জীবনের নানা পর্যায়ে মানুষের মৃত্যুর ইচ্ছে জাগে। এক একটা সময় হতাশা কিংবা অন্যান্য কারণে সে আর বাঁচতে চায় না, বিদায় নিতে চায় এই ধরাধাম থেকে। কতজন তো জীবনের কাছে পরাজিত হয়ে নিজেই নিজেকে শেষ করে দেয়, ভবলীলা সাঙ্গ ঘটে তার। তবে জীবনের সময়সীমা যতোই ফুরিয়ে আসে, মানুষের বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা ততই প্রবল হয়ে ওঠে। গলায় দড়ি দিয়ে যে ছেলেটা কয়েক সেকেন্ড আগেই ঝুলে পড়েছে, সে’ও মৃত্যুর আগে কামনা করে আরও কিছু মূহুর্তের আয়ু। যে মেয়েটা পৃথিবীকে শত্রু ভেবে ছাদের ওপর থেকে ঝাঁপ দিয়েছে, সে’ও পতনের আগের কয়েকটা সেকেন্ড হয়তো মনে মনে ভাবে, বোকামীটা না করলেও বোধহয় হতো!

সে যাই হোক, বেঁচে থাকার আকুতিটা মানুষের সহজাত একটা প্রবৃত্তি, প্রকৃতি এটা মানুষের হরমোনেই গেঁথে দিয়েছে। তবে ভারতের এক দম্পতি বেশ বিরল একটা দৃষ্টান্তই স্থাপন করেছেন ক’দিন আগে। দেশের রাষ্ট্রপতির কাছে তারা আবেদন করেছেন স্বেচ্ছামরণের। কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন বার্ধ্যক্য এবং সমাজের বোঝা হতে না চাওয়াকে। বেশ অদ্ভুত কারণ বটে! রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোভিন্দকে লেখা চিঠিতে তারা জানিয়েছেন, স্বাভাবিক আয়ুকাল তারা পার করেছেন, জীবনের কাছে তাদের আর কিছুই চাইবার নেই, আবার সমাজ বা সংসারেও কোন অবদান রাখার মতো শক্তি বা সামর্থ্য এই মূহুর্তে অবশিষ্ট নেই তাদের কারোই। এ কারণে বেঁচে থেকে অন্যের বা সমাজের বোঝা হতে চান না এই দম্পতি। রাষ্ট্রপতির কাছে কেন চিঠি লিখেছেন, সেটাও জানিয়েছেন তারা, বলেছেন, সংবিধান অনুসারে একমাত্র রাষ্ট্রপতিই পারেন প্রাণদণ্ড মওকুফ করতে। কাজেই প্রাণহরণের আর্জিও তার কাছেই করা চলে।

দক্ষিণ মুম্বাইয়ের গ্র‍্যান্ট রোডে একরুমের একটা ছোট্ট ফ্ল্যাটে বসবাস নারায়ণ লাভাতে (৮৮) আর তার স্ত্রী ইরাবতী লাভাতের (৭৮)। সাজানো গোছানো ছিমছাম একটা কামরা, তাকভর্তি ঔষধপথ্যি, বুড়ো বয়সে এসব তো সকলেরই নিত্যসঙ্গী। তবে এই ছোট্ট ঘরেও যেটা দৃষ্টি কেড়ে নেবে সবার আগে, সেটা হচ্ছে থরে থরে সাজানো গোটা চল্লিশের মোটাসোটা আইনের বই। স্বামী-স্ত্রী দুজনের কেউই ওকালতি করেননি জীবনে, কর্মজীবনে নারায়ণ ছিলেন সরকারী চাকুরে, কাজ করতেন সড়ক পরিবহন কর্পোরেশনে; ১৯৮৯ সালে অবসরে গিয়েছেন। আর ইরাবতী কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে অবসর নিয়েছেন। তাহলে এত এত আইনের বই দিয়ে এই বৃদ্ধ দম্পতির কাজটা কি?

গত একবছর ধরেই এই বইগুলো গুলে খাচ্ছেন নারায়ণ আর তার স্ত্রী ইরাবতী। স্বেচ্ছামৃত্যুর ধারণাটা পৃথিবীতে একদম নতুন নয়। বিশ্বের বেশকিছু দেশেই এই নিয়মটা চালু আছে, সেসব দেশে সরকারের কাছে আবেদন করে কেউ আত্মহত্যার অনুমতি নিতে পারেন, তবে অবশ্যই যথাযথ কারণ দেখানো সাপেক্ষে। মরণঘাতি ব্যাধি বা এই ধরণের কোন সমস্যায় আক্রান্ত হলেই সাধারণত এরকম আবেদন করতে দেখা যায়। কিন্ত নারায়ণ বা তার স্ত্রীর তো এই ধরনের কোন সমস্যা নেই, বড় মাপের কোন রোগ-বালাইতেও তারা আক্রান্ত নন, মোটামুটি সুস্থ দেহেই তারা আছেন, এখনও নিজের কাজ নিজে করতে পারেন। আর ভারতে এই স্বেচ্ছামরণের নিয়মটা চালু নেই, একারণেই আইনের শরণাপন্ন হয়েছেন এই দম্পতি। চেষ্টা করছেন ফাঁকফোঁকর কিছু বের করা যায় কিনা। তাতে ব্যর্থ হয়েই রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন জানিয়েছেন তারা।

কিন্ত কেন এই দম্পতি স্বেচ্ছামৃত্যুকে বরণ করে নিতে চান? দুজনের যা বয়স, স্বাভাবিক আয়ুর সময়সীমা তো পেরিয়ে গেছে ইতিমধ্যেই, যে ক’টা দিন বেঁচে থাকতে পারেন সেটাই বোনাস। সেই বোনাসটা নিতে এত আপত্তি কেন নারায়ণ আর ইরাবতীর?

স্বেচ্ছামরণ, স্বেচ্ছামৃত্যু, ভারতীয় দম্পতির স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন, আত্মহত্যা

টুইস্টটা এখানেই। কোন সন্তানাদি নেই, কাজেই এই বুড়ো বয়সে কারো মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে চান না তারা দুজন। কারো দয়ায় বাঁচতে চান না, কারো ভরসায় জীবনের শেষ মূহুর্তগুলো কাটাতে চান না। হিন্দুস্তান টাইমসকে এবং ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে এই দম্পতি জানিয়েছেন, তাদের সবচেয়ে বড় ভয়টা মৃত্যুকে নয়, বিচ্ছেদকে। প্রায় ষাট বছরের সংসারজীবন তাদের, একসঙ্গে কতশত মূহুর্ত পার করেছেন হাসিকান্নায়, হাত ধরে পথ চলেছেন দুজনে। একদিন এই পথচলা থামবে সেটা তারাও জানেন, কিন্ত কেউ আগে চলে যাবেন, অন্য একজন তার কাছে যাবার অপেক্ষায় বিনিদ্র প্রহর কাটাবেন- সেটা তারা মানতে পারবেন না। সাত জনম সাথে থাকবেন পণ করে সাত পাকে বাঁধা পড়েছিলেন দুজনে, মৃত্যুতে যেন সেই বন্ধনে ছেদ না পড়ে সেটাই ওদের কামনা। হাসপাতাল বা ওল্ডহোমে শেষ আশ্রয় হোক, এটা কেউই চান না, চান না লাভাতে দম্পতিও। আর সে কারণেই ওদের আর্জি, এই স্বেচ্ছামরণের অনুমতি যেন তাদেরকে দেয়া হয়।

সুইজারল্যান্ডে স্বেচ্ছামৃত্যু নিয়ে কাজ করে এমন একটা সংগঠনের সঙ্গে ওদের যোগাযোগ হয় বেশ কয়েক বছর আগে। এই সংগঠনটা তাদের ক্লায়েন্টের পক্ষে ওকালতি করে, সরকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথাবার্তা বলে আইনী ব্যাপারগুলোর সমাধান করে, মক্কেলকে স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমতি পাইয়ে দেয়াটাই ওদের কাজ। সেই সংগঠনের সঙ্গে লাভাতে দম্পতির কথাবার্তা অনেকদূর এগিয়েছে। কিন্ত ভারতে ওদের কোন শাখা নেই, তাছাড়া ভারতে এই ব্যাপারটাই নিষিদ্ধ, এই ধরণের কোন আইনও প্রণয়ন হয়নি এখনও পর্যন্ত। দুজনেরই পাসপোর্ট আছে, কিন্ত বিপত্তি বেঁধেছে আরেক জায়গায়। ইরাবতীকে সুইজারল্যান্ড সরকার ভিসা দিলেও, দুইবার রিজেক্ট হয়েছেন নারায়ণ। কাজেই তারা সুইজারল্যান্ডও যেতে পারছেন না একসঙ্গে। আর ইরাবতী স্পষ্ট না করে দিয়েছেন একা যাবার ব্যপারে, তার সাফ কথা- “ওকে ছাড়া আমি কিছুতেই মরবো না!”

ওরা যে কামরাটায় থাকেন, সেখানে একটামাত্র বিছানা। সেটায় বসেই নারায়ণ বলছিলেন- “ধরুন কাল ধরা পড়লো আমার ক্যান্সার হয়েছে, দুই মাস আমার আয়ু। এই দুটো মাস কি আমাদের কাছে নরকসম যন্ত্রণার হবে না? ও সারাক্ষণ ভাববে আমাকে হারিয়ে ফেলছে, আমি সারাক্ষণ ভাববো ওকে ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে। এসব ঝামেলার মধ্যে না গিয়ে একসঙ্গে সবাইকে বিদায় বলে দেয়াটাই কি ভালো নয়? পৃথিবীতে ওর চেয়ে বেশী কাউকে তো আমি ভালোবাসিনি, সেই ভালোবাসার মানুষটার সঙ্গেই আমি চলে যেতে চাইছি, সরকারের তো এখানে আপত্তি থাকার কথা নয়।”

দুজনে তাই আবেদন জানিয়েছেন, ‘অ্যাক্টিভ ইউরেশিয়া’ পদ্ধতিতে তাদের স্বেচ্ছামৃত্যু বরণ করে নিতে তাদের যেন সরকার অনুমতি দেয়। অ্যাক্টিভ ইউরেশিয়া পদ্ধতিতে ব্যথানাশক ঔষধ অতিমাত্রায় প্রবেশ করানো হয় মানুষের শরীরে, এর ফলে কোনরকম যন্ত্রণা অনুভব করা ছাড়াই মানুষের মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।

এখন এই দম্পতির মৃত্যুভাগ্য নির্ভর করছে রাষ্ট্রপতি তথা সরকারের সিদ্ধান্তের ওপরে। যদিও লাভাতে দম্পতির ইচ্ছে পূরণ হবার সম্ভাবনা কমই। বরং রাজ্যসরকার ভাবছে তাদের সব ধরণের দায়িত্ব নেয়ার কথা। রাষ্ট্রপতির কাছে যে আবেদনটি তারা করেছিলেন, সেটার একটা কপি মহারাষ্ট্রের মূখ্যমন্ত্রীর কাছেও পাঠানো হয়েছিল। জয়েন্ট সেক্রেটারি সুরেন্দ্র ঢালিয়া জানিয়েছেন, এরকম আবেদন বেশ কিছু এসেছে তাদের দপ্তরে। কিন্ত যেহেতু এটা বেআইনী, তাই তারা এসব আবেদনে সাড়া দেয়ার এখতিয়ার রাখেন না। তবে মানবিক দৃষ্টিকোণ বিবেচনা করে লাভাতে দম্পতির ব্যপারে তারা দারুণ কিছু সিদ্ধান্তই নিতে যাচ্ছেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ঢালিয়া।

নারায়ণ আর ইরাবতীর এই দাবী হয়তো সরকার মানবে না, কিন্ত সবকিছুর ওপরে একজন তো আছেন শোনার মতো, তিনি ওদের মনোবাঞ্ছাটা পূরণ করবেন বলেই বিশ্বাস করি। যে’কটা দিন ওদের আয়ু, প্রতিটা দিন ওরা বেঁচে থাকুক তুমুল আনন্দ আর ভালোবাসায়, এটাই কামনা।

তথ্যসূত্র- দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

Comments
Spread the love