সিনেমা হলের গলি

মাই নেইম ইজ ‘সঞ্জু’ এন্ড আই এম নট এ টেরোরিস্ট

করন জোহরের ‘মাই নেইম ইজ খান’ মুভিটার কথা মনে আছে? নিউইয়র্কে টুইন টাওয়ার হামলার পর আমেরিকায় ধর্মীয় অসন্তোষ বাড়তে বাড়তে এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে প্রতিটি মুসলমানের দিকেই টেরোরিস্ট সন্দেহে তাকানো হতো। সে প্রেক্ষাপটেই রিজওয়ান খান নামের এক মানুষের যুদ্ধ দেখানো হয় তাকে দেয়া টেরোরিস্ট ট্যাগের বিরুদ্ধে। যদিও করনের কাহিনী ফিকশন ছিল কিন্তু মূল প্রেক্ষাপটের বাস্তবেও যে অস্তিত্ব ছিল তা সকলেই জানে।

কোন একটা বড় ঘটনার পর আমরা সাধারণ মানুষরা জেনারালাইজড মন্তব্য করতে পছন্দ করি। আর মিডিয়া তো আরও এক কাঠি সরেস, তারা সেই জেনারালাইজড মন্তব্যকে পারলে স্ট্যাবলিশ করে ফেলে। ফলে ঝরে যায় অনেক জীবন, অনেকগুলো সুখী গল্প; ছোট্ট অপরাধ হয়ে যায় টেরোরিজম, শুধরানোর সুযোগ দেয়া হয় না। সেরকমই এক গল্প হতে পারতো সঞ্জয় দত্তের নিজেরও। চাইলেই সঞ্জু ঝরে পড়তে পারতো আর দশটা ফল্টি মানুষের মতো। চাইলেই আরও নীচে নেমে পালিয়ে থাকতে পারতো সুদূর কোন দ্বীপরাষ্ট্রে। কিন্তু সঞ্জু আর যাই করুক কখনো পলায়নপর হয় নি, সে বারবার ফিরে এসে নিজের ভাগ্যকে বরণ করে নিয়েছে। তাই তো তার গল্পটি হয়েছে আর দশটি গল্প থেকে আলাদা।

জীবনের প্রায় শেষ প্রান্তে এসে সেই গল্পের ভাণ্ডারই তিনি খুলে দিয়েছিলেন দীর্ঘদিনের বন্ধু রাজকুমার হিরানীর কাছে। রাজু মুন্নাভাই করতে গিয়ে সঞ্জয় আর সুনীল দত্তকে যতটুকু জেনেছিলেন সেটি যে সঞ্জয়ের জীবনের ১% ও না সেটি গল্পের শুরুতেই বুঝে গিয়েছিলেন। সে গল্পের বিশালতা একা ধারণ করা সম্ভব না বলে সঙ্গী হয়েছিল অভিজাত জোশিও। এই দুজনে মিলে কতো কতো সরল অথচ অসাধারণ গল্প সিনেমার মাধ্যমে উপহার দিয়েছেন দর্শকদের। সঞ্জয়ের গল্প শুনে তাদের মনে হল এবার সময় হল বুঝি একটি জটিল গল্প বলার। যেখানে অল ইজ ওয়েল, রং নাম্বারের মতো কোন ক্যাচি লাইন ঢুকানোর জো নেই; সার্কিট কিংবা চতুরের মতো ক্যারেক্টার সাজানোর সুযোগ নেই। সিনেমায় বলতে হবে একটা জীবনের গল্প, যা সিনেমার চেয়েও বেশি সিনেম্যাটিক। বলতে হবে সঞ্জুর গল্প, যে কীনা আর যাই হোক টেরোরিস্ট নয়।

সাঞ্জু, সঞ্জয় দত্ত, রনবীর কাপুর, রাজকুমার হিরানী

সঞ্জুর গল্পে উঠে এসেছে তার ১৯৮০ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত টাইমলাইন। নায়ক সঞ্জু থেকে ব্যক্তি সঞ্জুই যেখানে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। বাবা সুনীল দত্তের হাত ধরে সঞ্জুর সিনেমায় শুরু থেকে গল্প শুরু হয়ে তার ড্রাগস লাইফ, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, অসৎ সঙ্গ, প্রেমজীবন, ৯২ এর দাঙ্গা পরবর্তী সময় আর পুনরায় উত্থানই গল্পের অধিকাংশ জায়গা দখল করেছে। রাজু হিরানী চাইলেই গল্পকে একরৈখিকভাবে বর্ণনা করতে পারতেন, তাতেও উত্তেজনার কমতি হতো না। কিন্তু মাস্টার ডিরেক্টর সবসময়ই তো খেলা করেছেন তার ন্যারেশন নিয়ে, এবারও তাই করলেন। নিজেকে আর অভিজাতকে বসালেন বায়োগ্রাফি রাইটার আনুশকার জায়গায় আর কখনো সঞ্জুর বয়ানে, কখনো তার বন্ধুর বয়ানে খুলতে লাগলেন একের পর এক গল্পের পরত। সে গল্পে উঠে আসলো সঞ্জুর বহুমাত্রিক জীবন।

কীভাবে অসৎ সঙ্গে পরে সঞ্জু ড্রাগসের পৃথিবীতে হারিয়ে যায়। বাবা সুনীল দত্ত আর মা নার্গিস চেষ্টা করেও যে পথ থেকে ফেরাতে পারে নি তাকে। মায়ের মৃত্যুর পর যেখান থেকে বের হয়ে আসা সঞ্জুর জন্য অসম্ভব বলেই মনে হয়। এহেন কোন ড্রাগস নেই যা সঞ্জু নেয় নি সেসময়কালে। সেসময় ত্রাতা হিসেবে বাবা সুনীল দত্তকেই আসতে সঞ্জুর জীবনে। সুনীল দত্ত সবসময়ই ফাদার ফিগার ছিলেন, সঞ্জুকে গাইডলাইন দিতে চাইতেন। কিন্তু এবার তিনি আসলেন সঞ্জুর বন্ধু হয়ে। আমেরিকায় রিহ্যাবে পাঠানো হয় সঞ্জুকে, সে পাহাড়সম বাঁধা টপকে অবিশ্বাস্যভাবে সঞ্জু কামব্যাক করে। ড্রাগের ছোবল থেকে নিজেকে বের করে নিয়ে আসে। দুলাইনে লিখে শেষ করলেও সে কষ্ট আসলে লিখে বোঝানো সম্ভব না। বেডের সাথে বেঁধে রাখা হতো তাকে, পালিয়েও গিয়েছিল, ভিক্ষা করে বাসের টিকিট সংগ্রহ করতে হয়েছে, মানুষের দেয়া এটো স্যান্ডউইচ খেয়ে খিদে মেটাতে হয়েছে। তাও সঞ্জু হার মানে নি, ফিরে এসেছে আবার ক্লিন হয়ে। তখন থেকে আজ অব্দি সঞ্জয় দত্ত কোন ড্রাগ নেন নি বলেই তিনি দাবী করেন। কিন্তু সঞ্জুর ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ সেখানেই থেমে থাকে নি।

বলিউড আর আন্ডারওয়ার্ল্ডের সম্পর্ক বেশ পুরনো। সঞ্জয়ও বাবা সুনীল দত্তের অজান্তেই জড়িয়ে যান সে অন্ধকার দুনিয়ার সাথে। বাবরি মসজিদে হামলা হবার পর থেকেই দাঙ্গা বাড়তে থাকে ভারতজুড়ে। সুনীল দত্ত পলিটিশিয়ান হিসেবে তখন বেশ নামী নাম। তিনি তখন ত্রাতা হিসেবে হাজির হন তার এলাকার মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য। কিন্তু ভারতের কট্টর হিন্দু সংগঠনগুলো এই ব্যাপারটা ভালোভাবে নেয় নি। তারা সঞ্জয় দত্তকে ক্রমাগত হুমকি দিতে থাকে। তার বাবাকে হত্যা করা হবে, বোনদের রেইপ করা হবে। সঞ্জু ভয়ে ভয়ে দিনাতিপাত করতে লাগলো আর জীবনের সবচেয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিলো নিরাপত্তার জন্য নিজ বাড়িতে একে ৫৬ রাইফেল রেখে। আবু সালেম, কাইয়ুমদের সাথে রাখা এই সম্পর্কই সঞ্জুর জীবনের কালো অধ্যায়ের সূচনা করলো আরও একবার। টাডা এক্টে দোষী প্রমাণিত হয়ে টেরোরিস্ট ট্যাগ লেগে গেল সঞ্জুর গায়ে। কারাবরণ করতে হল সেসময়ের সুপারহিট এই নায়ককে। অন্ধকার এক সেল, সঙ্গী ছিল ইঁদুর আর পিঁপড়া, বৃষ্টির রাতে টয়লেট থেকে ভেসে আসতো মলের পানি; এসবের মাঝেই দিনাতিপাত করতে হতো সঞ্জুকে। একটা ভুল সিদ্ধান্ত তার আর তার পরিবারের দিনগুলোকে করে তুলেছিল অসহনীয়।

এর মাঝেও তার বাবা সুনীল দত্ত হার মানেন নি। রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন ছেলেকে বেইল দেয়ার জন্য, পত্রিকা অফিসে ছুটেছেন ছেলেকে নিয়ে চটকদার শিরোনাম দেয়া বন্ধ করার জন্য। সঞ্জু জেল থেকে বের হবার পর নিজের ভুলগুলো বুঝতে পেরে আবার ক্যারিয়ারে মন দেয়। রাজু হিরানীর হাত ধরেই ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্য পায় মুন্না ভাই চরিত্রের মাধ্যমে। সঞ্জুকে আবারও ভালোবেসে ফেলে আপামর দর্শক, তবুও টেরোরিস্ট ট্যাগ মুছছিল না। সেই এক ট্যাগের বিরুদ্ধে সারাজীবন যুদ্ধ করতে হয়েছে সঞ্জুকে, এখনো করে যাচ্ছে। এখন বাবা সুনীল দত্ত সাথে নেই কিন্তু সঙ্গী হয়ে আছে তার বহুমাত্রিক জীবনের গল্প। সে গল্পই রাজু হিরানী উপস্থাপন করেছেন তার স্বভাবসুলভ হাস্যরস আর আবেগের মিশেলে। সঞ্জয় দত্তের চরিত্রে অভিনয় করেছে রনবীর কাপুর আর বাবা সুনীল দত্ত হচ্ছেন পরেশ রাওয়াল। এই দুজনের পাশাপাশি আরেক বলিষ্ঠ চরিত্র বন্ধু কমলেশ্বর হিসেবে ভিকি কৌশল। আর বাকিরা ছোট্ট আর ইমপ্যাক্টফুল রোলে।

রনবীর তার জীবনের সেরা অভিনয় করেছেন কীনা সে তর্কে যাব না তবে এটা মেনে নিতেই হবে সঞ্জয় দত্তকে এর চেয়ে ভালো কেউ উপস্থাপন করতে পারতো না। একইরকম ফিল্ম ফ্যামিলিতে বড় হওয়া, নেপোটিজমের ট্যাগ নিয়ে সিনেমায় আসা তারপর প্রতিভা দিয়ে নিজের অবস্থান টিকিয়ে রাখা এদিক থেকে রনবীর চাইলে নিজেকে সঞ্জয়ের সাথে রিলেট করতে পারেন। কিন্তু সঞ্জয় চরিত্রে নিজেকে ঢেলে দিতে রনবীর এক্সট্রা কী করেছেন তা একমাত্র তিনিই জানেন। এ বছরের সকল পুরষ্কার, ব্যবসায়িক সাফল্য সবকিছু রনবীর পাবেন তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। সুনীল দত্ত ব্যক্তি হিসেবে লার্জার দ্যান লাইফ ছিলেন, পরেশ রাওয়ালও সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন নিজেকে লার্জার দ্যান লাইফ দেখানোর। তার ডায়লগ ডেলিভারি, ইমোশনাল এক্সপ্রেশন সবকিছুই পারফেক্ট ছিল। রনবীরের সাথে তার রসায়ন অবাক করে দিয়ে­ছে সঞ্জু আর সুনীল দত্তের রসায়ন কেমন ছিল তা ভাবতে গিয়ে। বাবা-ছেলের এমন গল্প সিনেমায় খুব কমই দেখা যায়। রনবীর আর পরেশ রাওয়ালের সাথে দাপিয়ে অভিনয় করেছে আরেকজন, তিনি ভিকি কৌশল। সঞ্জুর বন্ধুর ভূমিকায় ভিকির অভিনয় এবারের সব সাপোর্টিং এক্টরের পুরষ্কার তার করে দিয়েছে নিশ্চিত। কখনো কখনো যেন রনবীর আর পরেশকেও ছাড়িয়ে গেছেন ভিকি অভিনয়ের দিক দিয়ে। মনীষা কৈরালাকে নার্গিস হিসেবে দেখা সত্যিই অনবদ্য এক এক্সপেরিয়েন্স ছিল। কী দারুণ স্ক্রিন প্রেজেন্স, কী দুর্দান্ত ডায়লগ ডেলিভারি, স্ক্রিনে আসলেই স্ক্রিনকে নিজের করে নিতেন। অন্যান্য চরিত্রে আনুশকা, দিয়া মির্জা, সোনম কাপুর, বোমান ইরানী, জিম সার্ভ সবাই যোগ্য সঙ্গ দিয়েছেন।

‘সঞ্জু’ রাজকুমার হিরানীর বেস্ট ফিল্ম নয়, রাজু এটাকে তার সেরা সিনেমা বানাতেও চান নি। তিনি বলতে চেয়েছেন একজন মানুষের গল্প, যে মানুষটা জীবনে অনেক ভুল করেছে। সে ভুলগুলোর আফটার ইফেক্ট দেখাতে চেয়েছেন, ফ্যামিলি বন্ডিং কেন জরুরী সেটা বোঝাতে চেয়েছেন। সঞ্জুকে নায়ক না মানুষ হিসেবে প্রকাশ করেছেন রুপালী পর্দায়। অন্য কেউ হলে নিজেকে এমনভাবে দেখতে চাইতো না হয়তো পর্দায় কিন্তু সঞ্জয় দত্ত পেরেছেন নিজের ভুলগুলোকে আরও শত কোটি মানুষকে দেখাতে। আর হয়তো বলতে চেয়েছেন একটা কথাই- মাই নেইম ইজ সঞ্জু এন্ড আই এম নট এ টেরোরিস্ট…

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close