়ান। তাই তারা ইচ্ছে করলেই মাতাল হয়ে রাস্তায় নেমে যে কাউকে গাড়ি চাপা দিয়ে মেরে ফেলতে পারেন, জ্যামে আটকালে বিরক্ত হয়ে গাড়ি থেকে নেমে এলোপাথাড়ি গুলি চালিয়ে নিরীহ মানুষকে মেরে ফেলতে পারেন, কারো কিচ্ছু বলার অধিকার নাই। প্রভাবশালীরা রেডিই থাকে তাদের বাঁচাতে! ব্যাপারটা অনেকটা এমন যে আমরা পুরোনো আমলের রাজ-রাজড়াদের শিকারের বস্তু, এই এমপির ছেলেরা অর্থাৎ রাজার ছেলেরা যখন তখন ইচ্ছেমত শিকারে বেরিয়ে চাইলে খেয়ালখুশি মতন আমাদের শিকার করেন, প্রতিবাদে কোন কথা বলতে গেলেই হুমকি দিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়, প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। আর মাননীয় এমপি কিংবা তার স্ত্রী যিনি নিজেও উপজেলা চেয়ারম্যান, তারা জনপ্রতিনিধি হয়ে শুরু করেন একজন নিরীহ মানুষকে মেরে তার পুত্রকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা, বাঁচানোর চেষ্টা! অথচ ওই নিরীহ মানুষটার প্রতিনিধি হিসেবেই তিনি এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এইরকম অসংখ্য নিরীহ মানুষের হয়ে কথা বলার জন্য, তাদের স্বার্থ দেখার জন্যই জনগণ তাকে ভোট দিয়েছে। অথচ তারা ব্যস্ত হয়ে পড়েন একজন অপরাধীকে বাঁচাতে!

আজ যদি শাদাবের মত ঠান্ডা মাথার খুনীর বিচার না হয়, সেলিম মোল্লার মত আমি বা আপনি কাল ঘরে নাও ফিরতে পারি। মারা যেতে পারি এভাবেই, কোন এক্সিডেন্টের মত দেখতে হত্যাকান্ডে! শাদাবের কি বিচার হবে? পরপর দুইবার গাড়ি চাপা দিয়ে মেরে ফেলা শাদাবের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করবার জন্য আমরা কি আবার আরেকবার সোচ্চার হবো?

তথ্য ও সাক্ষাৎকার কৃতজ্ঞতা: বিডিনিউজ২৪, বাংলা ট্রিবিউন, বাংলানিউজ২৪ যুগান্তর পত্রিকা!

Comments
Spread the love