ইনসাইড বাংলাদেশরাজনীতি নাকি জননীতি

ছাত্রলীগের স্কুল কমিটির সিদ্ধান্ত ‘ব্যাকফায়ার’ করবে কি?

আমার ছোট ভাইটা ঢাকার মোটামুটি নামকরা একটা হাই-স্কুলে ক্লাস সিক্সে পড়ে। আজ বাসায় এসে তাকে জিজ্ঞেস করলাম স্কুলের অবস্থা কি। সে যা বর্ণনা দিলো- অবস্থা আমার অনুমানের চেয়েও ভয়াবহ! স্কুলে নাকি অনেক গ্যাং-এ বিভক্ত! তূর্য গ্যাং, শিহাব গ্যাং- এরকম বেশ কিছু গ্যাং এর নাম বললো। এরা তুচ্ছ কারণে স্কুলের মধ্যে ঘোষণা দিয়ে মারামারি করে। কোন গ্যাং সবচেয়ে বেশি পাওয়ারফুল সেটা নিয়ে রেষারেষি লেগেই থাকে- বারুদের মতো অবস্থা, পান থেকে চুন খসলেই দাউদাউ করে জ্বলে উঠে। এসব গ্যাং এর মেম্বাররা হলো নামকরা এই স্কুলের ক্লাস সেভেন থেকে টেনে পড়া ছেলেরাই। কেউ কোন গ্যাং এর মেম্বার বা কোন গ্যাং এর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে তাদের ‘প্রটেকশনে” না থাকলে স্কুলে তার নিরপত্তার কোন মা বাপ নাই!

শুধু তাই না- বড় ধরণের ঝামেলা বাঁধলে এরা বাইরে থেকে বড় ভাই পর্যন্ত ধরে নিয়ে আসে! স্কুল টাইমের পর কাছাকাছি কোথাও চলে পাওয়ারের শো ডাউন। এসব গুন্ডা মাস্তান টাইপের ছেলেদের দলের রেষা-রেষির ফাঁকে পড়ে নিরীহ ছেলেরা প্রায়ই মারটার খায়। তাদের অনেকে সাথে ধারালো অস্ত্রও রাখে। সেগুলোর আবার নানান গালভরা নাম আছে- কিরীচ, ডলফিন, ব্লেড, সুইচ গিয়ার… অনেকগুলার নামও শুনি নাই! ছোটভাইয়ের এক বন্ধুও নাকি এক গ্যাং এর সবচেয়ে শক্তিশালী মেম্বার, তাই সে এগুলো জানে। প্রচন্ড দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম সাথে সাথে!

এখন আপনারাই বলুন- ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত সনামধন্য একটা স্কুলের ভেতরের পরিস্থিতি যদি এরকম হয় তাহলে দেশের বাকি স্কুলগুলোতে কি চলছে? আর এখন যদি এর মধ্যে দেশের ক্ষমতাশীল দলের ছাত্র সংগঠনের কার্যকর কমিটি করা হয় হাইস্কুল গুলোতে তাহলে তার নেতৃত্বে কারা আসবে? ফার্স্ট বেঞ্চে বসা সারাদিন মুখ গুঁজে থাকা ছেলেটা? নাকি সেই শিহাব, তূর্য, কাশফিরা যারা অলরেডি হাইস্কুলেই তাদের ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে, এলাকায় পাওয়ার-ওয়ালা বড় ভাইদের সাথে উঠা-বসা করে? তারা বসে বসে আংগুল চুষবে আর শান্তশিস্ট ভালো ছেলেরা নেতা হবে, এইটা বুঝাতে চাচ্ছেন? সিরিয়াসলি?

আমিও একমত- স্কুল লেভেল থেকেই আমাদের ছেলে মেয়েদের ভেতর দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, স্বাধীনতার ইতিহাস, আমাদের শহীদদের আত্মত্যাগ- এসব ব্যাপারে মূল্যবোধ গড়ে তুলতে হবে। আর সে জন্য অনেক চমৎকার কার্যকর উপায় খুঁজে পাওয়া সম্ভব। স্কুলের ছেলেমেয়েদের ভেতরে কমিটি না করে স্থানীয় কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে প্রতি সপ্তাহে সেমিনার, মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা দেখানোর আয়োজন, মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক বইয়ের পাঠচক্র আলোচনা করা যেতে পারে। এখনো বেঁচে আছেন এরকম মুক্তিযোদ্ধাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে তাদের মুখ থেকে গল্প শোনানোর আয়োজন করা যায় স্কুলগুলোতে। মুক্তিযুদ্ধের উপর রচনা প্রতিযোগিতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, উপস্থিত বক্তৃতা, চিত্রাঙ্কণ প্রতিযোগিতা- সচেতনতা বাড়াতে চাইলে উপায়ের অভাব নেই! তার বদলে স্কুলে স্কুলে ক্ষমতাসীন দলের বর্তমানে সবচেয়ে উত্তপ্ত অংগসংঠন- যারা প্রায়ই সংবাদ শিরোনাম হয় নিজেদের ভেতরেই বিভিন্ন স্বার্থে সংঘর্ষে জড়িয়ে- তাদের সক্রিয় কার্যক্রম চালু করে কতটা আদর্শগত সাফল্য আসবে তা নিয়ে আশঙ্কা থেকেই যায়। এক সময় দেশের সবচেয়ে মেধাবীরা রাজনীতিতে আসতো। এখন কিন্তু সেই দৃশ্যটা বদলে গেছে। স্কুল গুলোতে অলরেডি ক্ষমতা, হ্যাডম ডেয়ারিং এর শোডাউনের যে ধিকিধিকি আগুন জ্বলছে তাতে রাজনৈতিক ক্ষমতার পেট্রোল ঢাললে ফলফল কি হবে তা নিয়ে আমরা গার্জিয়ানরা প্রচন্ড উদ্বেগে থাকবো।

এতদিন বিভিন্ন পলিটিকাল সংঘর্ষের যের ধরে দেশের ভার্সিটি গুলো যখন তখন বন্ধ হয়ে যেত অনির্দিষ্টকালের জন্য। ভবিষ্যতে যে এই খবর হাইস্কুলগুলো থেকে আসবে না তার নিশয়তা কে দিচ্ছে আমাদের বর্তমান অস্থিরতাময় বাস্তবতায়?

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close