টেকি দুনিয়ার টুকিটাকি

মহাকাশে লাল-সবুজ: কিছু প্রশ্নের উত্তর

[বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের সাথে জড়িত সবাইকে, বিশেষকরে বুয়েটিয়ানদের অভিনন্দন। সায়েন্স ফিকশন এবং আর্থার সি ক্লার্ক-এর (কেন, পরে বলছি) বিশাল ভক্ত হিসাবে আগেই স্যাটেলাইট নিয়ে পড়াশোনা ছিল, এবং ২০১০ থেকে ২০১১ একটা ফ্রেঞ্চ স্যাটেলাইট কন্সাল্টিং কোম্পানির সাথে কিছু কাজ করেছিলাম। তখন জানা/শেখা কিছু তথ্য নিয়ে এই লেখা]

এই লাইনের কেউ স্যাটেলাইট শব্দটা ব্যাবহার করতে চায় না, সবাই বলে “স্পেইসক্রাফট” অথবা “বার্ড”। এটা ছিল প্রথম শিক্ষা, যদিও আমি এটাতে অভ্যস্ত হতে পারি নাই।

বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট একটু আগে উড়ে গেল। এটা একটা জিওস্টেশনারি (ভূস্থির) স্যাটেলাইট। যদি জিওস্টেশনারি না হয়, তাহলে সেই স্যাটেলাইট থেকে হয় সারাদিন কাভারেজ পাওয়া যাবে না, অথবা কিছুকিছু ক্ষেত্রে গ্রাউন্ড স্টেশনের অ্যান্টেনা স্যাটেলাইটের সাথে সাথে ঘুরতে/নড়তে হবে, যাতে খরচ বেড়ে যায়।

সব স্যাটেলাইট জিওস্টেশনারি হতে পারে না, দরকারও নেই। কিন্তু যেসব স্যাটেলাইট জিওস্টেশনারি, তাদের দুইটা বৈশিষ্ট থাকে:

– তারা বিষুব রেখার ঠিক উপরে অবস্থান করে (এক ডিগ্রি কম/বেশি হতে পারে)

– পৃথিবী যেমন নিজের অক্ষকে কেন্দ্র করে ২৪ ঘন্টায় একবার ঘুরে আসে, এই স্যাটেলাইটগুলিও পৃথিবীর অক্ষকে কেন্দ্র করে ২৪ ঘন্টায় একবার ঘুরে আসে।

এই দুই শর্তের ফলাফল—পৃথিবীর ঘোরার সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য এই স্যাটেলাইটগুলি পৃথিবীপৃষ্টের একটা নির্দিষ্ট এলাকার ওপর থেকে যায়, অর্থাৎ জিও (পৃথিবী বা ভূ) + স্টেশনারি (স্থির) হয়ে যায়। (প্রথম ছবি। আসলে স্থির না; বন্দুকের গুলির চাইতেও দ্রুত চলছে তবে পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে দেখলে মনে হবে স্থির)

বিষুব রেখার ওপরে মানে পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে বিষুব রেখা বরাবর অসংখ্য লাইন টেনে যদি আকাশে বাড়ানো হয়, জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইটগুলি সেই লাইনের উপরে থাকবে। কিন্তু এই দূরত্ব অসীম নয়; নিউটন আর কেপলারের কয়েকশ বছর আগে আবিষ্কার করা সূত্র অনুযায়ী আমরা জানি, জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট পৃথিবী থেকে প্রায় ৩৫,৮৫৩ কিলোমিটার দূরে থাকবে। এটাকে জিওস্টেশনারি অরবিট (বাংলা করলাম ভূস্থির কক্ষপথ) বলা হয়। এটাকে সায়েন্স ফিকশন লেখক আর্থার সি ক্লার্ক-এর নামে ক্লার্ক অরবিটও বলা হয় কারন ক্লার্ক প্রথম যোগাযোগ স্যাটেলাইটের এই ধারণা দিয়েছিলেন।

যে কোন স্থায়ী কক্ষপথের একটা আজব গুণ আছে–এটা এমন একটা জায়গা, যেখানে মহাকর্ষ আর ঘুর্ণন-এর গতিতে কাটাকাটি হয়ে যায় বলে সেই কক্ষপথের যাত্রী (সেটা আমাদের পৃথিবী বা চাঁদ, যেটাই হোক না কেন, একই ভাবে ঘুরতে থাকে। স্যাটেলাইটগুলিও একই ভাবে ভূস্থির কক্ষপথেও ঘুরতে থাকে। কিন্তু কিভাবে সেটা পৃথিবীর সাথে তাল রাখে? (আসলে এত সুক্ষভাবে গতি রাখা অসম্ভব; তাই স্যাটেলাইটে গ্যাস থাকে যা উচ্চচাপে বের করে দিয়ে রকেটের মত অবস্থান ঠিক করে নেয় মাঝে মাঝে)

যাদের একটু অংক এবং ফিজিক্স নিয়ে উৎসাহ আছে, তাদের জন্য কিভাবে স্যাটেলাইট পৃথিবীর সাথে তাল রাখে আর কিভাবে পড়ে যায় না বা মহাকাশে উড়ে যায় না, সেটার গাণিতিক ব্যাখ্যা মূল লেখার সবশেষে দিয়েছি। এখানে সেই দুইটা ব্যাপার অংক ছাড়া বোঝানোর চেষ্টা করি।

কিভাবে ভূস্থির: ধরুন, আপনি ছয় ইঞ্চি ব্যাসার্ধের একটা বৃত্ত আঁকলেন, আর একই কেন্দ্র ধরে বেয়াল্লিশ ইঞ্চি ব্যাসার্ধের আরেকটা বৃত্ত আঁকলেন। আপনার আকার গতি যদি একই থাকে, তাহলে বড় বৃত্তটা আঁকতে বেশি সময় লাগবে, তাই না? কিন্তু যদি বড় বৃত্তটা আকার গতি বাড়িয়ে দেন, তাহলে কোন একটা গতিতে চললে দেখা যাবে, দুইটা বৃত্ত একই সময়ে শুরু এবং শেষ করা যাচ্ছে, অর্থাৎ ছোট বৃত্তের পেন্সিল আর বড় বৃত্তের পেন্সিল একই তালে চলছে। একইভাবে জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট পৃথিবীর চাইতে দ্রুত চলে বলে মনে হয় এক জায়গায় স্থির হয়ে আছে।

কেন উড়ে চলে যাচ্ছে না বা পড়ে যাচ্ছে না: প্লেন বা রকেট আকাশে উড়তে পারে জ্বালানী খরচ করে। কিন্তু স্যাটেলাইট কিভাবে ভেসে থাকে ইঞ্জিন না চালিয়েই? রকেটে করে প্রথমে স্যাটেলাইটটাকে সোজা উপরের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়, তারপর রকেটটা পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘন্টায় প্রায় ১১,০০০ কিমি গতিতে চলতে শুরু করে এবং একসময় স্যাটেলাইটটাকে ছেডে দেয়। ছেড়ে দেয়া স্যাটেলাইটটাও গতিজড়তার কারণে একই গতিতে চলতে থাকে। এই গতির জন্য, যদিও স্যাটেলাইট পৃথিবীর আকর্ষনে নিচের দিকে নেমে আসে, কিন্তু এই নেমে আসার পরিমান, কক্ষপথের বক্রতার সমান। তাই পৃথিবী থেকে দূরত্ব সমান থেকে যায়। যদি এই গতি কম হতো, তাহলে এক সময় পড়ে যেত আর যদি বেশি হতো তাহলে উপবৃত্তাকার (elliptical) হয়ে যেত। এটা বুঝতে একটু অসুবিধা হয়, তাই একটা উপমা দেই। ধরুন ঢাকার রাস্তায় জলবদ্ধতার জন্য পানি দাঁড়িয়ে আছে। আপনি একটা ব্যাগ নিয়ে হাটছেন, ব্যাগটা পানি থেকে ৩৮ ইঞ্চি উপরে। হাটতে হাটতে পানি গভীর হলো, আপনি ব্যাগটা আরেকটু উপরে তুললেন, যাতে ব্যাগটা পানি থেকে সেই ৩৮ ইঞ্চি উপরেই থাকে। একইভাবে স্যাটেলাইটটাও সমান উচ্চতা বজায় রাখতে পারে।

তাহলে প্রায় ৪২,০০০ কিমি ব্যাসার্ধের বৃত্তের পরিধি প্রায় ২৬৪,০০০ কিলোমিটার (2πr)। এক কিলোমিটার দূরে দূরে রাখলেও ২৬৪,০০০ স্যাটেলাইটের জায়গা আছে, তাই না? কাগজে কলমে তাই, কিন্তু বাস্তবে না।

এখানে গরিব দেশগুলির জন্য একটা ঝামেলা হয়েছে। সেই ঝামেলা কি বলার আগে ফুটপ্রিন্ট কি জেনে নেই। দূর থেকে টর্চের আলো যেমন একটা আলোকিত বৃত্ত তৈরি করে, তেমনি স্যাটেলাইটের রেডিও সিগন্যাল শুধুমাত্র একটা এলাকা থেকে পাওয়া যায়। সেই এলাকাটাকে সেই স্যাটেলাইটের ফুটপ্রিন্ট/পদচিহ্ন বলা হয়ে থাকে। রাতের আকাশে যেমন সূর্য পৃথিবীর আড়ালে পড়ে যায়, তেমনি অ্যামেরিকার আকাশে জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট বাংলাদেশের জন্য পৃথিবীর আড়ালে—বাংলাদেশ সেই স্যাটেলাইটের ফুটপ্রিন্টে নাই এবং সেই স্যাটেলাইট দিয়ে বাংলাদেশের কোন কাজ হবে না। সুতরাং বাংলাদেশের জন্য এমন জায়গায় স্যাটেলাইট স্থাপন করা লাগবে, যাতে বাংলাদেশ তার ফুটপ্রিন্টে পড়ে। কোথায় স্যাটেলাইট বসবে, সেই জায়গাগুলিকে বলা হয় অরবিটাল স্লট (কক্ষঘর), এবং International Telecommunication Union (ITU) প্রতিটি দেশকে আগে আসলে আগে পাবেন ভিত্তিতে স্লট দিয়ে থাকে। ক্যাচালটা এইখানেই—বাংলাদেশের উপরে বা আশেপাশের সব স্লট অন্য কিছু দেশ নিয়ে নিয়েছে (তালিকা নিচে)। বাংলাদেশ আগে চায় নাই, তাই পায় নাই। আবার অনেক দেশ নিজেদের স্যাটেলাইট দরকার নাই, তাই স্লট নিয়ে বিক্রি করেছে; যেমন টংগা নিজেদের পাঁচটা স্লট বছরে ২ মিলিয়ন ডলার দরে ১৯৮৮ তে নিলাম করেছে।

দক্ষিণ গোলার্ধে সমুদ্রের উপরে অনেক জায়গা আছে, যেখানে কোন জমি নেই, কোন মানুষ থাকে না। সেই ফুটপ্রিন্টে স্লট পাওয়া যায়, কিন্ত সেটা নিয়ে কি হবে?

ব্যাপারটা অনেকটা এরকম হয়ে গিয়েছে যে আপনি থাকেন চট্টগ্রামে, এবং চাইলেই আপনি ৩০০০ মাইল দূরে সমুদ্রের দখল কিনতে পারেন। কিন্তু আপনার দরকার বাসা বানিয়ে থাকা; সমুদ্রের পানির দখল নিয়ে কি করবেন? সুতরাং আপনাকে এখন দাম দিয়ে অন্যের কাছ থেকে চট্টগ্রামেই জমি কেনা লাগবে।

স্যাটেলাইটের জন্যও জরুরী আমাদের সেই ফুটপ্রিন্টে থাকা–সমুদ্রের পানি কিনলে চলবে না। অতএব বাংলাদেশ সেটাই করেছে, ১১৯.১ ডিগ্রি দ্রাঘিমাতে একটা স্লট লিজ নিয়েছে ১৫ বছরের জন্য রাশিয়ানদের কাছ থেকে ২৮ মিলিয়ন ডলার দিয়ে, যেটার ফুটপ্রিন্টে বাংলাদেশ পড়ে।

স্যাটেলাইট ১৫ বছর টিকবে (সাধারনত এরকমই হয়ে থাকে), তারপর আবার হয়তো এই স্লট লিজ নেবে, অথবা ততদিনে টেকনলজি আরো ছড়িয়ে যাবে, আর স্যাটেলাইট লাগবে না। সীমিত সংখ্যক জিওস্টেশনারি স্লট আছে–একটা থেকে আরেকটা বেশ দূরে যাতে ধাক্কা না লাগে এবং একটা আরেকটার রেডিও ফ্রিকোয়েন্সিতে ঝামেলা না করে। (স্লটের দাম বাড়ছে, কমছে না। আফসোস; টংগা যদি ১৯৮৮ সালে এটা নিয়ে ভাবতে পারে, আমরা কেন নিজেদের স্লট নিয়ে তখন ভাবতে পারি নাই যার ফলে এখন টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে? স্লট নিয়ে বিস্তারিত নিচের [১] লিঙ্কে)

বাসা বানাতে গেলে যেরকম প্রথমে জমি ঠিক করা লাগে, তার পর জমি বুঝে প্ল্যান, সেই প্ল্যান রাজউক থেকে পাশ করানো লাগে, স্যাটেলেইটের জন্যও তাই। প্রথমে জমি (স্লট) আশেপাশে কি স্যাটেলাইট আছে, তারা কোন ফ্রিকোয়েন্সি ব্যাবহার করে, সেগুলির সাথে যাতে কোন সঙ্ঘর্ষ (interference) না হয়, সেটা হিসাব করে ITU ফ্রিকোয়েন্সি অনুমোদন দেয় (প্ল্যান পাশ)। তারপর স্যাটেলাইট (বাসা) বানানো লাগে। বাংলাদেশ জমি পেয়েছে, প্ল্যান পাশ হয়েছে, এবং সব শেষে স্যাটেলাইট তৈরী হয়ে উড়ে গেল মহাকাশে।

#লঞ্চ_উইন্ডো (উৎক্ষেপনের মোক্ষম সময়): প্রথমবার উড়তে গিয়েও স্পেইস এক্স-এর ফ্যালকন-৯ রকেট শেষ মুহুর্তে এসে উৎক্ষেপন বন্ধ করে দেয়। কিন্তু সমস্যা সমাধানের সাথে সাথে কেন আবার উৎক্ষেপন করা হলো না? কারন এই লঞ্চ উইন্ডো। জ্বী না, এটা ঢাকা বরিশাল লঞ্চের জানালা নয়, এটা ঠিক কখন উৎক্ষেপন করলে সবচাইতে কম খরচে স্যাটেলাইট জায়গা মত পৌছান যাবে, সেটার একটা হিসাব। ছুটন্ত কিছুর দিকে কখনো ঢিল মেরে দেখেছেন? আপনার ঢিল পৌছাতে পৌছাতে টার্গেট সরে যায়; তাই টার্গেট আর ঢিলের গতি হিসাব করে টার্গেটের সামনে ঢিল মারা লাগে। এখানেও তাই; স্লট কোথায় সেটা হিসাব করে উৎক্ষেপন করা লাগে কারন পৃথিবী ঘুরছে। আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, উৎক্ষেপনস্থল যখন কক্ষপথ সমতলে (অরবিটাল প্লেইন; পুরো কক্ষপথকে একটা গোলাকার সমতল কল্পনা করলে যা পাওয়া যায়) থাকে তখন জ্বালানী কম লাগে। সেটা স্লটটা কোথায়, সেটার ওপরে নির্ভর করে। মহাকাশে কিছু পাঠানোর খরচ অনেক; প্রতি কেজি পাঠাতে খরচ প্রায় ২৫,০০০ ডলার বা ২০ লক্ষ টাকা। সুতরাং বাড়তি জ্বালানী পাঠাতেও অনেক খরচ। তাই খরচ কমানোর জন্য এই দুইটা হিসাব মাথায় রেখে দিনের যে সময়ে উৎক্ষেপন করলে সবচাইতে কম খরচ হবে সেটাকে লঞ্চ উইন্ডো বলা হয় ।

রাত জেগে বাংলাদেশের অনেকেই দেখলেন কিভাবে রকেট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মহাকাশের দিকে ভেসে গেল আমাদের বঙ্গবন্ধু ১ স্যাটেলাইট। এই ধারাবর্ননায় অনেকেই শুনেছেন, রকেটের স্টেইজ-২ ট্র্যান্সফার_অরবিট-এ (স্থানান্তর কক্ষপথ) পৌছে দিল। ধরুন, প্লেনে করে বিদেশ থেকে দেশের এয়ারপোর্টে নামলেন। এবার বাসায় যাওয়ার জন্য গাড়িতে করে যেতে হবে। ট্র্যান্সফার অরবিট এরকম মধ্যবর্তি একটা স্থান, যেখানে রকেট থেকে স্যাটেলাইট আলাদা হয়ে যায়। এর পর স্যাটেলাইট নিজের জ্বালানী ব্যবহার করে তার নিজস্ব স্লটে পৌছে যাবে। এই কাজটা করবে থালিস-এর প্রকৌশলীরা; স্পেইস-এক্স এর এখানে আর কোন ভূমিকা নেই। কিছুদিন পরীক্ষা-নিরিক্ষার পরে শুরু হবে এর বানিজ্যিক ব্যাবহার। দেশের দুটা উপগ্রহ ভূ-কেন্দ্র অন্যের স্যাটেলাইটের বদলে আমাদের নিজেদের স্যাটেলাইটের সাথে যোগাযোগ রাখবে।

এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ!

[১] https://theconversation.com/theres-a-parking-crisis-in-space-and-you-should-be-worried-about-it-83479

[২] কিছু প্রশ্নের উত্তর

– এখানে স্যাটেলাইট লেখা হয়েছে কেন? আসলে কি এটা Artificial Satellite বা কৃত্রিম উপগ্রহ না?
— হ্যা, ঠিক বলেছেন। লেখাকে সাবলীল রাখার জন্য এটা করা হয়েছে।
— স্যাটেলাইট এমনিতেই এক জায়গায় থাকে না, আস্তে আস্তে সরতে থাকে। সেটাকে মাঝে মাঝে আবার ঠিক জায়গায়

– ১৫ বছর পরে কি হবে?
— স্যাটেলাইট এমনিতেই এক জায়গায় থাকে না, আস্তে আস্তে সরতে থাকে। সেটাকে মাঝে মাঝে আবার ঠিক জায়গায় আনা লাগে। যখন আয়ু শেষ হয়ে যাবে, কিছু না করলে সেটা এমনিতেই নিচে নামতে নামতে এক সময় বায়ুমন্ডলে ঢুকবে এবং পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। কিন্তু যেহেতু স্লটের দাম আছে, হয়তো এভাবে নিজে থেকে নামতে না দিয়ে সেটাকে ধাক্কা দিয়ে (জ্বালানী পুড়িয়ে) নামানো হবে অথবা ধাক্কা দিয়ে আরো ২০০ কিমি উপরে তুলে দেয়া হয় যেখানে সেই মৃত স্যাটেলাইট ঘুরতেই থাকে। আর পরবর্তি স্যাটেলাইট একই স্লট নিতে পারে বেশি অপেক্ষা না করেই।

– মাত্র ১৫ বছর কেন?
— সব ইলেক্ট্রনিকেরস মতই, স্যাটেলাইটের ক্যাপাসিটি দিন দিন বাড়ছে আর দাম কমছে। ৫০ বছর টিকবে এমন স্যাটেলাইট বানানো সম্ভব, কিন্তু সেটা ১০-১৫ বছর পরে আর নতুন স্যাটেলাইটের সাথে পাল্লা দিতে পারবে না। তাই এগুলি এভাবেই ডিজাইন করা হয়।
–লাইসেন্সও ১৫ বছরের

– বাংলাদেশের উপরের স্লটগুলি কাদের হাতে?
— বাংলাদেশের অবস্থান ৯০.৩৫ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাতে। ৯০ ডিগ্রির উপরের স্লটগুলি এবং মালিকানা দিলাম এখানে।
দ্রাঘিমাংশ দেশের নাম স্যাটেলাইটের নাম
৯০ (স্লটের জন্য আবেদন করে রেখেছে) সাইপ্রাস KYPROS-APHRODITE-2 (প্রস্তাবিত)
৯০ (স্লটের জন্য আবেদন করে রেখেছে) চীন GC-11B (প্রস্তাবিত)
৯০ (স্লটের জন্য আবেদন করে রেখেছে) অ্যামেরিকা USGAE-3A C (প্রস্তাবিত)
৯০.৫ জাপান QZSS-GS1
৯০.৭ জাপান DRTS-90.75E
৯০.৭৫ জাপান DRTS-90.75E

প্রথম তিনটা আসলে ঠিক ৯০ ডিগ্রিতে থাকবে না; এটা চুড়ান্ত করার সময় তাদের দশমিকের তফাৎ রেখে অনুমতি দেয়া হবে। মনে রাখবেন যে জিওস্টেশনারি হতে হলে বিষুব রেখার ওপরে বা অতি অল্প বাইরে হতে হবে, অর্থাত অক্ষাংশ (latitude) ০ বা তার কাছাকাছি হতে হবে। অক্ষাংশ ১ এর বেশি হলে সেটা আর জিওস্টেশনারি থাকতে পারে না, সেটা জিওসিনক্রোনাস, বাংলা ৪ এর মত প্যাচানো অবস্থান হয় আকাশে।

৫ ডিগ্রি ডানে-বামের স্যাটেলাইটের তালিকা পাবেন এখানে https://tinyurl.com/ycp23cdw

– এই স্যাটেলাইট দিয়ে ঝড়ের পূর্বাভাস পাওয়া যাবে?

— কেউ কেউ এই কথাটা বলছেন বটে। কিন্তু রেডিও দিয়ে যেমন টিভি দেখা যায় না, তেমনি কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট দিয়ে আবহাওয়া দেখা যায় না। আমি কোন বর্ণনাতেই পড়ি নাই যে এই স্যাটেলাইটে আবহাওয়া পর্যবেক্ষনের কোন যন্ত্র আছে। তাহলে এটা দিয়ে আবহাওয়ার পূর্বাভাস পাওয়া যাবে না।

(ফক্রে-প্রথম ছবি নাসা, বাকিগুলি স্পেইস-এক্স এর লাইভ ভিডিও থেকে নেয়া)
(বত্ব, ছবিতে স্যাটেলাইটের গায়ের সোনালী অংশগুলি কিন্তু সোনা দিয়ে বানানো না)

[৩] এই লেখার জন্য কিছু ইংলিশ শব্দের বাংলা পরিভাষা তৈরি করেছি; এখানে তার তালিকা দিলাম

Geostationary ভুস্থির
Geostationary Orbit ভুস্থির কক্ষপথ
Footprint পদচিহ্ন
Orbital Slot কক্ষঘর
Orbital Plane কক্ষপথ সমতল
Transfer Orbit স্থানান্তর কক্ষপথ

আরো জানতে আগ্রহীরা ইংলিশ শব্দগুলি উইকিপেডিয়াতে খুঁজে নিয়ে পড়তে পারেন।

[৪] একটু অংক আর ফিজিক্স। উপরে ব্যাখ্যা করা আছে; অঙ্ক ভাল না লাগলে বাদ দিয়ে যেতে পারেন, কোন অসুবিধা নাই।

[ক] আমরা জানি, পৃথিবীর সাথে তাল রাখা/ভূস্থির/জিওস্টেশনারি থাকার জন্য স্যাটেলাইটটাকে ২৪ ঘন্টার একবার আবর্তন করা লাগবে।

r ব্যাসার্ধের বৃত্তের পরিধি 2π . r
T=২৪ ঘন্টা=৮৬,৪০০ সেকেন্ডে এই পথ অতিক্রম করলে গতি হচ্ছে
v=2π . r /T

[খ] কোন ঘূর্নায়মান বস্তুর ওপর কেন্দ্রমুখী বল, F = mv^2/r (m স্যাটেলাইটের ভর, r দূরত্ব, v সরলরৈখিক গতি)

আর মহাকর্ষের সূত্র থেকে আমরা জানি, F = G M m / r^2 (F বল, G মহাকর্ষ ধ্রুবক, M পৃথিবীর ভর, m স্যাটেলাইটের ভর, r দূরত্ব)। এই দুইটা সমান,
অর্থাৎ
m v^2 / r = F = G M m / r^2
দুই দিকে m কাটাকাটি হয়ে গেল,
বা, v^2 r = G M

উপরের সমীকরনে v=2π . r /T বসিয়ে আমরা পাই,

(2π . r)^2 . r / T^2 = GM
বা, T^2 = (2π)^2 . r^3 / (GM)
বা, T^2/(2π)^2 . GM = r^3

মহাকর্ষ ধ্রুবক, G= 6.67(10^-11)Nm^2/kg^2
পৃথিবীর ভর, M=5.972 × 10^24 kg
T = 24 hours = 86,400 second

মান বসিয়ে সমাধান করলে পাই,
(86,400 s )^2 x 6.67(10^-11)Nm^2/kg^2 x 5.972 × 10^24 kg / (2π)^2 = 7.53205×10^22 m^3 = r^3
এটা হচ্ছে ব্যাসার্ধের কিউব। এটার কিউব রুট নিলে আমরা পাই,
r = 4.22316×10^7 মিটার = 42,231.6 km.

এই ব্যাসার্ধ থেকে বিষুব রেখায় পৃথিবীর ব্যাসার্ধ 6,378 কিমি বিয়োগ করলে আমরা পাই,
35853.6 কিমি। অর্থাৎ জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট সমুদ্রপৃষ্ট থেকে 35853.6 কিমি উপরে থাকবে (বাস্তবে আরেকটু কম/বেশী হতে পারে, উইকিপেডিয়া ৩৫৭৮৬ কিমি দেখাচ্ছে। এটা অঙ্কে দশমিকের পর কয় ঘর তার ওপর বদলে যাচ্ছে)। আর আমরা যখন r পেয়ে গেলাম, তখন v = v=2π . r /T = 2π *42,231/86400 = 3.07 km/sec

এই কেন্দ্রমুখী বল বা মহাকর্ষের জন্য স্যাটেলাইটটা সবসময় পৃথিবীর দিকে পড়তে থাকে, কিন্তু শুরুর গতিজড়তা/ঘুর্ননজড়তার জন্য সামনের দিকেও আগাতে থাকে। এই পড়ার পরিমান যদি কক্ষপথের বক্রতার সমান হয়, তাহলে এটা একটা বৃত্তাকার কক্ষপথকে অনুসরন করতে থাকবে, কখনই পড়ে যাবে না বা মহাকাশে ছুটে যাবে না]

অসামান্য পরিশ্রমসাধ্য এই লেখাটি লিখেছেন:

“যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী প্রকৌশলী ও প্রাক্তন স্যাটেলাইট কনসাল্টেন্ট  জাভেদ ইকবাল 
টুইটার- https://twitter.com/javedikbal

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close