বর্তমান পৃথিবীতে কোন ব্যাপার গোপন রাখা খুবই কঠিন। প্রযুক্তির উৎকর্ষতা, সংবাদ মাধ্যমের ব্যাপকতা, মানুষের দুর্দমনীয় কৌতুহল এবং এধরণের আরও অনেক কারণে এখন পৃথিবী এসে গেছে মানুষের নখদর্পণে। পৃথিবীর একপ্রান্তে বসে অন্য প্রান্তের অনেক গোপন পাওয়া যায় সহজেই। তবু পৃথিবীতে কিছু রহস্য আর গোপনীয়তা আজও রয়ে গেছে। কিছু ব্যাপার আছে যা অতি গোপনীয়। এতটাই গোপনীয় যে একজনের বেশি দু’জনের পক্ষে জানা সম্ভব হয়নি তা সম্পর্কে।

এমনই অসম্ভব গোপন এক কৌশলের কথা শোনাব আজ। “সি সিল্ক”- এর উৎপাদন কৌশল, যা জানা আছে পুরো পৃথিবীর সাড়ে সাতশ কোটি মানুষের মধ্যে মাত্র একজন মানুষের। কি বিশ্বাস হচ্ছে না? না হওয়ারই কথা। যা হোক, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ভার আপনাদের হাতেই থাক। আমি বরং যা জানলাম বিবিসি এবং ন্যাশনাল জিওগ্রাফির দুটি রিপোর্ট পড়তে গিয়ে তা আপনাদের সাথে শেয়ার করার চেষ্টা করি-

হালকা, মসৃণ, তুলোর মতো একধরণের তন্তু, ‘সি সিল্ক’ বা ‘বাইসেস’ নামে পরিচিত। দুনিয়ার সবথেকে অমূল্য এবং দুষ্প্রাপ্র্য সুতা এটি। এটি তৈরি হয় ভূমধ্যসাগরের এক প্রকার ঝিনুকের লালা থেকে। সি সিল্কের রয়েছে পাঁচ হাজার বছরের পুরনো ইতিহাস। কিংবদন্তী প্রচলিত আছে, ‘সি সিল্ক দিয়ে মেসোপটেমিয়ার রাজাদের কাপড়ে কারুকাজ করা হত। মিশরীয় রাণী নেফারতিতি পরতেন এই সি সিল্ক দিয়ে তৈরি ব্রেসলেট। শুধু তাই নয়, মুসা নবীও নাকি ব্যবহার করেছিলেন এ সি সিল্ক।’

তবে কিংবদন্তী বা ইতিহাস নয়, সি সিল্ক সম্পর্কে সম্ভবত সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আর বিস্ময়কর তথ্য হলো- সি সিল্ক উৎপাদন করা, এটাতে রং করা এবং এটা দিয়ে কারুকাজ করার পদ্ধতি দুনিয়াতে কেবলমাত্র একজন মানুষেরই জানা আছে। ইতালির ৬২ বছর বয়সী বৃদ্ধা কিয়ারা ভিগো’র।

কিয়ারা ভিগো বাস করেন ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত ইতালির সার্ডিনিয়ান দ্বীপের সেন্ট অ্যান্টিওকোতে। তিনি তার মাতৃকুলের এ যাবত পর্যন্ত সর্বশেষ কারুশিল্পী, তিনি ‍উত্তরাধিকার সূত্রে সি সিল্ক বানানোর কৌশল সম্পর্কে অবগত আছেন।

১০০০ বছর পূর্ব থেকে কিয়ারা ভিগোর মাতৃকুল সি সিল্ক বানানোর এই শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন অতি গোপনে। তিনি তার পূর্বসুরীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে, কখনোই সি সিল্ক বিক্রি করেন না। সি সিল্ক দিয়ে তিনি যা তৈরি করেন তা কেবল তিনি উপহার হিসেবে অন্যদের দিয়ে থাকেন। সেগুলো তিনি কোন সন্তানসম্ভবা মহিলা বা কোন নবদম্পতিকে বা কোন পছন্দের কাউকে দিয়ে থাকেন।

কিয়ারা ভিগো তার পূর্বসুরীদের এক শপথকে রক্ষা করছেন উত্তরাধিকার সূত্রে, যাদের কাছে সি সিল্ক খুবই পবি্ত্র বস্তু। কিয়ারা ভিগোর পূর্বসুরীরা শপথ করেছিল, সি সিল্ক কখনোই বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে না। এ শপথ রক্ষা করতেই সি সিল্কের উৎপাদন প্রণালী নিয়ে এত গোপণীয়তা।

কিয়ারা ভিগো জীবিত থাকাকালীন শুধু তিনিই সি সিল্কের প্রস্তুত প্রণালী সম্পর্কে অবগত আছেন। মৃত্যু সন্নিকট হলে, যদি তিনি বুঝতে পারেন, তবে তার মেয়েকে শিখিয়ে দিয়ে যাবেন সি সিল্ক তৈরির কৌশল। কিয়ারা ভিগোর মেয়ের নাম মেডেলিনা। সে সি সিল্ক তৈরির পদ্ধতি অনেকটাই জানে, তবে পুরোপুরি নয়। সে এ সুতা তৈরির পদ্ধতি পুরোপুরি জানতে পারবে কেবল তার মার মৃত্যুর পূর্বে। আর সে যদি জানতে আগ্রহী না হয় বা আকস্মিক মৃত্যুতে মা তাকে জানিয়ে যেতে না পারে, তবে কিয়ারা ভিগোর মৃত্যুর সাথে সাথেই শেষ হয়ে যাবে সি সিল্কের ইতিহাস আর ঐতিহ্য।

শুধু, সি সিল্কই নয়। এমন আরও কিছু গোপন উৎপাদন পদ্ধতি এবং কৌশল আছে যা পৃথিবীতে কেবল একজন মানুষেরই জানা আছে। পাঠক যদি আগ্রহ দেখায় তবে এমন আরও কিছু নিয়ে হাজির হব অন্য কোন দিন।

Comments
Spread the love