অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

একজন আইয়াকো সুকিনি এবং কিছু কাকতাড়ুয়া!

জাপানের প্রধান চারটি দ্বীপ হোক্কাইডো, হনসু, কিউসু এবং শিকাকু। এ চারটি দ্বীপের মধ্যে সবচেয়ে ছোট আর অবহেলিত দ্বীপটির নাম শিকাকু। অবহেলিত বলছি কারণ এই দ্বীপটির রাস্তাঘাট, যোগাযোগ ব্যবস্থা বা পর্যটনশিল্প খুব একটা উন্নয়নের মুখ দেখেনি আজও। এখানকার মানুষের জীবিকার মাধ্যম আজও কৃষিতেই সীমাবদ্ধ। জীবন ও জীবিকার তাগিদে সবসময়ই সংগ্রাম করতে হয় এ দ্বীপের অধিবাসীদের। তা বলে শিকাকু দ্বীপটি যে মন্দ তা কিন্তু বলছি না! খুব একটা উন্নত না হলেও, এ দ্বীপেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রাচুর্য রয়েছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে রয়েছে এখানকার ৮৮টি প্রাচীন আর ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধ মন্দির। তবু, শিকাকু দ্বীপে দর্শনার্থীদের আনাগোনা জাপানের অন্য তিনটি প্রধান দ্বীপের তুলনায় অনেক কম।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাপানের এই কম আকর্ষণীয় দ্বীপটিরই একটি গ্রাম পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। শিকাকু দ্বীপের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সবুজে ঘেরা আইয়েল ‍উপত্যকার ছোট্ট এ গ্রামটির নাম নাগোরো। এ গ্রামের মোট বাসিন্দা ২২৭ জনের মত। এর মধ্যে ২৭ জন জীবিত, আর বাকিরা প্রাণহীন।

প্রাণহীন বাসিন্দা! অবাক হচ্ছেন তো! ভাবছেন, ভূত নাকি রে বাবা! না, ভূত না, তবে সত্যিই প্রাণহীন শ দুয়েক বাসিন্দার বাস এই নাগোরো গ্রামে। আর এই প্রাণহীন অদ্ভূত বাসিন্দারাই এ গ্রামের মূল আকর্ষণ। তাদের দেখতেই শত শত পর্যটকের আগমণ ঘটে নাগোরো গ্রামে।

নাগারো গ্রামটিতে গেলে, প্রবেশ পথেই হয়তো দেখা মিলবে পায়ে বুট, হাতে গ্লাভস, মাথায় টুপি এবং ফিটফাট পোশাক পরা মানবসদৃশ এই প্রাণহীন বাসিন্দাদের। হয়তো রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে বা গাছের তলায় বসে আছে, হয়তো বাগানে কাজ করছে বা দলবেধে বাসস্টপে দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে মানুষ বলে ভ্রম হলেও, ভুল ভাঙবে কাছাকাছি হতেই। মানুষ নয়, মানুষের বেশে দাঁড়িয়ে বা বসে আছে কতগুলো পুতুল। গ্রাম জুড়ে মানুষের মত সেসব পুতুলের সংখ্যা এতটাই বেশি যে, দূর থেকে দেখলে যে কারও মনে বিভ্রম তৈরি হবে, কখনো সত্যিকার মানুষকেও পুতুল মনে হবে, আবার কখনো পুতুলকে মনে হবে মানুষ।

গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এমন পুতুলের সংখ্যা দুই’শরও বেশি। কাকতাড়ুয়ার মত করে বানানো এইসব পুতুলের কারণে নাগারো গ্রামের নামই হয়ে গেছে, “কাকতাড়ুয়া গ্রাম”। এ নামেই এখন দর্শনার্থীদের কাছে বেশি পরিচিত গ্রামটি। কিন্তু কে বানিয়েছে এত এত পুতুল? কেনই বা বানিয়েছে? মানুষের মত ঢঙে কি কারণেই বা সাজিয়েছে এদের?

পুতুলগুলো যিনি বানিয়েছেন তিনি এ গ্রামেরই বাসিন্দা। ভদ্রমহিলার নাম আইয়ানো সুকিনি। ভদ্রমহিলার বাড়িতে গেলে হঠাৎ কারো মনে হবে, ভুল করে হয়তো কোন পুতুলের জাদুঘরে চলে এসেছে। সারা বাড়ির আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে নানা-রঙের আর ঢঙের পুতুল। পুতুলগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে, স্কুল ড্রেস পরা কোন ছোট্ট মেয়ে বা বাচ্চা কোলে বসে আছে কোন মা, বৃদ্ধ কোন ভদ্রলোক স্যুটেড-বুটেড হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সিগারেট হাতে। কিমানো পরে দাঁড়িয়ে আছে কোন নবদম্পতি।..এসব দেখে মজা লাগবে হয়তো, প্রথম দেখায় কৌতুক অনুভব করবে হয়তো অনেকে। কিন্তু যখন জানা যাবে, কেন বানিয়েছে আইয়ানো সুকিনি এসব পুতুল, তখন কৌতুকের জায়গা দখল করবে এক অদ্ভূত শূন্যতা আর বিষণ্ণতার অনুভূতি।

আইয়ানো সুকিনির জন্ম হয়েছে নাগোরো গ্রামে। ছোটবেলাও কেটেছে এখানেই। কিন্তু উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময় তারা সপরিবারে পাড়ি জমিয়েছিল জাপানের বন্দরনগরী ওসাকায়। সেখানেই বিয়ে আর সন্তান হয়েছিল ভদ্রমহিলার। কিন্তু পরে কি যেন কি কারণে, ২০০০ সালের দিকে তিনি আবারও এ গ্রামে ফিরে আসেন। মা মারা যাবার পরে বৃদ্ধ বাবার দেখাশোনা  আর তাকে সঙ্গ দেবার জন্য থেকে যান এ গ্রামেই।

আইয়ানো সুকিনি প্রথম কাকতাড়ুয়া বানিয়েছিলেন ২০০২ সালের দিকে। অন্যসকলের মতো, ফসলের ক্ষেত থেকে পাখি তাড়াবার জন্যই কাকতাড়ুয়া বানিয়েছিলেন ভদ্রমহিলা। কিন্তু এরপর যেগুলো বানিয়েছেন, সেগুলো নিছক কাকতাড়ুয়া হিসেবে বানাননি। বানিয়েছেন কাছের কারো স্মৃতি রক্ষার্থে, কোন আপনজনের শূন্যতা পূরণে বা হারানো মানুষকে খুঁজে পেতে।

২০০২ সালের দিকে যখন সুকিনির পাশের বাড়ির বৃদ্ধা ভদ্রমহিলা মারা গেলেন, তখন তার খুবই মন খারাপ হলো। সুকিনি প্রায়ই সেই প্রতিবেশী মহিলার সাথে গল্প করতেন। তাই সেই মৃত মহিলার শূন্যতা পূরণে তিনি সেই বৃদ্ধার আদলে তৈরি করলেন একটা পুতুল বা কাকতাড়ুয়া। তিনি নিয়ম করে বৃদ্ধার সেই প্রতিকৃতির সাথে গল্প করতে শুরু করলেন। এসব শুনে মনে হতে পারে আইয়ানো সুকিনি নামক ভদ্রমহিলা হয়তো বাতিকগ্রস্থ। কিন্তু না, তিনি বাতিকগ্রস্থ বা পাগল নয়, তিনি পুরোপুরি সুস্থ একজন মানুষ। সুস্থ এবং সৃষ্টিশীল। খানিকটা নিঃসঙ্গ আর মায়াবতীও বলতে পারেন। যে মহিলা প্রিয় মানুষদের স্মৃতি ভুলতে পারেন না, কারো চলে যাবার শূন্যতা সহজভাবে নিতে পারেন না।

সেই ২০০২ সাল থেকে শুরু হওয়া সুকিনির  পুতুল বানানোর অভিযান আজও চলছে। যখন গ্রামের কোন মানুষ শহরে পাড়ি জমায়, কোন প্রতিবেশি, আত্মীয় বা পরিচিত জন মারা যায় তাদের আদলে আইয়ানো সুকিনি বানাতে শুরু করেন কাকতাড়ুয়া। হারিয়ে যাওয়া মানুষদের স্মৃতি ধরে রাখতে এবং তাদের শূন্যতা পূরণ করতে একের পর এক কাকতাড়ুয়া বানিয়ে গ্রামেজুড়ে ছড়িয়ে রাখেন সুকিনি।

নাগেরো গ্রামে একটি প্রাইমারি স্কুল আছে। নিকট অতীতে, বাচ্চা ছেলেমেয়েদের আনাগোনা, হইচই আর আনন্দ-গুঞ্জনে মুখরিত থাকত স্কুলটি। এখন আর সে স্কুলে কেউ যায় না, শহরের বড় বড় আর ভালো ভালো সব স্কুলে পড়তে যায় বাচ্চারা। আর যাদের শহরের যাবার সামর্থ্য নেই তারা বাসে ত্রিশ মিনিটের পথ পেড়িয়ে যায় অপেক্ষাকৃত ভালো একটি স্কুলে। গ্রামের স্কুলে কেউ আর পড়েনা এখন। একারণেই একসময় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে স্কুলটি। এইযে, আস্ত একটা বিদ্যালয় শুন্য হয়ে গেলো, এ ব্যাপারটিও নাড়া দিয়েছে আইয়ানো সুকিনির কোমল মনকে।

তিনি স্কুলকে ভরিয়ে তুলেছেন নতুন সব ছাত্রছাত্রী আর শিক্ষক দিয়ে। তাই আজও সে স্কুলে গেলে দেখা যাবে, স্কুলের প্রিন্সিপ্যাল আঙিনায় দাঁড়িয়ে রয়েছে, ছাত্ররা ক্লাসরুমে বই খুলে বসে আছে, শিক্ষক সামনে দাঁড়িয়ে ছাত্রদের পাঠ দিচ্ছে। হোক না সে পুতুল ছাত্র, আর পুতুল শিক্ষক। তবুও তো ছাত্র-শিক্ষক।

এই যে আইয়ানো সুকিনি নামের এক মহিলার গ্রামের প্রতি ভালোবাসা। গ্রামকে বাঁচিয়ে রাখা, গ্রামের মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার এক মরিয়া চেষ্টা- এসবের কথা শুনলে-জানলে কি এক অজানা মায়ায় ছেঁয়ে যায় মন। এমন মায়াময়  কোন গল্পকেই কি হৃদয়স্পর্শী বলে না! আইয়ানো সুকিনি তার গ্রামকে ভরিয়ে তুলতে, শুন্য হয়ে যাওয়া গ্রামকে পূর্ণ করে রাখতে এ পর্যন্ত চার’শর ও বেশি কাকতাড়ুয়া বা পুতুল তৈরি করেছে। পুতুলগুলো পুরোনো হলেও প্রতি তিন বছর পর পর সেগুলোকে আবার নতুন করে রুপ দেয় সুকিনি। অনেকের কাছে সুকিনির তৈরি এসব কাকতাড়ুয়া অদ্ভূত আর ভূতুরে মনে হলেও, অনেকের কাছেই এ এক অসাধারণ উদ্যেগ আর ভালবাসার গল্পগাঁথা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এই কাকতাড়ুয়ার কল্যানেই, আইয়ানো সুকিনি এখন আর সাধারণ একজন গ্রাম্য মহিলা নেই, তিনি সেখানকার বেশ আলোচিত মানুষে পরিণত হয়েছেন। তাকে নিয়ে বিদেশী সব নামী-দামী পত্রিকায় প্রতিবেদন বেড়িয়েছে। এক জার্মান চিত্রপরিচালক তাকে নিয়ে নন্দিত একটি ডকুমেন্টারিও তৈরি করেছেন ২০১৪ সালের দিকে। আর এসব কারণেই নাগোরো গ্রামে বেড়েছে দর্শনার্থীদের আনাগোনা।

নাগোরো গ্রামের কাহিনী নতুন নয়, এ গ্রামের মত জাপানের অনেক গ্রামই আজকাল জনশূন্য গ্রামে পরিণত হচ্ছে। উন্নত জীবন, শিক্ষা-দীক্ষা আর জীবিকার প্রয়োজনে আজকাল অনেক মানুষই শহরে পাড়ি জমাচ্ছে। পেছনে ফেলে রেখে যাচ্ছে তাদের গ্রামকে। নতুন হলো, আইয়ানো সুকিনি আর তার বানানো কাকতাড়ুয়ার কারণে নাগারো গ্রামে শত শত দর্শনার্থীদের আগমণ। একজন মায়াবতী আইয়ানো সুকিনি আর তার বানানো কাকতাড়ুয়ার কারণে, শূন্য হয়েও পূর্ণ হয়ে থাকা একটি গ্রামের গল্প একেবারেই নতুন!

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close