ছবির মানুষ দুজনের চেহারায় অদ্ভুত রকমের মিল। এমন মিল সচরাচর দেখা যায় না। সিনেমার পোকা হয়ে থাকলে দুজনকেই আপনার চেনার কথা। একজন বাংলাদেশের এক সময়ের জনপ্রিয় নায়ক নাঈম। অন্যজন ভারতের দক্ষিনী সিনেমার নায়ক অজিত কুমার।

চেহারায় মিল থাকতেই পারে। সেটা মূল বিষয় নয়। এই দুজনের ছবি নিয়ে কেন আলোচনা করছি? একটু তাহলে পেছনে ফিরে যাই। ১৯৯১ সালে বিখ্যাত পরিচালক এহতেশামের হাত ধরে সিনেমায় এসেছিলেন নাঈম-শাবনাজ জুটি, সিনেমার নাম ছিল ‘চাঁদনী’। এরপরে দুজনে জুটি বেঁধে আরও বেশ কিছু ছবি করেছেন; ‘জিদ’, ‘লাভ’, ‘চোখে চোখে’, ‘অনুতপ্ত’, ‘বিষের বাঁশি’, ‘সোনিয়া’, ‘টাকার অহংকার’, ‘সাক্ষাৎ’ ও ‘ঘরে ঘরে যুদ্ধ’- এগুলো ছিল অন্যতম। নায়ক হিসেবে নাঈমের ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গিয়েছিল নতুন শতাব্দীর আগেই। নিজের প্রোডাকশন থেকে ‘আগুন জ্বলে’ নামে একটা সিনেমা প্রযোজনা করেছিলেন নাঈম। এফডিসিতে তার সর্বশেষ কাজ ছিল ‘মেয়েরাও মাস্তান’ নামের একটা সিনেমায়।

অজিত কুমারের ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল ১৯৯৩ সালে। সিনেমায় অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি জীবনে অনেক কিছুই করেছেন। চিত্রনাট্য লিখেছেন, গান গেয়েছেন। ফর্মূলা-ওয়ান রেসিঙে ভারতের হয়ে লড়েছেন। ফোর্বস ম্যাগাজিনের ‘বিশ্বের সেরা ১০০ সেলিব্রেটি’র তালিকায় এসেছে তার নাম। চুটিয়ে অভিনয় করছেন সিনেমায়, এখনও তার সিনেমা মুক্তি পেলে দক্ষিণের বক্স অফিসে ছোটখাটো ঝড় বয়ে যায়।

আক্ষেপটা এখানেই। নাঈম আর অজিত কুমারের বয়সের পার্থক্য খুব একটা বেশি নয়। অথচ অজিত যেখানে নায়ক হিসেবে একের পর এক সিনেমা করে যাচ্ছেন, সেখানে নাঈমেরা সিনেমাকে বিদায় বলে দিয়েছেন আরও দেড়যুগ আগেই! না, এই মধ্যপঞ্চাশে দাঁড়িয়ে নাঈম নায়ক হতে পারবেন না, কিন্ত তাদের চরিত্রাভিনেতা হিসেবে সিনেমায় ব্যবহার করার কথা কি আমাদের সিনেমাপাড়ার মানুষেরা ভেবেছেন কখনও? যারা সিনেমা বানান, সেই নির্মাতারা কি এইসব সিনিয়র শিল্পীদের ব্যবহার করার কথা ভাবেন না কখনও?

শাহরুখ-সালমান-আমিরের উদাহরণ দেবো না। অত দূরে না যাই। কলকাতার দিকে তাকাই চলুন। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বয়স ‘মাত্র’ চুরাশি। এই বয়সেও মানুষটা কি ভীষণ ব্যাস্ত! সিনেমায় অভিনয় করছেন, মঞ্চে নাটক করছেন। বেলাশেষে দিয়ে অন্যরকম এক সৌমিত্রকে আবিস্কার করেছিলেন শিবপ্রসাদ-নন্দিতা। এরপর প্রাক্তনে খানিকটা ছোঁয়া, সর্বশেষ ময়ূরাক্ষী। ময়ূরাক্ষী তো গত বছরের সেরা বাংলা সিনেমা নির্বাচিত হলো। সৌমিত্র নায়ক নন, কিন্ত সিনেমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রই তিনি! তাকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে গল্পটা।

আমাদের নায়করাজ রাজ্জাক চলে গেলেন গত বছর। জীবনের শেষ বছরগুলোতে তাকে আমাদের পরিচালকেরা ব্যবহার করতে পারলেন কই? এই শক্তিমান অভিনেতার আরও অনেক কিছু দেয়ার ছিল, অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ নায়করাজের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার কথা ছিল জুনিয়র শিল্পীদের। কিন্ত সেই সুযোগটা কেউ করে দিতে পারলেন না। আরেক দুর্দান্ত অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামানও এখন আর সিনেমায় কাজ করেন না। তাকে ব্যবহার করার কোন তাগিদও নির্মাতাদের মধ্যে দেখতে পাই না সেভাবে।

আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে একটা সময়ে খলনায়কের ভীষণ অভাব ছিল। মিশা সওদাগর একাই সব সিনেমায় ভিলেন হয়েছেন। এখন তিনি সিনেমার সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছেন। নতুন কয়েকজন ভিলেন হয়ে এসেছেন সিনেমায়, তবুও অভাবটা পূরণ হয়নি সেভাবে। অথচ তারিক আনাম খানের মতো দারুণ একজন অভিনেতাকে সিনেমায় আনার কথা কারো মাথায় আসেনি এতদিন! আশিকুর রহমানের পরবর্তী সিনেমা ‘সুপারহিরো’তে শাকিবের সঙ্গে দ্বন্দ্বে অবতীর্ণ হতে দেখা যাবে তারিক আনাম খানকে, সিনেমাপ্রেমী হিসেবে এটা নিঃসন্দেহে খুশীর একটা খবর। শাকিব-ববির পরবর্তী সিনেমা ‘নোলকে’ও তিনি থাকছেন। বেটার লেট দ্যান নেভার!

নব্বইয়ের দশকে টালিগঞ্জের সিনেমায় সবচেয়ে জনপ্রিয় জুটি ছিলেন প্রসেনজিত-ঋতুপর্ণা। মাঝে মান-অভিমান হয়েছে, একসঙ্গে সিনেমা করেননি অনেকগুলো বছর। ‘প্রাক্তনে’ এসে আবার মিলে গিয়েছিলেন প্রাক্তন এই জুটি। ‘দৃষ্টিকোণ’ মুক্তি পাচ্ছে। আমাদেরও এমন জুটি আছে। রিয়াজ-পূর্ণিমার কথাই ধরুন না। তাদের বয়স বেড়ে গেছে? পূর্ণিমাকে দেখে অন্তত সেরকমটা বলার উপায় নেই। প্রসেনজিত-ঋতুপর্ণা তো এখন কলেজের ছাত্র-ছাত্রী হয়ে পর্দায় প্রেম করছেন না। বয়স বেড়েছে, সময় বদলেছে। সেই সঙ্গে বদলে গেছে চরিত্রের উপস্থাপনটাও। রিয়াজ-পূর্ণিমা দুজনেই জাতীয় পুরস্কার বিজয়ী, ওদের অভিনয়প্রতিভা নিয়ে তো সংশয় নেই। রিয়াজকে বয়স আর সময় অনুযায়ী চরিত্র দিলে দর্শক তাকে অবশ্যই গ্রহণ করবে। জোর করে কৃষ্ণপক্ষের মুহিব সাজালে তো হবে না।

আনিসুর রহমান মিলনের মতো অভিনেতাকেও ঠিকঠাক ভাবে কাজে লাগাতে পারছি না আমরা, তার সক্ষমতা আরও অনেক বেশী। যেসব চরিত্র তাকে দেয়া হচ্ছে, সেগুলো তার নামের সঙ্গে পুরোপুরি মানানসই নয়। আরও ভালো স্ক্রীপ্ট, আরেকটু বেশী স্ক্রীনটাইম তিনি ডিজার্ভ করেন। ইলিয়াস কাঞ্চনেরা ‘বাংলার ফাটাকেষ্ট’ নামের অখাদ্য সিনেমায় নাম লেখান, অথচ বিজলিতে তাকে দেখে খারাপ লাগেনি একটুও, প্রশংসাও করেছেন সবাই। নির্মাতাদের পাশাপাশি তো অভিনেতাদের নিজেদেরও সচেতন হতে হয় সিনেমা বাছাই কিংবা চরিত্র পছন্দের ব্যাপারে।

একটা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটা হিসেবে ধরা হয় সেটার সিনিয়র আর্টিস্টদের। আমাদের ইন্ডাস্ট্রিটা এখানেও পিছিয়ে আছে। একটু বয়স হয়ে গেলেই বাপ-চাচার রোল ধরিয়ে দেয়া হয় এখানে, যে চরিত্রে নেই কোন নতুনত্ব, নেই কোন গুরুত্ব। ‘বুড়িয়ে গেলেন তো ফুরিয়ে গেলেন’ ভাবনাটা যতোদিন আমাদের মাথা থেকে দূর না হবে, ততদিন নিজেদের সিনেমা নিয়ে গর্ব করার মতো জায়গাটাতেও যেতে পারবো না আমরা।

Comments
Spread the love