ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

ক্ষমতা পেলেই ভগবানের ভেক ধরা তো স্বাভাবিক ঘটনা!

আমিনুল ইসলাম:

এক সাংসদ তার চেয়ারে হাসি হাসি মুখে বসে আছে আর স্কুলের মেয়েগুলো দল বেঁধে ফুলের মালা নিয়ে এমনভাবে তার দিকে এগিয়ে আসছে, দেখলে মনে হবে, সামনে সাংসদ না, কোন দেব-দেবী বসে আছেন; মেয়েগুলো তাকে পুজো করছে। পেছন থেকে অবশ্য গান বেজেই চলছে! সাংসদ চেয়ারে বসে আছে, মেয়েগুলো আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে; সাংসদের সামনে এসে একবার পায়ের সামনে নিচু হচ্ছে, আবার উঁচু হচ্ছে। গানের তালে তালে আর সাংসদ সেই দৃশ্য ৩২ দাঁত বের করে উপভোগ করছে! এ এক অদ্ভুত দৃশ্য। মাত্রই আমার নজরে এসেছে।

তবে আমি শুধু এই সাংসদ কিংবা মন্ত্রী-এমপিদেরই দোষ দিব না। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষই ক্ষমতা পেলে নিজেদের ভগবান মনে করে বসে থাকে। ইউনিভার্সিটি থেকে মাত্রই ফিরেছি। এসে দেখি এক মেয়ে আমাকে টেক্সট করেছে। মেয়েটা সিলেটের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে পড়াশুনা করছে। মেয়েটি লিখেছে-

স্যার, আমি এবার চতুর্থ বর্ষে উঠেছি। আজ আমাদের আগের সেমিস্টারের রেজাল্ট দিয়েছে। সব কোর্সেই সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়েছি, কেবল একটা কোর্সে ‘সি’ গ্রেড পেয়েছি! আমি চেষ্টা করছিলাম যাতে এবার রেজাল্টটা খুব ভালো হয়। কিন্তু এই একটা কোর্সে “সি” গ্রেড পাওয়াতে আমার এভারেজ গ্রেড কমে গিয়েছে। আমি অবশ্য আমার সর্বোচ্চ চেষ্টাই করেছি। কিন্তু কোর্সের ভাইভাতে যেই শিক্ষক ছিলেন- এই শিক্ষকের কোন কোর্স বা তিনি যদি কোন ভাইভা বোর্ডে থাকেন, তাহলে আমি সব সময়ই কম নাম্বার পাই।

প্রথম বর্ষে থাকতে এই শিক্ষক আমাকে ফেসবুকে নিয়মিত নক করতেন, আমার ফোন নাম্বার চাইতেন; ফোন নাম্বার না দেয়াতে আমাকে মেসেঞ্জারে’ই ফোন দিয়ে বসতেন; তাই আমি বাধ্য হয়ে তাকে ব্লক করে দিয়েছি। এরপর থেকেই এই অবস্থা! মেয়েটা অবশ্য এই শিক্ষকের নামসহ আরও বিস্তারিত লিখেছে। আমি অবশ্য শিক্ষকের নামটা তুলে দিচ্ছি না, সেটা উচিতও হবে না।

আমার দর্শন অনুযায়ী, একজন শিক্ষক অতি অবশ্যই একজন ছাত্র কিংবা ছাত্রীকে ভালোবেসে ফেলতে পারে, তার প্রেমেও পড়তে পারে। একজন ছাত্র কিংবা ছাত্রীও তার শিক্ষক কিংবা শিক্ষিকার প্রেমে পড়তে পারে। ইন ফ্যাক্ট যে কেউ যে কারো প্রেমে পড়তেই পারে। ২০ বছরে তরুণ ৫০ বছরের কারো প্রেমে পড়তে পারে। ৫০ বছরের তরুণী, ২০ বছরের তরুণের প্রেমে পড়তেই পারে। সেই প্রেম-ভালোবাসার কথা জানানও দেয়া যেতে পারে। ভালোবাসা পাবার চেষ্টাও করা যেতে পারে যতটুকু সম্ভব সীমার মাঝে থেকে। এরপর ভালোবাসা না পেলে তো আর কিছু করার নেই। মন খারাপ হতে পারে, খারাপ লাগতে পারে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু ভালোবাসা পেলাম না বলে কিংবা অবহেলা পেলাম বলে নিজের ক্ষমতাটুকু প্রয়োগ করতে হবে কেন?

এই মেয়েটা যেই শিক্ষকের কথা লিখেছে, সে কি আদৌ এই মেয়েকে ভালোবেসেছে কিনা আমার জানা নেই কিংবা ঠিক কোন কারণে সে এই মেয়েকে বিরক্ত করত সেটাও আমার জানা নেই। তবে মেয়েটা তাকে ব্লক করে দেয়ার কারনণে- সে তার হাতে ঠিক যতটুকু ক্ষমতা আছে সেটাই ব্যবহার করছে। সে যেহেতু মেয়েটার শিক্ষক, তার হাতে মেয়েটাকে নাম্বার দেয়ার ক্ষমতা আছে; তাই সে মেয়েটাকে নাম্বার হয়ত কম দিয়ে দিচ্ছে, কিংবা হয়ত মেয়েটা এমনিতেই কম নাম্বার পাচ্ছে!

তবে মেয়েটা যেহেতু বলছে সে অন্য আর সব কোর্সে ভালো নাম্বারই পাচ্ছে, সুতরাং ওই শিক্ষকের ক্ষমতা ব্যবহার থাকলেও থাকলেও থাকতে পারে। এই শিক্ষক তার এই ক্ষমতাটুকু ব্যবহার করছেন কি করছেন না; সেটা মূল ব্যাপার না; ব্যাপারটা হচ্ছে এই ধরনের ঘটনা তো প্রায়ই ঘটছে। যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করছে, তাদের অনেকেরই এমন অভিজ্ঞতা আছে বলেই আমার ধারণা! এখন যে মানুষটা সরকারি দলের এমপি হয়েছে; সে চাইলেই তার এলাকার পুলিশ অফিসারকে ধমক দিতে পারছে, টিএনওকে যা ইচ্ছে তাই বলতে পারছে; সে তো নিজেকে দেব-দেবী তুল্য মনে করবেই! এটাই আসলে স্বাভাবিক!

কেন, আপনাদের কি মনে নেই- আমাদের মহামান্য মন্ত্রী মশাই এক মটর সাইকেল যাত্রীকে ইচ্ছেমত কষিয়ে চড় মেরেছিল হেলমেট না থাকার কারণে? আইন অমান্য করলে, দেশের কোন মন্ত্রীর চড় দেয়ার অধিকার আছে, এমন কোন আইন কি কোথাও লেখা আছে? তো, সেই মন্ত্রীর কি কোন বিচার হয়েছে? এই একই মন্ত্রী অবশ্য নিজেই এরপর দিব্যি হেলমেট ছাড়া মটরসাইকেলে চড়েছেন। এতে অবশ্য কেউ তাকে চড় মেরেছে বলে শুনতে পাইনি! নারায়ণগঞ্জের ওই সাংসদ যখন স্কুল শিক্ষককে কানে ধরে সবার সামনে উঠবস করিয়েছিল; তার কি কোন বিচার হয়েছে? তো, এখন কেন আপনারা আরেক সাংসদ চেয়ারে বসে নিজেকে ভগবান মনে করে মনের আনন্দে ৩২ দাঁত বের করে সামনে দাঁড়ানো স্কুলের ছাত্রীগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে দেখে এত অবাক হচ্ছেন? এতে তো অবাক হবার কিছু দেখছি না! অন্তত এই সাংসদ তো কাউকে দিনে দুপুরে সবার সামনে চড়-থাপ্পড় মেরে বসেনি, কিংবা কোন শিক্ষককে হাজার হাজার মানুষের সামনে কানে ধরে উঠবস করাননি।

এই সাংসদের ভিডিওটা এখন ভাইরাল হয়ে গিয়েছে। তার দলের লোকজনই এই নিয়ে সমালোচনা করছে। আমি জানি না, এই সাংসদের কপালে কি ঘটতে যাচ্ছে। তবে আমি এটা জানি- যেই মন্ত্রী একজনকে চড় মেরে বসেছিল কিংবা যেই সাংসদ একজনকে কানে ধরে উঠবস করিয়েছিল; তাদের অবশ্য কোন কিছু হয়নি! আপনাদের জানিয়ে রাখি, চড়-থাপ্পড় মারা এবং কানে ধরে উঠবস করার ব্যাপারটা আসলে এখন অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে আমাদের কাছে। ভবিষ্যতে স্কুল-কলেজের ছেলে-মেয়েরা এমপি-মন্ত্রীদের এভাবে পুজা করছে; এটাও বোধকরি আমাদের কাছে স্বাভাবিক হয়ে যাবে!

সত্যজিৎ রায় (তার সিনেমা) তো আর এমনি এমনি অস্কার পায়নি! শত বছর আগেই তিনি এসব ভেবে গিয়েছেন, লিখেছেন এবং সিনেমাও বানিয়েছেন! সরকার যায়-আসে। রাজাও আসে-যায়! মাঝখান থেকে আমাদের সোনার দেশটা কবে যে “হীরকের” দেশ হয়ে গেল, সে হয়তো আমরা নিজেরাও বুঝে উঠতে পারিনি।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close