ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

দুর্ভাগা সেলিম ব্যাপারীর লাশটাও বিক্রি হয়ে গেল ২০ লাখ টাকায়?

আচ্ছা, কে কে ভেবেছিলেন যে নিরীহ পথচারী সেলিম ব্যাপারীকে পিষে মারার দায়ে এমপি পুত্র শাবাবের বিচার হবে?

অনেকেই রসিকতা ভাবছেন, তাই না? আসলেই, কোন অপরাধের প্রতিবাদ করা এবং বিচার চাওয়ার ব্যাপারটাই আজ খুব বিচিত্র আর হাস্যকর এক রসিকতায় পরিণত হয়েছে। একটা অপরাধ ঘটবে এবং তারপর সমাজের প্রভাবশালী, বিত্তশালী, ক্ষমতাশালী মানুষগুলোকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে তার বিচার হবে, এটা আজকাল সত্যিই রসিকতার মত শোনায়। ঠিক যেমনটি শুনিয়েছিল যখন আমরা এমপি পুত্র শাবাবের বিচার চেয়েছিলাম। কোথাকার কোন সামান্য এক ড্রাইভার নাহয় গাড়ির তলে পিষেই গেছে একটু, তার জন্য আবার বিচারটিচার চেয়ে কি হুলুস্থুল ব্যাপার দেখো তো! এমপির ছেলেকে যদি আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়, তাহলে এমপি সাহেবের আর তার পদে থেকে কি লাভ? তাই এমপি সাহেব দয়াপরবশ হয়ে প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে মামলাটা তুলে নিলে কিছু টাকা ধরিয়ে দেওয়া হবে সেলিম ব্যাপারীর পরিবারকে। তারা সেই প্রস্তাব মেনে নিয়েছে, ২০ লাখ টাকায় বিক্রি করেছে সেলিম ব্যাপারীর লাশটা। সুন্দর চুক্তি, এমপি ছেলেও বেঁচে গেল, পরিবারও সেলিম মোল্লার লাশ বিক্রি করে পেরে খুশী হলো, আর মাঝখান দিয়ে আমরা যারা একটা জলজ্যান্ত খুনের বিচার চাইলাম, তারা বরাবরের মতই পেলাম আইঠা কলা! চমৎকার না?

যে মেয়ের সাথে সেদিন রাতে দেখা করতে যাচ্ছিলেন সেলিম ব্যাপারী, সেই মেয়ের জামাই এবং সেলিমের বোন জামাই আবদুল আলীম সংবাদমাধ্যমগুলোকে জানিয়েছেন, “সেলিমের স্ত্রী চায়না ব্যাপারীর ব্যাংক এ্যাকাউন্টে ২০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। আর প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন এমপি সাহেব। ভবিষ্যতেও পাশে থাকবেন বলেছেন।”

তো, এমপির সাহেবের পক্ষ থেকে এই শান্তিচুক্তির বার্তা নিয়ে কে গেলেন সেলিমের পরিবারের কাছে? আবদুল আলিম জানান, গত বৃহস্পতিবার রাতে মহাখালীর ডিওএইচএসে নাওয়ার প্রোপার্টিজের ব্যাবস্থাপনা পরিচালক ইমরান হোসেনের উপস্থিতিতে ওই আপস বৈঠক হয়। সেলিম ব্যাপারীর পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি এমপি একরামুল করিমের পক্ষে কয়েকজন সেখানে ছিলেন।

এই নাওয়ার প্রপার্টিজের গাড়ি চালাতেন সেলিম। তাদের প্রতিষ্ঠানে গত ২০ বছর ধরে সুনামের সাথে ড্রাইভার হিসেবে কর্মরত থাকা সেলিমকে এমন নৃশংসভাবে পিষে মারার পর মামলাটা পরিচালনায় সেলিমের পরিবারকে সাহায্য করা উচিৎ ছিল তাদের, সেলিমের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, ন্যায়বিচার পাইয়ে দেওয়া উচিৎ ছিল। কিন্তু এটা যে বাংলাদেশ! তাই পাশে দাঁড়ানোর বদলে ন্যায়বিচার নিশ্চিতের চেষ্টার বদলে তিনি খুনী শাবাবের পক্ষ থেকে নিয়ে এলেন ঝামেলা মিটিয়ে ফেলার প্রস্তাব! নিজের পক্ষে আবার সাফাইও গেয়েছেন তিনি। সংবাদমাধ্যমের সামনে ইমরান বলেছেন, এমপি একরামুল করিম চৌধুরী বৃহস্পতিবার রাতে তাকে ফোন করে সমঝোতার প্রস্তাব দেন। তিনি চান, নিহতের পরিবারের পাশে থাকার বিনিময়ে তারা কাফরুল থানায় করা মামলা প্রত্যাহার করে নেবে। পরে এমপি সাহেব আমার অফিসে লোক পাঠিয়েছিলেন সমঝোতার জন্য। সেলিম ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। এ কারণে তার পরিবারের জন্য ৩০ লাখ টাকার একটি ফিক্সড ডিপোজিট করে দেওয়ার প্রস্তাব সাংসদকে দিয়েছিলেন বলে জানান ইমরান।

আহ, কি অসাধারণ দিলদরিয়া! ভাবা যায়? এমপি সাহেব দয়াপরবশ হয়ে পাশে দাঁড়াতে চেয়েছেন, এটাই তো অনেক কিছু, তার ওপরে ইমরান সাহেব আবার পরিবারের কথা চিন্তা করে টাকাও চেয়েছেন। যে গেছে সে তো গেছেই, এখন তার লাশটা বিক্রি করে দিয়ে যা টাকা পাওয়া যায় আর কি! এটা তো ওই পরিবারের ভালোর জন্যই, তাই না? সবমিলিয়ে সবদিকই রক্ষা। শত হলেও এককালীন ২০ লাখ টাকার পাশাপাশি মাসে মাসে ২০ হাজার টাকা করে যেখানে পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে কেন বাবা একজন মৃত মানুষের বিচার পেতে উদয়াস্ত কোর্টে দৌড়াদৌড়ি করবো? আর দৌড়াদৌড়ি করলেই যে বিচার পাবো, তা তো আর না! বরং বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও এই মামলার বিচার হবে না, কারণ শাবাবের বাবা কেবল এমপিই নন, বাংলাদেশের অন্যতম বড় কোটিপতি ব্যবসায়ী! বছরের পর বছর তো দূরে থাক, তিনি চাইলে প্রমাণের অভাবে বন্ধ হয়ে যাবে এই মামলা। আর যেহেতু কাউকে অভিযুক্ত করে মামলা দায়ের করা হয়নি, সুতরাং অপরাধী হয়ে থাকলেও, সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে তার প্রমাণ থাকলেও শাবাবের কোন শাস্তিই হবে না। পাবলিক বেশি ক্যাচম্যাচ করলে এমপি সাহেবের ৫-৬ জন ড্রাইভারের যে কোন একজনকে বলির পাঁঠা বানিয়ে অভিযুক্ত আসামী হিসেবে কাঠগড়ায় তুলে দেওয়া হবে। শাবাব সব হিসেবেই শাস্তির বাইরে, বিচারের বহু উর্দ্ধে! সুতরাং যে মামলার ভবিষ্যৎ হচ্ছে প্রমাণে অভাবে কয়েকদিন পর খারিজ হয়ে যাওয়া কিংবা কোন ড্রাইভারের বলির পাঁঠা হওয়া, কেন সেই মামলা চালাবে সেলিম ব্যাপারীর পরিবার? এর চেয়ে আপোষের প্রস্তাবে রাজি হয়ে নগদ নারায়ণের বিনিময়ে লাশটা বিক্রি করে দেওয়াই যুক্তিযুক্ত না?

আজকের পরেও এমপিপুত্র শাবাব চৌধুরী তার অডি গাড়ি নিয়ে বেরোবেন, ইচ্ছেমত বেপোরোয়া গাড়ি চালাবেন, হয়তো আরও কিছু মানুষ মারবেন, সেগুলোর খবর হয়তো আমরা জানবোও না, মৌজ-মাস্তিতে সুখে-শান্তিতে বাকি জীবন কাটাবেন, কয়েক বছর পর হয়তো ইলেকশনে দাঁড়াবেন বাবার জায়গায়, নির্বাচিত হবেন, জনপ্রতিনিধি হিসেবে একজন কুশলী রাজনীতিবিদ হিসেবে মন্ত্রীও হয়ে যেতে পারেন। যেভাবে টাকার বিনিময়ে তিনি একজন মানুষের জীবন, লাশ এমনকি বিচারের দাবীটাও পর্যন্ত কিনে নিলেন, তাতেই বোঝা যায় তিনি এই দেশের, এই দেশের জনগণের জন্য সবচেয়ে যোগ্য রাজনীতিবিদ। পেছনে এই পচে যাওয়া সমাজের পচে যাওয়া মানুষগুলোর পাপ আর অপরাধের গ্লানি নিয়ে মাটির নীচে পড়ে থাকবে কেবল একজন সেলিম ব্যাপারীর লাশ, বিনা অপরাধে বিনা কারণে যাকে পিষে ফেলা হয়েছিল, যার লাশটাও বিক্রি করে দিয়েছিল তার আপনজনেরা!

Comments

Tags

Related Articles