আমাদের সাঁওতালরা তো তিলকা মাঝিরই উত্তরসূরী!

১৭৭০ সাল, ঝাড়খন্ড, সাঁওতাল পল্লী। বছরটা যেন অভিশাপ নিয়ে এসেছে, একদিকে অনাবৃষ্টি তো অন্যদিকে ব্রিটিশদের ক্রমাগত অত্যাচার রয়েছেই। অনাবৃষ্টিতে প্রবল খাদ্যের অভাবে মারা যাচ্ছে সাঁওতালরা, পাহাড়ে ওদের জমি কেড়ে নিচ্ছে ব্রিটিশরা এবং সাথে যোগ দিয়েছে লোভী ভূমিদস্যুদের দল যারা সাঁওতালদের ভূমি দখলে নিয়ে অর্থের বিনিময়ে খুশি রাখছে সরকারকে। চাষের জমি কমে যাচ্ছে, বসবাসের জায়গা হারাচ্ছে, খাদ্যের অভাবে বাড়ছে অস্থিতিশীলতা। শাসকগোষ্ঠী কোন ইতিবাচক ব্যবস্থা না নিয়ে আরো বেশি কঠোর অবস্থান নিয়ে নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এভাবে চলার পর ১৭৮০ সালের দিকে এগিয়ে আসলেন এক মহান পুরুষ, অসীম সাহস নিয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন একজন সাঁওতাল, নাম বাবা তিলকা মাঝি। ব্রিটিশরা হয়তও ভাবতেও পারেনি  এই জনগোষ্ঠী থেকে এভাবে কেউ বিদ্রোহ করে বসবে। সরকারের দ্বিমুখী নীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা এই মহান সাঁওতাল নেতা ‘জাবরা পাহারিয়া’ নামেও পরিচিত।

এই সাহসী মানুষটা শুধুমাত্র বিদ্রোহ করেই থেমে থাকেননি, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন একতাবদ্ধ না হলে এই বিপ্লবের কোন মূল্যই থাকবে না শেষ পর্যন্ত। মাঝি শুরু করলেন গণসংযোগ, আন্দোলনকে বৃহৎ পরিসরে গড়ে তুলতে তিনি পাতায় বার্তা লিখে বিলি করতে শুরু করলেন। পাতায় লিখে ‘আমাদের এক হতে হবে’ ডাক দিয়ে ভারতে ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা প্রথম মানুষটি ছিলেন এই বাবা তিলকা মাঝি।

মাঝির বিদ্রোহ দমন করতে ক্যাপ্টেন ব্রুকের অধীনে প্রায় ৮০০ ব্রিটিশ সৈন্য নিযুক্ত ছিল, কিন্তু পরবর্তী দুই বছরেও তেমন কোন সুবিধা করতে পারেনি ব্রিটিশরা। সাঁওতালদের উপরে অত্যাচার বেড়েছে, কিন্তু হার মানেনি তিলকা ও তাঁর বাহিনী। তিলকা ব্রিটিশদের মুখোমুখি হতে গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব বাহিনী, পাহাড়-জঙ্গল সব কিছু নখদর্পনে থাকা এই বাহিনীর সাথে ব্রিটিশ বাহিনী সুবিধা করতে পারছিল না। ঐতিহ্যবাহী তীর-ধনুক নিয়ে তিলকার আক্রমণ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিল ব্রিটিশরা। তিলকার আক্রমণের ধরণই ছিল জঙ্গল ও পাহাড়কেন্দ্রিক, ভাগলপুর ও সুলতানগঞ্জের জঙ্গলাঞ্চল দিয়ে তিলকা বাহিনী এগিয়ে চলতো।

সাওতালদের বিদ্রোহ দমনে এবারে নিয়োগ দেওয়া হল লেফটেন্যান্ট ক্লিভল্যান্ডকে, তিনি এসেই শুরু করলেন ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ নীতি। মাত্র নয় মাসেই ক্লিভল্যান্ড প্রায় ৪০ টি স্থানীয় গোষ্ঠীকে নিজের দলে টেনে নিতে সক্ষম হলেন, বিনে সুবিধায় তাদের পক্ষে থাকার ঘোষণা দিলেন ধূর্ত ক্লিভল্যান্ড। কিন্তু তিলকা মাঝির সাথে কোন সমঝোতায় আসতে পারলেন না এই ব্রিটিশ, তিলকা মাঝি পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন যে সবার জন্যে এক নীতি গ্রহণ করতে হবে। সুবিধা নিয়ে এবং দিয়ে বিভিন্ন অন্যায় নীতির পক্ষে কিছুতেই সায় দেননি তিলকা। তিলকা মাঝির এই সৎ অবস্থান জনগণের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং তাঁর সমর্থন আরো বাড়তে থাকে।

ব্রিটিশ শাসকদের সাথে এই জাবরা পাহাড়িয়ার সংঘাত চলতেই থাকে, সাহসী তিলকা বাহিনীর গেরিলা আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে ক্লিভল্যান্ড বাহিনী। তিলকা মাঝির বিদ্রোহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাল হলো ১৭৮৪, এই বছরেই একদিন তিলকা বাহিনী দমনে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে ঘোড়ায় করে এগিয়ে আসছিল ক্লিভল্যান্ড, গাছের উপরে বসে থাকা তিলকার তীরের অব্যর্থ নিশানায় প্রাণ যায় ইংরেজ এই কমান্ডারের। ক্লিভল্যান্ডের মৃত্যুতে ভীষণভাবে ভীত সন্ত্রষ্ট হয়ে পরে ঐ অঞ্চলের ব্রিটিশ সৈন্য ও শাসকেরা। তিলকাকে ধরার জন্যে সর্বাত্মক শক্তি নিয়োগ করে ইংরেজরা।

ব্রিটিশ মানেই সেখানে থাকবে ছল-চাতুরী ও ষড়যন্ত্র, বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় তেমনি তিলকা মাঝির বিদ্রোহের ইতি টেনে দেওয়ায় ভূমিকা রাখে আরেক বিশ্বাসঘাতক। কোন এক রাতে তিলকা বাহিনী তাদের সফলতা উদযাপন করছিল ঐতিহ্যবাহী নাচে-গানে, তাদের এই অপ্রস্তুত অবস্থার সুযোগ নিয়ে স্থানীয় ব্রিটিশ মদদপুষ্ট বিশ্বাসঘাতক জাওদাহ (Jaudah) সাঁওতাল বাহিনীকে আক্রমণ করে। আকস্মিক আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়ে পরে গোটা দল, অনেকেই মারা যায় ও কিছু সংখ্যক বন্দী হয়। কিন্তু তিলকাকে ধরতে পারেনি, বাকিদের নিয়ে তিলকা পাহাড়ে পালিয়ে যায়।

ভাগলপুর ও সুলতানগঞ্জের পাহাড়ি অঞ্চল ঘিরে ফেলে ব্রিটিশ বাহিনী, তিলকাকে ধরার জন্যে কৌশল অবলম্বন অব্যাহত রাখে ইংরেজরা। পাহাড়ে লুকিয়ে থেকে খাদ্যের অভাবে তিলকা বাহিনী কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হয়, একদিকে খাদ্যের অভাব, আহত সৈন্য এবং অন্যদিকে শত্রুপক্ষের আক্রমণ। খাবারের অভাবেই অনেকে মারা যেতে লাগল। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া দলটি তিলাপুর জঙ্গলে গেরিলা যুদ্ধে লিপ্ত হয় ব্রিটিশ বাহিনীর সাথে, স্বল্প লোকবল নিয়েই প্রায় কয়েক সপ্তাহ যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছিল তিলকা মাঝি। গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সময়কালেই ১৭৮৫ সালে শত্রুপক্ষের হাতে ধরা পরে তিলকা মাঝি।

তিলকা মাঝিকে ঘোড়ার পেছনে বেঁধে ভাগলপুর অঞ্চলে টেনে হিচড়ে নিয়ে আসা হয়, এরপরে প্রকাশ্যে বট গাছে ফাঁসি ঝুলিয়ে হত্যা করা হয় মহান এই নেতাকে। তিলকা মাঝির সাহসিকতা পরবর্তীতে সাহস ঝুগিয়েছে ভারতকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে বিপ্লব করা আরো অনেককে, আমরা পেয়েছি তিতুমীর, মঙ্গল পান্ডে, মাস্টারদা সূর্যসেনের মত অনেক বিপ্লবীকে, যাদের পথের শুরুটা করে দিয়েছিলেন এক আদিবাসী বিপ্লবী। ভারতকে ব্রিটিশ দাসত্বের হাত থেকে মুক্তির আলো দেখানো এই সাঁওতালের ফাঁসির স্থানে রয়েছে তাঁর একটি মূর্তি এবং ভাগলপুরে রয়েছে তিলকা মাঝি বিশ্ববিদ্যালয়।

স্বাধীনতার জন্যে প্রাণ দেওয়া তিলকা মাঝির সাঁওতাল জনগোষ্ঠী বরাবরই সাহস ও সততার জন্যে সমাদৃত। তাই গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাওতালরা যখন ত্রাণ ফিরিয়ে দিয়ে শুধু ন্যায্যবিচার চায়, তখন খুব একটা অবাক হওয়ার কিছু নেই। কেননা এঁরা তিলকা মাঝির উত্তরসূরী, ভারতের স্বাধীনতা বিপ্লবের জন্যে প্রাণ দেওয়া প্রথম জাতিগোষ্ঠী!

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-