সেই ১৯১৬ সালে মহামতি আলবার্ট আইনস্টাইন তাঁর বিখ্যাত “থিওরি অফ রিলেটিভিটি” এর উপর ভিত্তি করে “Gravitational wave” বা মহাকর্ষীয় তরঙ্গের অস্তিত্বের কথা প্রেডিকশন করে গিয়েছিলেন। মহাকর্ষীয় তরঙ্গ তড়িৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গের মতই আলোর গতিতে তরঙ্গ আকারে শক্তি পরিবহন করে “মহাকর্ষীয় বিকিরণের” সাহায্যে, এটা উৎপন্ন হয় যখন দুইটা টাইম-স্পেস কার্ভেচারের মধ্যে মিথস্ক্রিয়ায় উৎপন্ন হয়। নিউটনিয় ক্লাসিক পদার্থবিজ্ঞান দিয়ে এটা ব্যখ্যা করা যায় না।

গ্র‍্যাভিটেশনাল ওয়েভ উৎপন্ন হয়ে বাইনারি স্টার সিস্টেম যেমন দুইটা সাদা বামন, নিউট্রন স্টার বা ব্ল্যাক হোলের মধ্যে মিলন হলে বা সুপারনোভার মত মহাকাশীয় ঘটনাবলী থেকে।

ড সেলিম শাহরিয়ার, ড দীপঙ্কর তালুকদার, ব্ল্যাকহোল, থিওরি অফ রিলেটিভিটি, আইনস্টাইন

এই গ্র‍্যাভিটেশনাল ওয়েভ শুধু থিওরীতেই রয়ে গেছে অনেকদিন। কোটিকোটি আলোক বর্ষ দূরে থাকা ব্ল্যাক হোল বা নিউট্রন স্টারদের কার্যকলাপে উৎপন্ন হওয়া এই তরঙ্গ বাস্তবে পর্যবেক্ষণ করার মত প্রযুক্তি ছিলো না মানুষের কাছে। তবে সেই সত্তরের দশক থেকেই মহাকাশ থেকে আসা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম তরঙ্গ গুলো নিয়ে গবেষণা করার জন্য শক্তিশালী ডিটেক্টর বানানোর চেষ্ট চলছিলো। বহু বছরের নানা ঘাত প্রতিঘাত, রাজনৈতিক নানা বাধা ও বিজ্ঞানীদের মধ্যে টানা পোড়েন পার হয়ে অবশেষে কাজ শুরু করে Laser Interferometer Gravitational-Wave Observatory বা সংক্ষেপে LIGO. এটা আমেরিকার National Science Fund এর অর্থায়নে ও MIT এবং Caltech এর তত্ত্বাবধানে নির্মিত ও পরিচালিত এক মহাশক্তিশালী এন্টেনার মত যা মহাকাশ থেকে আসা সব তরঙ্গ করে, বিশ্লেষণ করে, বাছাই করে এবং গ্র‍্যাভিটেশনাল ওয়েভ খুঁজে বেড়ায়। এই লাইগোর ক্ষমতা কতবেশি তার আইডিয়া পাওয়া যাবে এই উদাহরণে- এটা সূর্যের নিকটতম নক্ষত্র, প্রক্সিমা সেঞ্চুরি যতটুকু দূরে- প্রায় ৪.২৫ আলোক বর্ষ দুরের কোথাও মানুষের চুলের সমান সূক্ষ্ম পরিবর্তন চিহ্নিত করতে পারে!!

২০০২ থেকে ২০১০ পর্যন্ত এই লাইগোতে বলার মত কিছু ধরা পরে নি। তারপর বৃটিশ,অস্ট্রেলিয়া এবং জার্মানির প্রতিষ্ঠানরা এগিয়ে আসায় এটার ৫বছর মেয়াদি সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়। ২০১৫ সালে গিয়ে তা শেষ হয়, মোট খরচ হয় প্রায় ৬২০মিলিয়ন ডলার! প্রতিষ্ঠান গুলো ছিলো- যুক্তরাজ্যের UK Science and Technology Facilities Council, জার্মানির The Max Planck Society of Germany, and আর অস্ট্রেলিয়ার The Australian Research Council.

ড সেলিম শাহরিয়ার, ড দীপঙ্কর তালুকদার, ব্ল্যাকহোল, থিওরি অফ রিলেটিভিটি, আইনস্টাইন

অবশেষে, ২০১৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি Ligo এবং তার সাথে কাজ করা Virgo সহ সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাজার হাজার বিজ্ঞানীদের কোলাবেরেশনের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়, আইনস্টাইনের বলে যাওয়া সেই গ্র‍্যাভিটেশনাল ওয়েভ সত্যি সত্যি মানুষের কাছে ধরা দিয়েছে। ২০১৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর লাইগোর হ্যানফোর্ড আর লিভিংস্টোন দুই ডিটেক্টরে ১৩০ কোটি আলোক বর্ষ দূরের দুই ব্ল্যাক হোলের মিলিত হবার সময় উৎপাদিত মহাকাঙ্খিত তরঙ্গ ধরা পরে। সূর্যের চেয়ে ২৯ গুণ বেশি পদার্থধারী একটি ব্ল্যাক হোল, সূর্যের চেয়ে ৩৬ গুণ বেশি পদার্থধারী একটি ব্ল্যাক হোল ঘিরে ঘুরপাক পরস্পরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিলো। এবং সেকেন্ডের ভগ্নাংশের সময়ে সেখানে আমাদের চেনা জানা মহাকশে যত নক্ষত্র আছে তার চেয়ে ৫০গুন বেশি শক্তি বিচ্ছুরিত হয়েছিলো!! তারপর মাস কয়েক সেই ডাটা গুলো বারবার পরীক্ষা নীরিক্ষা করে অবশেষে ২০১৬ এর ফেব্রুয়ারীতে বিজ্ঞানীরা ঘোষণা দেন- হ্যা, Gravitational wave শুধু তত্ত্বকথা নয়, এর বাস্তব অস্তিত্ব আছে! এর পর এখন পর্যন্ত আরো চারবার লাইগো ও ভারগো এই গ্র‍্যাভিটেশনাল ওয়েভের অস্তিত্ব ডিটেক্ট করতে পেরেছে যার মধ্যে শেষের টা ছিলো প্রথম বারের মত দুইটা নিউট্রন স্টারের একাভূত হবার সময় উৎপন্ন হওয়া।

২০১৭ সালে পদার্থ বিজ্ঞানে নোবেল এই গ্র‍্যাভিটেশনাল ওয়েভ সনাক্ত করার জন্যই Rainer Weiss, Kip Thorne এবং Barry Barish কে দেওয়া হয়।

তবে এই আবিষ্কার নির্দিষ্ট একটা সংস্থা বা গুটকয়েক বিজ্ঞানীদেরই কৃতিত্ব নয়। সারা দুনিয়া থেকেই মেধাবী গবেষক ও বিজ্ঞানীরা এতে যুক্ত ছিলেন। এরকম দুইজন হলেন নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িেকৗশল ও কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম শাহরিয়ার এবং ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির ড. দীপঙ্কর তালুকদার। ড. সেলিম নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তার বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি টিমকে। তিনি দীর্ঘ ১০ বছর ধরে সেলিম শাহরিয়ার কাজ করছিলেন লাইগোর তরঙ্গ শনাক্তকারী যন্ত্রের কার্যকারিতা ও ব্যান্ডউইথ বাড়ানোর জন্য। মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করা নিয়ে অধ্যাপক সেলিম শাহরিয়ার ও তার তিন শিক্ষার্থীর লেখা প্রকাশ হয়েছে ফিজিক্যাল রিভিউ লেটারসে। ড. সেলিম উচ্চমাধ্যমিকে সারা দেশে মেধাতালিকায় স্থান করে নিয়ে আমেরিকায় চলে যান এবং বিশ্ববিখ্যাত MIT তে পড়ার সুযোগ করে নেন। সেখানেই তড়িৎ প্রকৌশল ও কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং পদার্থবিজ্ঞানে ১৯৮৬ সালে ব্যাচেলর অব সায়েন্স, তড়িৎ প্রকৌশল ও কম্পিউটার বিজ্ঞানে ১৯৮৯ সালে মাস্টার অব সায়েন্স এবং তড়িৎ প্রকৌশল ও কম্পিউটার বিজ্ঞানে ১৯৯২ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

ড সেলিম শাহরিয়ার, ড দীপঙ্কর তালুকদার, ব্ল্যাকহোল, থিওরি অফ রিলেটিভিটি, আইনস্টাইন

আর বরগুনার ছেলে ড. দীপঙ্কর লাইগোর যে বিজ্ঞানী দলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল এই সংকেত পৃথিবীর বা এই সৌরজগতের অন্য কোথাও থেকে এসেছে, নাকি এসেছে ব্ল্যাকহোল থেকেই, তা বিশ্লেষণ করে দেখার, তার একজন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে মাস্টার্স শেষ করে বৃত্তি নিয়ে যান প্রথমে যুক্তরাজ্যে, সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটি। মহাকর্ষ তরঙ্গ গবেষণা শুরু করেন ২০০৭ সাল থেকে। ২০০৮ সালে লাইগো সায়েন্টিফিক কোলাবরেশনের সদস্য হন। এখন লাইগো সায়েন্টিফিক কোলাবরেশনের হয়ে কর্মরত আছেন অরিগন বিশ্ববিদ্যালয়ে।

এই গ্র‍্যাভিটেশনাল ওয়েভের আবিষ্কারকে ধরা হচ্ছে পদার্থ বিজ্ঞানের জন্য বিশাল অগ্রগতি। তাত্ত্বিক পদার্থ বিজ্ঞানের একটি আবিষ্কার শত বছর পর সত্য হয়ে বাস্তবে ধরা দিচ্ছে মানুষের এন্ট্যানায়- আরো কত গোপন রহস্য লুকিয়ে আছে আবিষ্কারের অপেক্ষায় এই বিশাল বিশ্ব ব্রহ্মান্ডে কে জানে!

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-