রাজকুমার হিরানী পরিচালিত ও রনবীর কাপুর অভিনীত সঞ্জয় দত্তের বায়োপিক সাঞ্জুর সাফল্য নিয়ে নতুন করে আর কিছু বলার নেই। ছবিটি একাধারে যেমন সমালোচক মহলে আলোচনার ঝড় তুলেছে, তেমনই রমরমিয়ে ব্যবসা করছে বক্স অফিসেও। মুক্তির তিন সপ্তাহের মাথায়ই শুধু ভারতের ডমেস্টিক মার্কেট থেকেই ছবিটি আয় করে নিয়েছে ৩০০ কোটি রুপিরও বেশি। এবং খুব শীঘ্রই ছবিটি মুক্তি পেতে যাচ্ছে চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায়ও।

নিঃসন্দেহেই এ ছবিটি নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করেছে রনবীর কাপুরের মূমুর্ষূ ক্যারিয়ারে। ২০০৭ সালে সাওয়ারিয়া ছবির মাধ্যমে অভিষিক্ত রনবীরের ক্যারিয়ার ২০১৩ সাল পর্যন্ত দারুণ উর্ধ্বমুখী ছিল। ওই বছরই ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্য পেয়েছিলেন ইয়ে জাওয়ানি হ্যায় দিওয়ানির মাধ্যমে। কিন্তু তারপরই যেন ধস নামে তার ক্যারিয়ারে। পরপর তার তিনটি ছবি বেশরম, রয় ও বোম্বে ভেলভেট বক্স অফিসে শুধু মুখ থুবড়েই পড়ে না, তিনটিই ছিল পরিষ্কার ডিজাস্টার। 

সাঞ্জু, রাজকুমার হিরানী, রনবীর কাপুর, সঞ্জয় দত্ত, বায়োপিক

২০১৫ সালে দীপিকা পাড়ুকোনের সাথে তামাশা ও ২০১৬ সালে মাল্টি-স্টারার অ্যায় দিল হ্যায় মুশকিলের মাধ্যমে তার ক্যারিয়ারে কিছুটা হলেও আলোর রেখা দেখা গেলেও, খুব দ্রুতই মিলিয়ে যায় তা। পরবর্তী ছবি জাগগা জাসুসেই আবারও বড় ধরণের হোঁচট খেতে হয় তাকে। ঠিক একই সময়ে রনবীর সিং তো বটেই, এমনকি বরুণ ধাওয়ান, সিদ্ধার্থ মালহোত্রা ও টাইগার শ্রফরাও অনেকটা এগিয়ে গেলে, হুমকির মুখে পড়ে যায় রনবীরের ক্যারিয়ার।

সাঞ্জু ছবিটি তাই রনবীরের জন্য ছিল এক প্রকার এসিড টেস্ট। আর সেখানে বেশ ভালোভাবেই উৎরে গেছেন তিনি। নতুন করে সম্ভাবনার হাওয়া লেগেছে তার ক্যারিয়ারের পালে। সুতরাং এ কথা নিঃসংকোচে বলাই যায় যে সাঞ্জু ছবিটি আশীর্বাদ হয়েই এসেছে রনবীরের জীবনে।

কিন্তু সেই একই কথা কি আমরা বলতে পারি সঞ্জয় দত্তের ক্ষেত্রেও, যার জীবন কাহিনীর উপর ভিত্তি করেই নির্মিত হয়েছে সাঞ্জু ছবিটি? সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে আমাদেরকে নজর ফেরাতে হবে সঞ্জয় দত্তের ক্যারিয়ারের সাম্প্রতিক গতি-প্রকৃতির উপর। 

সঞ্জয় দত্ত, সুনীল দত্ত, বলিউড, বোম্বে ব্লাস্ট, বেআইনী অস্ত্র, নার্গিস

অনেকেই হয়ত জেনে অবাক হবেন যে, সেলুলয়েডে সঞ্জয় দত্তের শেষ সত্যিকারের সাফল্য ছিল ২০০৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত লাগে রাহো মুন্নাভাই আর ২০০৭ সালের শ্যুটআউট অ্যাট লোখান্ডওয়ালা। এরপর তার ক্যারিয়ারে রামান কুমার পরিচালিত ক্রস-বর্ডার রোমান্সের ছবি সারহাদ পার, সঞ্জয় গাদভীর রিভেঞ্জ ড্রামা কিডন্যাপ, সোহাম শাহর থ্রিলার লাক, টনি ডি’সুজার ওশানিক অ্যাডভেঞ্চার ব্লু এবং রাম গোপাল ভার্মার কপ থ্রিলার ডিপার্টমেন্ট, প্রতিটি ছবিই ছিল ফ্লপ।

এরপর সঞ্জয়ের জানজীর, জিলা গাজিয়াবাদ ও পুলিশগিরি ছবিগুলোও মুখ থুবড়ে পড়েছিল বক্স অফিসে। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তার প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ছিল ভূমি, যেখানে তিনি অভিনয় করেছিলেন এক ধর্ষিতা মেয়ের বাবার চরিত্রে। বক্স অফিসে সে ছবিটিও এমনই ডিজাস্টার ছিল যে তিনি বাধ্য হন একই পরিচালক ওমাং কুমারের সাথে তার চুক্তিবদ্ধ পরবর্তী ছবিটি থেকেও নাম প্রত্যাহার করে নিতে।

অর্থাৎ সঞ্জয় দত্তের ক্যারিয়ার গত এক দশকে পুরোপুরি কোমায় চলে গিয়েছে। ১১ বছর হয়ে গেছে তার ক্যারিয়ারে একটিও হিটের দেখা মেলেনি। এমন অবস্থা থেকে কি আদৌ তার পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব? অন্য কোন অভিনেতার ক্ষেত্রে এমন প্রশ্নও হতো সম্পূর্ণ অবান্তর। কিন্তু যে অভিনেতার বায়োপিক দর্শকদের মাঝে এতটা সাড়া জাগাতে পারে, তার ক্ষেত্রে চিন্তার অবকাশ রয়েছে অবশ্যই। 

সঞ্জয় দত্ত, সাঞ্জু, ক্যারিয়ার

তবে ট্রেড অ্যানালিস্ট অমোদ মেহরার বিশ্বাস, সঞ্জয় দত্তের ক্যারিয়ার এতটাই বাজে অবস্থায় চলে গিয়েছে যে তার বায়োপিক নিয়ে যতই হাইপ তৈরী হোক না কেন, সেটি তার ক্যারিয়ারের পুনর্জাগরণের জন্য যথেষ্ট হবে না। “সাঞ্জুর সাফল্য থেকে কেবল একজনই লাভবান হবেন। তিনি হলেন রনবীর কাপুর। সঞ্জয় দত্তের ইমেজ কিছুটা হলেও ইতিবাচক হবে। তার অতীত নিয়ে যেসব নেতিবাচক বিতর্ক রয়েছে, সেগুলো হ্রাস পাবে। কিন্তু এর ফলের তার ক্যারিয়ারে কোন উন্নতি হবে না, বক্স অফিসেও সাফল্য পাবেন না, যদি না তিনি খুব ভালো কোন ছবি নিয়ে হাজির হন।”

তবে আরেক ট্রেড অ্যানালিস্ট ও এডিটর অতুল মোহন এ ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করে বলেন, “বৃহদার্থে দেখতে গেলে, হ্যাঁ। সাঞ্জু বক্স অফিসে খুব বড় রকমের হিট হয়েছে। এর মানে হলো দর্শক ছবিটিকে গ্রহণ করেছে। এবং যেহেতু সঞ্জয় দত্ত ছবির মুখ্য চরিত্র, তাই ধরে নেয়া যায় দর্শকদের মাঝেও তাকে ঘিরে নতুন ধরণের গ্রহণযোগ্যতার মাত্রা তৈরী হয়েছে। হিরানী ও রনবীর অবশ্যই ছবিটির বক্স অফিস সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছেন, কিন্তু দর্শক যদি ‘বাবা’র ব্যাপারে আগ্রহী না হতো, তাহলে ছবিটি এত বড় হিট হতো না। সাঞ্জুর মাধ্যমে রনবীরের ক্যারিয়ারেও নতুন রং লেগেছে। তাই আমি মনে করি একটি ব্লকবাস্টারের মাধ্যমে একজন নয়, দুইজন সুপারস্টার লাভবান হচ্ছেন।”

একই সুরে কথা বলেন গিরিশ জোহরও, “সঞ্জয় দত্ত সবসময়ই ছিলেন। হ্যাঁ, তরুণ প্রজন্মের কাছে সাঞ্জুর মাধ্যমে সঞ্জয় দত্তের গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে গেছে। তারা এখন নতুন আঙ্গিকে চিনতে ও জানতে পেরেছে সঞ্জয় দত্তকে। তাই আগামী দিনগুলোতে তারা সঞ্জয় দত্ত ও তার ছবিগুলোর সাথে আরও ভালোভাবে কানেক্ট করতে পারবে। ফলে সঞ্জয় দত্তের তরুণ ও নতুন প্রজন্মের অডিয়েন্সের সংখ্যাও বাড়বে।”

সুতরাং সাঞ্জুর সাফল্যের ফলে সঞ্জয় দত্তের পরবর্তী ছবিগুলো অবশ্যই হিট হবে, এমন গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবে না ঠিকই, কিন্তু তার আগামী ছবিগুলোকে কেন্দ্র করে দর্শকমনে নিঃসন্দেহে বাড়তি উন্মাদনা দেখা দেবে। অনেকেই নিছক আগ্রহের বশে সঞ্জয় দত্তের নতুন ছবি দেখতে হলমুখী হবে। তবে দিনশেষে কনটেন্টই সব। সঞ্জয় দত্তের আগামী ছবির কনটেন্ট যদি শক্তিশালী হয়, কাহিনী যদি যুগোপযোগী হয়, তাহলেই কেবল নতুন করে সেজে উঠবে তার ক্যারিয়ার!

Comments
Spread the love