সবশেষ যে সিনেমাটার জন্যে আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছিলাম, সেটার নাম ছিল ‘জাব হ্যারি মেট সেজেল’। বাকীটা ইতিহাস। প্রিয় পরিচালক, তারচেয়ে প্রিয় অভিনেতা, দুজনে মিল যে কি জগাখিচুড়ি বানালেন, সেটাই বুঝে উঠতে পারি নি। এরপর থেকে সিনেমার জন্যে অপেক্ষা করা ছেড়ে দিয়েছি। আশাভঙ্গের বেদনার চাইতে প্রত্যাশা না করাই তো ভালো।

তবে হ্যাঁ, কিছু মানুষ আপনাকে কখনোই নিরাশ করবেন না। রাজকুমার হিরানী এমনই একজন। ‘সাঞ্জু’ রিলিজ পেয়েছে গতকাল, আমাদের তো আর সিনেমা হলে গিয়ে সেটা দেখার সুযোগ নেই, থাকলে হয়তো ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো মিস হবার কোন চান্সই থাকতো না। সেকারণে হলপ্রিন্টের পাইরেটেড কপিই একমাত্র ভরসা।

সিনেমার ট্যাগলাইন ছিল ‘ওয়ান ম্যান, মেনি লাইভস’। এই বাক্যটা সার্থক। সঞ্জয় দত্ত সম্ভবত বলিউডের সর্বকালের সবচেয়ে বিতর্কিত মানুষগুলোর একজন। তার বায়োপিক বানানোটাও সবচেয়ে কঠিণ কাজগুলোর একটা। সেই মিশনে কেমন করলেন রাজকুমার হিরানী?

সিনেমার মেকিং এককথায় দুর্দান্ত। স্টোরিটেলিং ওয়াজ ফ্যান্টাস্টিক। এমন চমৎকার করে সঞ্জয়ের ঘটনাবহুল জীবনের গল্পটা রাজকুমার হিরানী আর অভিজাত জোশী ছাড়া আর কেউ বলতে পারতেন না, বলতে পারবেনও না। হিরানী নিজেকে ভেঙেছেন এই সিনেমায়, তবুও এটা তার সেরা সিনেমা নয়। কেন? বলবো সেটা। তার আগে সিনেমার ভেতরের কথাবার্তা একটু বলে নিই।

মোটাদাগে সঞ্জয়ের জীবনের বেশ কয়েকটা অংশকে তুলে আনা হয়েছে সাঞ্জুতে। মাদক আর জেল তো ছিলই, সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ যেটা নিয়ে থাকার কথা, সেই বেআইনী অস্ত্র রাখার ব্যাপারটাও চেপে যাননি হিরানী বা সঞ্জয় কেউই। আরেকটু ডিটেইলে বলতে গেলে, এটা সঞ্জয়ের নিজের সাথে নিজের লড়াইয়ের গল্প, বাবা-ছেলের চমৎকার একটা সম্পর্কের গল্প, আর দুজন বন্ধুর একে অন্যের পাশে শক্ত হয়ে দাঁড়ানোর গল্প। এর বাইরেও অনেক কিছুই ছিল। কিন্ত মূল চরিত্র তিনজনই।

টিজার আর ট্রেলার দেখে রনবীর কাপুর কি করবেন সেটার একটা আন্দাজ পাওয়া গিয়েছিল। সঞ্জয়রূপী রনবীর তো জানিয়েই দিয়েছিলেন, শক্ত হয়ে বসুন, তুফান আসছে! তুফান নিয়ে এসেছেন রনবীর নিজেই। একটা মানুষ আরেকটা মানুষের চরিত্রে এভাবে ঢুকে যেতে পারে, একটা চরিত্রের সাথে নিজেকে মিশিয়ে একাকার করে ফেলতে পারে, সেটা সাঞ্জু না দেখলে, রনবীরের অভিনয় না দেখলে বোঝা সম্ভব নয়। এমন দুর্দান্ত ট্রান্সফরমেশন রনবীরের চাইতে ভালো এই মূহুর্তে বলিউডে আর কেউ করে দেখাতে পারবেন না বোধহয়।

সাঞ্জু’র মাতাল অবস্থার দৃশ্যগুলো, আর প্রথমবার জেল খাটার সময়টায় রনবীরের অভিনয় উপভোগ করেছি তারিয়ে তারিয়ে। ড্রাগের জন্যে একটা মানুষ কতটা বেপরোয়া হতে পারে, সেটা একজন ড্রাগ অ্যাডিক্ট ছাড়া আর কেউ বুঝবে না। পর্দায় রনবীরকে দেখে একবারও মনে হয়নি তিনি মাতাল নন। কোকেন না পেয়ে মৃগিরোগীর মতো খিঁচুনী উঠছে তার, সেই দৃশ্যগুলোতে তিনি কি অসাধারণ অভিনয়টাই না করলেন!

অভিনয় জিনিসটা শুধু ঈশ্বরপ্রদত্ত প্রতিভার ব্যাপার নয়। সেটার জন্যে ডেডিকেশন লাগে, কঠোর সাধনা আর অমানুষিক পরিশ্রমও দরকার হয়। সাঞ্জু’র রোলে অভিনয়ের জন্যে মেকাপ নিতে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ-ছয় ঘন্টা সময় লাগতো। রনবীর রাত তিনটায় এসে হাজির হয়ে যেতেন সেটে, কোন অভিযোগ-অনুযোগ ছাড়াই। ভোর আটটা থেকে শুটিং শুরু হতো, বাকীদের চেয়ে পাঁচঘন্টা আগে এসে সেটে বসে থাকতেন রনবীর। সেই পরিশ্রমের সুফলটার দেখা মিলেছে সাঞ্জুতে। প্রতিটা ডায়লগে, প্রতিটা সিকোয়েন্সে আপনি সঞ্জয় দত্তকে খুঁজে পাবেন, রনবীর কাপুরকে নয়।

তবুও রনবীর এই সিনেমার নায়ক নন। সাঞ্জু আসলে এন্টি-হিরো। নায়ক বলা যায় অন্য দুজনকে। একজন ভিকি কৌশল। রনবীরের সঙ্গে প্রতিটা দৃশ্য পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন। যে সিকোয়েন্সেই দুজন একসঙ্গে ছিলেন, সিনেমা এগিয়েছে ঝড়ের গতিতে, সময় কেটেছে রকেটের বেগে। দুর্দান্ত রনবীরের পাশে একবারের জন্যেও ফ্যাকাশে মনে হয়নি ভিকি কৌশলকে। এই ছেলে জাত অভিনেতা।

সুনীল দত্তের চরিত্রে পরেশ রাওয়ালকে একটু যেন বেমানান মনে হলো। এমনিতে পরেশ রাওয়ালের অভিনয় নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না, বরাবরই তিনি নিজের দিকে আলোটা কেড়ে নেন, এই সিনেমাতেও সেটা করেছেন। তবুও সুনীল দত্ত হিসেবে তাকে মেনে নিতে খুঁতখুঁত করলো মন। আবারও বলছি, পরেশ রাওয়ালের অভিনয় নিয়ে কোন কথা হবে না। সঞ্জয়ের আরেক বন্ধুর চরিত্রে জিম সার্ভও ভালো করেছেন।

নারী চরিত্রগুলোর মধ্যে কোনটারই গভীরতা নেই। দিয়া মির্জা-সোনম কাপুর তো অভিনয়ের সুযোগই পেলেন না। আনুশকার স্ক্রীনটাইম এই দুজনের চেয়ে বেশি ছিল, কিন্ত তিনিও যে খুব আহামরি কিছু করেছেন, তেমনটা নয়। তবে অল্প কয়েকটা মিনিটের স্ক্রীনটাইমেই ঝলক দেখিয়েছেন মনীষা কৈরালা। এটাই বোধহয় অভিনেতা আর জাত অভিনেতার মধ্যে পার্থক্য। মনীষা যে কয়টা দৃশ্যে ছিলেন, সেগুলো মনে থাকবে অনেকদিন!

এবার বলি, কেন হিরানীর সেরা সিনেমা নয় সাঞ্জু। বলিউডি বায়োপিকের একটা সমস্যা আছে। এখানে হয় কাউকে ফেরেশতা বানিয়ে দেয়া হয়, নয়তো সাক্ষাৎ শয়তান বানানো হয়। রাজকুমার হিরানীও সেই চেনা রাস্তার বাইরে হাঁটেননি। প্রায় পুরো গল্পটা আপনাকে শুনতে হবে সঞ্জয়ের মুখে, ঘটনাগুলো আপনি জানবেন সঞ্জয়ের পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে। হিরানীর সিনেমায় সাঞ্জুও সেই সুযোগটা নিয়েছেন, লুকোচুরি খেলেছেন। আদালতে কিংবা মিডিয়ার সামনে নিজেকে নির্দোষ দাবী করে যে যুক্তিগুলো সঞ্জয় দত্ত দিয়েছিলেন, সেগুলোই সিনেমায় দেখবেন আপনি। ব্যাপারটা তাই নতুন বোতলে পুরনো মদের মতোই। এর বেশি বলতে গেলে স্পয়লার হয়ে যাবে, এখানেই তাই থামছি।

হিরানীর গল্পটা গুণ্ডা থেকে ডাক্তার বনে যাওয়া মুন্নাভাইকে নিয়ে হোক, কিংবা ভীনগ্রহ থেকে উড়ে আসা পিকে’কে নিয়েই হোক, সেখানে ইমোশন থাকবে, হিউমারও থাকবে। এই দুটো একসঙ্গে পরিমাণমত মেশানোর কাজটা খুব ভালো জানেন হিরানী। সাঞ্জু’তেও সেই ককটেলটা বানাতে ভুল করেননি তিনি। এবং সেই ইমোশন বা হিউমার, কোনটাই জোর করে আরোপিত নয়। আগেই বলেছি, ব্রিলিয়ান্ট মেকিং, আউটস্ট্যান্ডিং স্টোরি টেলিং। এই দুইয়ের দুর্দান্ত কম্বিনেশনে সাঞ্জু অন্যরকম একটা মাত্রা পেয়েছে। আর অসাধারণ অভিনয় তো আছেই!

সাঞ্জু’র টিজারের শুরুতে লেখা ছিল, ‘এই গল্পটা শুনলে আপনি বিশ্বাস করতে পারবেন না।’ কথাটা সত্যি। গল্পের অনেক কিছুই বিশ্বাস হবে না তাদের, যারা সঞ্জয়ের জীবনটাকে মোটামুটি হলেও জানেন। যদিও বায়োপিকে শতভাগ সত্যি আশা করে লাভ নেই। সেটার দরকারও নেই বোধহয়। সিনেমায় কিছু সিনেম্যাটিক ব্যাপার নাহয় থাকুক, কিছু প্রশ্ন নাহয় উঠুক। ফিকশনের নীচে চাপা পড়ে থাকুক কিছু ‘আনটোল্ড ট্রুথ’। নায়ক সঞ্জয় দত্তকে আমি-আপনি পছন্দ না’ই করতে পারি, কিন্ত সিনেমার সাঞ্জুকে আপনি পছন্দ না করে পারবেন না, তার প্রতি খানিকটা সিম্প্যাথি আপনার মনে জন্ম নেবেই। কে জানে, সেটাই হয়তো সিনেমাটা বানানোর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল!

Comments
Spread the love