সিনেমা হলের গলি

ধন্যবাদ নোবেল, ধন্যবাদ সারেগামাপা!

রুপালি গিটার ফেলে আমাদের জাদুকর, আমাদের লিজেন্ডারি গায়ক আইয়ুব বাচ্চু চলে গিয়েছিলেন গত ১৮ই অক্টোবর। সেই শোকের রেশ এখনো কাটেনি। এখনো অবিশ্বাস্য মনে হয় আইয়ুব বাচ্চুর অসময়ের এই প্রস্থান। মানুষটা চলে যাওয়ায় যেখানেই তাকে নিয়ে যত স্মৃতিগাঁথা শুনি, যেখানেই তাকে শ্রদ্ধা রেখে যত ট্রিবিউট দেয়া হয়, সবই দেখি। জেমস থেকে শুরু করে এখনকার প্রজন্মের শিল্পীরাও আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে স্মৃতিচারণা করেছেন, যে যার মতো ট্রিবিউট দিয়েছেন। এতো আবেগী এসব ট্রিবিউট দেখে মন আরো উথলে উঠে, শোক আরো যেন ভয়াবহ হয়। আইয়ুব বাচ্চুকে স্মরণ করে এবার সারেগামাপা মঞ্চ থেকে ট্রিবিউট দেয়া হলো, তার গান গেয়ে।

ট্রিবিউটের মূল কাজটা করলেন বাংলাদেশি তরুণ উদীয়মান প্রতিভা নোবেল, ছিলেন ওপার বাংলার জনপ্রিয় গায়ক অনুপম রয়। তবে যোগ দিলো বাকি সকলেই। কিছুক্ষণের জন্য পুরো সারেগামাপার সকলেই যেন একসাথে স্মরণ করল আইয়ুব বাচ্চুকে। উপস্থাপক যীশু সেনগুপ্ত গেলেন ড্রামসে, বাজালেন ড্রামস। বিচারক শান্তনু মৈত্র হাতে গিটার তুলে নিয়ে বাজালেন। অন্যান্য প্রতিযোগী, বিচারক, দর্শকরাও একসাথে গাইলো আমাদের আইয়ুব বাচ্চুর গান। অসাধারণ এক মুহুর্তের অবতারণা ঘটে গেল সারেগামাপার মঞ্চে।

নোবেল যখন এগিয়ে চলো‘কে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন, তখন নিজের একটা স্বপ্নের কথা বলেছিলেন। তিনি অদূর ভবিষ্যতে যদি কখনো সুযোগ পান, কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চুর সাথে একমঞ্চে পারফর্ম করতে চান। সেটা আর হলো না। নোবেল এখন সারেগামাপার জনপ্রিয় প্রতিযোগীদের একজন। রক গান গেয়ে ওপার বাংলা মাতাচ্ছেন। তাকে ঘিরে প্রশংসায় ভেসে যাচ্ছে সাদা-নীলের ফেসবুক মাধ্যম। কিন্তু, নোবেলের যে আইকন, আইডলরা তাদের মধ্যে অন্যতম একজন কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চু, তার সাথে গান গাওয়ার স্বপ্ন যে অধরাই রয়ে গেল, সেটা নিয়ে কি নোবেলের একটুও খচখচানি থাকবে না মনের মধ্যে?

হয়ত থাকবে। নোবেল এই পর্বে আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে বলেছেন, ১৮ তারিখ তিনি যখন শুনলেন আইয়ুব বাচ্চু আর নেই, তিনি বিশ্বাস করতে পারেননি। দুইদিন পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করেছেন, আশা করেছেন কেউ একজন বলবে এই ঘটনা সত্য নয়, গুজব, আইয়ুব বাচ্চু আছেন। কোথাও যাননি। কিন্তু, দুইদিন পর নোবেল যখন নিজেকে আবিষ্কার করলেন তিনি আইয়ুব বাচ্চুর জানাজার নামাজে শরীক হয়েছেন তখন আর অবিশ্বাসের কারণ থাকলো না। তিনি যে এখনো ভীষণ মর্মাহত সেটা তার চোখে মুখে ফুটে উঠেছে প্রবলভাবেই। বললেন, সেই ঘটনার পর এখন পর্যন্ত তিনি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারছেন না, বাচ্চু বিহীন এই বাজে সময়টাকে মন থেকে স্বীকার করতে পারছেন না। এখনো মন ভেঙ্গে আছে তার। রক মিউজিক যারা করে এই সময়ে, তাদের মধ্যে আইয়ুব বাচ্চুর প্রচ্ছন্ন প্রভাবের কথা জানালেন নোবেল। তার নিজের মধ্যেও আইয়ুব বাচ্চুর প্রভাব তো কম নয়।

 

সারেগামাপার এই পর্বে নোবেল গেয়েছিলেন “বেঁচে থাকার গান”। গানটির গায়ক ছিলেন রুপম ইসলাম, গীতিকার ছিলেন অনুপম রয়। এই পর্বে উপস্থিত ছিলেন গীতিকার নিজেই। অনুপম রয়ও যুক্ত হলেন নোবেলের সাথে, দুইজন মিলে গাইলেন “বেঁচে থাকার গান”। নোবেল এখন গান গাইবেন, বিচারকরা উত্তেজিত হবেন, খুশি হয়ে দশে দশ নাম্বার দিবেন, গোল্ডেন গিটার বাজাবেন এগুলো একদম কমন দৃশ্য হয়ে গেছে আমাদের জন্য, চোখ সয়ে গেছে। উল্লেখ করার মতো আলাদা ব্যাপার ছিল জনপ্রিয় মেধাবী শিল্পী অনুপম রয়ের গান গাওয়াটা। অনুপম রয় নিজে এমনিতে ভীষণ “ডাউন টু দ্যা আর্থ” টাইপ মানুষ। নোবেলের প্রশংসা করলেন তো বটেই, তিনি নাকি নোবেলের গানও আগে শুনেছেন এবং এক মঞ্চে নোবেলের সাথে মঞ্চ শেয়ার করবার জন্য আনন্দিত তিনি একথাও বললেন। এটা একদমই অনুপমের বানিয়ে বলা না, এটেনশন পাওয়াও না। অনুপমকে যারা নিয়মিত ফলো করে তারা জানবে, এই লোক বাই ডিফল্ট এমন শান্ত, নিরীহ, উদারমনা। এদিন বিচারক মোনালি ঠাকুরও আনন্দের আতিশয্যে বললেন, তিনি অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকবেন নোবেলের মৌলিক এলবামের গান শুনবার জন্য। নোবেলের কণ্ঠ মৌলিক গানের জন্য আশীর্বাদ।

এসবের পরই উপস্থাপক যীশু সেনগুপ্ত আইয়ুব বাচ্চুর কথা স্মরণ করলেন। আইয়ুব বাচ্চুর প্রতি শোক জ্ঞ্যাপন করার পর বললেন, “কিন্তু রকস্টার কখনো থেমে থাকে না, থামতে জানে না। তাই রুপালি গিটার বাজবে, অন্য কোথাও, অন্য কোনোখানে। তিনি সবসময় থাকবেন আমাদের মনে, তার গিটারে, তার গানে। আর তিনি বারবার ফিরে ফিরে আসবেন নোবেল এবং নোবেলের মতো আর সব প্রতিভাদের মধ্যে দিয়ে। আমরা আজ সবাই মিলে গাইব আইয়ুব বাচ্চুর কিছু গান।”

তারপর শুরু হলো ভায়োলিনের করুণ সুর, সুরটা বড্ড চেনা আমাদের। “সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে” গানের সুর। গানটা ধরলেন প্রথমে অনুপমই। ড্রামসে চলে গেলেন উপস্থাপক যীশু সেনগুপ্ত নিজেই, বিচারক শান্তনু উঠে এসে গিটার হাতে নিলেন। স্টেজে সব আমন্ত্রিত অতিথিরাও এসে দাঁড়িয়েছেন। এমন একটা পরিবেশ। সেই তুমির প্রথম চার লাইন আবেগ ভরা কণ্ঠে অনুপম গাওয়ার পরই নোবেল ধরলেন “এই রুপালি গিটার ফেলে..” গানটি। তারপরই অদ্ভুত এক দৃশ্য দেখলাম। সবাই মিলে ধরলো, সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে গানটি৷ শিহরিত হলাম, বিষণ্ণও হলান খানিকটা।

আইয়ুব বাচ্চুর প্রতি ভালবাসা কতখানি, সেটাই ঝরে পড়তে থাকলো পুরো স্টেজে। সবাই মিলে যখন গানটা ধরলো মনে হলো গমগম করে উঠছে স্টেজটা। তুমি কেন বোঝো না তোমাকে ছাড়া আমি অসহায় – এই লাইন যখন গাচ্ছেন সবাই মনে হলো আইয়ুব বাচ্চুকেই যেন ডাকছেন। নোবেল তো চোখ বন্ধ করেই আবেগের একদম গভীর স্তরে গিয়ে গানটা গাইছেন এমন মনে হলো৷ ধন্যবাদ নোবেল, আপনি অসাধারণ! লিজেন্ডকে এভাবে ট্রিবিউট দেয়ার জন্য, আমাদের আবেগকেও ধারণ করে গানটা গাইবার জন্য, ধন্যবার আপনাকে।

কিছু বিশেষজ্ঞ আছেন যারা সব বোঝেন। সেই বিশেষজ্ঞরা সব কিছুতে একটা না একটা সমস্যা বের করবেনই। তারা বলছেন জি বাংলা টিআরপি বাড়ানোর জন্য এই ট্রিবিউটের আয়োজন করেছে। তাতে ক্ষতিটা কি আসলে? যদি তাদের উদ্দেশ্যও শুধু টিআরপি বাড়ানো হয় এভাবে বাংলাদেশের কিংবদন্তিকে সম্মানিত করে টিআরপি বাড়ানোতে আমি তো কোনো অসম্মান দেখি না। বাংলাদেশে তো দর্শকের চেয়ে চ্যানেল বেশি, এতোগুলা চ্যানেল মিলে টিআরপি বাড়ানোর এমন বুদ্ধি বের করতে পারলো না?

ওরা পেরেছে, কারণ শুধু কমার্শিয়াল চিন্তা থাকলেই টিআরপি বাড়ে না। মানুষের আবেগকে কানেক্ট করতে শিখতে হয়। জি বাংলা সেটাই করেছে তবে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়ে। আর আইয়ুব বাচ্চুকে ট্রিবিউট দিয়ে ওরা যতটা না প্রচার পেয়েছে, তার চেয়ে বেশি এই ভেবে ভাল লাগছে পশ্চিম বাংলার সবাই এখন এই ট্রিবিউটের পর আমাদের এক কিংবদন্তিকে আরো বেশি অনুভব করতে পারছে, রিলেট করতে পারছে তার গানের সাথে। সচরাচর, এরকম ট্রিবিউট তো দেয়া হয় না আসলে কাউকে। আইয়ুব বাচ্চুকে এই সম্মান দেয়ার জন্য ধন্যবাদ জানাতে একটুও বাঁধবে না জি বাংলা কিংবা সারেগামাপাকে।

আইয়ুব বাচ্চুর শুণ্যস্থানে কেউ আর বসবে না, একটা ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়ে গেছে, অনুপম রয়ও এমনটাই বললেন। তবে আইয়ুব বাচ্চু টিকে থাকবেন, বেঁচে থাকবেন তার লাখো ভক্তের কণ্ঠে, তিনি বেঁচে থাকবেন তার গানের মধ্যেই। সারেগামাপার আয়োজনের জন্য ধন্যবাদ, আর ধন্যবাদ প্রিয় অনুপম রয়! নোবেল বোধহয় এখন পর্যন্ত সেরা পারফর্মেন্সটা দিলেন এই এপিসোডেই, ধন্যবাদ আপনাকেও।

আরও পড়ুন-

Comments

Tags

Related Articles