প্রথম সপ্তাহে শুধু ভারতের বক্স অফিস থেকেই দুইশো কোটি রূপি আয় করেছে সাঞ্জু। দর্শকেরা ভীষণ পছন্দ করেছেন ‘সাঞ্জু’রূপী রনবীর কাপুরের অভিনয়, সমালোচকেরাও স্ততির বন্যায় ভাসাচ্ছেন তাকে। প্রশংসা পাচ্ছেন পরিচালক রাজকুমার হিরানীও। সঞ্জয় দত্তের বহুমূখী জীবনের উল্লেখযোগ্য কিছু অধ্যায়কে রূপালী পর্দায় তুলে ধরার কঠিণ কাজটা হিরানীর মতো করে বলিউডে আর কেউ হয়তো পারতেন না। তবুও হিরানীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে সত্যকে আড়াল করার, প্রশ্ন উঠেছে, সঞ্জয় দত্তের ইমেজ ক্লিন করার জন্যেই এই সিনেমাটা বানিয়েছেন কিনা তিনি!

অভিযোগ ওঠার কারণও আছে। সঞ্জয় দত্ত যে জঙ্গীবাদ কিংবা মুম্বাই বোম্ব ব্লাস্টের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, সেটা আদালতের রায়েই প্রমাণ হয়েছে। তবে বেআইনী অস্ত্র রাখার দায় তিনি এড়িয়ে যেতে পারেননি, সেই মামলায় সঞ্জয়কে জেল খাটতে হয়েছে পাঁচ বছর। সিনেমায় এই জায়গাগুলোতে কৌশলে সঞ্জয়ের প্রতি মানুষের সহানুভূতি তৈরি করার চেষ্টা করেছেন হিরানী। মাদক থেকে শুরু করে একে-৫৬ রাইফেল, সিনেমায় সব ব্যাপারেই একটা না একটা অজুহাত দেখিয়েছেন সঞ্জয়, দর্শককে সেটা জোর বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করা হয়েছে। টিভি টক শো-তে সঞ্জয় দত্ত নিজের মুখে যে কথা বলেছেন, সেটারই উল্টো প্রতিচ্ছবির দেখা মিলেছে সাঞ্জু-তে।

সিনেমায় সিনেম্যাটিক ব্যাপার থাকবেই। তবে সেটা সত্যের সাথে সাংঘর্ষিক হলেই সমস্যাটা তৈরি হয়। সাঞ্জু’তেও পরিচালক রাজকুমার হিরানী কিছু জায়গায় এমন সব সত্যকে এড়িয়ে কল্পনার আশ্রয় নিয়েছেন, যাতে করে সাধারণ মানুষের কাছে সঞ্জয়ের অপকর্মগুলোকে ‘পরিস্থিতির শিকার’ বলে মনে হতে পারে, কখনও বা মনে হবে সঞ্জয় দত্ত বুঝি এগুলো ‘বাধ্য হয়েই’ করেছেন! দর্শকদের সাথে এই সাইকোলজিকাল আর ইমোশনাল গেমটা হিরানী কেন খেললেন, সেটা অনেকেরই বোধগম্য নয়। সাঞ্জুর ট্যাগলাইন ‘ওয়ান ম্যান মেনি লাইভস-কে ব্যাঙ্গ করে ওয়ান ম্যান মেনি লাই’স(মিথ্যে) ডাকতেও ছাড়ছে না অনেকে।

সাঞ্জু, রাজকুমার হিরানী, সঞ্জয় দত্ত, মুম্বাই ব্লাস্ট, বেআইনী অস্ত্র, মাদক

প্রথমেই আসা যাক মাদকে ডুবে যাওয়ার ব্যাপারটায়। সিনেমায় দেখানো হয়েছে, বাবার প্রতি অভিমান আর মায়ের অসুস্থতার দুঃখ ভুলতেই মাদকের শরণাপন্ন হয়েছিলেন সঞ্জয় দত্ত। বাস্তবে ব্যাপারটা মোটেও এরকম কিছু ছিল না। ছোটবেলা থেকেই সঞ্জয় দত্ত ছিলেন খামখেয়ালী রাজপুত্র। কলেজ জীবন থেকেই মাদকের সঙ্গে তার বসবাস, বন্ধুদের মাধ্যমে নেশার জগতের সঙ্গে তার পরিচয়। সেখানে অভিমান বা কষ্টের কোন ঘটনা ছিল না।

সিনেমায় দেখা যায়, সঞ্জয়ের মা নার্গিস দত্ত তার ছেলের মাদকাসক্তির ব্যাপারে কিছুই জানতেন না। তবে সত্যিটা হচ্ছে, পরিবারের মধ্যে সঞ্জয়ের এই মাদকে ডুবে যাওয়ার ঘটনাটা সবার আগে বুঝতে পেরেছিলেন নার্গিসই। এমনিতেই মায়ের সঙ্গে ভীষণ নৈকট্য ছিল সঞ্জয়ের। নার্গিস চেষ্টা করেছিলেন সঞ্জয়কে এই ধ্বংসের পথ থেকে ফেরানোর, কিন্ত তিনি সেটা পারেননি। নার্গিস তখন ক্যান্সারের সঙ্গে লড়ছেন, সুনীল দত্তের সঙ্গে সঞ্জয়ের সম্পর্ক ছিল খানিকটা শীতল। একারণে ছেলের মাদকাসক্তির ব্যাপারে স্বামীকে কিছু জানাননি নার্গিস।

বর্তমান স্ত্রী মান্যতা দত্তের উপস্থিতি থাকলেও, সঞ্জয় দত্তের প্রথম স্ত্রী রিচা শর্মার কোন অস্তিত্বই নেই সিনেমায়। একইভাবে নেই দ্বিতীয় স্ত্রী রিয়া পিল্লাইয়ের অস্তিত্বও। রিচা শর্মাকে সঞ্জয় ডিভোর্স দিয়েছিলেন যখন রিচা ব্রেইন টিউমারে আক্রান্ত। ডিভোর্সে রাজী ছিলেন না রিচা, কিন্ত সঞ্জয় সংসার করতে চাননি তার সঙ্গে। ১৯৯৬ সালে মারা যান রিচা শর্মা। এক ম্যাগাজিনে দেয়া সাক্ষাৎকারে রিচা দাবী করেছিলেন, মাধুরী দীক্ষিতের সঙ্গে সঞ্জয়ের প্রেমই নাকি তাদের সংসার ভাঙার কারণ।

সাঞ্জু, রাজকুমার হিরানী, সঞ্জয় দত্ত, মুম্বাই ব্লাস্ট, বেআইনী অস্ত্র, মাদক

মাধুরীর সঙ্গে সঞ্জয়ের প্রণয়ের ব্যাপারটাও সিনেমায় নেই। অবশ্য এটা যে থাকবে না, সেরকমটা আন্দাজ করা গিয়েছিল। এই ধরণের ব্যক্তিগত বিতর্কের ব্যাপার সিনেমায় না আসাই ভালো। নব্বইয়ের দশকের শুরুর সময়টায় চুটিয়ে প্রেম করেছেন এই দুই বলিউডি স্টার। সঞ্জয় তখন বিবাহিত, দুই সন্তানের জনক। ১৯৯৩ সালে মুম্বাই ব্লাস্টের পর যখন বেআইনী অস্ত্র রাখার দায়ে সঞ্জয় জেলে গেলেন, তখন মাধুরী দূরে সরে গিয়েছিলেন। বিতর্কিত এই অভিনেতার সঙ্গে হয়তো সম্পর্কটা আর টানতে চাননি মাধুরী দীক্ষিত।

বে আইনী অস্ত্র রাখার যে ব্যাপারটা, এখানেও লুকোচুরি খেলেছেন রাজকুমার হিরানী। সিনেমায় দেখানো হয়েছে, বাবার ওপর প্রাণনাশের হুমকি আসায় নিজের পরিবারকে রক্ষা করার জন্যেই একে-৫৬ রাইফেল নিজের কাছে রেখেছিলেন সঞ্জয় দত্ত। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, রাইফেলটা দাউদ ইব্রাহিমের সহযোগী আবু সালেমের থেকে কেন নিতে হলো সঞ্জয়কে? স্বাভাবিক উপায়ে একটা লাইসেন্স করা বন্দুক কি তিনি ঘরে রাখতে পারতেন না? একজন দাগী আসামী, চাঁদাবাজ মাফিয়ার থেকে কেন অস্ত্র নিতে হলো তাকে?

বাস্তবতা একদমই ভিন্ন। সঞ্জয় কেন, কি উদ্দেশ্যে একে-৫৬ রাইফেল আর বুলেটগুলো নিয়েছিলেন, সেগুলো নিজের কাছে রেখেছিলেন, এই সত্যিটা হয়তো তিনি ছাড়া আর কেউই জানে না। আদালত আর মিডিয়ার সামনে দেয়া বক্তব্যে তিনি দাবী করেছেন, পরিবারকে রক্ষার জন্যে অস্ত্র রেখেছিলেন তিনি। আবার এক টক-শো তে এসে বলেছেন, শিকারের ভীষণ শখ ছিল তার, শিকারের জন্যেই নাকি এইই বন্দুক নিজের কাছে রেখেছিলেন তিনি! একে-৫৬ দিয়ে শিকারের এই গালগপ্পো শুনলে জিম করবেটও বোধহয় আত্মহত্যা করতেন!

সঞ্জয় দত্ত, সুনীল দত্ত, বলিউড, বোম্বে ব্লাস্ট, বেআইনী অস্ত্র, নার্গিস

আন্ডারওয়ার্ল্ডের মাফিয়াদের সঙ্গে সঞ্জয় দত্তের সংযোগটা নতুন কিছু নয়। দাউদ ইব্রাহিমের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল, দাউদের বিশ্বস্ত যেসব সহকর্মী ছিলেন, ছোটা শাকিল, ছোটা রাজন, টাইগার মেমন, ইয়াকুব মেমন- এদের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ হতো সঞ্জয়ের। মুম্বাই ব্লাস্টের পরে ছোটা শাকিলের সঙ্গে সঞ্জয়ের বেশ কয়েকটা ফোন রেকর্ডও ফাঁস করেছিল মুম্বাই পুলিশ। অথচ সিনেমায় দেখানো হয়েছে ভানুদাদা নামের এক কমিক ভিলেনকে, যিনি সঞ্জয়কে চাপাচাপি করেন কোন এক গণপতি বিসর্জনের অনুষ্ঠানে! সিনেমায় ফিকশন থাকবে অবশ্যই, কিন্ত সেটা সত্যকে আড়াল করে নয়। এটা বোধহয় হিরানী ভুলে গিয়েছিলেন, অথবা ভুলে যেতে চেয়েছিলেন। উল্টো মিডিয়াকে ভিলেন বানানো হয়েছে সিনেমায়, যেন সঞ্জয়কে পাঁচ বছরের সাজা মিডিয়া ট্রায়ালেই দেয়া হয়েছিল!ম

বলিউডি বায়োপিকের একটা সমস্যা আছে। এখানে হয় কাউকে ফেরেশতা বানিয়ে দেয়া হয়, নয়তো সাক্ষাৎ শয়তান বানানো হয়। রাজকুমার হিরানীও সেই চেনা রাস্তার বাইরে হাঁটেননি। প্রায় পুরো গল্পটা আপনাকে শুনতে হবে সঞ্জয়ের মুখে, ঘটনাগুলো আপনি জানবেন সঞ্জয়ের পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে। হিরানীর সিনেমায় সাঞ্জুও তাই নিজেকে সাধু হিসেবে দাবী করার সুযোগটা নিয়েছেন, লুকোচুরি খেলেছেন। আদালতে কিংবা মিডিয়ার সামনে নিজেকে নির্দোষ দাবী করে যে যুক্তিগুলো সঞ্জয় দত্ত দিয়েছিলেন, সেগুলোই সিনেমায় দেখবেন আপনি। ব্যাপারটা তাই নতুন বোতলে পুরনো মদের মতোই।

সাঞ্জু’র টিজারের শুরুতে লেখা ছিল, ‘এই গল্পটা শুনলে আপনি বিশ্বাস করতে পারবেন না।’ কথাটা সত্যি। গল্পের অনেক কিছুই বিশ্বাস হবে না তাদের, যারা সঞ্জয়ের জীবনটাকে মোটামুটি হলেও জানেন। যদিও বায়োপিকে শতভাগ সত্যি আশা করে লাভ নেই। তবে সত্যি লুকিয়ে কারো অপরাধ ঢেকে দেয়ার জন্যে মনগড়া গল্প শোনানোটাও সমর্থনযোগ্য নয়। নায়ক সঞ্জয় দত্তকে আপনি পছন্দ না’ই করতে পারেন, কিন্ত সিনেমার সাঞ্জুকে আপনি পছন্দ না করে পারবেন না, তার প্রতি খানিকটা সিম্প্যাথি আপনার মনে জন্ম নেবেই। কে জানে, সেটাই হয়তো সিনেমাটা বানানোর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল!

Comments
Spread the love